মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ বলেছেন, ওয়াশিংটন আমাদের বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টাকে অবহেলা ও উপহাস করে, এটা আমরা মেনে নেব না। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গী, দাস নই। তিনি বলেন, জার্মানি ও ইউরোপ প্রয়োজনে নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত।
মার্জ বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বিশ্ব রাজনীতিতে ‘সাম্রাজ্যবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের একটি বিকল্প’ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এবং ক্রমবর্ধমান পরাশক্তির প্রতিযোগিতার এই সময়ে সমমনা অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি করতে সক্ষম।
আজ বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বক্তব্যে মার্জ ন্যাটোর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন, যেখানে ইউরোপ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও জোরদার করবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে, তবে ‘অধস্তন’ হিসেবে নয়।
তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-বহির্ভূত ন্যাটো দেশগুলোর সেনারা সম্মুখসারিতে অংশ নেয়নি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন দাবির বিরুদ্ধেও তিনি অন্যান্য ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে একমত হয়ে অবস্থান নিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জার্মানি ও আরও সাতটি ইউরোপীয় দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন যাতে ডেনমার্কের অধিভুক্ত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। পরে তিনি সেই হুমকি প্রত্যাহার করেন। এর এক সপ্তাহ পর জার্মান পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে বক্তব্য দেন মার্জ।
মার্জ বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে আমরা আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি একটি পরাশক্তিনির্ভর বিশ্ব গড়ে উঠছে। এই বিশ্বে একটি কঠোর হাওয়া বইছে, এবং আমরা তা ভবিষ্যতেও অনুভব করব।
তবে তিনি বলেন, এতে ইউরোপের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে। কারণ গণতান্ত্রিক দেশগুলো, যাদের বাজার উন্মুক্ত ও ক্রমবর্ধমান, তারা ইউরোপের কাছে এমন অংশীদারিত্ব চায়, যা পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।
তিনি বলেন, নতুন অংশীদার ও নতুন জোটের কাছে এই ইউরোপীয় মডেল কতটা আকর্ষণীয় হতে পারে, তা আমাদের অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। আমরা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের একটি নীতিগত বিকল্পও।
ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের মধ্যে মাঝে মাঝে মতপার্থক্য থাকলেও ঐক্যের গুরুত্বের ওপর জোর দেন মার্জ। তিনি বলেন, গত সপ্তাহেই ইইউ দেখিয়েছে যে তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। “আমরা একমত হয়েছি যে শুল্ক আরোপের হুমকিতে আমরা আর ভয় পাব না,” বলেন তিনি।
তবে একই সঙ্গে মার্জ বলেন, বদলে যাওয়া বিশ্বে ইউরোপকে নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে হলে ‘ক্ষমতার রাজনীতির ভাষা’ শিখতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়া, প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বনির্ভরতা অর্জন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো।
ইইউর আরও বেশি বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে জোরালো সমর্থক মার্জ। এর মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার মারকোসুর জোটের সঙ্গে একটি চুক্তি এবং চলতি সপ্তাহে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত আরেকটি চুক্তির কথা উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন জোট গড়ার চেষ্টা করলেও বিদ্যমান জোটগুলো যেন অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়েও সতর্ক করেন মার্জ। তিনি বলেন, “আমাদের জন্য এটা স্পষ্ট যে বিদ্যমান জোটগুলোকে অবিবেচকের মতো ঝুঁকির মুখে ফেলা উচিত নয়। ট্রান্স-আটলান্টিক আস্থা আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ।”
তিনি বলেন, ইউরোপ ন্যাটোকে সংরক্ষণ করতে চায় এবং এটিকে আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী। “আমরা সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব,” বলেন তিনি।
তবে তিনি যোগ করেন, “একই সঙ্গে এই নীতির ভিত্তি স্পষ্ট, গণতন্ত্র হিসেবে আমরা অংশীদার ও মিত্র, অধস্তন নই।”
আফগানিস্তানে প্রায় ২০ বছর ধরে চলা জার্মান সামরিক অভিযানে ৫৯ জন জার্মান সেনা নিহত হন এবং শতাধিক সেনা আহত হন— এ কথাও উল্লেখ করেন মার্জ।
তিনি সরাসরি ট্রাম্পের সেই সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করেননি, যেখানে ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে ন্যাটোর অন্য ৩১টি দেশ এগিয়ে আসবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন এবং আফগানিস্তানে তারা ‘সামনের সারি থেকে কিছুটা দূরে’ ছিল।
তবে মার্জ বলেন, “এই অভিযানে আমাদের অংশগ্রহণ ছিল এবং তা আমরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই করেছি, সেটিকে আজ অবমূল্যায়ন বা হেয় করতে আমরা দেব না।” সূত্র: অ্যাসোসিয়েট প্রেস
মাহফুজ/