যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মাঞ্জানিটা বনের ঝরা পাতার ওপর দিয়ে হন্যে হয়ে কিছু একটা খুঁজছিলেন ছত্রাকবিজ্ঞানী জেসিকা অ্যালেন। তার লক্ষ্য একটি বিরল প্রজাতির হলুদ ছত্রাক ‘মাঞ্জানিটা বাটার ক্লাম্প’ খুঁজে বের করা। উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে দেখা মেলা এই ক্ষুদ্র ছত্রাকটির সর্বশেষ দেখা মিলেছিল দুই বছর আগে। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে অ্যালেন বারবার থমকে যাচ্ছিলেন পাথরের গায়ে জন্মানো বিচিত্র সব লাইকেনের সমাহার দেখে।
অ্যালেন এবং তার সঙ্গী পরিবেশবিদ জেসি মিলারের মতো একদল গবেষক এখন বুঁদ হয়ে আছেন ছত্রাকের এই রহস্যময় জগতে। তাদের লক্ষ্য কেবল গবেষণা নয়, বরং প্রাণপ্রকৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা।
পৃথিবীর প্রাণমণ্ডলীর অস্তিত্ব রক্ষায় ছত্রাক অপরিহার্য। স্প্রিংগার নেচার জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২৫ লাখ প্রজাতির ছত্রাক রয়েছে। খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য খাতে এই ছত্রাকগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৫৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবদান রাখে।
ছত্রাক উদ্ভিদ বা প্রাণী কোনোটি নয়, এটি একটি স্বতন্ত্র জগৎ। এর মধ্যে রয়েছে পাউরুটি ও পনির তৈরিতে ব্যবহৃত ইস্ট, পচা ফলের ওপর জন্মানো মোল্ড এবং আমাদের পরিচিত ব্যাঙের ছাতা (মাশরুম)। এগুলো বনের বাস্তুসংস্থানে মৃত দেহাবশেষ পচিয়ে মাটিতে পুষ্টি ফিরিয়ে দেয় এবং কার্বন সঞ্চয় করে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। পেনিসিলিনের মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধও এসেছে এই ছত্রাক থেকে।
এত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও ছত্রাক সংরক্ষণের বিষয়টি বরাবর অবহেলিত। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত মাত্র ১ লাখ ৫৫ হাজার প্রজাতির ছত্রাক নথিভুক্ত করতে পেরেছেন, যা মোট সম্ভাব্য প্রজাতির মাত্র ৬ শতাংশ।
জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, বন উজাড় এবং অতিমাত্রায় আহরণের ফলে ছত্রাক আজ চরম সংকটে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর লাল তালিকা অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মূল্যায়ন করা ১ হাজার ৩০০ প্রজাতির মধ্যে ৪১১টি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
ছত্রাকের একটি বড় অংশ মাটির নিচে ‘মাইসেলিয়াম’ নামক সুতার মতো নেটওয়ার্ক হিসেবে থাকে। কেবল অনুকূল পরিবেশ পেলে এগুলো মাটির ওপরে মাশরুম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই লুকায়িত স্বভাবের কারণে এদের শনাক্ত করা এবং রক্ষা করা বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমানে ছত্রাক সংরক্ষণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ আশা জাগাচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়া লাইকেন সোসাইটির মতো শৌখিন গবেষকদের দলগুলো এখন দুর্গম বনে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করছে। ল্যারি কুলের মতো শৌখিন গবেষকরা গত পাঁচ দশক ধরে লাইকেনের বৈচিত্র্য নথিবদ্ধ করছেন। আবার কেন কেলম্যানের মতো সাবেক মেকানিকও তার নেশা থেকে ছত্রাক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
নেচারসার্ভ-এর মাইকোলজিস্ট জেসিকা অ্যালেন বলেন, ‘এই শৌখিন সংগ্রাহকরা অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলো করেন এবং বিরল প্রজাতির ওপর নজর রাখেন।’ বর্তমানে ‘আইন্যাচারালিস্ট’ ও ‘মাশরুম অবজার্ভার’-এর মতো প্ল্যাটফর্মে সাধারণ মানুষের তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ছত্রাকের বৈচিত্র্য ও বিপদাপন্ন প্রজাতি সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন।
ইউরোপে ছত্রাক সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের ইতিহাস থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। দেশটিতে মাত্র দুটি লাইকেন প্রজাতি ফেডারেল আইনের অধীনে সুরক্ষা পায়। তবে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ জার্সির মতো অঙ্গরাজ্যগুলো এখন ছত্রাককে তাদের সংরক্ষণ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করছে।
সংরক্ষণবিদদের মতে, ছত্রাক রক্ষা করা মানে পুরো বন রক্ষা করা। ১৯৯০-এর দশকে উত্তর আমেরিকার স্পটেড আউল (প্যাঁচা) রক্ষায় যখন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তখন দেখা যায় প্যাঁচাকে বাঁচাতে হলে পুরো বনের ছত্রাক ব্যবস্থাকেও রক্ষা করা জরুরি।
মাঞ্জানিটা বাটার ক্লাম্প খুঁজতে গিয়ে সেদিন অ্যালেন এবং তার দল সফল হননি। তাতে অবশ্য মন খারাপ নেই তাদের। অ্যালেনের ভাষায়, ‘আমার অনেক দিন এভাবে শেষ হয়। কিন্তু দিনটি আমাদের জন্য দারুণ ছিল।’ প্রকৃতিপ্রেমী ও বিজ্ঞানীদের এই নিরলস অনুসন্ধান হয়তো আগামীর পৃথিবীতে এই নীরব কারিগরদের টিকিয়ে রাখবে।


