ইরানের কাছাকাছি নতুন করে রণতরি মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি আলোচনায় রাজি না হয় তাহলে আগের চেয়ে ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে ইরান জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ওপর হামলা হলে কড়া জবাব দেওয়া হবে। আর সে হামলা ছোট কোনো ঘটনা হবে না।
ইরানের ভেতরে আন্দোলন স্তিমিত হলেও পুরোপুরি নিভে যায়নি। কার্যত ইরানের নেতারা এখন দুই দিক থেকে চাপে পড়েছেন। একদিকে রয়েছে এমন একটি আন্দোলন, যা ক্রমেই পুরো শাসনব্যবস্থার অপসারণ দাবি করছে। অন্যদিকে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রেসিডেন্ট, যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের উদ্দেশ্য অস্পষ্ট রেখেছেন। এতে শুধু তেহরান নয়, পুরো অঞ্চলজুড়েই উদ্বেগ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টা ভয়াবহ জবাবের হুমকি জানালেও আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে। একই সঙ্গে দেশটি জানিয়েছে, এবার যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে পাল্টা যে জবাব দেওয়া হবে সেগুলোর সঙ্গে অতীতের মিল না-ও থাকতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরান সাধারণত দেরিতে এবং সীমিত পরিসরে প্রতিশোধ নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। ২০২৫ সালের ২১-২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর ইরান কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-পরিচালিত আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান আগেই হামলার সতর্কতা দিয়েছিল। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপকে ব্যাপকভাবে এমন এক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ইরান নিজের অবস্থান জানান দিয়েছে, কিন্তু বড় যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছে।
একই ধরনের চিত্র দেখা গিয়েছিল, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। ৩ জানুয়ারি বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পাঁচ দিন পর ইরান ইরাকে অবস্থিত মার্কিন আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
সেই ক্ষেত্রেও আগাম সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। সেবার কোনো মার্কিন সেনা নিহত হয়নি। অবশ্য পরে ডজনখানেক সেনা মানসিক আঘাতজনিত মস্তিষ্কে সমস্যার কথা জানান। এই ঘটনাও ধারণা জোরদার করে যে, তেহরান উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল- উসকে দিতে নয়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবেই ভিন্ন। ইরান ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে অন্যতম গুরুতর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সময় পার করছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে ও জানুয়ারির শুরুতে শুরু হওয়া বিক্ষোভগুলোকে অত্যন্ত সহিংসভাবে দমন করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও দেশের ভেতরের চিকিৎসাকর্মীদের মতে, কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। আরও অনেকে আহত বা আটক হয়েছেন।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার না থাকায় হতাহতের সঠিক সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইরানি কর্তৃপক্ষ এসব মৃত্যুর দায় স্বীকার না করে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ ও ইসরায়েলের দিকে আঙুল তুলেছে। তাদেরই এই অস্থিরতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছে।
এই বয়ানটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সম্প্রতি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব বলেছেন, এই বিক্ষোভগুলোকে গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা উচিত। এতে সরকারের ‘নিরাপত্তা আগে’ নীতির ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এবং একই সঙ্গে দমনপীড়নের মাত্রা ও তীব্রতা বৈধতা দেওয়ার একটি অজুহাতও তৈরি হয়েছে।
যদিও রাস্তায় বিক্ষোভের মাত্রা এখন কিছুটা কমেছে, তা পুরোপুরি শেষ হয়নি। ৮ ও ৯ জানুয়ারি নিরাপত্তা বাহিনী নাকি বড় শহরের কয়েকটি এলাকা ও আশপাশের শহরের ওপর সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, পরে ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করে কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
এই সাময়িক নিয়ন্ত্রণ হারানো ঘটনা কর্তৃপক্ষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে বলে মনে করা হয়। এরপর যে শান্ত অবস্থা দেখা গেছে, তা আলোচনার মাধ্যমে অর্জিত হয়নি। বরং চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিস্ফোরক রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার ধরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সীমিত মাত্রার হামলা ওয়াশিংটনকে সামরিক সাফল্যের দাবি করার সুযোগ দিতে পারে এবং তাৎক্ষণিক আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি ইরানি কর্তৃপক্ষকে অভ্যন্তরীণ দমনপীড়নের নতুন দফার অজুহাতও দিতে পারে। এতে নতুন করে ধরপাকড়, গণগ্রেপ্তার এবং আটক বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সাজা, এমনকি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। অন্যদিকে যদি যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিসরের সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে দুর্বল বা অচল করে দেয়, তাহলে দেশটি বিশৃঙ্খলার কিনারায় চলে যেতে পারে।
৯ কোটির বেশি মানুষের দেশে হঠাৎ কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়লে তা সহজ বা দ্রুত কোনো রূপান্তর ডেকে আনবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম। বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, গোষ্ঠীগত সহিংসতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার পরিণতি সামলাতে বেশ বছর লেগে যেতে পারে।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতারা সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলা, তা যত ছোটই হোক, যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই বক্তব্যগুলো বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করেছে, যারা তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা মোতায়েনের সুযোগ দিয়েছে। ইরানের দ্রুত প্রতিক্রিয়া এসব দেশ ও ইসরায়েলকে তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, সরাসরি জড়িত থাকুক বা না থাকুক এবং সংঘাত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করে।
ওয়াশিংটনও সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। ট্রাম্প বারবার ইরানি কর্তৃপক্ষকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করার সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং অস্থিরতার চূড়ান্ত পর্যায়ে ইরানিদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘সহায়তা আসছে।’ এই মন্তব্যগুলো ইরানের ভেতরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করে।
দুই পক্ষই বৃহত্তর কৌশলগত বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। ট্রাম্প জানেন, গত গ্রীষ্মের ১২ দিনের যুদ্ধের আগের তুলনায় ইরান সামরিকভাবে দুর্বল। আবার তেহরানও জানে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পূর্ণমাত্রার, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রতি খুব একটা আগ্রহ নেই। এই পারস্পরিক উপলব্ধি কিছুটা আশ্বাস দিতে পারে, তবে একই সঙ্গে তা বিপজ্জনক ভুল-বোঝাবুঝির জন্মও দিতে পারে। যেখানে প্রতিটি পক্ষ নিজেদের প্রভাব অতিরঞ্জিতভাবে মূল্যায়ন করতে পারে বা প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
ট্রাম্পের জন্য ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। তার এমন একটি ফলাফল দরকার, যা তিনি বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। আবার একই সময়ে যা ইরানকে নতুন করে দমনপীড়নের চক্রে বা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলায় ঠেলে দেবে না। ইরানি নেতাদের জন্য ঝুঁকির জায়গাটি হলো- সময় ও উপলব্ধি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইরানের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন। এমনকি ট্রাম্প নিজেও একাধিকবার এ তথ্য দিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরু করতে ইরান প্রস্তুত। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনকে অবশ্যই ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
আরাগচি জানান, এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ বা সরাসরি আলোচনার কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে তিনি বলেন, সম্ভাব্য আলোচনার জন্য একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরিতে তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ কাজ করছে। সূত্র: বিবিসি, অ্যাক্সিওস