যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে পাকিস্তান। উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমনে পাকিস্তান বা তুরস্ক দুই দেশই আলোচনার সম্ভাব্য ভেন্যু হতে পারে বলে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল বুধবার রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেওয়া ওই মন্তব্যকে তেহরানের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক সমাধান বিবেচনার একটি বিরল ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও প্রকাশ্যে ইরান বারবার বলেছে, তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যাবে না।
ইরানি সূত্রটি পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো প্রস্তাবের বিস্তারিত জানায়নি। এটি গণমাধ্যমে আলোচিত ১৫ দফা মার্কিন প্রস্তাব কি না, তাও স্পষ্ট করা হয়নি। তবে সূত্রটি জানায়, তুরস্কও ‘যুদ্ধ শেষ করতে বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা রাখছে’ এবং আলোচনার স্থান হিসেবে পাকিস্তান বা তুরস্ক দুটি দেশই বিবেচনায় রয়েছে।
১৫ দফা পরিকল্পনার খবর প্রকাশের পর গতকাল বুধবার তেলের দাম কমে এবং শেয়ারবাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজারও মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
গত মঙ্গলবার একটি সূত্র রয়টার্সকে নিশ্চিত করে যে যুক্তরাষ্ট্র এই পরিকল্পনা ইরানের কাছে পাঠিয়েছে।
ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভাকে এই প্রস্তাব সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। এতে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সরিয়ে ফেলা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়ন বন্ধ করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এদিকে পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে হাজার হাজার প্যারাট্রুপার পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে ট্রাম্পের সামনে স্থল হামলার আরও বিকল্প তৈরি হয়। এর আগে ইতোমধ্যে মেরিন সেনাদের দুটি ইউনিট ওই অঞ্চলের পথে রয়েছে। একটি বড় জাহাজে থাকা প্রথম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট মাসের শেষ নাগাদ পৌঁছাতে পারে।
ইরানের প্রতিবেশী পাকিস্তান ইতোমধ্যে এই সপ্তাহেই শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে আলোচনা আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে। তুরস্কের শাসক দলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হারুন আরমাগান জানান, আঙ্কারা ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা রাখছে’।
তবে এখন পর্যন্ত ইরান প্রকাশ্যে কোনো আলোচনায় আগ্রহ দেখায়নি। বরং তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি রাষ্ট্রীয় টিভিতে ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘এমন কী পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আপনি নিজের সঙ্গেই আলোচনা করছেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মতো মানুষ কখনোই আপনাদের মতো মানুষের সঙ্গে সমঝোতায় আসবে না। এখন নয়, কখনোই নয়।’
ভারতে এক টিভি সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, আলোচনা চলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরু করে। এটা ছিল ‘কূটনীতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা’ এবং ভবিষ্যৎ আলোচনাকে অর্থহীন করে দেওয়া। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো আলোচনা নেই… আমাদের সেনাবাহিনী এখন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মনোযোগী।’
ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ইরান এসব শর্তে রাজি হবে কি না, তা নিয়ে তারা সন্দিহান। পাশাপাশি আশঙ্কা রয়েছে, আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কিছু ছাড় দিতে পারে।
যুদ্ধের মধ্যে ট্রাম্পের অবস্থানেও কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। শুরুতে তিনি ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করলেও সম্প্রতি তিনি ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনার কথা বলেছেন এবং ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকিও সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন। এতে আর্থিক বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে। তবে ইরান এসব দাবিকে ‘সময়ক্ষেপণ’ হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে মাঠপর্যায়ে সংঘাত থামেনি। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা তেহরানজুড়ে অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রেও আঘাত হেনেছে। ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ জানায়, এসব হামলায় আবাসিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কুয়েত ও সৌদি আরব নতুন ড্রোন হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি ট্যাংকে ড্রোন হামলায় আগুন লাগে, তবে হতাহতের খবর নেই। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিব ও কিরিয়াত শ্মোনা শহরসহ কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে নতুন হামলা চালিয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতেও হামলা চালাচ্ছে এবং কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, যা বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহনের পথ।
উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও সেনা পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। জানা গেছে, এলিট ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের তিন থেকে চার হাজার সেনা পাঠানো হতে পারে। এর আগে অঞ্চলটিতে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের ভেতর প্রায় ৯ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ২৯০ জন আহত হয়েছেন।
তবে স্থলবাহিনী সরাসরি ইরানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি, যদিও ভবিষ্যৎ অভিযানের জন্য প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্থলযুদ্ধ শুরু হলে তা রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন তুলনামূলক কম। সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, আল জাজিরা