ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ইংল্যান্ডকে জিততে দিল না ঘানা মায়ের মৃত্যুতে দেশে ফিরে গেলেন ফ্রান্সের কোচ অতঃপর দেম্বেলে… প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডকে রুখে দিল ঘানা বিশ্বকাপে ইরানের সফর নীতি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের ক্যানভাসে চিরযৌবন নেইমারে ভয় নেই স্কটল্যান্ডের মাঠে হেঁটেই সফল মেসি রোনালদোর রেকর্ডের রাতে পর্তুগালের গোল উৎসব ৪১ বছরেও থামেননি রোনালদো, ভাঙলেন মেসির রেকর্ড পর্তুগিজ কিংবদন্তিতে ছাড়িয়ে শীর্ষে রোনালদো রোনালদোর বিশ্বরেকর্ড, প্রথমার্ধে উজবেকিস্তানের জালে ৩ গোল পর্তুগালের গোল করেই ইতিহাস গড়লেন রোনালদো ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে ভাবছেন না হালান্ড তৃণমূল থেকে ফিরহাদ-অরূপসহ ৮ নেতা বহিষ্কার উপদেষ্টা জাহেদের ফেরা ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত: জয়সওয়াল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সিএফমোটো বাংলাদেশের নতুন শোরুম উদ্বোধন পর্তুগালের একাদশে ২ পরিবর্তন ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ঘুরে দেখলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি বিস্ফোরক সংকটে বন্ধ মধ্যপাড়া পাথরখনির উত্তোলন কার্যক্রম জলবায়ু অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর হরমুজ প্রণালিতে রেকর্ড তেল রপ্তানির তথ্য দিলেন ট্রাম্প কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন আলোচিত কৃষক কবির হোসেন আর নেই ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন আদব মানুষকে সম্মানিত করে, আদবহীনতা মর্যাদা নষ্ট করে: ছারছীনার পীর ছাহেব কারা পাবেন হেদায়েতের এই পরম নিয়ামত? রেকর্ড তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে ট্র্যাজেডি, পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে প্রতারণা, রিমান্ডে আইনজীবী বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৮ দেশের বাণিজ্য ঘাটতি, শীর্ষে চীন ও ভারত: বাণিজ্যমন্ত্রী

ইফতেখার মাহমুদ: সুগন্ধি সাঁকো পেরিয়ে, মৃত্যু নদীর দিকে

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:০৯ পিএম
আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:৪৯ পিএম
ইফতেখার মাহমুদ: সুগন্ধি সাঁকো পেরিয়ে, মৃত্যু নদীর দিকে
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বাড়ির পেছনের উঠোনে, একেবারে শেষ কোণে, একটা ফিল্ড মেপলের গাছ, বসন্তে রঙে রঙে ভরে ছিল। শীত আসি আসি, তাই সব পাতা রঙ নিয়ে ঝরতে শুরু করেছে। আশ্চর্য বাতাসে তার ঝরে পড়ারও গন্ধটা রয়ে যাচ্ছে!

এক-একটা গন্ধের সঙ্গে জীবনের কিছু মুহূর্ত কেমন অযৌক্তিকভাবে জড়িয়ে থাকে মানুষের। নিবিড় নিষ্ঠায় ভাবতে থাকলে সেই গন্ধের সঙ্গে স্মৃতির যোগ সূত্র ঠিক খুঁজে নেওয়া যায়! বকুলগন্ধে আমার স্কুল বেলার সেই ‘ফুল বাড়ি’র কথা মনে আসে প্রথমে। সারা বাড়িটি জুড়ে কত্তো প্রজাতির গাছ আর ফুল যে ছিল। আমরা স্কুলে যেতাম, ঠিক সেই বাড়িটার গা ঘেঁষে। দেখেছি— আজও মনে আছে, ‘ফুলবাড়ি’র কাছে এলেই সব স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীর হাঁটা যেত শ্লথ হয়ে। মানুষ গন্ধের ডাক উপেক্ষা করতে পারেনি কোনো দিন! কদমফুলের গন্ধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাট থেকে বাড়ি ফেরার পথখানি। আমি আর অবিনাশ শিস বাজিয়ে সিনেমার হালকা কোনো গান তুলতে চেয়েছি যেই, কদমের ভেজাগন্ধ এসে লেগেছে নাকে! অবিনাশ খুব অভাবে আছে বোধ হয়। মাঝে মাঝে দেশ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দেয়, অনটনের গল্প বলে। মেয়ের একটা মোবাইল ফোন চাই, তাতেই নাকি ভালো একটা চাকরি জুটে যাবে। আমি এপাড় থেকে শিস তুলতে চেষ্টা করি, তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম। অবিনাশ বলে, হবে না। এইটা তুলতে হলে বাজার থেকে হাইঞ্জ্যার সময় বাড়ি ফিরতে হবে। আমার নাকে তখনো কদমের ঘ্রাণ এসে লাগে।

বোনের আঙুল জড়িয়ে অন্ধকার পথ ধরে ফিরছি। সনকাপনের মাঠ পেরিয়ে চড়কপূজো দেখে ফিরি। ধু ধু মাঠের মাঝখানটায় এসে বাতাসে ছাতিম ফুলের গন্ধ। আমি আর বোন দৌড়াচ্ছি, এ নির্ঘাত বদ-ঘ্রাণ, ভূত-পেত্নীর কিছুর। বোনের হাত ছুটে গেছে হাত থেকে, কত হাজার বছর, এখন সাভেরনাক ফরেস্টে ঢুকে ছাতিমের গন্ধ পেয়ে গাড়ি থামিয়ে দিই।

রজনীগন্ধার গন্ধে পাশের বাড়ির চাচির বোন, দীবা খালার কথা মনে পড়ে। শাহ মোস্তফা সড়কের পুষ্পবিতান থেকে এক তোড়া রজনীগন্ধা কিনে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। বললেন, বাড়ি নিয়ে পানির মধ্যে রাখতে হবে, অনেক দিন গন্ধ ছড়াবে। আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করে কাকে ভালোবেসেছিলে জীবনে প্রথম? আমার রজনীগন্ধার ঘ্রাণ এসে তখন লাগে নাকে।

বাতাবি লেবু ফুলের গন্ধ যে জানে না, তার জীবন অসম্পূর্ণ বলে মনে হয় আমার! বেল-ফুলও তাই! গন্ধরাজ ফুলের গন্ধ নাকে এলেই দোলন কাকার কথা মনে পড়ে। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল বাবর মামাদের বাড়ি। তাদের প্রতিবেশী দোলন কাকা। বাবর মামা, মিফতা মামা দুজনেই প্রবাসী। বাড়িতে বুড়ো মা। কে থাকবে সঙ্গে! কলেজপড়ুয়া তরুণ প্রতিবেশী হিন্দু ছেলেটা সারাটা জীবনই প্রায় এই বাড়িতেই থাকলেন। রাধা গোবিন্দের ছবি আঁকলেন। আর বিলালেন, একে ওকে। বাড়ি জুড়ে রুয়ে রাখলেন সারি সারি গন্ধরাজ গাছ। দোলন কাকার খবর জানি না। জানি কেবল সেই বাংলাদেশ, সেই গ্রাম-জনপদ আর ভূগোলে নাই, অল্প বিস্তর রয়ে গেছে ইতিহাসের বইয়ে হয়তো। কিন্তু গন্ধটা আছে। স্মৃতির সঙ্গে লেপ্টে আছে। আমার মায়ের প্রিয় ফুল ছিল গোলাপ। আব্বু একবার নাকি কার বাসা থেকে ডাল ভেঙে একটা গোলাপ নিয়ে এসেছিলেন, সেই তাদের বিয়ের পর। সেই গল্পের কত ভার্সন যে আমি শুনেছি আম্মার মুখে! ফ্লোরাল শপের সবগুলো গোলাপে আমি এখন আম্মা আম্মা গন্ধ পাই। বাড়িতে হাসনাহেনার গাছ লাগিয়ে ছিলেন ছোটচাচা। এখন ঘ্রাণে রঙে গানে সুরে তার কত যে আপত্তি! ওহাবী প্রভাবে বাংলার সুর ঘ্রাণ রঙে যে ফিকে হয়ে এলো— আমার ছোটচাচা তার প্রাইম এক্সাম্পল!

একটা বয়সের পরে মানুষের স্মৃতির নতুন সঞ্চয় জমে না আর! কবিত্ব, আবেগ, ভাবনা, নির্মাণ, সৃষ্টির ক্ষমতা, ‘হয়ে ওঠা’, দেখবার, শুনবার চোখ-কান— সব ওই মধ্য কুড়িতেই! একদিন জীবন যে মায়াকাজল চোখে পরিয়ে দেয়, তারই চিহ্ন ধরে বাকি পথ চলা। তার পরে যা হয়, তা নাকি শুধু অভিজ্ঞতা, অনুশীলন আর পুরোনো সঞ্চয়ে পালিশ লাগানোর জীবনপণ চেষ্টা— আশ্বিনের রোদে বই, লেপ-কাঁথা রোদে শুকিয়ে তুলে রাখার মতো! ওইটুকু সঞ্চয় যার যত বেশি, তার পথ তত দীর্ঘ প্রশস্ত। সত্যি-মিথ্যে জানিনে।...

তবু কেউ চলে যায়, জনপদ, রাস্তায়, লোকালয়ে, শাহবাগে ফুলের গন্ধে ছাতিমে আকুল হয় নগর। হঠাৎ ভেসে আসা কোনো গন্ধে আনমনা হওয়ার মতো জানতে পারি মেপল লিফের মতো মোলায়েম গতিতে ঝরে পড়ছে এক সোনার মানুষ!

তার ফুলের নাম মনীষা। ঘ্রাণের নাম কোমল গান্ধার। সন্ধ্যার আলো মিটিমিটি বইমেলার মাঠে, আমি ডাকি ইফতেখার আসো, ছবি তুলি! একটা ক্লিকে তাকে সেই ঘ্রাণ-পুরুষের মতো লাগে, আর আমাকে দেখায় বেখাপ্পা। সারোদের সুরের মতো মিহি মোলায়েম এক স্বরে বলে— আপনার গদ্য কী যে মিষ্টি সুমন ভাই! আমি বলি, তুমি বলছো এই কথা! আমার সময়ে তোমার মতো সুঘ্রাণে মাখা গদ্য কারও নেই ইফতেখার!

সেই ঘ্রাণটা আজ সারা দিন-রাত আমার নাকে লেগে থাকল। আমি, আমার নিজের, ইফতেখারের, গদ্য-ঘ্রাণ, আর ইনবক্স খুঁড়ে প্রাণের কথা তুলে আনতে পারলাম না একটুও।
আমি আরও একদিন তোমাকে নিয়ে লিখব, সোনার মানুষ। পৃথিবীকে কাঙাল করেছো বটে কিন্তু গন্ধ নিয়ে যেতে পারনি! আমাদের, আমার, মনীষার, তার মায়ের, অজস্র বন্ধুর পাঠকের নাকে মুখে বুকে গালে তুমি লেগে র’বে...

দিনাজপুরে কবি আযাদ কালাম রচিত ‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’ কবিতা গ্রন্থের পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১০:১০ পিএম
‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’ কবিতা গ্রন্থের পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত
ছবি: সংগৃহীত

উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের আয়োজনে এবং দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সহযোগিতায় কবি আযাদ কালামের কবিতাগ্রন্থ ‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’-এর পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

গত ২২ মে স্থানীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের সভাপতি কবি অধ্যাপক কামরুজ্জামান গোপন। প্রধান আলোচক ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক এমরান কবির।

অনুষ্ঠানের অন্যান্য আলোচক ছিলেন কবি অধ্যাপক মোজাম্মেল বিশ্বাস, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কবি ও প্রাবন্ধিক মাসুদ মুস্তাফিজ, কবি ও গবেষক চাষা হাবিব, কবি নিরঞ্জন হীরা এবং কবি কমল কুজুর। এছাড়া বক্তব্য রাখেন কবি অধ্যাপক জলিল আহমেদ, কবি ফরিদুল আজাদ মিলন, রেজাউর রহমান রেজু, গল্পকার মাহবুব আলী, কবি আজাহারুল আজাদ জুয়েল, প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বরূপ বক্সী বাচ্চু এবং উত্তরতরঙ্গের নির্বাহী সম্পাদক রাজ্জাক কাঞ্চন প্রমুখ।

কবি আযাদ কালামের কবিতা আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী মোকাররম হোসেন, মীর শিরিন, সুবর্ণা মুখার্জী এবং ছড়াকার বিধান দত্ত।

প্রধান আলোচক এমরান কবির বলেন, ‘সাম্প্রতিক কবিতার বড় একটি ব্যর্থতা হলো এর কেন্দ্রহীনতা, পারম্পর্যহীন শব্দসমাবেশ এবং পঙ্ক্তির বিধ্বস্ত বিন্যাস। বিমূর্তায়ন ও বিচ্ছুরণের দিকে ধাবিত হতে গিয়ে সাম্প্রতিক কবিতা প্রায়ই কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কবিতা পড়া যাচ্ছে না। শব্দ থেকে শব্দের যোগাযোগহীনতা, পঙ্ক্তি থেকে পঙ্ক্তির পারম্পর্যহীনতা পাঠককেও যোগাযোগহীন করে তুলছে। এই যোগাযোগহীনতা বা সংযোগ স্থাপনের ব্যর্থতার কারণে কবিতা এখন সবচেয়ে কম পঠিত সাহিত্যধারাগুলোর একটি। আযাদ কালামের কবিতা পাঠ করতে গিয়ে দেখা যায়, এসব নেতিবাচক উপাদানের উপস্থিতি নেই। ফলে তার কবিতাগুলো পাঠযোগ্য। আর যদি কোনো কবিতা পড়া যায়, তাহলে বলা যেতে পারে সেই কবিতায় ‘কিছু একটা’ আছে। এই ‘কিছু একটা’ হলো কবিতার অধরা আলোর কাছে পাঠকের প্রত্যাশা। আযাদ কালামের কবিতা সেই প্রত্যাশা পূরণ করে। কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে মফস্বলে অবস্থান করেও বৈশ্বিক কবিতার সমান্তরালে যে কবিতাচর্চা করা সম্ভব, আযাদ কালাম তা প্রমাণ করেছেন।’

কবি আযাদ কালাম তার কবিতাগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করার জন্য উপস্থিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি ও শিল্পী কমল কুজুর।

সমধারার স্রোতে সৃজনের উচ্ছ্বাস: কবিতা, চেতনা ও আনন্দের মিলনমেলা

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
আপডেট: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
সমধারার স্রোতে সৃজনের উচ্ছ্বাস: কবিতা, চেতনা ও আনন্দের মিলনমেলা
প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উৎসবে বক্তব্য রাখেন। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব যখন অমীমাংসিত যুদ্ধ, সংঘাত আর মানবিক বিপর্যয়ের ভারে ন্যুব্জ—
যখন বিশ্বমানবতা অশান্তি ও উদ্বেগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে—
ঠিক সেই সময়ই অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠাকে দূরে সরিয়ে দেশের এক কোণে, সীমিত পরিসরে, এক অপার আনন্দময় আবহে ধানমন্ডির ছায়ানটে অনুষ্ঠিত হলো সমধারার দ্বাদশ কবিতা উৎসব ২০২৬।

 ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আয়োজন কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; বরং এটি এক চলমান সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণস্পন্দন। “সমধারা”-নামটির মধ্যেই যেন প্রবাহমান সৃজনশীলতার ইঙ্গিত, আর সেই স্রোতধারায় যুক্ত হয়েছেন দেশের প্রথিতযশা ও নবীন কবি-সাহিত্যিকেরা। তাদের সম্মিলিত উপস্থিতিতে উৎসবটি হয়ে উঠেছিল এক অনন্য নান্দনিক মেলবন্ধন। সত্যিই, অনুভূতিটা ছিল অপার্থিব।

সমধারা এমন এক উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নবীন ও প্রবীণ-সব প্রজন্মের সাহিত্যসাধকরা মিলিত হন এক অভিন্ন সৃজনস্পন্দনে। উপস্থিত ছিলেন শিল্প সাহিত্যের দিকপাল বহুমাত্রিক লেখক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল, কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক হারুন হাবীব, কবি-প্রাবন্ধিক ফরিদ আহমেদ দুলাল, কবি মজিদ মাহমুদ এবং লেখক-গবেষক ড. এমদাদ হাসনাইনসহ আরও অনেক গুণীজন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার বক্তব্যে সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন-সাহিত্য কেবল আত্মপরিচয়ের বাহন নয়, এটি চর্চার মধ্য দিয়েই টিকে থাকে। অন্যদিকে, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামার মাঝেও কবিতা চর্চার এমন আয়োজনকে এক বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক মোস্তফা কামাল সাহিত্যচর্চাকে তুলনা করেন প্রার্থনার সঙ্গে—যেখানে প্রতিদিনের সাধনাই লেখককে পরিপূর্ণ করে।

অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকরাও তাদের বক্তব্যে সন্তুষ্টি ও প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করেন।

এ উৎসব যেন নববর্ষের রেশ বহন করছিল। পহেলা বৈশাখের আবহ তখনও বাতাসে ভাসমান-চারদিকে বৈশাখি মেলার আমেজ, প্রকৃতিতে মধুমাসের আগমনী বার্তা, গাছে গাছে ফলের সমারোহ। সেই আবহকে ধারণ করেই লাল রঙে সজ্জিত কবিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যেন উৎসবের রঙ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছিল।

ফরিদ আহমেদ দুলালের সভাপতিত্বে এবং কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক হারুন হাবীবের উদ্বোধনে, সালেক নাছির উদ্দিনের সুচারু সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সারা দেশ থেকে আগত কবিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ছায়ানটের প্রাঙ্গণ।

এবারের সমধারা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। শিশু সাহিত্যিক ড. ধনঞ্জয় সাহা এবং কবিতা সাহিত্যে আদ্যোনাথ ঘোষও সম্মানিত হয়েছেন। তাদের প্রতি রইল অকুণ্ঠ অভিনন্দন, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সমধারার কর্ণধার সালেক নাছির উদ্দিন তার অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এই সংগঠনকে সুসংগঠিত করেছেন। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি সমধারার যাত্রাকে অব্যাহত রাখার যে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

এবারের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল আরেকটি কারণে-অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উপস্থিতি। তিনি নিয়মিতভাবে সব অনুষ্ঠানে অংশ না নিলেও, সমধারায় এসে তিনি যেন লেখক-কবি সত্তাকে নতুন করে জাগ্রত করে তুললেন। তার উপস্থিতি সকলের মধ্যে দ্বিগুণ উৎসাহের সঞ্চার করেছে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মোস্তফা কামালের উপন্যাস “দেবো খোঁপায় তাড়ার ফুল” অবলম্বনে কাব্যগীতি নৃত্যনাট্য “প্রেমার্ঘ নৈবেদ্য”-যা ছিল এক অনবদ্য শিল্পসম্ভার।

সব মিলিয়ে, সমধারার দ্বাদশ কবিতা উৎসব ছিল এক সফল, অর্থবহ এবং শিক্ষণীয় আয়োজন। একটি অনুষ্ঠান শুধু উপভোগের বিষয় নয়-এর ভেতরে থাকে শেখার অসংখ্য উপাদান। গুণীজনদের কথা শোনা যেমন সৌভাগ্যের, তেমনি তাদের সান্নিধ্য পাওয়া এক বিরল প্রাপ্তি।

সৌভাগ্যক্রমে সেই প্রাপ্তির অংশীদার হতে পেরেছি-প্রিয় মানুষদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে, আশীর্বাদ চেয়েছি আগামী পথচলার জন্য।

পরিশেষে, এই আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ ধন্যবাদ সালেক নাছির উদ্দিনকে। সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে-সমধারার এই সৃজনযাত্রা আরও বহুদূর এগিয়ে যাক।

এসএন/

বইয়ের প্রচ্ছদই পাঠককে ডাকে: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
বইয়ের প্রচ্ছদই পাঠককে ডাকে: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন বই ‘প্রিয়জন আপনজন’-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে লেখকসহ অতিথিরা ছবি: খবরের কাগজ

একটি বইয়ের পরিচিতি ও পাঠককে আকর্ষণের ক্ষেত্রে প্রচ্ছদই প্রধান ভূমিকা রাখে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বলেছেন, প্রচ্ছদ ছাড়া বই হয় না। প্রচ্ছদ ডাক দেয়, প্রচ্ছদ চিনিয়ে দেয়। প্রচ্ছদ বলে এসো- তারপরে না বই।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন বই ‘প্রিয়জন আপনজন’-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিতব্য এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন বরেণ্য শিল্পী ও অভিনেতা আফজাল হোসেন।

বই প্রকাশের আগেই ঘটা করে প্রচ্ছদ উন্মোচনের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনকে লুইস ক্যারলের ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর রূপকের সঙ্গে তুলনা করেন অধ্যাপক সায়ীদ। রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘এ কেমন বই, যার বই নেই; কিন্তু প্রচ্ছদ আছে! এটি অনেকটা সেই অদৃশ্য বিড়ালের হাসির মতো।’ লেখক ফরিদুর রেজা সাগর সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কেউ লেখক হওয়ার পরে লেখে, আর কেউ লিখতে লিখতে লেখক হয়। সাগরের ভেতরে আগে থেকেই লেখার রসদ তৈরি ছিল, যা এখন বই হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।’

অনুষ্ঠানে লেখক ফরিদুর রেজা সাগর জানান, ‘প্রিয়জন আপনজন’ বইটিতে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের ১০০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রচ্ছদ নিয়ে লেখক বলেন, শিল্পী আফজাল হোসেন আমার প্রায় ৩০টি বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। তার একটি স্বভাব হলো কাজ দেরিতে করা। কিন্তু এবার তিনি বই লেখা শেষ হওয়ার আগেই একাধিক প্রচ্ছদ তৈরি করে ফেলেছেন। সেই আনন্দ থেকেই এই প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা।

আফজাল হোসেন বলেন, ‘বই প্রকাশের আগে প্রচ্ছদ উন্মোচন আমাদের দেশে নতুন ঘটনা। একটি সময়কে ধরে রাখার জন্য সাগর ভাই যেসব গুণী মানুষকে নিয়ে লিখেছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে।’

অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী, শাইখ সিরাজ, জিল্লুর রহমান, ছড়াকার আমীরুল ইসলাম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষার।

ফারজানা ব্রাউনিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট নজরুল সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা।

স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতা ও ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতা ও ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’

সম্প্রতি শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন সৃজনের মিরপুর কার্যালয়ে একক বক্তৃতা, একক কবিতাপাঠ এবং পাঠপর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কবি লুব্ধক মাহবুবের ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট গবেষক ও গল্পকার প্রফেসর ড. আনোয়ারুল হক, বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ।

আনোয়ারুল হক বলেন, কবি লুব্ধক মাহবুব প্রেমের কবি। প্রবাসী জীবনের টানাপোড়েন তার কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ। ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থে এই কবি পরিণত এবং শব্দ চয়নে দক্ষতা তার কবিতাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। তার কবিতার বিষয়ে গভীরভাবে দেশের প্রতি ভালোবাসা স্থান পেয়েছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রকৃতিও বিশেষভাবে তার কবিতায় উঠে এসেছে। এই কবি যে দেশে না থেকেও দেশের সঙ্গে তার কবিতার মাধ্যমে গভীর সংযোগ রেখেছেন– এই বই তার সাক্ষ্য বহন করে।

প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ বলেন, ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থের কবি লুব্ধক মাহবুব একজন জাত কবি। ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। আগের দুটি কাব্যগ্রন্থ থেকে এ গ্রন্থে তিনি অনেক বেশি পরিণত কবি। সুনির্বাচিত শব্দ চয়ন, অনুপ্রাসের কাব্যময় প্রয়োগ, বক্রোক্তি ও ব্যজস্তুতির বর্ণময় ব্যবহার, প্রাসঙ্গিক যথাযথ উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্প এবং গদ্য ছন্দের অনবদ্য ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে নিজের জন্য একটি নিজস্ব ভাষাশৈলী তৈরিতে দারুণভাবে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করি। আর বাংলায় লেখা এ গ্রন্থের ৮০টি কবিতায়ই বিষয় বৈচিত্র‍্যে বৈচিত্র্যময় ধারক হিসেবে কবিকে অনন্য বিশিষ্টতায় বিভূষিত করেছে। দীর্ঘ ৩৪ বছর বিদেশ বিভুঁইয়ে অবস্থান করেও নিজের মা-মাটি-মানুষকে তিনি যে ভুলে যাননি বরং গভীর ও প্রগাঢ় মমতায় তাদের বেঁধে রেখেছেন, এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা তার বড় প্রমাণ। বলা চলে স্রষ্টা প্রদত্ত কবি প্রতিভা আর গভীর অনুশীলন, অধ্যয়ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে নিজেকে তিনি একজন উত্তর আধুনিক কবি হিসেবে এ কাব্যগ্রন্থে যেভাবে শিল্পশ্রীমণ্ডিতভাবে মেলে ধরেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

অনুষ্ঠানের ‘স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতার গতি-প্রকৃতি’ বিষয়ের মূল বক্তব্যে লেখক ও গবেষক ড. কুদরত-ই-হুদা বলেন, সাতচল্লিশে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা যখন তৈরি হয় তখন পূর্ববাংলার মুসলমান কমিউনিটি সাগ্রহে তাতে শামিল হয়েছে। এর কারণ যতটা বা ধর্ম তারচেয়ে বেশি অর্থনীতিকেন্দ্রিক। তিনি বলেন, চল্লিশের দশকে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রচুর কবিতা লেখা হয়েছে। ষাটের দশকে গিয়ে কবিদের এ বিষয়ে মোহভঙ্গ ঘটে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আরিফ মঈনুদ্দীনের একক কবিতা পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা করেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার, কবি ও কথাসাহিত্যিক নুসরাত সুলতানা এবং কবি ওয়াহিদ জামান। আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে নুসরাত সুলতানা বলেন, কবিতা ব্যাখ্যার অতীত এক শিল্পকর্ম। শিশুর প্রথম কান্না যখন মা শুনতে পান সেই আনন্দ যেমন ব্যাখ্যা করা যায় না তেমনি কবিতাও ব্যাখ্যা করা যায় না। কেবল উপলব্ধি করা যায়। কবি আরিফ মঈনুদ্দীন কাব্যজগতে বহু পথ পেরিয়ে এসেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ১৮টি কাব্যগ্রন্থ। এই কবির কবিতার শব্দ চয়ন যেমন নান্দনিকতার দাবি রাখে তেমনি তার গভীর উপলব্ধি ও পাঠকের মননকে নাড়া দেয়। কবির কবিতায় দর্শন ভাবনা, মনস্তত্ত্ব এবং জীবনের ভাঁজকে পরতে পরতে খুলে দেখার আকাঙ্ক্ষা আছে।

আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার বলেন, এ গ্রন্থের কবিতাগুলোতে মিস্টিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। কবিতাগুলো হৃদয় নয় বরং মেধাশাসিত।

আলোচক কবি ওয়াহিদ জামান বলেন, আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সহজ-সরল, কিন্তু গভীর। জীবনের প্রতিটি অনুভবকে ধারণ করার প্রতিশ্রুতি আছে তার কবিতায়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- কবি লুব্ধক মাহবুব, কবি আরিফ মঈনুদ্দীন, কবি রমজান সরকার, কবি সাদমান সজীব, কবি শামস আরেফিন, কবি ও কথাসাহিত্যিক আকেল হায়দার, অনুবাদক মেজবাহ উদ্দিন, কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আহমেদ বাসার, কবি জুননু রাইন, পরিবেশবিদ কবি শেখ আহমেদ ফরহাদ, কবি ও প্রবন্ধকার প্রফেসর ড. রকিবুল হাসান, প্রফেসর ড. ডি. এম, ফিরোজ শাহ, নাট্য নির্মাতা মিতুল খান, গবেষক হোসাইন মোহাম্মদ জাকি, কবি আহমেদ বাবু, কবি হাসিবুর রহমান জয়, মো. আরিফুল ইসলাম, কবি মুনযির সাদ, কবি ও ছড়াকার হুসাইন আলমগীর, কবি অঞ্জলী রাণী পূজা, কবি ও সাংবাদিক মাসুদ হাসান, কবি ও সম্পাদক বহ্নি কুসুম, কবি ও কথাসাহিত্যিক সাহিনা মিতা, কথাসাহিত্যিক ফরিদুল ইসলাম নির্জন, ড. সর্দার এ হায়দার, কবি রহিজ আলী সরদার, কবি বোরহান মাসুদ, কবি তৌহিদ আহাম্মেদ লিখন, কবি আহমেদ বাবুল, কবি ফরহাদুর রহমান, সোহাগ হাওলাদার, রাসেল প্রমুখ...।

একজন নাবিকের চোখ, কিছু প্রশ্ন এবং ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৯ এএম
একজন নাবিকের চোখ, কিছু প্রশ্ন এবং ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’

সময়ের প্রবাহে মানুষ যত বেশি তথ্যের কাছে পৌঁছেছে, ততই যেন হারিয়ে ফেলেছে ভাবনার গভীরতা। জানা আর বোঝার ভিড়ে প্রশ্ন করার অভ্যাসটি ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এক ভিন্নধর্মী চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে বাজারে এসেছে নতুন বই ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’। যেখানে উত্তর নয়, বরং প্রশ্নই হয়ে উঠেছে মূল আলোচ্য।

বইটি ছাপিয়েছে পরিবার পাবলিকেশনস আর প্রচ্ছদ করেছেন মৌমিতা রহমান। এবারের অমর একুশে বইমেলায় বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বর্তমানে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে এই গ্রন্থ।

বইটির লেখক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন একজন অভিজ্ঞ নৌ কর্মকর্তা, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। সমুদ্রপথে দীর্ঘ যাত্রা, প্রকৃতির বিশালতা ও মহাবিশ্বের নীরব বিস্ময় তাকে বারবার দাঁড় করিয়েছে কিছু মৌলিক প্রশ্নের সামনে। সেই অভিজ্ঞতা, সেই উপলব্ধি এবং সেই প্রশ্নগুলোকেই তিনি শব্দে রূপ দিয়েছেন এই গ্রন্থে।

লেখকের ভাষায়, এই বই কোনো তর্ক জেতার জন্য নয়, কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্যও নয় বরং এটি এক ধরনের মানসিক যাত্রা। যেখানে পাঠককে আহ্বান জানানো হয় ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং চারপাশের দৃশ্যমান জগতের আড়ালে থাকা অদৃশ্য রহস্যগুলোকে অনুভব করতে।

বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এখানে সহজভাবে এমন কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা মানুষের ভাবনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কেন প্রকৃতির নিয়ম আছে? কেন মহাবিশ্ব এত শৃঙ্খলাবদ্ধ? সবকিছু কি কেবলই ঘটে গেছে, নাকি কোনো এক অদৃশ্য প্রজ্ঞা তা ঘটিয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর বইটি দেয় না। বরং লেখক সচেতনভাবেই উত্তরহীনতার জায়গাটিকে উন্মুক্ত রাখেন। কারণ তার বিশ্বাস, প্রশ্নই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়, প্রশ্নই মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের জীবনের অভিজ্ঞতাও কম বিস্ময়কর নয়। ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জন্ম নেয়া এই নৌ কর্মকর্তা ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মিসাইল ফ্রিগেট বানৌজা ওসমানসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজের অধিনায়ক হিসেবে তার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুদান ও লেবাননে দায়িত্ব পালন তাকে দিয়েছে বৈশ্বিক বাস্তবতার কাছাকাছি থাকার সুযোগ।

একজন নাবিক হিসেবে তিনি যেমন বিশাল সমুদ্র দেখেছেন, তেমনি একজন গবেষক হিসেবে খুঁজেছেন তার অন্তর্নিহিত অর্থ। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে এমবিএ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে এমফিল ও পিএইচডি অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি জ্ঞানচর্চার পথেও নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা ও প্রকল্প পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’ তাই শুধু একটি বই নয়, এটি এক ধরনের চিন্তার অনুশীলন। এটি পাঠককে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয় না, বরং তাকে এমন এক মানসিক অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি নিয়ম, প্রতিটি ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন জাগায়।

এই বই যেন এক নীরব দরজা- যা খুললে হয়তো সব উত্তর মিলবে না, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বদলে যাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। আর সেই পরিবর্তিত দৃষ্টিই হয়তো আমাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই হারিয়ে যাওয়া অভ্যাসে, ভাবনায়, প্রশ্নে কিংবা বিস্ময়ে।