বাংলাদেশ শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে নিজের উত্তরণ ঘটাবে। এরপর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আর আগের মতো শুল্ক সুবিধা থাকবে না। তখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন হবে দক্ষ, বিজ্ঞানভিত্তিক মানবসম্পদ। তাই আজ থেকে স্কুল-কলেজে হাতে-কলমে, ল্যাবভিত্তিক ও প্রজেক্ট-কেন্দ্রিক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক থেকে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের অর্থনীতির প্রধান শক্তি, তবে একই সঙ্গে এটি একমুখী নির্ভরতা তৈরি করেছে। বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমে গেলে বা বাণিজ্যিক শর্ত কঠিন হলে পুরো অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সংকট ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা প্রমাণ করেছে একটি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ একটি বড় অর্জন, তবে এর সঙ্গে আসবে নতুন চ্যালেঞ্জও। এলডিসি হিসেবে যেসব বাণিজ্যিক সুবিধা এতদিন পেয়েছি, সেগুলো আর থাকবে না। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে চাই উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য, বহুমুখী রপ্তানি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প। রপ্তানি বৈচিত্র্য এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং এটি টিকে থাকার শর্ত।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় শক্তি হবে তরুণ প্রজন্ম। কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠী এখন মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এ এক বিরল সুযোগ, যাকে বলা হয় ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। যদি এই প্রজন্মকে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণার মনোভাব ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় গড়ে তোলা যায়, তবে তারা দেশকে বহুমুখী শিল্পে এগিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু দক্ষতা ছাড়া শ্রমবাজারে প্রবেশ করলে এই বিশাল জনসংখ্যা আশীর্বাদ নয়, বরং বোঝায় পরিণত হবে।
ইতোমধ্যে উদীয়মান কিছু খাত আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিক্স খাতে বছরে কোটি কোটি ইউনিট উৎপাদিত হচ্ছে। ফার্মাসিউটিক্যালস দেশে প্রায় পুরো চাহিদা মেটাচ্ছে এবং শতাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। আইসিটি খাতে তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং বিশ্বে পরিচিত নাম হয়ে উঠেছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সবখানে একটি সাধারণ সমস্যা দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি। গবেষণা ও উদ্ভাবন ছাড়া এসব খাত দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন জরুরি। স্কুল ও কলেজে বিজ্ঞানকে বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে হাতে-কলমে শেখানো দরকার। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও গণিতে প্রজেক্ট ও প্রায়োগিক কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেও শিখতে পারবে। একই সঙ্গে ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে হবে। রোবোটিকস, অটোমেশন, এমবেডেড সিস্টেম, মেশিন মেইনটেন্যান্স ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল এসব নতুন দক্ষতাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে কোর্সে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত করতে হবে। গবেষণা কেবল থিসিসে সীমাবদ্ধ থাকলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আসে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিল্প সহযোগিতায় প্রোটোটাইপ তৈরি, পণ্য উন্নয়ন ও স্টার্টআপ ইনকিউবেশন চালু করা গেলে তরুণদের উদ্ভাবন সরাসরি শিল্পে কাজে লাগবে। পাশাপাশি শিক্ষকদেরও নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষকদের হাতে নতুন প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা তুলে দেওয়া হলে তার প্রতিফলন শিক্ষার্থীদের শেখার পদ্ধতিতেও পড়বে।
এ ছাড়া প্রতিটি জেলায় মেকারস্পেস বা ফ্যাব ল্যাব গড়ে তুললে ছাত্রছাত্রীদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ মিলবে। ছোট ছোট দল সৌরচালিত ডিভাইস, পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র কিংবা কম খরচের রোবট বানাতে পারবে। এগুলো শুধু শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়াবে না, বরং স্থানীয় সমস্যারও সমাধান দেবে। পাশাপাশি ইংরেজি যোগাযোগ, দলগত কাজ ও উপস্থাপনার মতো সফট স্কিলকেও শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, কারণ বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে প্রযুক্তি জ্ঞানের পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতাও অপরিহার্য।
আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আমাদের কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। ইলেকট্রনিক্স খাতে স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ফার্মাসিউটিক্যালসে বায়োসিমিলার ও বিশেষায়িত ওষুধে গবেষণা বাড়াতে হবে। আইসিটি খাতে তরুণদের ক্লাউড, এআই ও সাইবার সিকিউরিটি সার্টিফিকেশনকে উৎসাহ দিতে হবে। কৃষিতে স্মার্ট সেন্সর ও কোল্ড চেইন প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি চালাতে সক্ষম টেকনিশিয়ান তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি বৈচিত্র্যের পথচলা শুধু সরকারি নীতি দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য চাই বিজ্ঞানশিক্ষা-কেন্দ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গবেষণা-শিল্প সহযোগিতা। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর যখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে, তখন তরুণদের জ্ঞান ও দক্ষতাই আমাদের মূল শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। আজ আমরা যদি শিক্ষাকে ল্যাবভিত্তিক, প্রজেক্ট-কেন্দ্রিক ও শিল্প-সংযুক্ত করতে পারি, তবে আগামী দশকে বাংলাদেশ পোশাকের বাইরেও ইলেকট্রনিক্স, ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃষি উদ্ভাবনে একটি শক্তিশালী রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত হবে।
/আবরার জাহিন


