২০২৪ সালের নভেম্বরে যখন ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল, তখন বিশ্বজুড়ে ধারণা করা হয়েছিল লেবাননের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি হয়তো তাদের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। গোষ্ঠীটির প্রধান হাসান নাসরাল্লাহসহ শীর্ষ নেতাদের মৃত্যু এবং ইসরায়েলি বাহিনীর দক্ষিণ লেবাননে প্রবেশের ফলে হিজবুল্লাহকে একটি ‘নিঃশেষিত শক্তি’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন দেখা যাচ্ছে। হিজবুল্লাহ কেবল লড়াইয়ে ফিরেই আসেনি, বরং বিশ্লেষকদের মতে, তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ১৫ মাসের স্বল্প মাত্রার ইসরায়েলি হামলা হিজবুল্লাহকে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ নিকোলাস ব্লানফোর্ড জানান, হিজবুল্লাহর কাছে প্রচুর অস্ত্র এবং কয়েক হাজার অভিজ্ঞ যোদ্ধা রয়েছে। তাদের সামরিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। গত ২ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ওপর হামলার পর হিজবুল্লাহ আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। লেবানন সরকার তাদের সামরিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করলেও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা মাঠ ছাড়েননি।
হিজবুল্লাহর একজন সামরিক নেতা আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বড় ধরনের কৌশল পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন। তিনি জানান, তারা এখন ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে আশির দশকের সেই ভয়ংকর ‘আত্মঘাতী অভিযান’ শুরু করার কথা ভাবছে। যদি ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে না আসে এবং হামলা বন্ধ না করে, তবে হিজবুল্লাহ এই চরম পথ বেছে নিতে দ্বিধা করবে না।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও আলোচনা
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকট নিরসনে দুটি সমান্তরাল আলোচনা চলছে। প্রথমটি ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের সরাসরি বৈঠক। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতির মতো একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক চুক্তি চাইলেও হিজবুল্লাহর বর্তমান নেতা নাঈম কাসেম এ আলোচনাকে ‘শত্রুর ফাঁদ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, আলোচনার টেবিলে নয়, বরং রণাঙ্গনেই ফয়সালা হবে।
অন্যদিকে, ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে গোপন বৈঠক চলছে। হিজবুল্লাহর প্রধান সমর্থক ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা হিজবুল্লাহর ওপর থেকে সমর্থন সরাবে না। দেশটির লেখক জোসেফ দাহেরের মতে, ইরান হিজবুল্লাহকে তার নিজের অস্তিত্বের অংশ মনে করে। তাই যতক্ষণ ইরান টিকে আছে, হিজবুল্লাহও আর্থিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী থাকবে।
সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর হিজবুল্লাহর অস্ত্র সরবরাহের পথ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও তারা নতুন বিকল্প পথ তৈরি করেছে। সৌদি আরবও এখন লেবাননের স্থিতিশীলতার জন্য স্পিকার নাবিহ বেরির মতো শিয়া নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছে। লেবাননের ১২ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে বাস্তুচ্যুত। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহর জনপ্রিয়তা শিয়া সম্প্রদায়ের মাঝে আগের চেয়ে বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, হিজবুল্লাহকে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার যে পরিকল্পনা ইসরায়েল ও পশ্চিমারা করেছিল, তা অন্তত বর্তমান পরিস্থিতিতে সফল হচ্ছে না। লেবাননের সার্বভৌমত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে হিজবুল্লাহর পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তেহরান-ওয়াশিংটন আলোচনার ফলাফলের ওপর। সূত্র: আল-জাজিরা