ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাওয়া মোজতবা খামেনির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। সাম্প্রতিক সামরিক বিপর্যয়, শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মৃত্যু এবং সরকারি কার্যালয়ে একের পর এক হামলার ঘটনায় ইরান এখন তীব্র অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামলাতে নতুন নেতৃত্ব এখন নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়ে থেকে কাজ করছে। এ যেন অস্তিত্ব টেকানোর শেষ বাজি।
নিরাপত্তা বলয় ও আইআরজিসির একক নিয়ন্ত্রণ
আইআরজিসি ও তাদের বিশেষায়িত সুরক্ষা ইউনিট ‘আনসার আল-মাহদি’ নতুন নেতার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে। অতীতের গোয়েন্দা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এখন ‘সর্বাত্মক ধ্বংসাত্মক’ কৌশল অনুসরণ করছে। এই নীতির অধীনে যেকোনো অভ্যন্তরীণ বিরোধিতাকে সরাসরি বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করছে। তেহরানের কেন্দ্রীয় এলাকা এবং সরকারি ভবনগুলোর চারপাশে সামরিক টহল জোরদার করা হয়েছে। এমনকি নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলো এখন নজরদারি এড়াতে গোপন স্থান বা ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো
সামরিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরান নতুন কমান্ড কাঠামো গঠন করেছে। অ্যাডমিরাল আলী শামখানির নেতৃত্বে একটি নতুন প্রতিরক্ষা কাউন্সিল সামরিক বিষয়গুলো তদারকি করছে। অন্যদিকে আলী লারিজানিকে শাসকের ‘টিকে থাকার প্রোটোকল’ বা অপারেশনাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইরান নিজস্ব গোয়েন্দা নজরদারিও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোনো গোপন তৎপরতা আর তাদের অগোচরে না থাকে।
মার্কিন-ইসরায়েলি কৌশলের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের বিমান ও গোয়েন্দা সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ইরানের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার কমান্ড ও ইসরায়েলি হ্যাকাররা সমন্বিতভাবে ইরানের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিকল করে দেয়। এতে দেশটির কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিআইএ ও মোসাদের দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন বলেছেন, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানকে ‘হতবাক ও বিভ্রান্ত’ করে দেওয়া।
সংকট ও অস্পষ্ট ভবিষ্যৎ
এত বিপুলসংখ্যক জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনায় তেহরানের শাসনব্যবস্থা গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ইরান কি সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজবে, নাকি লড়াই চালিয়ে যাবে। যুদ্ধের ঠিক আগে সিআইএর একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সর্বোচ্চ নেতার অপসারণ রেভল্যুশনারি গার্ডের কট্টরপন্থিদের হাতে ক্ষমতা আরও সংহত করতে পারে। কিন্তু নেতৃত্বের এই শূন্যতা এবং ক্রমাগত হামলার মুখে কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। যারা বিদ্রোহে অংশ নেবেন, তাদের পূর্ণ দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে ইরানি শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত গভীরভাবে প্রোথিত। তাই ক্ষমতা ধরে রাখতে তারা সব ধরনের চেষ্টা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান লক্ষ্য ইরানের শাসনব্যবস্থাকে যতটা সম্ভব পঙ্গু করে দেওয়া। তবে সামরিক শক্তির মাধ্যমে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সূত্র: বিবিসি