ঢাকা ৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হলো গ্লোবাল ইয়ুথ লিডারশিপ কনফারেন্স ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, গণপিটুনির শিকার তিন পুলিশ বিশ্বকাপে ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার সময় টিভির সাবেক এমডি জোবায়ের কারাগারে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় ইইউর ১.৪ কোটি ইউরো অনুদান বিশ্বকাপে বড় ধাক্কা খেল আইভরি কোস্ট, কানাডার ভিসা পেলেন না ওয়াহি মাগুরায় নবজাতককে বিক্রি করলেন বাবা পরীমনিকাণ্ডে এডিসি সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসর এসএসসি ফল ঘোষণা ২০ জুলাই, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী কুড়িগ্রামে ১২ ঘণ্টা পর রেলযোগাযোগ স্বাভাবিক চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে জাবির কর্মচারীদের অবস্থান মানিকগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষ, নিহত ২ সিলেটে ৩৬ ঘণ্টায় ১২২.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড সংসদে মামুনুল হক প্রসঙ্গে দেওয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করলেন স্পিকার টঙ্গীতে ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার নেপালের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি চায় বাংলাদেশ চুয়াডাঙ্গায় ট্রেন-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২ সামরিক জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার আহ্বান সেনাপ্রধানের উখিয়ায় আইওএমের গাড়ির চাপায় অজ্ঞাত শিশুর মৃত্যু ভার্চুয়াল জুয়ার ফাঁদে সমাজ এসএসএফকে জনগণের সঙ্গে সংযোগ অটুট রাখার নির্দেশ তারেক রহমানের গানেই লিজার ব্যস্ততা প্রয়াত বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের নামে আমন্ত্রণপত্র আধ্যাত্মিক ধনী হওয়ার সহজ সমীকরণ আবার জ্বলে ওঠো জার্মানি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০০ জাতের আম নিয়ে মেলা শুরু পাহাড়, বন আর নীল জলের অপূর্ব মিলন ৪টি চলচ্চিত্র নিয়ে ‘সামার বাংলা হিট ফেস্ট’ তিন নাটকে প্রশংসিত হিমি পুশ-ইন সমস্যা সমাধানের দাবিতে সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান

রুক্ষ মাটি

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৯:০৪ পিএম
রুক্ষ মাটি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

নিঃসীম দিগন্তরেখার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে সাবেত। চারপাশে শুধুই ধু ধু শূন্যতা। রুক্ষ, বিবর্ণ, ক্ষুধার্ত এক মাঠ। একদিন যেখানে ঢেউ খেলত ঘাসের সবুজ মায়া, আজ সেখানে রোদের খরায় ফেটে গেছে মাটি। বাতাসও যেন জবুথবু হয়ে বসে আছে গা পুড়িয়ে দেওয়া উত্তাপে। মাথার ওপরের সূর্যটা নির্দয় ও নির্মম, প্রতিটি কণায় জ্বালিয়ে যাচ্ছে অজস্র ক্লান্তির আগুন। তবুও সাবেত এগিয়ে যাচ্ছে। একাকী, নীরব, দৃশ্যমান কোনো গন্তব্য ছাড়াই।
সাবেত এগিয়ে যায়। পেছনে পড়ে থাকে ধুলোয় ভরা একটি শূন্য গ্রাম। তার নাম জরিপুর। কিছুদিন আগেও এই নামটা ছিল মানুষে ভরা, কুকুরের ডাকে জাগা, সন্ধ্যেবেলার উঠোনে গল্পের রুমঝুমে ব্যস্ত। এখন সব স্তব্ধ।
বয়স ত্রিশের কোঠায় সাবেত। লম্বা গড়ন, গায়ের রং খয়েরি, চোখের ভেতর সবসময় একটা চিন্তার কুয়াশা। কয়েক বছর আগে শহর থেকে ফেরে। উচ্চশিক্ষা শেষ করে। ভেবেছিল কিছু একটা করবে। শুধু নিজের জন্য না, এই গ্রামের জন্যও। কিন্তু পরিকল্পনাগুলো যে বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না, সেটা বুঝে নিতে সময় লাগেনি তার।
এখন সে হাঁটছে এই পোড়া মাঠের পথ ধরে। গরমে শুকিয়ে ফাটা মাটির মাঝে, মাঝে মাঝে পুরোনো নালার দাগ। পাশে পড়ে আছে একটা মরিচা ধরা সাইনবোর্ড ‘জরিপপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস’। সাবেত একবার থামে, বোর্ডের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে।
‘কী বোর্ড, তোর নিজের শরম বলে কিছু নাই?’
বোর্ড তো আর জবাব দেয় না। কিন্তু সাবেতের কানে যেন এক পুরোনো কণ্ঠস্বর বাজে, ‘সাবেত, তুই পারবি। দেখিস, তোকে দিয়াই শুরু হইব।’
সেই গলা তার বাবার। ছেলেবেলায় সাবেতের বাবা জমি মেপে মেপে বেড়াতেন। ইউনিয়নের ফাঁকা ফাঁকা খাসজমি, চরের জমি, গজিয়ে ওঠা ঝোপের জমি। সবই ছিল তার চোখের নিচে। একরকম নীরবে স্বপ্ন দেখতেন, যদি এসব জমিতে কারও নাম লেখা যেত। যাদের ঘর নেই, ঠাঁই নেই...। সেই মানুষটা আজ নেই। মারা গেছেন তিন বছর হলো। তার মৃত্যুর পরই সাবেত প্রথমবারের মতো বুঝেছিল, এই গ্রামে স্বপ্নটা আসলে কতটা মাটি কামড়ে পড়ে থাকে।
আজকের এই রুক্ষ মাঠ, এখানেই একসময় বাবার সঙ্গে গিয়েছিল সাবেত। তখন এখানে একদল মানুষ ঝোপ কেটে জুমচাষ করত। এখন সেই মাঠটা আগুনে পুড়ে খোলস হয়ে গেছে।
সাবেত এখানে এসেছে ঠিক একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু সেটা কারও চোখে পড়বে না সহজে। সে চায় এক ইঞ্চি খাসজমিও যেন চলে না যায় দখলদারদের হাতে। দখলদারদের নেতা মাহতাব সরকার। একসময় গ্রামে পোস্টার মারতেন জাতীয় নির্বাচনের সময়, এখন নিজেই নামেন না নির্বাচনে। তাকে দিয়েই নমিনেশন নেয় গ্রামের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা। মাহতাব সরকার যেখানে বলেন, ওখানেই রাস্তা হয়। যেখানে বলেন, ওখানেই ব্রিজ। 
সাবেত জানে, তার আজকের উপস্থিতি একটা ঝুঁকি। গ্রামের ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় এক বাড়ির বারান্দায় বসে আছে একজন বুড়ো। নাম জহির মিয়া। সাবেত কাছে যায়।
‘জহির কাকা, আপনি কেমন আছেন?’
জহির কাকা মুখ তোলে, দেখে সাবেতকে। ‘তুই? সাবেত? তোরে দেখি না কতদিন হইল!’
‘এই দিকটায় আসি নাই কাকা। আজ একটু মাঠ ঘুরে আসলাম।’
জহির মিয়া ধুঁকতে ধুঁকতে বলে, ‘দেখিস সাবেত, দখলবাজেরা আবার আইসা নাকি ঘর তুলে। তোরা তরুণরা যদি কিছু না করিস, গ্রাম একদিন গিলে ফেলব এরা।’
সাবেত চুপ করে। তার পর বলে, ‘কাকা, একটা দল করছি। কাগজপত্র তুলি। সব জমির হিসাব রাখব। প্রশাসনে দিয়াও দেব।’
জহির মিয়ার মুখে একঝলক বিস্ময়, তার পর হাসি। 
‘তোর বাবার মতোই হইছিস রে।’
কিন্তু কাজ এত সহজ না। সন্ধ্যাবেলা সাবেত বাড়ি ফেরার আগে দেখতে পায় মাহতাব সরকারের গুণ্ডারা মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চোখাচোখি হয় একজনের সঙ্গে। সে থেমে সাবেতকে দেখে।
‘এই যে ভাইসাব, গরমে হেঁটে কি খুব প্যারা খাইছেন?’
সাবেত কিছু বলে না। ছায়া লম্বা হয়, মুখ গম্ভীর করে সে হাঁটা বাড়ায়।
রাতে সাবেতের ঘরে আসে রাইসা। সাবেক স্কুলশিক্ষিকা, বয়সে এক-দুই বছরের বড়। সাবেতের কলেজে পড়ার সময় একদিন ক্লাস নিতেন উনারা। এখন বন্ধুর মতো, পাশে দাঁড়ায়।
‘তুমি সাবধান থেকো। মাহতাব ভয়ংকর।’
‘আমি জানি। কিন্তু আর কেউ যদি না দাঁড়ায়?’
রাইসা চুপ থাকে। জানে, সাবেতকে ফেরানো যাবে না। এরপর শুরু হয় সংগ্রাম। সাবেত পুরোনো ল্যান্ড রেকর্ড অফিসে গিয়ে খুঁজে খুঁজে বের করে জরিপের পুরোনো ম্যাপ। কোথায় খাসজমি ছিল, কোথায় নয়, কোনটা পানি শুকিয়ে চর হয়েছে। সে তথ্য লিখে রাখে। তার পাশে দাঁড়ায় কয়েকজন তরুণ। রাকিব, সায়েম, শুভ্রা। তারা মাঠে যায়, ছবি তোলে, ম্যাপ মেলায়। একটা রিপোর্ট তৈরি করে।
একদিন গভীর রাতে, সাবেতের ঘরে আগুন লাগে। লোকচক্ষুর আড়ালে পুড়ে যায় সেই সব রেকর্ডের কপি, ল্যাপটপ, ডায়েরি। পরদিন সকালে রাইসা আসে। দেখে ঘর পোড়া, সাবেত বসে আছে চুপ করে।
‘সব পুড়েছে,’ সাবেত ফিসফিস করে।
রাইসা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, বলে, ‘তুমি একা নও।’
দুই দিন পর দেখা যায়, সারা গ্রামের দেয়ালে এক পোস্টার, ‘খাসজমি দখলের প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াও। সাবেত ও তার দলকে সমর্থন করো।’
সেই পোস্টার কে ছাপায়, কেউ জানে না। মাহতাব সরকার থমকে যান। কারণ, প্রতিবাদ আসছে এমন জায়গা থেকে, যেটা তিনি ভয় পেতেন। গণমানুষ।
মাসখানেক পরে, সাবেত দাঁড়িয়ে থাকে সেই আগুনে পোড়া মাঠে। এবার মাঠে আবার সবুজ দেখা যায়। ঘাস নয়, তবে ছোট ছোট গাছ লাগানো হয়েছে। সাবেত দাঁড়িয়ে বলে, ‘এই রুক্ষ মাঠেও সবুজ ওঠে।’
পাশে দাঁড়িয়ে থাকে রাইসা, চুপ করে। তারা জানে, লড়াই শেষ হয়নি, তবে শুরুর পথ পেরিয়েছে।


মাঠে আবার সবুজ এসেছে। তবে সেই আগের মতো প্রাকৃতিক নয়। কষ্টে বোনা, মুঠোভর্তি আশায় ভরপুর সবুজ। গ্রামের কিছু তরুণ-তরুণী মিলে ধু  ধু জমিতে শোভা আনছে নিমগাছ, শিশু, মেহগনি। গাছগুলো ছোট, পাতাগুলো কাঁচা। তবু তারা আছে।
সাবেত সকাল থেকে মাঠে। একহাতে কোদাল, অন্য হাতে পানির হ্যান্ড স্প্রে। রোদ পড়েছে বেশ। ঘাড়ে গামছা দিয়ে মুখ মুছতেই দেখে, রাইসা আসছে হাতে পানির বোতল আর একটা ছোট ঝুড়ি নিয়ে।
‘তুমি আবার আজও একা?’ রাইসা দাঁড়িয়ে পড়ে পাশে। গলায় কোনো দয়া নেই, কণ্ঠে একধরনের জেদি মমতা।
সাবেত হাসে। ‘এসব গাছ আমার। গাছেরা একলা থাকতে পছন্দ করে, জানো?’
রাইসা হালকা চোখ কুচকে তাকায়, ‘গাছ না, তুমি একলা থাকতে চাও।’
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। চারপাশে বাচ্চাদের আওয়াজ, কিছু যুবকের হাসাহাসি, পেছনে গরুর গাড়ির টুংটাং। গ্রামের মধ্যে একটা আশ্চর্য নীরব উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে যেন। যতই ভয় থাকুক, যতই আগুন লাগুক, মানুষের ভিতরের সবুজ মরে না।
মাহতাব সরকার একরকম কোণঠাসা। জেলা অফিস থেকে মেইল এসেছে, ‘জরিপপুরে পুনর্জরিপের নির্দেশ।’ উপজেলা চেয়ারম্যান, যার নামে আগের সপ্তাহেও পত্রিকায় ফিতা কাটা ছবি ছাপা হয়েছে, সে-ও চুপচাপ। কারণ, এখন মিডিয়ায় সাবেতের নাম। একদিন হঠাৎই মাহতাব সরকার মুখোমুখি হয় সাবেতের। বাজারের মোড়ে।
‘বড় সাহস তো দেখাইলেন,’ বলেন ঠাণ্ডা গলায়। মুখে হালকা হাসি, চোখে হিংস্রতা।
সাবেত থামে না, শুধু জবাব দেয়, ‘এই সাহস আমার একার না। গ্রামটার।’
মাহতাব এক পা এগিয়ে আসে, ‘তুই ভাবিস তোকে মানুষ বিশ্বাস করে? দুইটা পোস্টার দেখলে কি লোকে তোকে নেতা বানায়?’
সাবেত দাঁড়িয়ে থাকে দৃঢ়। ‘আমি নেতা হইতে চাই না। চাই, কেউ যেন আর নিজের মাটি হারায়ে না যায়।’
সেদিন থেকেই মাহতাবের সাঙ্গপাঙ্গরা কমে যেতে থাকে। হাটে-ঘাটে চাপা গুঞ্জন- ‘মাহতাব সাহেবরে এবার ফাঁসাইয়া দিবে, শুনছ?’
‘ও মাঠটা খাসজমি রে ভাই!’
গভীর রাতে রাইসার উঠানে বসে থাকে সাবেত। রাইসা ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে চুপচাপ। ‘এই সময়?’ বলে। কণ্ঠে নেই বিরক্তি, আছে অভ্যস্ততা।
সাবেত বলে, ‘তোমার একটা কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ।’
‘কোনটা?’
‘তুমি বলেছিলে, গাছরা একা থাকতে চায় না।’
রাইসা হালকা হেসে জানালায় হেলান দেয়। বাতাসে তার চুল উড়ে পড়ে কপালে।
‘তাই তো। গাছ একা হলে শুকিয়ে যায়।’
সাবেত চুপ করে। তার পর বলে, ‘তুমি যদি পাশে থাকো, আমারও শুকিয়ে যাওয়া লাগবে না।’
এক মুহূর্তে সব চুপ। পাশের খেজুর গাছে বাতাস লাগে, রাতচরা পাখি ডাকে। রাইসা ধীরে উত্তর দেয়, ‘তোমার পাশে আমি তো আছিই সাবেত। শুধুই মাঠে না, অন্য সব রুক্ষ জায়গায়ও।’
এক টুকরো চুপচাপ আলো পড়ে সাবেতের চোখে। আর সেই চোখে যেন শত ঘাম, লড়াই, হেরে যাওয়া রাত পেরিয়ে একরাশ নিশ্চিন্তি খেলা করে।
এক সপ্তাহ পর। পুরো জরিপপুর আজ মাঠে। রংতুলি দিয়ে আঁকা হয়েছে গ্রাম রক্ষা কমিটির নাম। ঢোল বাজছে, মাইক বাজছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। এককোণে বাঁশের মাচায় বসে গান গাইছে স্থানীয় কলেজের ছেলেরা, ‘জমি যেখানে রইল পড়ে, লালন তারেই বাস করে
বলো না আর থেমে থাকি, মাটি রইছে ডাক পড়ে...’
সাবেত দাঁড়িয়ে আছে গাছতলায়। পাশে রাইসা। শুভ্রা, রাকিব, সায়েম সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে। রাইসা নিচু গলায় বলে, ‘এতটুকু পথ যখন পেরিয়ে এসেছ, বাকি রুক্ষগুলোও একদিন সবুজ হবেই।’
সাবেত হেসে তাকায়, ‘তুমি থাকলে, আমি আবার হাঁটব।’
রাইসা তার গলা একটু উঁচু করে, হাসতে হাসতে বলে, ‘তোমাকে হাঁটতেই হবে। কারণ, এই সবুজের গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।’
সাবেত একবার মাঠের দিকে তাকায়। হাজার মানুষের মুখ, ছোট গাছের নাচ, আর বাতাসে ভেসে যাওয়া ঘুড়ি। তার পর আবার তাকায় তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে, যার চোখে আজ অদ্ভুত এক শান্তি। হ্যাঁ, সবুজ সত্যিই জন্মায়। এমনকি সবচেয়ে রুক্ষ জমিতেও।
পরদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে গ্রামের স্কুলের সামনের মাঠে হঠাৎ মানুষ জড়ো হতে থাকে। কারও মুখে স্পষ্ট কিছু নেই, শুধু ফিসফাস।
‘কে করল এটা?
‘এমন শান্ত ছেলে ছিল...’
বালুচাপা একটা কুয়োর পাশে পড়ে আছে সাবেতের নিথর দেহ। চোখ খোলা, মাটি ছুঁয়ে থাকা এক হাতের আঙুলে এখনো শক্ত করে ধরা জরিপের মানচিত্র। হঠাৎ ভিড় ঠেলে ছুটে আসে রাইসা। তার চিৎকারে ভোরের বাতাস কেঁপে ওঠে, ‘সাবেত! সাবেত... উঠো... প্লিজ!’
কেউ কিছু বলতে পারে না। মাঠের দূরে ছোট্ট একটা গাছ কাঁপতে থাকে বাতাসে। কোনো শব্দ নেই, শুধু এক কান্না দীর্ঘ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে জরিপপুরের রুক্ষ মাটির ওপর।

দিনাজপুরে কবি আযাদ কালাম রচিত ‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’ কবিতা গ্রন্থের পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১০:১০ পিএম
‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’ কবিতা গ্রন্থের পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত
ছবি: সংগৃহীত

উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের আয়োজনে এবং দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সহযোগিতায় কবি আযাদ কালামের কবিতাগ্রন্থ ‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’-এর পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

গত ২২ মে স্থানীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের সভাপতি কবি অধ্যাপক কামরুজ্জামান গোপন। প্রধান আলোচক ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক এমরান কবির।

অনুষ্ঠানের অন্যান্য আলোচক ছিলেন কবি অধ্যাপক মোজাম্মেল বিশ্বাস, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কবি ও প্রাবন্ধিক মাসুদ মুস্তাফিজ, কবি ও গবেষক চাষা হাবিব, কবি নিরঞ্জন হীরা এবং কবি কমল কুজুর। এছাড়া বক্তব্য রাখেন কবি অধ্যাপক জলিল আহমেদ, কবি ফরিদুল আজাদ মিলন, রেজাউর রহমান রেজু, গল্পকার মাহবুব আলী, কবি আজাহারুল আজাদ জুয়েল, প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বরূপ বক্সী বাচ্চু এবং উত্তরতরঙ্গের নির্বাহী সম্পাদক রাজ্জাক কাঞ্চন প্রমুখ।

কবি আযাদ কালামের কবিতা আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী মোকাররম হোসেন, মীর শিরিন, সুবর্ণা মুখার্জী এবং ছড়াকার বিধান দত্ত।

প্রধান আলোচক এমরান কবির বলেন, ‘সাম্প্রতিক কবিতার বড় একটি ব্যর্থতা হলো এর কেন্দ্রহীনতা, পারম্পর্যহীন শব্দসমাবেশ এবং পঙ্ক্তির বিধ্বস্ত বিন্যাস। বিমূর্তায়ন ও বিচ্ছুরণের দিকে ধাবিত হতে গিয়ে সাম্প্রতিক কবিতা প্রায়ই কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কবিতা পড়া যাচ্ছে না। শব্দ থেকে শব্দের যোগাযোগহীনতা, পঙ্ক্তি থেকে পঙ্ক্তির পারম্পর্যহীনতা পাঠককেও যোগাযোগহীন করে তুলছে। এই যোগাযোগহীনতা বা সংযোগ স্থাপনের ব্যর্থতার কারণে কবিতা এখন সবচেয়ে কম পঠিত সাহিত্যধারাগুলোর একটি। আযাদ কালামের কবিতা পাঠ করতে গিয়ে দেখা যায়, এসব নেতিবাচক উপাদানের উপস্থিতি নেই। ফলে তার কবিতাগুলো পাঠযোগ্য। আর যদি কোনো কবিতা পড়া যায়, তাহলে বলা যেতে পারে সেই কবিতায় ‘কিছু একটা’ আছে। এই ‘কিছু একটা’ হলো কবিতার অধরা আলোর কাছে পাঠকের প্রত্যাশা। আযাদ কালামের কবিতা সেই প্রত্যাশা পূরণ করে। কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে মফস্বলে অবস্থান করেও বৈশ্বিক কবিতার সমান্তরালে যে কবিতাচর্চা করা সম্ভব, আযাদ কালাম তা প্রমাণ করেছেন।’

কবি আযাদ কালাম তার কবিতাগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করার জন্য উপস্থিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি ও শিল্পী কমল কুজুর।

সমধারার স্রোতে সৃজনের উচ্ছ্বাস: কবিতা, চেতনা ও আনন্দের মিলনমেলা

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
আপডেট: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
সমধারার স্রোতে সৃজনের উচ্ছ্বাস: কবিতা, চেতনা ও আনন্দের মিলনমেলা
প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উৎসবে বক্তব্য রাখেন। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব যখন অমীমাংসিত যুদ্ধ, সংঘাত আর মানবিক বিপর্যয়ের ভারে ন্যুব্জ—
যখন বিশ্বমানবতা অশান্তি ও উদ্বেগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে—
ঠিক সেই সময়ই অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠাকে দূরে সরিয়ে দেশের এক কোণে, সীমিত পরিসরে, এক অপার আনন্দময় আবহে ধানমন্ডির ছায়ানটে অনুষ্ঠিত হলো সমধারার দ্বাদশ কবিতা উৎসব ২০২৬।

 ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আয়োজন কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; বরং এটি এক চলমান সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণস্পন্দন। “সমধারা”-নামটির মধ্যেই যেন প্রবাহমান সৃজনশীলতার ইঙ্গিত, আর সেই স্রোতধারায় যুক্ত হয়েছেন দেশের প্রথিতযশা ও নবীন কবি-সাহিত্যিকেরা। তাদের সম্মিলিত উপস্থিতিতে উৎসবটি হয়ে উঠেছিল এক অনন্য নান্দনিক মেলবন্ধন। সত্যিই, অনুভূতিটা ছিল অপার্থিব।

সমধারা এমন এক উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নবীন ও প্রবীণ-সব প্রজন্মের সাহিত্যসাধকরা মিলিত হন এক অভিন্ন সৃজনস্পন্দনে। উপস্থিত ছিলেন শিল্প সাহিত্যের দিকপাল বহুমাত্রিক লেখক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল, কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক হারুন হাবীব, কবি-প্রাবন্ধিক ফরিদ আহমেদ দুলাল, কবি মজিদ মাহমুদ এবং লেখক-গবেষক ড. এমদাদ হাসনাইনসহ আরও অনেক গুণীজন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার বক্তব্যে সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন-সাহিত্য কেবল আত্মপরিচয়ের বাহন নয়, এটি চর্চার মধ্য দিয়েই টিকে থাকে। অন্যদিকে, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামার মাঝেও কবিতা চর্চার এমন আয়োজনকে এক বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক মোস্তফা কামাল সাহিত্যচর্চাকে তুলনা করেন প্রার্থনার সঙ্গে—যেখানে প্রতিদিনের সাধনাই লেখককে পরিপূর্ণ করে।

অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকরাও তাদের বক্তব্যে সন্তুষ্টি ও প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করেন।

এ উৎসব যেন নববর্ষের রেশ বহন করছিল। পহেলা বৈশাখের আবহ তখনও বাতাসে ভাসমান-চারদিকে বৈশাখি মেলার আমেজ, প্রকৃতিতে মধুমাসের আগমনী বার্তা, গাছে গাছে ফলের সমারোহ। সেই আবহকে ধারণ করেই লাল রঙে সজ্জিত কবিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যেন উৎসবের রঙ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছিল।

ফরিদ আহমেদ দুলালের সভাপতিত্বে এবং কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক হারুন হাবীবের উদ্বোধনে, সালেক নাছির উদ্দিনের সুচারু সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সারা দেশ থেকে আগত কবিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ছায়ানটের প্রাঙ্গণ।

এবারের সমধারা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। শিশু সাহিত্যিক ড. ধনঞ্জয় সাহা এবং কবিতা সাহিত্যে আদ্যোনাথ ঘোষও সম্মানিত হয়েছেন। তাদের প্রতি রইল অকুণ্ঠ অভিনন্দন, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সমধারার কর্ণধার সালেক নাছির উদ্দিন তার অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এই সংগঠনকে সুসংগঠিত করেছেন। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি সমধারার যাত্রাকে অব্যাহত রাখার যে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

এবারের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল আরেকটি কারণে-অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উপস্থিতি। তিনি নিয়মিতভাবে সব অনুষ্ঠানে অংশ না নিলেও, সমধারায় এসে তিনি যেন লেখক-কবি সত্তাকে নতুন করে জাগ্রত করে তুললেন। তার উপস্থিতি সকলের মধ্যে দ্বিগুণ উৎসাহের সঞ্চার করেছে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মোস্তফা কামালের উপন্যাস “দেবো খোঁপায় তাড়ার ফুল” অবলম্বনে কাব্যগীতি নৃত্যনাট্য “প্রেমার্ঘ নৈবেদ্য”-যা ছিল এক অনবদ্য শিল্পসম্ভার।

সব মিলিয়ে, সমধারার দ্বাদশ কবিতা উৎসব ছিল এক সফল, অর্থবহ এবং শিক্ষণীয় আয়োজন। একটি অনুষ্ঠান শুধু উপভোগের বিষয় নয়-এর ভেতরে থাকে শেখার অসংখ্য উপাদান। গুণীজনদের কথা শোনা যেমন সৌভাগ্যের, তেমনি তাদের সান্নিধ্য পাওয়া এক বিরল প্রাপ্তি।

সৌভাগ্যক্রমে সেই প্রাপ্তির অংশীদার হতে পেরেছি-প্রিয় মানুষদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে, আশীর্বাদ চেয়েছি আগামী পথচলার জন্য।

পরিশেষে, এই আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ ধন্যবাদ সালেক নাছির উদ্দিনকে। সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে-সমধারার এই সৃজনযাত্রা আরও বহুদূর এগিয়ে যাক।

এসএন/

বইয়ের প্রচ্ছদই পাঠককে ডাকে: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
বইয়ের প্রচ্ছদই পাঠককে ডাকে: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন বই ‘প্রিয়জন আপনজন’-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে লেখকসহ অতিথিরা ছবি: খবরের কাগজ

একটি বইয়ের পরিচিতি ও পাঠককে আকর্ষণের ক্ষেত্রে প্রচ্ছদই প্রধান ভূমিকা রাখে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বলেছেন, প্রচ্ছদ ছাড়া বই হয় না। প্রচ্ছদ ডাক দেয়, প্রচ্ছদ চিনিয়ে দেয়। প্রচ্ছদ বলে এসো- তারপরে না বই।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন বই ‘প্রিয়জন আপনজন’-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিতব্য এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন বরেণ্য শিল্পী ও অভিনেতা আফজাল হোসেন।

বই প্রকাশের আগেই ঘটা করে প্রচ্ছদ উন্মোচনের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনকে লুইস ক্যারলের ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর রূপকের সঙ্গে তুলনা করেন অধ্যাপক সায়ীদ। রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘এ কেমন বই, যার বই নেই; কিন্তু প্রচ্ছদ আছে! এটি অনেকটা সেই অদৃশ্য বিড়ালের হাসির মতো।’ লেখক ফরিদুর রেজা সাগর সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কেউ লেখক হওয়ার পরে লেখে, আর কেউ লিখতে লিখতে লেখক হয়। সাগরের ভেতরে আগে থেকেই লেখার রসদ তৈরি ছিল, যা এখন বই হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।’

অনুষ্ঠানে লেখক ফরিদুর রেজা সাগর জানান, ‘প্রিয়জন আপনজন’ বইটিতে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের ১০০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রচ্ছদ নিয়ে লেখক বলেন, শিল্পী আফজাল হোসেন আমার প্রায় ৩০টি বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। তার একটি স্বভাব হলো কাজ দেরিতে করা। কিন্তু এবার তিনি বই লেখা শেষ হওয়ার আগেই একাধিক প্রচ্ছদ তৈরি করে ফেলেছেন। সেই আনন্দ থেকেই এই প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা।

আফজাল হোসেন বলেন, ‘বই প্রকাশের আগে প্রচ্ছদ উন্মোচন আমাদের দেশে নতুন ঘটনা। একটি সময়কে ধরে রাখার জন্য সাগর ভাই যেসব গুণী মানুষকে নিয়ে লিখেছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে।’

অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী, শাইখ সিরাজ, জিল্লুর রহমান, ছড়াকার আমীরুল ইসলাম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষার।

ফারজানা ব্রাউনিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট নজরুল সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা।

স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতা ও ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতা ও ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’

সম্প্রতি শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন সৃজনের মিরপুর কার্যালয়ে একক বক্তৃতা, একক কবিতাপাঠ এবং পাঠপর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কবি লুব্ধক মাহবুবের ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট গবেষক ও গল্পকার প্রফেসর ড. আনোয়ারুল হক, বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ।

আনোয়ারুল হক বলেন, কবি লুব্ধক মাহবুব প্রেমের কবি। প্রবাসী জীবনের টানাপোড়েন তার কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ। ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থে এই কবি পরিণত এবং শব্দ চয়নে দক্ষতা তার কবিতাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। তার কবিতার বিষয়ে গভীরভাবে দেশের প্রতি ভালোবাসা স্থান পেয়েছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রকৃতিও বিশেষভাবে তার কবিতায় উঠে এসেছে। এই কবি যে দেশে না থেকেও দেশের সঙ্গে তার কবিতার মাধ্যমে গভীর সংযোগ রেখেছেন– এই বই তার সাক্ষ্য বহন করে।

প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ বলেন, ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থের কবি লুব্ধক মাহবুব একজন জাত কবি। ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। আগের দুটি কাব্যগ্রন্থ থেকে এ গ্রন্থে তিনি অনেক বেশি পরিণত কবি। সুনির্বাচিত শব্দ চয়ন, অনুপ্রাসের কাব্যময় প্রয়োগ, বক্রোক্তি ও ব্যজস্তুতির বর্ণময় ব্যবহার, প্রাসঙ্গিক যথাযথ উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্প এবং গদ্য ছন্দের অনবদ্য ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে নিজের জন্য একটি নিজস্ব ভাষাশৈলী তৈরিতে দারুণভাবে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করি। আর বাংলায় লেখা এ গ্রন্থের ৮০টি কবিতায়ই বিষয় বৈচিত্র‍্যে বৈচিত্র্যময় ধারক হিসেবে কবিকে অনন্য বিশিষ্টতায় বিভূষিত করেছে। দীর্ঘ ৩৪ বছর বিদেশ বিভুঁইয়ে অবস্থান করেও নিজের মা-মাটি-মানুষকে তিনি যে ভুলে যাননি বরং গভীর ও প্রগাঢ় মমতায় তাদের বেঁধে রেখেছেন, এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা তার বড় প্রমাণ। বলা চলে স্রষ্টা প্রদত্ত কবি প্রতিভা আর গভীর অনুশীলন, অধ্যয়ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে নিজেকে তিনি একজন উত্তর আধুনিক কবি হিসেবে এ কাব্যগ্রন্থে যেভাবে শিল্পশ্রীমণ্ডিতভাবে মেলে ধরেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

অনুষ্ঠানের ‘স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতার গতি-প্রকৃতি’ বিষয়ের মূল বক্তব্যে লেখক ও গবেষক ড. কুদরত-ই-হুদা বলেন, সাতচল্লিশে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা যখন তৈরি হয় তখন পূর্ববাংলার মুসলমান কমিউনিটি সাগ্রহে তাতে শামিল হয়েছে। এর কারণ যতটা বা ধর্ম তারচেয়ে বেশি অর্থনীতিকেন্দ্রিক। তিনি বলেন, চল্লিশের দশকে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রচুর কবিতা লেখা হয়েছে। ষাটের দশকে গিয়ে কবিদের এ বিষয়ে মোহভঙ্গ ঘটে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আরিফ মঈনুদ্দীনের একক কবিতা পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা করেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার, কবি ও কথাসাহিত্যিক নুসরাত সুলতানা এবং কবি ওয়াহিদ জামান। আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে নুসরাত সুলতানা বলেন, কবিতা ব্যাখ্যার অতীত এক শিল্পকর্ম। শিশুর প্রথম কান্না যখন মা শুনতে পান সেই আনন্দ যেমন ব্যাখ্যা করা যায় না তেমনি কবিতাও ব্যাখ্যা করা যায় না। কেবল উপলব্ধি করা যায়। কবি আরিফ মঈনুদ্দীন কাব্যজগতে বহু পথ পেরিয়ে এসেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ১৮টি কাব্যগ্রন্থ। এই কবির কবিতার শব্দ চয়ন যেমন নান্দনিকতার দাবি রাখে তেমনি তার গভীর উপলব্ধি ও পাঠকের মননকে নাড়া দেয়। কবির কবিতায় দর্শন ভাবনা, মনস্তত্ত্ব এবং জীবনের ভাঁজকে পরতে পরতে খুলে দেখার আকাঙ্ক্ষা আছে।

আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার বলেন, এ গ্রন্থের কবিতাগুলোতে মিস্টিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। কবিতাগুলো হৃদয় নয় বরং মেধাশাসিত।

আলোচক কবি ওয়াহিদ জামান বলেন, আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সহজ-সরল, কিন্তু গভীর। জীবনের প্রতিটি অনুভবকে ধারণ করার প্রতিশ্রুতি আছে তার কবিতায়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- কবি লুব্ধক মাহবুব, কবি আরিফ মঈনুদ্দীন, কবি রমজান সরকার, কবি সাদমান সজীব, কবি শামস আরেফিন, কবি ও কথাসাহিত্যিক আকেল হায়দার, অনুবাদক মেজবাহ উদ্দিন, কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আহমেদ বাসার, কবি জুননু রাইন, পরিবেশবিদ কবি শেখ আহমেদ ফরহাদ, কবি ও প্রবন্ধকার প্রফেসর ড. রকিবুল হাসান, প্রফেসর ড. ডি. এম, ফিরোজ শাহ, নাট্য নির্মাতা মিতুল খান, গবেষক হোসাইন মোহাম্মদ জাকি, কবি আহমেদ বাবু, কবি হাসিবুর রহমান জয়, মো. আরিফুল ইসলাম, কবি মুনযির সাদ, কবি ও ছড়াকার হুসাইন আলমগীর, কবি অঞ্জলী রাণী পূজা, কবি ও সাংবাদিক মাসুদ হাসান, কবি ও সম্পাদক বহ্নি কুসুম, কবি ও কথাসাহিত্যিক সাহিনা মিতা, কথাসাহিত্যিক ফরিদুল ইসলাম নির্জন, ড. সর্দার এ হায়দার, কবি রহিজ আলী সরদার, কবি বোরহান মাসুদ, কবি তৌহিদ আহাম্মেদ লিখন, কবি আহমেদ বাবুল, কবি ফরহাদুর রহমান, সোহাগ হাওলাদার, রাসেল প্রমুখ...।

একজন নাবিকের চোখ, কিছু প্রশ্ন এবং ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৯ এএম
একজন নাবিকের চোখ, কিছু প্রশ্ন এবং ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’

সময়ের প্রবাহে মানুষ যত বেশি তথ্যের কাছে পৌঁছেছে, ততই যেন হারিয়ে ফেলেছে ভাবনার গভীরতা। জানা আর বোঝার ভিড়ে প্রশ্ন করার অভ্যাসটি ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এক ভিন্নধর্মী চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে বাজারে এসেছে নতুন বই ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’। যেখানে উত্তর নয়, বরং প্রশ্নই হয়ে উঠেছে মূল আলোচ্য।

বইটি ছাপিয়েছে পরিবার পাবলিকেশনস আর প্রচ্ছদ করেছেন মৌমিতা রহমান। এবারের অমর একুশে বইমেলায় বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বর্তমানে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে এই গ্রন্থ।

বইটির লেখক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন একজন অভিজ্ঞ নৌ কর্মকর্তা, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। সমুদ্রপথে দীর্ঘ যাত্রা, প্রকৃতির বিশালতা ও মহাবিশ্বের নীরব বিস্ময় তাকে বারবার দাঁড় করিয়েছে কিছু মৌলিক প্রশ্নের সামনে। সেই অভিজ্ঞতা, সেই উপলব্ধি এবং সেই প্রশ্নগুলোকেই তিনি শব্দে রূপ দিয়েছেন এই গ্রন্থে।

লেখকের ভাষায়, এই বই কোনো তর্ক জেতার জন্য নয়, কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্যও নয় বরং এটি এক ধরনের মানসিক যাত্রা। যেখানে পাঠককে আহ্বান জানানো হয় ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং চারপাশের দৃশ্যমান জগতের আড়ালে থাকা অদৃশ্য রহস্যগুলোকে অনুভব করতে।

বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এখানে সহজভাবে এমন কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা মানুষের ভাবনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কেন প্রকৃতির নিয়ম আছে? কেন মহাবিশ্ব এত শৃঙ্খলাবদ্ধ? সবকিছু কি কেবলই ঘটে গেছে, নাকি কোনো এক অদৃশ্য প্রজ্ঞা তা ঘটিয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর বইটি দেয় না। বরং লেখক সচেতনভাবেই উত্তরহীনতার জায়গাটিকে উন্মুক্ত রাখেন। কারণ তার বিশ্বাস, প্রশ্নই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়, প্রশ্নই মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের জীবনের অভিজ্ঞতাও কম বিস্ময়কর নয়। ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জন্ম নেয়া এই নৌ কর্মকর্তা ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মিসাইল ফ্রিগেট বানৌজা ওসমানসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজের অধিনায়ক হিসেবে তার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুদান ও লেবাননে দায়িত্ব পালন তাকে দিয়েছে বৈশ্বিক বাস্তবতার কাছাকাছি থাকার সুযোগ।

একজন নাবিক হিসেবে তিনি যেমন বিশাল সমুদ্র দেখেছেন, তেমনি একজন গবেষক হিসেবে খুঁজেছেন তার অন্তর্নিহিত অর্থ। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে এমবিএ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে এমফিল ও পিএইচডি অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি জ্ঞানচর্চার পথেও নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা ও প্রকল্প পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’ তাই শুধু একটি বই নয়, এটি এক ধরনের চিন্তার অনুশীলন। এটি পাঠককে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয় না, বরং তাকে এমন এক মানসিক অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি নিয়ম, প্রতিটি ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন জাগায়।

এই বই যেন এক নীরব দরজা- যা খুললে হয়তো সব উত্তর মিলবে না, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বদলে যাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। আর সেই পরিবর্তিত দৃষ্টিই হয়তো আমাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই হারিয়ে যাওয়া অভ্যাসে, ভাবনায়, প্রশ্নে কিংবা বিস্ময়ে।