১৭ বছরের নির্বাসনের পর দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তারেক রহমানকে ঢাকার বিমানবন্দরে হাজার হাজার মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। তবে পাঁচ দিনের মধ্যে মারা যান তার মা খালেদা জিয়া। বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যদি আমি আমার পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারি, মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।’
তিনি সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, খাল খনন, বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নতুন পরিকল্পনা নিয়েছেন। দেশে ফেরার পর এটাই ছিল বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রথম সাক্ষাৎকার। টাইম ম্যাগাজিন গতকাল বুধবার এটি প্রকাশ করে।
টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিসেম্বরে ঢাকার বিমানবন্দরে হাজার হাজার সমর্থক তাকে স্বাগত জানায়। তবে পাঁচ দিনের মধ্যেই মারা যান তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এই দুই বড় ঘটনা দেশের রাজনীতি ও জনগণের আবেগের সঙ্গে যুক্ত।
তারেক রহমান বলেন, ‘মা আমাকে শিখিয়েছেন, দায়িত্ব থাকলে তা পালন করতে হবে।’ তিনি দেশের আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রার্থী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে নানা সমস্যা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বেশি, টাকার মান কমেছে। বিদেশি মুদ্রা কমে যাওয়ায় আমদানি ও উৎপাদন বাধাগ্রস্ত। বেকারত্ব ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, প্রতিবছর ২০ লাখ নতুন চাকরি খুঁজে বের করতে হয়।
তবে তারেক রহমানকে নিয়ে বিতর্কও আছে। সমালোচকরা বলেন, তিনি শুধু জন্মগত কারণে ক্ষমতায়। সমর্থকরা মনে করেন, তিনি দেশে ফেরেন দেশ রক্ষার জন্য। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু বাবা-মায়ের ছেলে বলে এখানে নেই। আমার সমর্থকদের জন্য আমি এখানে। তারাই আমাকে নেতা বানিয়েছেন।’
সাক্ষাৎকারে নিজের দেশে ফেরার উদ্দেশ্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নিজের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত দুর্নীতির মামলা, শেখ হাসিনার শাসনামল ও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তারেক রহমান।
টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে তারেক রহমানকে এমন একজন নেতা হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, যিনি রাজকীয় উত্তরসূরি হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ নির্বাসনে থেকে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
তিনি এখন কেবল একটি দলের নেতা নন, বরং তিনি হয়ে উঠেছেন পরিবর্তনের রূপকার। ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতির মতো তিনিও বলছেন, এটি এক ‘নতুন বাংলাদেশ’। যেখানে বিচার বিভাগ হবে স্বাধীন এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার থাকবে সুরক্ষিত।
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশের মানুষ তাকে যে আস্থা দিয়েছে, সেটাই তার রাজনীতিতে থাকার প্রধান কারণ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি শুধু পারিবারিক পরিচয়ের কারণে রাজনীতিতে নেই, বরং দলের সমর্থকরাই তাকে সামনে এনেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমান পরিষ্কারভাবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, তার নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রতি প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে, যেখানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থন মাত্র ১৯ শতাংশ। তবে একই সঙ্গে উঠে এসেছে উদ্বেগও।
অতীতে বিএনপির শাসনামলে দুর্নীতির অভিযোগ, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক খাম্বা বিতর্ক এখনো তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
তারেক রহমান সব ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, আগের মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো বাতিল করেছে। তিনি বলেন, কেউ অপরাধ করলে বিচার হবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দিয়ে দেশ চালানো যাবে না।
টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টাকার দুর্বল মান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসংকট এবং যুব বেকারত্ব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না–এ বিষয়টি তারেক রহমানের জন্য বড় পরীক্ষা বলে উল্লেখ করেছে টাইম ম্যাগাজিন।
দেশে ফেরার পর থেকে নিজের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন তারেক রহমান। তিনি ১২ হাজার মাইল খাল খননের কথা বলেছেন।
ভূমির অবক্ষয় রোধে বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানো; ঢাকায় ৫০টি উন্মুক্ত সবুজ স্থান গড়ে তোলা; বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা; প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি কলেজ পুনর্গঠন এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ প্রণয়নসহ নানা পরিকল্পনার কথা তিনি শুনিয়েছেন।
টাইম ম্যাগাজিনকে তিনি বলেন, ‘আমি যা যা পরিকল্পনা করেছি, তার মাত্র ৩০ শতাংশও যদি বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আমি নিশ্চিত, দেশের মানুষ আমাকে সমর্থন দেবে।’
সাক্ষাৎকারে লন্ডনে কাটানো সময় নিয়েও স্মৃতিচারণা করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, লন্ডনে তার পছন্দের কাজ ছিল রিচমন্ড পার্কে ঘুরে বেড়ানো, চিন্তায় ডুবে থাকা কিংবা ইতিহাসের বই পড়া। তার প্রিয় সিনেমা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি সম্ভবত আটবার সিনেমাটি দেখিছি।’