ব্রিটেনের সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভরাডুবির পর দলটির ভেতরে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ঘিরে চাপ দ্রুত বাড়ছে। গত শুক্রবার রাত পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের বেশি লেবার এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন অথবা তার প্রধানমন্ত্রিত্বের একটি নির্দিষ্ট ‘সময়সীমা’ বেঁধে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
দলটির অনেক এমপি মনে করছেন, ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় নেতিবাচক বিষয় ছিলেন স্বয়ং স্টারমার। এক লেবার এমপি বিবিসিকে বলেন, ‘ভোটারদের দরজায় একটাই বিষয় ছিল, কিয়ার। তাকে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে গেলে আমরা শেষ।’
আরেকজন সাধারণত স্টারমারপন্থি এমপি, যার এলাকায় বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে বড় সাফল্য পেয়েছে, তিনি বলেন, ‘ভোটাররা আসলে লেবারকে খুব একটা ঘৃণা করেনি, কিন্তু তারা কিয়ারকে অপছন্দ করেছে।’ দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘ওয়েলসজুড়ে সবাই বলছে, সব দোষ স্টারমারের।’
তবে দলটির ভেতরে অনেকে আবার সতর্কও করছেন। তাদের মতে, সরকারে থাকা অবস্থায় নেতৃত্ব পরিবর্তনের লড়াই দলকে আরও দুর্বল করতে পারে। এক লেবার এমপি বলেন, ‘যেই দায়িত্ব নিক না কেন, একই সমস্যার মুখোমুখি হবে। একটি অস্থির ও প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন দেশ, যারা একদিকে কর কমাতে চায়, অন্যদিকে প্রায় সব খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানায়।’
এদিকে মন্ত্রিসভার বেশির ভাগ সদস্য প্রকাশ্যে স্টারমারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল বলেন, ‘এই ফল ঘুরিয়ে দিতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার, শুধু নেতাকে দোষারোপ করে লাভ নেই।’
তবে দলটির ভেতরে অনেকে মনে করছেন, স্টারমার অন্তত সমস্যার একটি অংশ। সাবেক মন্ত্রী লুইস হাইঘ বলেন, এখন অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকট তৈরির সময় নয় এবং তিনি ইরান যুদ্ধ নিয়ে স্টারমারের অবস্থানের প্রশংসাও করেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জনগণের বার্তা পরিষ্কার, সরকার যদি দ্রুত ও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে না পারে, তাহলে স্টারমার পরবর্তী নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না।’
আরেক এমপি সারাহ ওয়েন আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘বাস্তব পরিবর্তন আনতে না পারলে কিয়ার স্টারমার আর কোনো নির্বাচনে, স্থানীয় বা জাতীয়তে, দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না।’
এই দুই নেতা লেবারের ‘সফট লেফট’ ঘরানার ট্রিবিউন গ্রুপের প্রভাবশালী সদস্য। তাদের একাংশ চান, আপাতত স্টারমারকে সাময়িক সমর্থন দেওয়া হোক, যতক্ষণ না গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নগ্যাম অ্যান্ডি বার্মহ্যাম ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরে এসে নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
দলটির কেন্দ্র-বাম অংশ থেকে দিনজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে স্টারমারের ওপর চাপ তৈরি করার চেষ্টা দেখা গেছে। তাদের অনেকে চান, প্রধানমন্ত্রী যেন সরে দাঁড়ানোর একটি সময়সূচি ঘোষণা করেন।
তবে সমস্যা হলো, লেবার নেতা হতে হলে সংসদ সদস্য হতে হয়, আর বর্তমানে অ্যান্ডি বার্মহ্যাম এমপি নন। ধারণা করা হচ্ছে, স্টারমার যদি তাৎক্ষণিক পদত্যাগ না করে ভবিষ্যতের একটি সময়সীমা ঘোষণা করেন, তাহলে বার্নহ্যামের সংসদে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কয়েক মাস আগে এমপি হওয়ার চেষ্টা করলে দলই তার প্রার্থিতা আটকে দিয়েছিল। এখনো দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির কয়েকজন সদস্য বিবিসিকে বলেছেন, প্রয়োজনে আবারও তাকে বাধা দেওয়া হতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে বার্নহ্যামপন্থিদের বিকল্প পরিকল্পনা কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে কয়েকজন এমপি ইতোমধ্যে এই বাধা সরানোর দাবি তুলেছেন। একজন এমপি বলেন, ‘বার্নহ্যামকে আবারও আটকে দেওয়া হলে সংসদীয় লেবার পার্টির মধ্যে বিদ্রোহী পরিস্থিতি তৈরি হবে।’
যদিও প্রকাশ্যে সমালোচনায় নামা এমপিদের সংখ্যা এখনো ৪০০-এর বেশি লেবার এমপির তুলনায় কম, তবু মন্ত্রিসভার সদস্যদের সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক প্রকাশ্য সমর্থন জানানো অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ সাধারণত এসব সমর্থন আলাদাভাবে জানাতে হয় না।
এই নির্বাচন ছিল ব্রিটিশ রাজনীতিতে এক অস্বাভাবিক ঘটনা। ভোটের ফলাফল দেখিয়েছে বিভক্তি, অস্থিরতা, বহুদলীয় রাজনীতির উত্থান এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রেকর্ড ভাঙার প্রবণতা।
উত্তর লন্ডনের ক্যামডেন কাউন্সিলে, যেখানে স্টারমারের নিজস্ব স্থানীয় এলাকা, সেখানে লেবার কাউন্সিল প্রধান গ্রিন পার্টির কাছে হেরে গেছেন, যদিও কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছে দলটি।
অন্যদিকে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনচের এলাকা এসেক্সে কনজারভেটিভরা হেরেছে রিফর্ম ইউকের কাছে। ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের কার্কলিজে ওয়েস্টমিনস্টারের তিন বড় দলের স্থানীয় নেতারাই নিজেদের আসন হারিয়েছেন।
ওয়েলসে লেবার পার্টি বহু দশক ধরে নির্বাচনে জিতে আসছিল। প্রখ্যাত প্রকৃতিবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরোর জন্মের আগের সময় থেকেও। এবার সেই ধারায় ছেদ পড়েছে। একইভাবে বার্নসলি কাউন্সিলের লেবার নেতা স্টিভ হাউটন সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজরে সময় থেকে দায়িত্বে ছিলেন। এবার তিনিও হেরে গেছেন।
অন্যদিকে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি এখনো স্কটল্যান্ডে ধারাবাহিকভাবে নির্বাচনে জিতে যাচ্ছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে, লেবার বড় ধাক্কা খেলেও কনজারভেটিভরাও কার্যত রাজনৈতিক প্রান্তে চলে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমার ডাউনিং স্ট্রিটে থেকেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
আগামী সপ্তাহে তিনি একটি বড় ভাষণ দেবেন এবং নতুন আইন প্রণয়নের কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। এমনকি তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কেউ কেউও স্বীকার করছেন, সেই ভাষণ কেমনভাবে গ্রহণ করা হয়, তার ওপরই নির্ভর করতে পারে স্টারমার কতদিন ক্ষমতায় টিকে থাকবেন। সূত্র: বিবিসি