বাড়ির পেছনের উঠোনে, একেবারে শেষ কোণে, একটা ফিল্ড মেপলের গাছ, বসন্তে রঙে রঙে ভরে ছিল। শীত আসি আসি, তাই সব পাতা রঙ নিয়ে ঝরতে শুরু করেছে। আশ্চর্য বাতাসে তার ঝরে পড়ারও গন্ধটা রয়ে যাচ্ছে!
এক-একটা গন্ধের সঙ্গে জীবনের কিছু মুহূর্ত কেমন অযৌক্তিকভাবে জড়িয়ে থাকে মানুষের। নিবিড় নিষ্ঠায় ভাবতে থাকলে সেই গন্ধের সঙ্গে স্মৃতির যোগ সূত্র ঠিক খুঁজে নেওয়া যায়! বকুলগন্ধে আমার স্কুল বেলার সেই ‘ফুল বাড়ি’র কথা মনে আসে প্রথমে। সারা বাড়িটি জুড়ে কত্তো প্রজাতির গাছ আর ফুল যে ছিল। আমরা স্কুলে যেতাম, ঠিক সেই বাড়িটার গা ঘেঁষে। দেখেছি— আজও মনে আছে, ‘ফুলবাড়ি’র কাছে এলেই সব স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীর হাঁটা যেত শ্লথ হয়ে। মানুষ গন্ধের ডাক উপেক্ষা করতে পারেনি কোনো দিন! কদমফুলের গন্ধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাট থেকে বাড়ি ফেরার পথখানি। আমি আর অবিনাশ শিস বাজিয়ে সিনেমার হালকা কোনো গান তুলতে চেয়েছি যেই, কদমের ভেজাগন্ধ এসে লেগেছে নাকে! অবিনাশ খুব অভাবে আছে বোধ হয়। মাঝে মাঝে দেশ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দেয়, অনটনের গল্প বলে। মেয়ের একটা মোবাইল ফোন চাই, তাতেই নাকি ভালো একটা চাকরি জুটে যাবে। আমি এপাড় থেকে শিস তুলতে চেষ্টা করি, তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম। অবিনাশ বলে, হবে না। এইটা তুলতে হলে বাজার থেকে হাইঞ্জ্যার সময় বাড়ি ফিরতে হবে। আমার নাকে তখনো কদমের ঘ্রাণ এসে লাগে।
বোনের আঙুল জড়িয়ে অন্ধকার পথ ধরে ফিরছি। সনকাপনের মাঠ পেরিয়ে চড়কপূজো দেখে ফিরি। ধু ধু মাঠের মাঝখানটায় এসে বাতাসে ছাতিম ফুলের গন্ধ। আমি আর বোন দৌড়াচ্ছি, এ নির্ঘাত বদ-ঘ্রাণ, ভূত-পেত্নীর কিছুর। বোনের হাত ছুটে গেছে হাত থেকে, কত হাজার বছর, এখন সাভেরনাক ফরেস্টে ঢুকে ছাতিমের গন্ধ পেয়ে গাড়ি থামিয়ে দিই।
রজনীগন্ধার গন্ধে পাশের বাড়ির চাচির বোন, দীবা খালার কথা মনে পড়ে। শাহ মোস্তফা সড়কের পুষ্পবিতান থেকে এক তোড়া রজনীগন্ধা কিনে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। বললেন, বাড়ি নিয়ে পানির মধ্যে রাখতে হবে, অনেক দিন গন্ধ ছড়াবে। আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করে কাকে ভালোবেসেছিলে জীবনে প্রথম? আমার রজনীগন্ধার ঘ্রাণ এসে তখন লাগে নাকে।
বাতাবি লেবু ফুলের গন্ধ যে জানে না, তার জীবন অসম্পূর্ণ বলে মনে হয় আমার! বেল-ফুলও তাই! গন্ধরাজ ফুলের গন্ধ নাকে এলেই দোলন কাকার কথা মনে পড়ে। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল বাবর মামাদের বাড়ি। তাদের প্রতিবেশী দোলন কাকা। বাবর মামা, মিফতা মামা দুজনেই প্রবাসী। বাড়িতে বুড়ো মা। কে থাকবে সঙ্গে! কলেজপড়ুয়া তরুণ প্রতিবেশী হিন্দু ছেলেটা সারাটা জীবনই প্রায় এই বাড়িতেই থাকলেন। রাধা গোবিন্দের ছবি আঁকলেন। আর বিলালেন, একে ওকে। বাড়ি জুড়ে রুয়ে রাখলেন সারি সারি গন্ধরাজ গাছ। দোলন কাকার খবর জানি না। জানি কেবল সেই বাংলাদেশ, সেই গ্রাম-জনপদ আর ভূগোলে নাই, অল্প বিস্তর রয়ে গেছে ইতিহাসের বইয়ে হয়তো। কিন্তু গন্ধটা আছে। স্মৃতির সঙ্গে লেপ্টে আছে। আমার মায়ের প্রিয় ফুল ছিল গোলাপ। আব্বু একবার নাকি কার বাসা থেকে ডাল ভেঙে একটা গোলাপ নিয়ে এসেছিলেন, সেই তাদের বিয়ের পর। সেই গল্পের কত ভার্সন যে আমি শুনেছি আম্মার মুখে! ফ্লোরাল শপের সবগুলো গোলাপে আমি এখন আম্মা আম্মা গন্ধ পাই। বাড়িতে হাসনাহেনার গাছ লাগিয়ে ছিলেন ছোটচাচা। এখন ঘ্রাণে রঙে গানে সুরে তার কত যে আপত্তি! ওহাবী প্রভাবে বাংলার সুর ঘ্রাণ রঙে যে ফিকে হয়ে এলো— আমার ছোটচাচা তার প্রাইম এক্সাম্পল!
একটা বয়সের পরে মানুষের স্মৃতির নতুন সঞ্চয় জমে না আর! কবিত্ব, আবেগ, ভাবনা, নির্মাণ, সৃষ্টির ক্ষমতা, ‘হয়ে ওঠা’, দেখবার, শুনবার চোখ-কান— সব ওই মধ্য কুড়িতেই! একদিন জীবন যে মায়াকাজল চোখে পরিয়ে দেয়, তারই চিহ্ন ধরে বাকি পথ চলা। তার পরে যা হয়, তা নাকি শুধু অভিজ্ঞতা, অনুশীলন আর পুরোনো সঞ্চয়ে পালিশ লাগানোর জীবনপণ চেষ্টা— আশ্বিনের রোদে বই, লেপ-কাঁথা রোদে শুকিয়ে তুলে রাখার মতো! ওইটুকু সঞ্চয় যার যত বেশি, তার পথ তত দীর্ঘ প্রশস্ত। সত্যি-মিথ্যে জানিনে।...
তবু কেউ চলে যায়, জনপদ, রাস্তায়, লোকালয়ে, শাহবাগে ফুলের গন্ধে ছাতিমে আকুল হয় নগর। হঠাৎ ভেসে আসা কোনো গন্ধে আনমনা হওয়ার মতো জানতে পারি মেপল লিফের মতো মোলায়েম গতিতে ঝরে পড়ছে এক সোনার মানুষ!
তার ফুলের নাম মনীষা। ঘ্রাণের নাম কোমল গান্ধার। সন্ধ্যার আলো মিটিমিটি বইমেলার মাঠে, আমি ডাকি ইফতেখার আসো, ছবি তুলি! একটা ক্লিকে তাকে সেই ঘ্রাণ-পুরুষের মতো লাগে, আর আমাকে দেখায় বেখাপ্পা। সারোদের সুরের মতো মিহি মোলায়েম এক স্বরে বলে— আপনার গদ্য কী যে মিষ্টি সুমন ভাই! আমি বলি, তুমি বলছো এই কথা! আমার সময়ে তোমার মতো সুঘ্রাণে মাখা গদ্য কারও নেই ইফতেখার!
সেই ঘ্রাণটা আজ সারা দিন-রাত আমার নাকে লেগে থাকল। আমি, আমার নিজের, ইফতেখারের, গদ্য-ঘ্রাণ, আর ইনবক্স খুঁড়ে প্রাণের কথা তুলে আনতে পারলাম না একটুও।
আমি আরও একদিন তোমাকে নিয়ে লিখব, সোনার মানুষ। পৃথিবীকে কাঙাল করেছো বটে কিন্তু গন্ধ নিয়ে যেতে পারনি! আমাদের, আমার, মনীষার, তার মায়ের, অজস্র বন্ধুর পাঠকের নাকে মুখে বুকে গালে তুমি লেগে র’বে...