বয়ঃসন্ধি হলো শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় পৌঁছানোর একটি পর্যায়, যখন যৌন পরিপক্বতার জন্য শরীরে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। সাধারণত মেয়েদের ১০-১৩ বছর বয়সে এবং ছেলেদের ১১-১৫ বছর বয়সে বয়ঃসন্ধি শুরু হয়। এটি দেশ, পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন মানুষের বয়ঃসন্ধিকাল ৩২ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধিকাল ৩২ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে পারে। কারণ মানুষ প্রায় ৯, ৩২, ৬৬ এবং ৮৩ বছর বয়সে মস্তিষ্কের বিকাশে চারটি প্রধান ‘টার্নিং পয়েন্ট’ অর্জন করে। পরের পর্যায়টি ৮৪ বছরের পরের সময়। গত মঙ্গলবার নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় ৯০ বছর বয়সী অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের প্রায় চার হাজার স্ক্যান পরীক্ষা করা হয়েছে।
গবেষকরা এসব তথ্য ব্যবহার করে মস্তিষ্ক বিকাশের মানচিত্র তৈরি করেছেন এবং আবিষ্কার করেছেন যে মানুষ পাঁচটি ‘মস্তিস্ক পর্যায়ের’ মধ্য দিয়ে নিজেকে অতিক্রম করে। এর মধ্যে চারটি পর্যায় গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলোতে তারা বৃদ্ধি পায়, পরিণত হয় এবং নিঃশেষ হয়ে যায়।
গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন যে ৩২ বছর বয়সের আগে মানুষের ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে এবং বয়ঃসন্ধির প্রাথমিক স্তর পার করার পর স্থিতিশীলতা আসে।
গবেষণা অনুসারে, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং বার্ধক্য পাঁচটি পৃথক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। সেগুলো হলো ১. শৈশব জন্ম থেকে ৯ বছর বয়স পর্যন্ত, ২. বয়ঃসন্ধিকাল ৯ থেকে ৩২ বছর পর্যন্ত, ৩. প্রাপ্তবয়স্কতা ৩২ থেকে ৬৬ বছর পর্যন্ত, ৪. অকাল বার্ধক্য ৬৬ থেকে ৮৩ বছর পর্যন্ত ও ৫. দেরিতে বার্ধক্য ৮৩ বছরের বেশি পর্যন্ত।
জন্ম থেকে বার্ধক্যের মধ্যে মস্তিষ্ক নতুন পরিবেশ এবং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গবেষকরা দেখেছেন- চারটি স্তর ৯, ৩২, ৬৬ এবং ৮৩ মস্তিষ্কের বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবর্তনগুলো বয়ঃসন্ধি, ব্যক্তিত্বের স্থিতিশীলতা, পুনর্গঠন এবং হ্রাস পাওয়ার পর্যায় বলে চিহ্নিত করা হয়।
শৈশব-জন্ম থেকে ৯ বছর বয়স পর্যন্ত
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনস হপকিনস মেডিসিনের তথ্য অনুসারে, ধূসর পদার্থ প্রাথমিকভাবে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং ব্যাখ্যা করে। তবে সাদা পদার্থ সেই তথ্য স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অংশে প্রেরণ করে। মস্তিষ্কে ধূসর পদার্থ বলতে গাঢ়, বাইরের অংশকে বোঝায় আর সাদা পদার্থ বলতে নিচের হালকা, ভেতরের অংশকে বোঝায়। মেরুদণ্ডের কর্ডে এই ক্রমটি বিপরীত, সাদা পদার্থ বাইরের দিকে থাকে এবং ধূসর পদার্থ ভেতরে থাকে।
গবেষকদের মতে, জীবনের প্রথম কয়েক বছর সিন্যাপ্সের একত্রীকরণ এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্মূলের দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, যেখানে নিউরনগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয় এবং যোগাযোগ করে। ধূসর ও সাদা পদার্থের আয়তন দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
এই বয়সটি বয়ঃসন্ধির সূত্রপাতের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি নারীদের জন্য ৮ থেকে ১৩ বছর এবং পুরুষদের জন্য ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে শুরু হয়। এ সময় হরমোন প্রকাশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এবং শক্তিশালী স্নায়বিক পরিবর্তনের সূচনা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধিকালে পরিবর্তনের ফলে হরমোনের পরিবর্তন এবং ‘স্নায়ু জীববিজ্ঞানগত পরিবর্তনের কারণে মানসিক স্বাস্থ্য, জ্ঞানীয় এবং আচরণগত ব্যাধির ঝুঁকি বাড়ে।
বয়ঃসন্ধিকাল: ৯ থেকে ৩২ বছর
আগে এটি মেনে নেওয়া হতো যে এই সময়টি শুরু হয় বয়ঃসন্ধি দিয়ে এবং ২০ বছর বয়সের আগেই শেষ হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে বয়ঃসন্ধি অবশ্যই বয়ঃসন্ধি দিয়ে শুরু হলেও এর শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরিবর্তন সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং সামাজিক কারণগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়, যা এটিকে সম্পূর্ণ জৈবিক পরিবর্তনের পরিবর্তে প্রেক্ষাপটনির্ভর করে তোলে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে কিশোর-কিশোরীদের টপোলজিক্যাল বিকাশ প্রায় ৩২ বছর বয়স পর্যন্ত প্রসারিত হয়। আর সেটি হয় মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কগুলো টপোলজিক্যাল বিকাশের একটি নতুন পথ শুরু করার আগে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে ৩২ বছর বয়সে, মস্তিষ্ক জীবনের অন্যান্য মোড়ের তুলনায় ‘সবচেয়ে বেশি নির্দেশনামূলক পরিবর্তন এবং গতিপথে একটি বড় পরিবর্তন আনে। তবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বয়ঃসন্ধিকাল কীভাবে অব্যাহত থাকে, সে সম্পর্কে তারা বিস্তারিত বলেননি।
প্রাপ্তবয়স্কতা: ৩২ থেকে ৬৬ বছর
গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের প্রথম দুটি পর্যায়ে মস্তিষ্কের বিকাশ দ্রুতগতিতে ত্বরান্বিত হয়। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দীর্ঘতম পর্যায় ষাটের দশক পর্যন্ত কোনো বড় পরিবর্তন আসে না। কারণ এ সময় মস্তিষ্ক আরও ধীরে ধীরে বিকশিত হয়।
অকাল বার্ধক্য: ৬৬ থেকে ৮৩ বছর
এই পর্যায়ে মস্তিষ্কে হঠাৎ করে পতনের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না, তবু শ্বেত পদার্থের অখণ্ডতা হ্রাসের কারণে মস্তিষ্কের সংযোগের ধরনে পরিবর্তন ঘটে। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে স্বাস্থ্য এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়া ও উচ্চ রক্তচাপের সূত্রপাত হয়, যা উভয়ই মস্তিষ্কের বার্ধক্যকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
দেরিতে বার্ধক্য: ৮৩ বছরের বেশি
যদিও নমুনার আকার কম থাকার কারণে অন্য পর্যায়গুলোর তুলনায় মস্তিষ্কের অগ্রগতির এই যুগের তথ্য কম, তবু গবেষণার ফলাফলগুলো মস্তিষ্কের সংযোগের হ্রাসের প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি জীবনের শেষের দিকে বয়স এবং কাঠামোগত মস্তিষ্কের টপোলজির মধ্যে একটি সত্যিকারের দুর্বল সম্পর্ককে প্রতিফলিত করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বয়ঃসন্ধিকাল ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সের মধ্যে। ২০১৮ সালে দ্য ল্যানসেট মেডিকেল জার্নালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধিকাল বিশের দশকে শেষ হয়। কিন্তু ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোইনফরমেটিকসের অধ্যাপক এবং গবেষণার অন্যতম লেখক ডানকান অ্যাস্টল দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছেন, ‘নতুন প্রতিবেদনটি আমাদের মস্তিষ্কের দুর্বলতাগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। আল-জাজিরা