ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়েহর (২৬) জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন আদালত।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকালে এক শুনানিতে আদালত তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, হিশামকে অস্ত্রসহ দুটি পরিকল্পিত প্রথম-ডিগ্রি হত্যার (ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডার) অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। দোষীসাব্যস্ত হলে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তবে প্রসিকিউটররা এখনো মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করবেন কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি।
আজ শুনানির সময় অভিযুক্ত হিশাম নিজে আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তবে নিহত দুই শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির বহু সহপাঠী ও বন্ধুরা আদালতে উপস্থিত থেকে বিচারের দাবি জানান।
মামলার নথি অনুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টি উভয়েই ২৭ বছর বয়সী বাংলাদেশি ডক্টরাল শিক্ষার্থী ছিলেন। তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন বলে তাদের এক আত্মীয় জানিয়েছেন। গত ১৬ এপ্রিল থেকে তারা নিখোঁজ ছিলেন।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে ২ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা: লোমহর্ষক তদন্ত প্রতিবেদন
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার ভোরে হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছ থেকে জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার শরীরে অসংখ্য ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এদিকে গত রবিবার পিনেলাস কাউন্টির ফোর্থ স্ট্রিট নর্থের ম্যানগ্রোভ বন থেকে আরও একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো নিশ্চিত করা হয়নি যে দেহটি বৃষ্টির কি না। তবে পুলিশের ধারণা এটি তারই মরদেহ।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, জামিল লিমন, হিশাম আবুগারবিয়েহ এবং আরও একজন রুমমেট একত্রে টাম্পার ‘অ্যাভালন হাইটস’ নামক অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। এটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত একটি আবাসন ব্যবস্থা। লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ জানান, হিশাম খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলেন না এবং তার আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। লিমন তার ভাইকে জানিয়েছিলেন হিশাম রুম থেকে খুব একটা বের হতেন না এবং অনেকটা ‘সাইকোপ্যাথ’ বা অপ্রকৃতিস্থের মতো আচরণ করতেন।
জুবায়ের আরও দাবি করেন, লিমনের কাছে যখন প্রকাশ পায় হিশামের পূর্বের অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে, তখন লিমন এবং অন্য রুমমেট মিলে অ্যাপার্টমেন্ট কর্তৃপক্ষ অ্যাভালন হাইটসের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগ গুরুত্বসহকারে নেয়নি। অভিযোগ করার ১৫ দিন পরই লিমন নিখোঁজ হন। লিমনের পরিবার এখন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার কাছে দাবি জানিয়েছে যাতে তারা অ্যাপার্টমেন্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়। কেন সঠিক ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বা অতীত ইতিহাস না জেনেই একজন অপরাধীকে আবাসিক এলাকায় রুম বরাদ্দ দেওয়া হলো, সেই প্রশ্নও তুলেছে পরিবারটি।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ ২ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে হত্যা করেছেন একজনের রুমমেট!
প্রসিকিউটরদের দাখিল করা একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানা গেছে, দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে হিশাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন চ্যাটবট ‘চ্যাটজিপিটি’র কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, একটি মানুষের শরীর প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হতে পারে? গোয়েন্দারা তাদের অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের ডাস্টবিন থেকে লিমনের ক্রেডিট কার্ড, রক্তমাখা কাপড় এবং একটি রক্তমাখা কিচেন ম্যাট উদ্ধার করেছেন।
নিহত লিমনের পরিবার এখন তাদের সন্তানের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির অনুরোধ করেছে। জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘আমরা হিশাম এবং এই ঘটনায় জড়িত সবার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর এই হৃদয়বিদারক ঘটনার সত্যতা সামনে আসায় বিচারপ্রার্থনায় অনড় রয়েছেন স্বজন ও বন্ধুরা।