নিঃসীম দিগন্তরেখার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে সাবেত। চারপাশে শুধুই ধু ধু শূন্যতা। রুক্ষ, বিবর্ণ, ক্ষুধার্ত এক মাঠ। একদিন যেখানে ঢেউ খেলত ঘাসের সবুজ মায়া, আজ সেখানে রোদের খরায় ফেটে গেছে মাটি। বাতাসও যেন জবুথবু হয়ে বসে আছে গা পুড়িয়ে দেওয়া উত্তাপে। মাথার ওপরের সূর্যটা নির্দয় ও নির্মম, প্রতিটি কণায় জ্বালিয়ে যাচ্ছে অজস্র ক্লান্তির আগুন। তবুও সাবেত এগিয়ে যাচ্ছে। একাকী, নীরব, দৃশ্যমান কোনো গন্তব্য ছাড়াই।
সাবেত এগিয়ে যায়। পেছনে পড়ে থাকে ধুলোয় ভরা একটি শূন্য গ্রাম। তার নাম জরিপুর। কিছুদিন আগেও এই নামটা ছিল মানুষে ভরা, কুকুরের ডাকে জাগা, সন্ধ্যেবেলার উঠোনে গল্পের রুমঝুমে ব্যস্ত। এখন সব স্তব্ধ।
বয়স ত্রিশের কোঠায় সাবেত। লম্বা গড়ন, গায়ের রং খয়েরি, চোখের ভেতর সবসময় একটা চিন্তার কুয়াশা। কয়েক বছর আগে শহর থেকে ফেরে। উচ্চশিক্ষা শেষ করে। ভেবেছিল কিছু একটা করবে। শুধু নিজের জন্য না, এই গ্রামের জন্যও। কিন্তু পরিকল্পনাগুলো যে বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না, সেটা বুঝে নিতে সময় লাগেনি তার।
এখন সে হাঁটছে এই পোড়া মাঠের পথ ধরে। গরমে শুকিয়ে ফাটা মাটির মাঝে, মাঝে মাঝে পুরোনো নালার দাগ। পাশে পড়ে আছে একটা মরিচা ধরা সাইনবোর্ড ‘জরিপপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস’। সাবেত একবার থামে, বোর্ডের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে।
‘কী বোর্ড, তোর নিজের শরম বলে কিছু নাই?’
বোর্ড তো আর জবাব দেয় না। কিন্তু সাবেতের কানে যেন এক পুরোনো কণ্ঠস্বর বাজে, ‘সাবেত, তুই পারবি। দেখিস, তোকে দিয়াই শুরু হইব।’
সেই গলা তার বাবার। ছেলেবেলায় সাবেতের বাবা জমি মেপে মেপে বেড়াতেন। ইউনিয়নের ফাঁকা ফাঁকা খাসজমি, চরের জমি, গজিয়ে ওঠা ঝোপের জমি। সবই ছিল তার চোখের নিচে। একরকম নীরবে স্বপ্ন দেখতেন, যদি এসব জমিতে কারও নাম লেখা যেত। যাদের ঘর নেই, ঠাঁই নেই...। সেই মানুষটা আজ নেই। মারা গেছেন তিন বছর হলো। তার মৃত্যুর পরই সাবেত প্রথমবারের মতো বুঝেছিল, এই গ্রামে স্বপ্নটা আসলে কতটা মাটি কামড়ে পড়ে থাকে।
আজকের এই রুক্ষ মাঠ, এখানেই একসময় বাবার সঙ্গে গিয়েছিল সাবেত। তখন এখানে একদল মানুষ ঝোপ কেটে জুমচাষ করত। এখন সেই মাঠটা আগুনে পুড়ে খোলস হয়ে গেছে।
সাবেত এখানে এসেছে ঠিক একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু সেটা কারও চোখে পড়বে না সহজে। সে চায় এক ইঞ্চি খাসজমিও যেন চলে না যায় দখলদারদের হাতে। দখলদারদের নেতা মাহতাব সরকার। একসময় গ্রামে পোস্টার মারতেন জাতীয় নির্বাচনের সময়, এখন নিজেই নামেন না নির্বাচনে। তাকে দিয়েই নমিনেশন নেয় গ্রামের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা। মাহতাব সরকার যেখানে বলেন, ওখানেই রাস্তা হয়। যেখানে বলেন, ওখানেই ব্রিজ।
সাবেত জানে, তার আজকের উপস্থিতি একটা ঝুঁকি। গ্রামের ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় এক বাড়ির বারান্দায় বসে আছে একজন বুড়ো। নাম জহির মিয়া। সাবেত কাছে যায়।
‘জহির কাকা, আপনি কেমন আছেন?’
জহির কাকা মুখ তোলে, দেখে সাবেতকে। ‘তুই? সাবেত? তোরে দেখি না কতদিন হইল!’
‘এই দিকটায় আসি নাই কাকা। আজ একটু মাঠ ঘুরে আসলাম।’
জহির মিয়া ধুঁকতে ধুঁকতে বলে, ‘দেখিস সাবেত, দখলবাজেরা আবার আইসা নাকি ঘর তুলে। তোরা তরুণরা যদি কিছু না করিস, গ্রাম একদিন গিলে ফেলব এরা।’
সাবেত চুপ করে। তার পর বলে, ‘কাকা, একটা দল করছি। কাগজপত্র তুলি। সব জমির হিসাব রাখব। প্রশাসনে দিয়াও দেব।’
জহির মিয়ার মুখে একঝলক বিস্ময়, তার পর হাসি।
‘তোর বাবার মতোই হইছিস রে।’
কিন্তু কাজ এত সহজ না। সন্ধ্যাবেলা সাবেত বাড়ি ফেরার আগে দেখতে পায় মাহতাব সরকারের গুণ্ডারা মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চোখাচোখি হয় একজনের সঙ্গে। সে থেমে সাবেতকে দেখে।
‘এই যে ভাইসাব, গরমে হেঁটে কি খুব প্যারা খাইছেন?’
সাবেত কিছু বলে না। ছায়া লম্বা হয়, মুখ গম্ভীর করে সে হাঁটা বাড়ায়।
রাতে সাবেতের ঘরে আসে রাইসা। সাবেক স্কুলশিক্ষিকা, বয়সে এক-দুই বছরের বড়। সাবেতের কলেজে পড়ার সময় একদিন ক্লাস নিতেন উনারা। এখন বন্ধুর মতো, পাশে দাঁড়ায়।
‘তুমি সাবধান থেকো। মাহতাব ভয়ংকর।’
‘আমি জানি। কিন্তু আর কেউ যদি না দাঁড়ায়?’
রাইসা চুপ থাকে। জানে, সাবেতকে ফেরানো যাবে না। এরপর শুরু হয় সংগ্রাম। সাবেত পুরোনো ল্যান্ড রেকর্ড অফিসে গিয়ে খুঁজে খুঁজে বের করে জরিপের পুরোনো ম্যাপ। কোথায় খাসজমি ছিল, কোথায় নয়, কোনটা পানি শুকিয়ে চর হয়েছে। সে তথ্য লিখে রাখে। তার পাশে দাঁড়ায় কয়েকজন তরুণ। রাকিব, সায়েম, শুভ্রা। তারা মাঠে যায়, ছবি তোলে, ম্যাপ মেলায়। একটা রিপোর্ট তৈরি করে।
একদিন গভীর রাতে, সাবেতের ঘরে আগুন লাগে। লোকচক্ষুর আড়ালে পুড়ে যায় সেই সব রেকর্ডের কপি, ল্যাপটপ, ডায়েরি। পরদিন সকালে রাইসা আসে। দেখে ঘর পোড়া, সাবেত বসে আছে চুপ করে।
‘সব পুড়েছে,’ সাবেত ফিসফিস করে।
রাইসা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, বলে, ‘তুমি একা নও।’
দুই দিন পর দেখা যায়, সারা গ্রামের দেয়ালে এক পোস্টার, ‘খাসজমি দখলের প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াও। সাবেত ও তার দলকে সমর্থন করো।’
সেই পোস্টার কে ছাপায়, কেউ জানে না। মাহতাব সরকার থমকে যান। কারণ, প্রতিবাদ আসছে এমন জায়গা থেকে, যেটা তিনি ভয় পেতেন। গণমানুষ।
মাসখানেক পরে, সাবেত দাঁড়িয়ে থাকে সেই আগুনে পোড়া মাঠে। এবার মাঠে আবার সবুজ দেখা যায়। ঘাস নয়, তবে ছোট ছোট গাছ লাগানো হয়েছে। সাবেত দাঁড়িয়ে বলে, ‘এই রুক্ষ মাঠেও সবুজ ওঠে।’
পাশে দাঁড়িয়ে থাকে রাইসা, চুপ করে। তারা জানে, লড়াই শেষ হয়নি, তবে শুরুর পথ পেরিয়েছে।
২
মাঠে আবার সবুজ এসেছে। তবে সেই আগের মতো প্রাকৃতিক নয়। কষ্টে বোনা, মুঠোভর্তি আশায় ভরপুর সবুজ। গ্রামের কিছু তরুণ-তরুণী মিলে ধু ধু জমিতে শোভা আনছে নিমগাছ, শিশু, মেহগনি। গাছগুলো ছোট, পাতাগুলো কাঁচা। তবু তারা আছে।
সাবেত সকাল থেকে মাঠে। একহাতে কোদাল, অন্য হাতে পানির হ্যান্ড স্প্রে। রোদ পড়েছে বেশ। ঘাড়ে গামছা দিয়ে মুখ মুছতেই দেখে, রাইসা আসছে হাতে পানির বোতল আর একটা ছোট ঝুড়ি নিয়ে।
‘তুমি আবার আজও একা?’ রাইসা দাঁড়িয়ে পড়ে পাশে। গলায় কোনো দয়া নেই, কণ্ঠে একধরনের জেদি মমতা।
সাবেত হাসে। ‘এসব গাছ আমার। গাছেরা একলা থাকতে পছন্দ করে, জানো?’
রাইসা হালকা চোখ কুচকে তাকায়, ‘গাছ না, তুমি একলা থাকতে চাও।’
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। চারপাশে বাচ্চাদের আওয়াজ, কিছু যুবকের হাসাহাসি, পেছনে গরুর গাড়ির টুংটাং। গ্রামের মধ্যে একটা আশ্চর্য নীরব উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে যেন। যতই ভয় থাকুক, যতই আগুন লাগুক, মানুষের ভিতরের সবুজ মরে না।
মাহতাব সরকার একরকম কোণঠাসা। জেলা অফিস থেকে মেইল এসেছে, ‘জরিপপুরে পুনর্জরিপের নির্দেশ।’ উপজেলা চেয়ারম্যান, যার নামে আগের সপ্তাহেও পত্রিকায় ফিতা কাটা ছবি ছাপা হয়েছে, সে-ও চুপচাপ। কারণ, এখন মিডিয়ায় সাবেতের নাম। একদিন হঠাৎই মাহতাব সরকার মুখোমুখি হয় সাবেতের। বাজারের মোড়ে।
‘বড় সাহস তো দেখাইলেন,’ বলেন ঠাণ্ডা গলায়। মুখে হালকা হাসি, চোখে হিংস্রতা।
সাবেত থামে না, শুধু জবাব দেয়, ‘এই সাহস আমার একার না। গ্রামটার।’
মাহতাব এক পা এগিয়ে আসে, ‘তুই ভাবিস তোকে মানুষ বিশ্বাস করে? দুইটা পোস্টার দেখলে কি লোকে তোকে নেতা বানায়?’
সাবেত দাঁড়িয়ে থাকে দৃঢ়। ‘আমি নেতা হইতে চাই না। চাই, কেউ যেন আর নিজের মাটি হারায়ে না যায়।’
সেদিন থেকেই মাহতাবের সাঙ্গপাঙ্গরা কমে যেতে থাকে। হাটে-ঘাটে চাপা গুঞ্জন- ‘মাহতাব সাহেবরে এবার ফাঁসাইয়া দিবে, শুনছ?’
‘ও মাঠটা খাসজমি রে ভাই!’
গভীর রাতে রাইসার উঠানে বসে থাকে সাবেত। রাইসা ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে চুপচাপ। ‘এই সময়?’ বলে। কণ্ঠে নেই বিরক্তি, আছে অভ্যস্ততা।
সাবেত বলে, ‘তোমার একটা কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ।’
‘কোনটা?’
‘তুমি বলেছিলে, গাছরা একা থাকতে চায় না।’
রাইসা হালকা হেসে জানালায় হেলান দেয়। বাতাসে তার চুল উড়ে পড়ে কপালে।
‘তাই তো। গাছ একা হলে শুকিয়ে যায়।’
সাবেত চুপ করে। তার পর বলে, ‘তুমি যদি পাশে থাকো, আমারও শুকিয়ে যাওয়া লাগবে না।’
এক মুহূর্তে সব চুপ। পাশের খেজুর গাছে বাতাস লাগে, রাতচরা পাখি ডাকে। রাইসা ধীরে উত্তর দেয়, ‘তোমার পাশে আমি তো আছিই সাবেত। শুধুই মাঠে না, অন্য সব রুক্ষ জায়গায়ও।’
এক টুকরো চুপচাপ আলো পড়ে সাবেতের চোখে। আর সেই চোখে যেন শত ঘাম, লড়াই, হেরে যাওয়া রাত পেরিয়ে একরাশ নিশ্চিন্তি খেলা করে।
এক সপ্তাহ পর। পুরো জরিপপুর আজ মাঠে। রংতুলি দিয়ে আঁকা হয়েছে গ্রাম রক্ষা কমিটির নাম। ঢোল বাজছে, মাইক বাজছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। এককোণে বাঁশের মাচায় বসে গান গাইছে স্থানীয় কলেজের ছেলেরা, ‘জমি যেখানে রইল পড়ে, লালন তারেই বাস করে
বলো না আর থেমে থাকি, মাটি রইছে ডাক পড়ে...’
সাবেত দাঁড়িয়ে আছে গাছতলায়। পাশে রাইসা। শুভ্রা, রাকিব, সায়েম সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে। রাইসা নিচু গলায় বলে, ‘এতটুকু পথ যখন পেরিয়ে এসেছ, বাকি রুক্ষগুলোও একদিন সবুজ হবেই।’
সাবেত হেসে তাকায়, ‘তুমি থাকলে, আমি আবার হাঁটব।’
রাইসা তার গলা একটু উঁচু করে, হাসতে হাসতে বলে, ‘তোমাকে হাঁটতেই হবে। কারণ, এই সবুজের গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।’
সাবেত একবার মাঠের দিকে তাকায়। হাজার মানুষের মুখ, ছোট গাছের নাচ, আর বাতাসে ভেসে যাওয়া ঘুড়ি। তার পর আবার তাকায় তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে, যার চোখে আজ অদ্ভুত এক শান্তি। হ্যাঁ, সবুজ সত্যিই জন্মায়। এমনকি সবচেয়ে রুক্ষ জমিতেও।
পরদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে গ্রামের স্কুলের সামনের মাঠে হঠাৎ মানুষ জড়ো হতে থাকে। কারও মুখে স্পষ্ট কিছু নেই, শুধু ফিসফাস।
‘কে করল এটা?
‘এমন শান্ত ছেলে ছিল...’
বালুচাপা একটা কুয়োর পাশে পড়ে আছে সাবেতের নিথর দেহ। চোখ খোলা, মাটি ছুঁয়ে থাকা এক হাতের আঙুলে এখনো শক্ত করে ধরা জরিপের মানচিত্র। হঠাৎ ভিড় ঠেলে ছুটে আসে রাইসা। তার চিৎকারে ভোরের বাতাস কেঁপে ওঠে, ‘সাবেত! সাবেত... উঠো... প্লিজ!’
কেউ কিছু বলতে পারে না। মাঠের দূরে ছোট্ট একটা গাছ কাঁপতে থাকে বাতাসে। কোনো শব্দ নেই, শুধু এক কান্না দীর্ঘ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে জরিপপুরের রুক্ষ মাটির ওপর।