যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত সপ্তাহের প্রাইম টাইম ভাষণের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের দিকে চলমান পরিস্থিতির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করা। কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ববিরোধিতাও।
ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামোসহ দেশটির সামরিক সক্ষমতা বহুলাংশে ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি এই যুদ্ধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তা সত্ত্বেও তিনি আগামী সপ্তাহগুলোতে সংঘাত আরও বাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
ফলে তার বার্তার প্রকৃত স্বরূপ অস্পষ্টই থেকে গেছে। ইরানের ওপর বিজয় ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু তা এখনো অর্জিত হয়নি। তার এই সতর্কবার্তার পর বাগাড়ম্বর আরও তীব্র হয়ে ওঠে যে ইরানে বোমা হামলা চালিয়ে দেশটিকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এর একটি সুস্পষ্ট প্রভাব ইরানের অভ্যন্তরে পড়েছে। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এমনকি ইরানে থাকা ট্রাম্প সমর্থকরাও একে ভালো চোখে দেখছেন না।
অনেকেই মনে করছেন ইরানি শাসকগোষ্ঠীর ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে এটি অবরুদ্ধ থাকার অনুভূতিকে আরও দৃঢ় করেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ও কমান্ডারকে হত্যা করার পর এই পরিবর্তন এসেছে।
এর ফলে ইরানে এমন এক নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছে, যাকে ট্রাম্প ‘কম উগ্রপন্থি এবং অনেক বেশি বিচক্ষণ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের সমর্থনে তেমন কোনো প্রমাণ নেই।
প্রকৃতপক্ষে তেহরানের ক্ষমতার কাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তার কতটা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু দেশে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন বা আদর্শগত পরিবর্তন ঘটেনি।
প্রেসিডেন্ট পদে বহাল আছেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সংসদের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। আব্বাস আরাগচি পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে চলেছেন।
হামলায় নিহত কমান্ডার ও বহু অফিসারের স্থলে একই আদর্শিক শিবিরের লোকদের আনা হয়েছে, যারা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আরও বেশি অনমনীয় হয়ে উঠেছেন। এটিকে ক্ষমতা পরিবর্তনের চেয়ে ক্ষমতার একত্রীকরণ বলেই বেশি মনে হচ্ছে। এই একত্রীকরণ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এই যুদ্ধে ইরানের লক্ষ্য প্রচলিত অর্থে জয়লাভ করা নয় বরং টিকে থাকা।
লড়াইয়ে টিকে থাকা ‘বিকল্প নয়, বরং লক্ষ্য’
বছরের পর বছর ধরে তেহরান এই সহজ নীতিতেই কাজ করে আসছে যে শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে টিকে থাকার মধ্যেই সাফল্য নিহিত।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বে ইরান বরাবরই বিশ্বাস করে এসেছে যে একজনের সঙ্গে যুদ্ধ হলে অন্যজনও তাতে জড়িয়ে পড়বে। ইরানের জন্য ‘স্থির থাকা’ কোনো বিকল্প নয় বরং এটিই তার প্রকৃত লক্ষ্য।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো এখনো কার্যকর, দেশটির সরকারি ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং বিরোধী শক্তিগুলো কিছুটা দুর্বল হলেও ভেঙে পড়েনি। এভাবে দেখলে ইরানের অবস্থান এখনো খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথগুলোতে বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে আধিপত্য বজায় রেখেছে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। ঠিক এই কারণেই বারবার হামলা সত্ত্বেও ইরান সবকিছু ব্যাহত করার বিপুল ক্ষমতা ধরে রেখেছে। ইরানের এই সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমস্যা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন পিছু হটলে এই আশঙ্কা রয়েছে যে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটিই সত্য প্রমাণিত হবে–‘অধ্যবসায়ের ফল মেলে।’ যদি সে লড়াই চালিয়ে যায়, তবে তাকে ক্রমবর্ধমান খরচের সম্মুখীন হতে হবে এবং চূড়ান্ত বিজয়ের কোনো সুস্পষ্ট পথ থাকবে না।
ট্রাম্পের ভাষণে উভয়সংকট প্রতিফলিত
ট্রাম্পের ভাষণে উভয়সংকট প্রতিফলিত হয়েছে। লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিজয় দাবি করে তিনি দুটি পরস্পরবিরোধী চাহিদার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে নিজের শক্তি প্রদর্শন করতে পারার পাশাপাশি দীর্ঘ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া এড়ানো যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ভাষণের ঠিক আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এক বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানের ‘প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা’ রয়েছে, তবে তা কোনো ছাড় দেওয়া নয়, বরং পরিকল্পিত পদক্ষেপ।
গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উদ্দেশে লেখা এক খোলা চিঠিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ কি করা হচ্ছে? তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্র কি ইসরায়েলের নির্দেশে কাজ করছে না? পেজেশকিয়ানের সরাসরি লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠী, যারা এই সংঘাত নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিল। ইরান যাতে তার আলোচনার শর্ত পরিবর্তন করতে না পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর এটি একটি প্রচেষ্টা ছিল।
ইরানের শর্তাবলি
এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে ইরান তাদের দাবিগুলোর বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় এই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এটি ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই চরম বিপর্যস্ত ছিল।
যুদ্ধের পর ইরানের বর্তমান সরকার যদি ক্ষমতায় থাকে, তবে এই সংকটগুলোর সম্মুখীন হয়েই তাকে দেশটি পুনর্গঠন করতে হবে। কিন্তু এই শাসনের টিকে থাকার পরিণতি হবে আরও সুদূরপ্রসারী। বছরের পর বছর ধরে ইরানের নিজস্ব ‘প্রতিরক্ষা সক্ষমতা’ অর্থাৎ বড় ধরনের (যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি) হামলার প্রচ্ছন্ন হুমকি–ইরানের ওপর একটি নিয়ন্ত্রণ হিসেবে কাজ করেছে। সরাসরি সংঘর্ষের পরেও যদি সে অক্ষত অবস্থায় রক্ষা পায়, তাহলে ভবিষ্যতের হুমকির প্রভাব হ্রাস পাবে। এই পরিবর্তনের প্রভাব আঞ্চলিক সমীকরণে ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।
আরব দেশগুলোর সমস্যা
প্রাথমিকভাবে যুদ্ধের বিপক্ষে থাকা কিছু আরব দেশ এখন ট্রাম্পকে যুদ্ধ মাঝপথে পরিত্যাগ না করে এর শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছে বলে জানা গেছে। অন্যথায় তাদের আরও আত্মবিশ্বাসী ইরানের মুখোমুখি হতে পারে। তাদের মতে, যুদ্ধ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল না আসাটা যুদ্ধের চেয়েও বেশি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। এই দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যুদ্ধের পরিণতিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে তাদেরই বেশি ভোগান্তি পোহাতে হবে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র একটি পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত কঠিন উভয়সংকটে পড়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি যুদ্ধ থেকে সরে আসেন, তবে তা ইরানের ‘অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখার’ মডেলটিকে সঠিক প্রমাণ করার সুযোগ করে দেবে। আর যদি সে যুদ্ধে থেকে যায়, তবে সে এমন এক যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে, যার কোনো স্পষ্ট শেষ দেখা যাচ্ছে না। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ‘নতুন ইরান’-এর আবির্ভাব ঘটেনি।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও যদি পরিস্থিতি একই থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, যুক্তরাষ্ট্র তার ‘বিজয়ের দাবি’কে সেই বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে পারবে কি না, যেখানে তার সেই শত্রু, যাকে সে বদলাতে চেয়েছিল আসলে একই রয়ে গেছে।