মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)-এর অংশীদারত্বে মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী কোম্পানি লকহিড মার্টিন স্কঙ্ক ওয়ার্কস (Lockheed Martin Skunk Works) তাদের এক্স-৫৯ (X-59) ‘নীরব সুপারসনিক’ বিমানটির প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
যদিও এই সপ্তাহের প্রথম উড্ডয়নটি শব্দের গতির কম ছিল, তবে বিমানটির চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শব্দের তীব্র বিস্ফোরণ বা ‘সনিক বুম’-কে কমিয়ে এমন একটি প্রযুক্তির প্রদর্শন করা, যা কেবল মৃদু ধাক্কার (gentle thumps) মতো শোনাবে।
স্কঙ্ক ওয়ার্কসের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জেনারেল ম্যানেজার ওজে সানচেজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘‘এক্স-৫৯ এর প্রথম উড্ডয়ন অর্জন করতে পেরে আমরা রোমাঞ্চিত। এই বিমানটি আমাদের যৌথ দলের উদ্ভাবন এবং দক্ষতার একটি প্রমাণ, এবং আমরা নীরব সুপারসনিক প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রভাগে থাকতে পেরে গর্বিত।’’
নাসার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক শন ডাফি এক্স-৫৯ বিমানকে ‘‘আমেরিকান উদ্ভাবনী শক্তির প্রতীক’’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘‘আমেরিকান চেতনার কোনো সীমা নেই। আরও দূরে, আরও দ্রুত এবং আগের চেয়েও নীরবে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের ডিএনএতে আছে। এই কাজটি বিমান চালনায় আমেরিকার নেতৃত্বকে বজায় রাখবে এবং জন সাধারণের আকাশপথে ভ্রমণের পদ্ধতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।’’
নকশা ও ইতিহাস
‘লো-বুম’ সুপারসনিক ফ্লাইটের পথ প্রশস্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এক্স-৫৯ বিমানটি গত সাত বছর ধরে তৈরি করা হচ্ছে। শব্দের তীব্রতার কারণে ১৯৭৩ সাল থেকে মার্কিন ভূখণ্ডের ওপর বাণিজ্যিক সুপারসনিক ফ্লাইট নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু গত জুন মাসে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাহী আদেশে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
স্পাইকি আকারের এক্স-৫৯ প্রোটোটাইপটি ৯৯.৭ ফুট (৩০.৪ মিটার) লম্বা এবং এর ডানার বিস্তার ২৯.৫ ফুট (৯ মিটার)। এটি শব্দের গতির ১.৪ গুণ (Mach 1.4) গতিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এভিয়েশন উইক জানিয়েছে, গত ২৮ অক্টোবর সকাল ৮:১৪ মিনিটে ক্যালিফোর্নিয়ার পামডেল-এ অবস্থিত স্কঙ্ক ওয়ার্কসের টেস্ট ফ্লাইট কেন্দ্র থেকে বিমানটি উড্ডয়ন করে। পাইলট নিলস লারসন বিমানটিকে ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় নিয়ে যান এবং ঘাঁটির চারপাশে ২৫০ নটস পর্যন্ত গতিতে মৌলিক হ্যান্ডলিং পরীক্ষা করেন। মোট ১ ঘণ্টা ৭ মিনিটের ফ্লাইট শেষে বিমানটি কাছাকাছি এডওয়ার্ডস এয়ার ফোর্স বেসে নিরাপদে অবতরণ করে।
লকহিড মার্টিন জানিয়েছে, এক্স-৫৯ ‘‘পরিকল্পনা অনুযায়ী নিখুঁতভাবে কাজ করেছে’’, এবং এর প্রাথমিক উড্ডয়ন গুণাবলী এবং এয়ার ডেটা কর্মক্ষমতা যাচাই করেছে।
বিমানটির বিশেষ নকশার মধ্যে রয়েছে এর সূঁচালো নাক, শকওয়েভ-মৃদুকারী কাঠামো (fuselage) এবং উপরে-স্থাপিত ইঞ্জিন। সনিক বুমের তীব্রতাকে ন্যূনতম করার উদ্দেশ্যে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে। সনিক বুম হলো শব্দের গতিকে অতিক্রম করার সময় একটি বস্তুর (যেমন বিমান) দ্বারা সৃষ্ট তীব্র বিস্ফোরণ বা শক ওয়েভ, যা পৃথিবীতে পৌঁছালে বিকট শব্দ সৃষ্টি করে। এটি আসলে বায়ুর চাপ দ্রুত পরিবর্তনের ফল।
পরবর্তী ধাপ ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী
আগামী মাসগুলোতে স্কঙ্ক ওয়ার্কস নাসার সঙ্গে কাজ করে এক্স-৫৯ এর ফ্লাইট এনভেলপ সম্প্রসারণ করবে এবং ট্রান্সসনিক ও সুপারসনিক পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন চালাবে। পরীক্ষার পরবর্তী ধাপগুলিতে, নাসা এক্স-৫৯ এর শব্দ স্বাক্ষর পরিমাপ করবে এবং জনসাধারণের মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা কেমন, তা যাচাই করবে।
এদিকে, অন্যান্য কোম্পানিও তাদের বাণিজ্যিক সুপারসনিক প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বুম সুপারসনিক (Boom Supersonic) তাদের ছোট আকারের এক্সবি-১ (XB-1) বিমানের শব্দের চেয়ে দ্রুত গতির পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ আকারের ‘ওভারচার (Overture)’ জেটটির প্রথম উড্ডয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বুম সুপারসনিক দাবি করছে, তাদের জেটগুলো এত উঁচু দিয়ে ক্রুজ করবে যে মাটিতে থাকা মানুষের জন্য তা ‘‘বুমহীন’’ মনে হবে। এছাড়া, স্পাইক এরোস্পেস (Spike Aerospace) ‘এস-৫১২ ডিপ্লোম্যাট’ নামে একটি লো-বুম সুপারসনিক বিজনেস জেট তৈরি করছে।
তবে, এরিয়ন (Aerion) এবং এক্সোসনিক (Exosonic) নামের আরও দুটি স্টার্টআপ সংস্থা সুপারসনিক বিমানের ধারণার উপর কাজ করলেও, তহবিলের অভাবে তারা তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। সূত্র: নাসা, রয়টার্স
মাহফুজ/


