শুক্রবার অনুষ্ঠিত হলো সৃজন আয়োজিত সাপ্তাহিক পাঠচক্র। রাজধানীর মিরপুরে সৃজনের নিজস্ব কার্যালয়ে বিকেলের নরম আলোয় এক প্রাণময় সাহিত্য আসর জমে ওঠে কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের উপস্থিতিতে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সৃজন থেকে প্রকাশিত কবি আজাদুর রহমানের কাব্যগ্রন্থ ‘পথটাকে সোজা করে ধরুন আমি হাঁটছি’ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করেন প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ। তার মতে, এই কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাই পরাবাস্তবতার কথা বলে, যেখানে কবি মানুষকে পথের নির্মাতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রতিটি কবিতার শিরোনামে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প বলার এক অদ্ভুত নিপুণতা লুকিয়ে আছে। কবি আজাদুর রহমানের কবিতা লেখার এই নতুন ঐতিহ্য নির্মাণের প্রচেষ্টা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে। কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে নিজের মূল্যায়নে লেখক ও অনুবাদক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, আজাদুর রহমানের লেখনী মানে শুধু শব্দের বিন্যাস নয়, বরং আত্মার গভীরে প্রোথিত স্মৃতির অন্বেষণ। প্রকৃতির নিসর্গ, বাউলতত্ত্বের গভীরতা আর মানুষের ভেতরের নদী- সবই তার কবিতায় একাকার হয়ে মিশে যায়। আত্ম-অন্বেষণের এ দীর্ঘ যাত্রায় তিনি নিজের মুখের দিকে তাকিয়েই খুঁজে নেন সৃষ্টির প্রেরণা।
এরপর পাঠচক্রের দ্বিতীয় পর্বে কবি কামরুল আলম সিদ্দিকী তার কাব্যগ্রন্থ ‘দোআঁশ মাটির দাগ’ থেকে কবিতা পাঠ করেন। তার কণ্ঠে উঠে আসে মাটির গন্ধ, মানুষের শ্রম ও ইতিহাসের স্মৃতি। শ্রোতাদের মুগ্ধ করে তার আবৃত্তির ভঙ্গি, উচ্চারণে থাকা একরাশ নিঃশব্দ আবেগ। তার পঠিত কবিতাগুলো নিয়ে আলোচনা প্রকাশ করেন কবি ও সম্পাদক জুননু রাইন, কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার এবং শিক্ষাবিদ গবেষক প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ। কবি জুননু রাইন বলেন, কামরুল আলম সিদ্দিকীর কবিতা আমাদের মাটির গন্ধে, শ্রমজীবনের ভাষায়, এক প্রাত্যহিক মহাকাব্য। নিজের মাটি আর মানুষকে এভাবে ধারণ করতে সাধারণত খুব একটা দেখা যায় না। কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার তার কবিতায় ঐতিহ্যের নিপুণ বুননের দিকটির প্রতি আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, কামরুল আলম সিদ্দিকী ঐতিহ্যিক অনুষঙ্গকে সমকালীন জীবনের উত্তাপে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। কামরুল আলম সিদ্দিকীর কবিতা নিয়ে ড. সেলিম আকন্দ দীর্ঘ আলোচনা করেন। তার আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে কামরুল আলম সিদ্দিকীর কবিতার জীবন সংলগ্নতা এবং নস্টালজিয়া। ড. সেলিম আকন্দের মতে কামরুল আলম সিদ্দিকী সেই প্রকৃত কবিদের একজন যারা নিজের ছাপ রেখে যেতে পারেন নিজের দেশ এবং দেশের মানুষের ভালোবাসার মহিমায়।
এদিনের পাঠচক্রে আরও উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক ফরিদুল ইসলাম নির্জন, কবি ও পাখি বিশেষজ্ঞ শেখ আহমেদ ফরহাদ, কবি আকেল হায়দার, কবি সীমান্ত হেলালসহ আরও বহু সাহিত্যিক ও গুণীজন। সৃজনের এই পাঠচক্র কেবল একটি সাহিত্য আয়োজন নয়- এ যেন এক আত্মিক পুনর্মিলন, এক সৃষ্টিশীল সংলাপের অনন্ত পরিসর। সমকালীন সাহিত্যচর্চার প্রবণতা, ভাষা ও বিষয়বস্তুর পরিবর্তন এবং সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে সাহিত্যিক দায়বদ্ধতার গভীর সম্পর্ক উঠে আসে আলোচনায়।