যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এখন আর কেবল নির্দিষ্ট সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। তেহরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েল ইরানের বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র ‘সাউথ পারস’-এ হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান কাতারের ‘রাস লাফান’ জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হেনেছে। ধারাবাহিক এই উসকানি সত্ত্বেও কাতারসহ প্রতিবেশী দেশগুলো এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। তবে এই ধৈর্য কতদিন টিকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
হামলার লক্ষ্যবস্তু যখন অসামরিক অবকাঠামো
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে। তেহরান এর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে। তারা শুধু ইসরায়েলকে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায়। উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ছাড়াও বিমানবন্দর, হোটেল, আবাসিক এলাকায় হামলা চালায় ইরান। এ ছাড়া জ্বালানি অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ অসামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে আমিরাত ও বাহরাইনের বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও এসব দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রয়েছে।
কৌশলগত নীরবতার কারণ
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো সিনা তুসি এই পরিস্থিতিকে ঝুঁকি ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশের সমন্বয় হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ‘উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিতে এটি তাদের যুদ্ধ নয়। প্রতিশোধ নিতে গেলে তারা আরও বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতির শঙ্কাই বেশি।’
এই দেশগুলোর অর্থনীতি মূলত জ্বালানি রপ্তানি, সামুদ্রিক পরিবহন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর নির্ভরশীল। ইরান ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, তারা এই খাতগুলো ব্যাহত করার সক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহার করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক রব জেইস্ট পিনফোল্ডের পর্যবেক্ষণ ভিন্ন। তিনি মনে করেন, ইসরায়েলের পাশে প্রকাশ্যে দাঁড়াতে আরব দেশগুলোর মধ্যে একধরনের অনীহা কাজ করছে। অনেক নেতার ধারণা, ইসরায়েলই যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের তিক্ত স্মৃতি এখনো তাদের তাড়া করে ফেরে। সে সময়ে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর সৃষ্ট শূন্যতা পুরো অঞ্চলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছিল, তার পুনরাবৃত্তি কেউ চায় না।
যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরতা ও নিরাপত্তার সমীকরণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু করার ধরনে অসন্তুষ্ট হলেও উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপত্তার জন্য এখনো ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করে।
পিনফোল্ডের মতে, ‘রাজনৈতিক স্তরে তারা আমেরিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেও সামরিক ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটি এখন প্রকৃত অর্থে পরীক্ষিত হচ্ছে।’ যুক্তরাষ্ট্র তার অভিযানের উদ্দেশ্য হিসেবে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা থেকে শুরু করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বলছে। তবে আরব নেতারা মনে করেন, কূটনীতিই এই সংঘাত অবসানের একমাত্র উপায়।
ইরান সব দেশের ওপর সমান তীব্রতায় হামলা চালাচ্ছে না। এটি দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্কের ভিন্নতাকেই প্রতিফলিত করে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন যেহেতু ২০২০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে, তাই তারা বেশি হামলার শিকার হচ্ছে। বিপরীতে ওমানের ওপর হামলা অনেক কম। ওমান দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও পশ্চিমের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। এমনকি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানানো একমাত্র উপসাগরীয় দেশ ছিল ওমান।
দুবাই পাবলিক পলিসি রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মোহাম্মদ বাহারুন সতর্ক করে বলেন, ‘ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে তার বিরুদ্ধে একটি সম্প্রসারণশীল জোট গঠনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। হামলা চালিয়ে ইরান তাদের শত্রুতে পরিণত করছে। এমন একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যা কেউ চায় না।’ সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকে আরব দেশগুলো জাতিসংঘের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
প্রতিশোধের সীমা কোথায়?
এখন প্রশ্ন হলো, আরব দেশগুলো ঠিক কতক্ষণ এই পরিস্থিতি সহ্য করবে? রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) ফেলো ড. এইচ এ হেলিয়ার মনে করেন, জ্বালানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা হলে রাজনৈতিক হিসাব দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। ইরান হুমকি দিয়েছে, তাদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে আরব অংশীদারদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
আরেকটি পরিস্থিতি যা আরব দেশগুলোর ধারণা বদলে দিতে পারে, তা হলো প্রক্সি যুদ্ধ। পিনফোল্ডের মতে, ‘যদি হুতিরা সরাসরি হামলা শুরু করে, তবে একটি নতুন রণাঙ্গন তৈরি হবে। তখন উপসাগরীয় দেশগুলো একে কেবল মার্কিন যুদ্ধ হিসেবে দেখবে না, নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে গণ্য করবে।’
ইরানের এই উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল হিতে বিপরীত হতে পারে। বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে আরব দেশগুলো শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে পূর্ণ সমর্থন দিতে বাধ্য হতে পারে।
পিনফোল্ডের ভাষায়, ‘শুরুতে তারা যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানোকেই অধিকতর যুক্তিযুক্ত মনে করতে পারে।’ সূত্র: বিবিসি