যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘নিউ স্টার্ট’ (New Start) পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) শেষ হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই পারমাণবিক শক্তির অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর থাকা শেষ পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণও উঠে যাচ্ছে।
এই ঘটনা গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য এক ধরনের মৃত্যুঘণ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই চুক্তির অবসান ঘটছে, যখন বৈশ্বিক অস্থিরতা দ্রুত বাড়ছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে।
বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস–এর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলেক্সান্দ্রা বেল বলেন, “পারমাণবিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে ২০২৫ জুড়ে সবকিছুই ভুল পথে এগোচ্ছে। পারমাণবিক ঝুঁকি এখন আরও জটিল ও আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, আর বিশ্বনেতারা এই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
আর মাত্র দুই দিনের মধ্যেই আমরা দেখব, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া পারমাণবিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অর্ধশতাব্দীর পরিশ্রম একেবারে নষ্ট করে ফেলছে।”
রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন, এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া “সবার জন্য উদ্বেগজনক” বিষয়। তিনি ২০১০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে নিউ স্টার্ট চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।
তিনি বলেন, “যখন কোনো চুক্তি থাকে, তখন তা পারস্পরিক আস্থার প্রতীক। আর যখন কোনো চুক্তি থাকে না, তখন বুঝতে হবে সেই আস্থা নিঃশেষ হয়ে গেছে।” বর্তমানে মেদভেদেভ মস্কোর একজন কট্টর অবস্থানধারী নেতা হিসেবে পরিচিত।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসী সংগঠনগুলো শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে চুক্তিটি রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। নিউ স্টার্ট চুক্তির অধীনে উভয় দেশ সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৫০টি মোতায়েনযোগ্য কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেড রাখতে পারত এবং ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমারু বিমানের মতো ডেলিভারি সিস্টেমের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮০০–তে সীমাবদ্ধ ছিল।
গত সেপ্টেম্বর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চুক্তিটি আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বিষয়টি “ভালো ধারণা মনে হচ্ছে”।
তবে ওই মন্তব্যের পর কোনো বাস্তব আলোচনা শুরু হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে। মস্কো জানিয়েছে, পুতিনের এক বছরের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে তারা কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব পায়নি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “মেয়াদ শেষ হলে শেষ হোক। আমরা আরও ভালো একটি চুক্তি করব।”
পরে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তি চান, যেখানে চীনও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস (এফএএস)–এর হিসাব অনুযায়ী, চীনের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা প্রায় ৬০০, যার খুব অল্প অংশই মোতায়েন ও ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত।
তুলনামূলকভাবে, এফএএসের হিসাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রয়েছে মোট ৫ হাজার ১৭৭টি (মজুত ও অবসরপ্রাপ্তসহ) পারমাণবিক ওয়ারহেড এবং রাশিয়ার কাছে রয়েছে ৫ হাজার ৪৫৯টি।
ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ নামের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণপন্থী সংগঠনের সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাহ বলেন, নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর “আরও ভালো চুক্তি” করার ট্রাম্পের আশা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।
তিনি বলেন, “প্রশাসন যদি মনে করে এই চুক্তি শেষ হওয়ার পর নতুন ও ‘আরও ভালো’ চুক্তি করা সহজ হবে, তাহলে তারা ভুল করছে। চীনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি থাকা প্রায় অপরিহার্য। ট্রাম্প নিজেকে বড় দরকষাকষির মানুষ মনে করলেও, এই ক্ষেত্রে নতুন কিছু করার আগে বিদ্যমান চুক্তিটা কিছুদিন ধরে রাখাই তার জন্য ভালো হতো।”
অনানুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ (নন–প্রোলিফারেশন) নিয়ে তাদের অবস্থান ঘোষণা করতে পারে।
সংখ্যাগত সীমা আরোপের পাশাপাশি নিউ স্টার্ট চুক্তির আওতায় পারস্পরিক নজরদারি, তথ্য বিনিময় ও পরিদর্শনের একটি বিস্তৃত ব্যবস্থা ছিল। তবে ২০২৩ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর যুক্তরাষ্ট্রের ইউক্রেনকে সমর্থনের প্রতিবাদে পুতিন ওই ব্যবস্থায় রাশিয়ার অংশগ্রহণ স্থগিত করেন।
নিউ স্টার্টের অবসান বিশ্বব্যাপী অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শেষ নিঃশ্বাস হয়ে উঠতে পারে, যা বহু বছর ধরেই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, মধ্যম পাল্লার অস্ত্র ও পারস্পরিক আকাশপথ পর্যবেক্ষণ–সংক্রান্ত একাধিক চুক্তি ইতোমধ্যেই বাতিল হয়ে গেছে।
এদিকে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়নে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। পুতিন ও ট্রাম্প দুজনই প্রকাশ্যে নিজেদের পারমাণবিক শক্তির কথা হুমকির সুরে তুলে ধরছেন। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক পরীক্ষা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের হুমকিও দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ড্যারিল কিমবল সতর্ক করে বলেন, নিউ স্টার্টের অবসান খুব দ্রুতই নতুন একটি পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করতে পারে।
তিনি বলেন, “পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থার ভেতরে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা চীনের কৌশলগত শক্তি বৃদ্ধির মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বাহিনীর আকার দ্রুত বাড়াতে চান।”
নিউ স্টার্টের পতন ১৯৭০ সালের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)–কেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ওই চুক্তির অধীনে পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন দেশগুলো অস্ত্র না নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল, এই শর্তে যে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো সৎভাবে নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টা করবে। এনপিটি চুক্তিটি এ বছর পুনর্মূল্যায়নের জন্য নির্ধারিত।
কিমবল বলেন, “এটি এনপিটি–এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতার সরাসরি লঙ্ঘন হবে এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিকে নড়িয়ে দেবে।”
ঐতিহাসিকভাবে পারমাণবিক প্রতিরোধনীতির একটি যুক্তি ছিল যে এটি বিশ্বকে স্থিতিশীল করেছে, কারণ পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়াতে ভয় পায়। কিন্তু নিউ স্টার্ট শেষ হওয়ার আগেই সেই স্থিতিশীলতার ধারণা ভেঙে পড়ার নানা লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল।
বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন, তার পর পশ্চিমা দেশগুলোর ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ এবং রাশিয়া–ন্যাটো সীমান্তে উত্তেজনা তীব্র হওয়ার ফলে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টসে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক লেখায় পারমাণবিক অস্ত্র বিশ্লেষক অ্যালেক্স কোলবিন লিখেছেন, “সহজভাবে বললে, বৈশ্বিক নিরাপত্তায় পারমাণবিক অস্ত্র আর নির্ণায়ক ভূমিকা রাখছে না।” সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মাহফুজ/