নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর ঘিরে সংঘটিত ঘটনাগুলোর সবচেয়ে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছে। যেখানে কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে গ্যাস ও ধূলিকণার প্রবাহ থেকে ক্রমাগত ক্ষীণ আলোর ঝলকানি নির্গত হচ্ছে, যার মাঝে মাঝে উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা দেখা যাচ্ছে।
২০২১ সালে উৎক্ষেপণের পর ২০২২ সালে কার্যক্রম শুরু করা ওয়েব টেলিস্কোপের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ‘স্যাজিটেরিয়াস এ (Sgr A*)’ নামে পরিচিত এই ব্ল্যাকহোলের চারপাশে দীর্ঘসময় ধরে পর্যবেক্ষণ চালানোর সুযোগ পেয়েছেন। এতে দেখা গেছে, স্যাজিটেরিয়াস এ-এর চারপাশের অঞ্চলটি স্থির অবস্থার পরিবর্তে অস্থিতিশীল গতিশীলতার মধ্যে রয়েছে।
গবেষকরা ব্ল্যাকহোলের চারপাশে থাকা গ্যাসের ঘূর্ণায়মান অ্যাক্রেশন ডিস্ক থেকে ক্রমাগত আলোর বিচ্ছুরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই আলো ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজনের কাছাকাছি থেকে নির্গত হচ্ছে। এটি এমন একটি সীমারেখা, যেখানে প্রবেশ করামাত্র সবকিছু চিরতরে হারিয়ে যায়। যেখানে তারা, গ্রহ, গ্যাস, ধূলিকণা, এমনকি আলোও হারিয়ে যায়।
এ ছাড়া গবেষণায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় এক থেকে তিনটি বড় আকারের ঝলকানি এবং এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ছোট আকারের ঝলকানি শনাক্ত করা হয়েছে।
ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিদ ফারহাদ ইউসুফ-জাদেহ সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণাটির গবেষক দলের প্রধান। তিনি জানিয়েছেন, এই অঞ্চল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও চরম মাধ্যাকর্ষণ দ্বারা প্রভাবিত। গ্যাসের কণা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে এবং শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের কারণে একত্রিত হয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে ব্ল্যাকহোলে প্রবেশ করছে।
এই শক্তিশালী বিস্ফোরণগুলো সূর্যের ‘সোলার ফ্লেয়ারস বা সৌর শিখা’-এর মতো একই প্রক্রিয়ার কারণে ঘটে। যেখানে গরম চার্জযুক্ত কণা মহাকাশে বিচ্ছুরিত হয়। তবে স্যাজিটেরিয়াস এ-এর ক্ষেত্রে এই বিস্ফোরণগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী ও ভিন্ন ভৌত পরিবেশে সংঘটিত হয়।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ব্ল্যাকহোলটি সরাসরি দেখা সম্ভব নয়। তবে এর চারপাশের উপাদান বিশ্লেষণ করে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। স্যাজিটেরিয়াস এ-এর ভর সূর্যের চেয়ে প্রায় ৪০ লাখ গুণ বেশি এবং এটি পৃথিবী থেকে ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এক আলোকবর্ষ হলো আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, যা প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।
বেশির ভাগ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটি সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর থাকে। এসজিআর স্যাজিটেরিয়াস এ-এর চারপাশে পর্যবেক্ষণ করা ঘটনাগুলো নাটকীয় হলেও, এই কৃষ্ণগহ্বর অন্যান্য গ্যালাক্সির কেন্দ্রের মতো সক্রিয় নয় এবং তুলনামূলকভাবে শান্ত অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করা হয়।
নতুন ফলাফলগুলো এক বছরে ওয়েব দ্বারা স্যাজিটেরিয়াস এ-এর প্রায় ৪৮ ঘণ্টার সব পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা ৬ ঘণ্টা থেকে সাড়ে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত সাতটি ধাপে বিভক্ত।
এই পর্যবেক্ষণগুলোর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোল কীভাবে তার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারছেন। ইউসুফ-জাদেহ বলেন, অ্যাক্রেশন ডিস্কের প্রায় ৯০ শতাংশ উপাদান ব্ল্যাকহোলে প্রবেশ করে, আর বাকি ১০ শতাংশ মহাকাশে ফিরে যায়।
গবেষকরা মনে করেন, এই অ্যাক্রেশন ডিস্ক মূলত নিকটবর্তী নক্ষত্রের স্টেলার উইন্ড বা তারার পৃষ্ঠ থেকে বিচ্ছুরিত গ্যাসের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে, যা ব্ল্যাকহোলের তীব্র মাধ্যাকর্ষণ বলের কারণে আকৃষ্ট হয়।
আগে এ ধরনের পর্যবেক্ষণ শুধু কয়েক ঘণ্টার জন্য স্থলভিত্তিক টেলিস্কোপ বা একবারে প্রায় ৪৫ মিনিটের জন্য কক্ষপথে থাকা হাবল স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে সম্ভব ছিল। কিন্তু ওয়েব টেলিস্কোপের উন্নত সেন্সর ও নিয়ার-ইনফ্রারেড ক্যামেরার সাহায্যে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ৪৮ ঘণ্টা স্যাজিটেরিয়াস এ পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন।
এই গবেষণা সম্প্রতি অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারসে প্রকাশিত হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে ব্ল্যাকহোল সম্পর্কিত আরও গভীর গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করবে। সূত্র: রয়টার্স


