ঢাকা ৫ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
১০ জনের বসনিয়ার বিপক্ষে বড় জয় সুইজারল্যান্ডের অসুস্থ মেসির বাবা, গুজব ছড়ানোয় ক্ষুব্ধ পরিবার গোলশূন্য সমতায় বিরতিতে সুইজারল্যান্ড-বসনিয়া অবশেষে কাটল ভিসা জটিলতা, কানাডায় খেলতে পারবেন ওয়াহি বিশ্বকাপে সহজ ম্যাচ বলে কিছু নেই: ডগলাস সান্তোস বিশ্বকাপে সৌদি আরবের জন্য ভিন্ন নিয়ম পেনাল্টি গোলে চেক প্রজাতন্ত্রকে রুখে দিল দক্ষিণ আফ্রিকা অপ্সরার আন্তর্জাতিক অভিষেক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে গিয়ে কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা বাদশা গণপিটুনির শিকার তিন ডিবি সদস্য, উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি মেনে নাও, মেসি সেরা: রোনালদো নাজারিও কেইনের প্রেরণা এমবাপ্পে-হালান্ড কুমিল্লায় ধর্ষণকাণ্ড: গ্রেপ্তার শিবির নেতার পক্ষে দাঁড়ানো দুই এপিপির নিয়োগ বাতিল টাঙ্গাইলে প্রতিমন্ত্রী টুকুর নামে প্রতারণা, গ্রেপ্তার ১ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমার্ধে এগিয়ে চেক প্রজাতন্ত্র টাকার অভাবে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত, সহায়তার আবেদন রাজবাড়ীতে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ নেইমার ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ সাবেক মন্ত্রী হারুণ অর রশীদ অর নেই কুমিল্লায় মাদক মামলায় কারাবন্দি যুবদলকর্মীর মৃত্যু চুয়াডাঙ্গায় বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু হাইতির বিপক্ষে নামার আগে ব্রাজিলকে সুখবর দিল ফিফা ওয়ালটন পিসিবিএ'র রপ্তানি উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হলো গ্লোবাল ইয়ুথ লিডারশিপ কনফারেন্স ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, গণপিটুনির শিকার তিন পুলিশ বিশ্বকাপে ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার সময় টিভির সাবেক এমডি জোবায়ের কারাগারে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় ইইউর ১.৪ কোটি ইউরো অনুদান বিশ্বকাপে বড় ধাক্কা খেল আইভরি কোস্ট, কানাডার ভিসা পেলেন না ওয়াহি মাগুরায় নবজাতককে বিক্রি করলেন বাবা

শেষ ঘোষণা

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৫:৫৬ পিএম
আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:০০ পিএম
শেষ ঘোষণা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সাতটার মাইকে আজও তার গলা উঠলেই প্ল্যাটফর্ম জেগে ওঠে। ‘দয়া করে দূরে দাঁড়ান, ট্রেন ঢুকছে।’ রীতা ঘোষ চেনা স্বরে বলে, তার পর সামান্য বিরতি রেখে ইংরেজিটা। কলসিটা থেকে এক চুমুক জল খেয়ে গলা পরিষ্কার করে আবার বোতাম টিপে দেয়। বোতামের চারপাশে হলুদ টেপ, তাতে পুরোনো আঠার গন্ধ। ডেস্কে এলোমেলো রুট চার্ট, স্যানিটাইজারের কৌটো, ক্যালেন্ডারে ‘সোম’ ঘরে রিং- আজ রাতেই বারোটা বাজলেই তার চাকরি ফুরোবে। কাল থেকে ‘অবসরপ্রাপ্ত’। শব্দটার ভেতর কেমন যেন ধুলো বসে আছে; চোখের কোনে খচখচ করে ওঠে।

প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছেলে ফোন করে- ‘মা, ডেলিভারি ছিল, দেরি হবে।’ মিলন এখন অনলাইন খাবার পৌঁছে দেয়। কখনো লেট, কখনো ক্যানসেল; তবু মোটামুটি চলে যায় মা-ছেলের সংসার। বাপটা ছিল বাস কন্ডাক্টর, করোনা-লকডাউনে অন্য শহরে আটকে পড়ে, পরে আর খোঁজ পাওয়া গেল না। রীতা কারও কাছে কাঁদেনি; শুধু অফিসের মাইকটা চালু থাকলে মনে হতো, কাকে যেন সে পৌঁছে দিচ্ছে বাড়ি পর্যন্ত- অন্তত শব্দে।

আজ সারা দিন শহর থম মেরে আছে। আকাশ ফ্যাকাসে, রোদ নেই, শিরা-ধমনিতে শুধু গুমোট। প্ল্যাটফর্ম ২-এ রেলিংয়ের গায়ে তাকিয়ে আছে এক তরুণী- কপালে ঘাম, হাতে সাদা ব্যাগ। চোখে পলক কম। রীতা দেখে বুঝল, কোনো অপেক্ষা নয়, দ্বিধা। এমন চোখ বহুবার দেখেছে- একটা সিদ্ধান্তের ধারে দাঁড়ানো চোখ। মাথা সামান্য কাত করে সে বুঝে নিতে চায়: লোকাল ট্রেনের আনচান এ মেয়েটার ভেতরের আনচানকে জোর দিচ্ছে, না কমাচ্ছে?

চাইলে বাইরে ডিউটি অফিসারকে ডাকতে পারে। চাইলে মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোককে সরে দাঁড়াতে বলবে। কিন্তু সে প্রথমে এক কাজ করে- মাইকে ফাঁকা অডিও লাইনে মুখ কাছাকাছি এনে একবার নিঃশ্বাস নেয়। স্পিকারের ভেতর দিয়ে নিজের নিঃশ্বাসের পাতলা শোঁ শোঁ শব্দ প্ল্যাটফর্মে ভেসে ওঠে। তরুণী চমকে তাকায় এই দিকে। রীতা মাথা ঝুঁকিয়ে হাসে- খুব সামান্য, কাচের ওপার থেকে।

‘দয়া করে হলুদ লাইনের পেছনে দাঁড়ান।’ স্বরটায় মা-মা একটা অনুনয়। মেয়েটা এক পা পিছু যায়। রীতা স্বস্তির একটা রেখা টেনে নেয় কপালে। সবকিছুর আগেই মানুষকে একটু পেছোতে শেখানো দরকার- গুলতানি শব্দে, ভালোবাসার চাপে। তার পর সে স্ট্যাটাস বোর্ডে চোখ বুলিয়ে নেয়- দমদম লোকাল পাঁচ মিনিট দেরি। মাইকে সেটা বলে। শব্দ চলে যায় টানেলে, স্টিলের গায়ে লেগে ফিরে আসে। এই প্রতিধ্বনিটাই তার দিনের চুড়ি।

ডিউটি রুমের প্লাস্টিক চেয়ারটা একটু ফেটে গেছে; সেখানে টেপ লাগিয়েছিল আগের মাসে মিলন। ছেলেটার হাত বাবার মতো নয়, কিন্তু বেশ কাজের। তবু মিলনের একধরনের চুপচাপ ভাব রীতাকে কষ্ট দেয়। ছোটবেলায় যুক্তাক্ষর পড়তে পড়তেই মাথাব্যথা, পরে বোঝা গেল অতিসংবেদনশীল; হঠাৎ শব্দে আঁতকে ওঠে। রীতা তখন অফিসের রেকর্ডিং রুমে ছেলেকে নিয়ে ঘুম পাড়াত- স্পিকারে কম ভলিউমে রাতের ঘোষণা চালিয়ে। ‘অ্যাটেনশন প্লিজ…’- শব্দে শব্দে তার বুকে ওঠানামা করত ছেলের ঘুম। সে ভাবত, শব্দও কি একটা শাড়ি? নরম করে জড়ানো যায় কারও কাঁধে?

আজ দুপুরবেলা সুপারিন্টেনডেন্ট ডেকে বলেছিল, ‘মা, কাল থেকে আর তোমার শিফট লাগবে না। আজ শেষের দিন, ইচ্ছে হলে একটু আগে উঠে যেও।’ রীতা মাথা নাড়ে। ‘শেষের দিনেও ঘোষণা পুরো করা চাই। লোকজন অভ্যস্ত হয়েছে এই গলা শুনতে।’ কথাটা বলার সময় নিজের গলার ওপর একবুক গর্ব সে শুঁকে নিয়েছিল, যেমন ঝাড়বাতিতে ধুলো মুছলে নরম আলো বেরোয়- তেমন। সুপারিন্টেনডেন্ট হাসল, ‘একদম ক্লাসিক, রীতা দি। তুমিই তো আমাদের স্ট্যান্ডার্ড।’ ‘ক্লাসিক’ শব্দটা তার সারা দিনের সঙ্গী- কত বছর ধরে একই ঠিক উচ্চারণ, না কিছু কম, না বেশি। কেউ বলে রোবটিক; সে জানে, এই মাপজোখে তার নাড়ি বসে আছে।

তিনটের দিকে ঝাপসা বৃষ্টি পড়ল। প্ল্যাটফর্ম ভিজে চকচক, আলোতে একরকম আঁচড় পড়ে। মেয়েটা এখনো রেলিংয়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। এবার ওর ফোনটা বাজল, সে ধরল না। চোখ নামিয়ে রাখল থুতনির নিচে। একটি বাচ্চা ছেলে পায়ের কাছে কৌতূহলে লাফালাফি- মাকে টানছে, ‘ট্রেন আসবে?’ মা বলছে, ‘আরেকটু পর।’ রীতার বুকের ভেতর কোথায় যেন টান খেলে গেল: ‘আরেকটু পর’- এই কথাটা বাতাসে থাকলে মানুষ নিজেকে সামলে রাখে। কথা যেমন ব্যান্ডেজ- রক্ত থামায় না, কিন্তু ভিজে বয়ে পড়া ঠেকায়।

চারটে বাজে মিলনের ফোন আসে- ‘মা, তোমার রিংটা দেখলাম ক্যালেন্ডারে… আজ কি শেষ?’ রীতা চুপ করে। ‘হ্যাঁ।’ ‘তা হলে রাতে ফিরব তাড়াতাড়ি। তোমার প্রিয় জিলিপি আনব।’ ‘শুধু জিলিপি নয়, আজ মাইকটা একটু নিয়ে ঘরে বসে শুনতে চাই।’ ‘কী?’ ‘তোর বাবার কণ্ঠস্বর যে রাস্তায় মিলিয়ে গেল-সেই থেকে আমার গলাটা তোদের বাড়ি।’

ফোন নামিয়ে রাখতেই টানেলের ভেতর থেকে ট্রেনের হেডলাইট দেখা গেল। রীতা অটো-রুটিনে ঘোষণা দিল; তবু আজ এই বলার ভেতরে কেমন অস্ফুট কাঁপন। ট্রেন ঢুকল। বাতাসে উড়ে গেল রেলিংয়ে জমে থাকা জলফোঁটা। মানুষ উঠে পড়ছে, নামছে। ধাক্কাধাক্কির মধ্যে সেই মেয়েটা হঠাৎ এগিয়ে একধাপ। রীতা টের পেল- বুঝি সেও ট্রেনে উঠবে; কিন্তু ঠিক শেষ মুহূর্তে মেয়েটা দাঁড়িয়ে পড়ল। ওঠেনি। রীতা নিঃশ্বাস ছাড়ল। সব ট্রেনেই উঠতে নেই; কিছু ট্রেন ছেড়ে দিতে হয়, তবেই পরের ট্রেনটা নিজের মতো আসে।

ক্রমে সন্ধ্যে নামল। বৃষ্টির ধার কমে গিয়ে টুপটাপ। ভেজা লাইনের গায়ে থুতনির মতো কিছুটা কুয়াশা। ট্র্যাফিক কন্ট্রোল থেকে খবর- একটা সিগন্যাল ডাউন, পাঁচ নম্বর গাড়ি আটকে আছে টানেলে। ‘অ্যানাউন্স করো,’ ওদিক থেকে কড়া গলা। রীতা ঘোষণা দিল। প্ল্যাটফর্মে একটা অস্থিরতা ছড়াল। কিশোররা হাসছে, বুড়োরা ক্ষেপছে, বউরা ফোনে বাড়ির খবর দিচ্ছে, বাচ্চারা ‘চায়না বেল্ট’ ফড়ফড় করাচ্ছে। রীতা দেখল- রেলিংয়ের মেয়েটা কেমন ফ্যাকাসে। তার কাছে কি ফিরতে হবে কোথাও? নাকি কোথাও না-ফিরতে চায় বলে এমন দাঁড়িয়ে আছে?

ডিউটি রুমে ঢুকল আলতাফ- পুরোনো গার্ড। ‘রীতা দি, আজ তোমার ফাইনাল, তাই না? এই নাও, একটা রেকর্ডার। কাল খালি আওয়াজটা থাকবে।’ ছোট্ট ডিজিটাল ডিভাইস। ‘ইচ্ছে হলে তোমার নিজের গলায় ‘শেষ ঘোষণা’ রেখে দিও।’ বলে হেসে চলে গেল। রীতা ডিভাইসটা হাতে নিয়ে ভাবল- শেষ ঘোষণা কেমন হতে পারে? শুধু এইটা: ‘সব যাত্রীকে ধন্যবাদ’- না কি একটু নিজস্ব? উনি কখনো নিজের কথা বলেনি মাইকে। কেবল শহরের।

ঠিক সেই সময় বাইরে একটু গোলমাল। প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে কেউ চিৎকার করল, ‘ওই, ধরো ধরো!’ একটা ছায়া হোঁচট খেয়ে পড়ল লাইনের দিকে। মুহূর্ত। মানুষ দৌড়চ্ছে। রীতার চোখ আর মাইকের বোতামের মাঝখানে এক ধাক্কা- আঙুল থতমত। সে দেখল- কেউ পড়েনি; সাদা ব্যাগওয়ালা সেই মেয়েটাই ছায়াটাকে টেনে রেলিংয়ের এদিকে ফেলেছে। লোকজন উঠে দাঁড়িয়ে ভোল পাল্টে গালাগাল, ‘পাগল- পাগল!’ কেউ জল দিল। মেয়েটা দুহাত কাঁপিয়ে একবার চোখ তুলে রীতার দিকে তাকাল। এক পলক। তার পর মাথা নিচু করে পিছিয়ে গেল, যেন নিজের জেদ থেকে একটু নেমে এল। রীতার বুকের ভেতর হালকা ঝুম শব্দ- যেন ট্রেনের ভেতরের রেলিংয়েও কেউ হাত রাখল।

পাঁচ নম্বর ট্রেনের সিগন্যাল ছাড়ল না; টানেলে বসে আছে। কন্ট্রোল আবার বলল, ‘আরও ঘোষণা দাও। যাত্রীদের শান্ত করো।’ রীতা বলল। শব্দ ঝুলে রইল সিলিং ফ্যানের নিচে। হঠাৎ বিদ্যুৎ দপ করে চলে গেল। অন্ধকার। পরে জরুরি আলো। সবার মুখ লালচে। অন্ধকারে শব্দ গায়ে গায়ে ওঠে- জুতোর চাপ, কাশির দম, ব্যাগের চেন। রীতা হাতড়ে ডিভাইসটা কাছে আনল। একটা চিনচিনে ব্যথা হলো মেরুদণ্ডের গুড়ো-জায়গায়; কী যেন টান পড়ল। বয়সের আলগা সুতো। তবু সে মাইকের সামনে গলা নামিয়ে বলল, ‘আমরা আছি। আপনারা ভয় পাবেন না। আলোর ব্যবস্থা হচ্ছে।’

এই ‘আমরা’ শব্দটা রীতার এত প্রিয়। কাজের মানুষেরা- গার্ড, পোর্টার, ক্লিনার, টিকিটচেকার- সবাই মিলে একটা ‘আমরা’। শহরগুলোর নিচে যে টানেল, তার গায়ে একটা হাড়ের ছাঁচ আছে; ‘আমরা’ তাকে উষ্ণ রাখি। জরুরি আলোয় আলতাফ টর্চ নিয়ে ওঠানামা করছে, বাচ্চাদের মাথায় হাত রেখে হাসছে। উঁচু সিঁড়ির পাশের বিজ্ঞাপনে বিদেশি মডেলের হেসে থাকা মুখ। রীতা আবার বলল, ‘ট্রেন আসছে। একটু ধৈর্য। পানি চাইলে স্টলে বলুন।’

হঠাৎ পেছন থেকে এক আওয়াজ- খুব কাঁপা, নরম- ‘দিদি…’ রীতা ফিরল। দরজার পাশে সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে। ‘এখানে বসতে পারি?’ ‘এসো।’ রীতা চেয়ারটা টেনে দিল। মেয়েটা বসে পড়তে পড়তেই বলে, ‘আমি একটু… কোথাও যাইনি আগে। আজ গেলেই হয়তো যেতাম। কিন্তু… আপনার আওয়াজটা শুনে…’ থেমে যায়। ‘মনে হলো… কেউ আছে।’ কথাগুলো এত সোজা যে রীতার গলার কাছে একটা কাঁটা দাঁড়ায়। সে শুধু বলে, ‘এখানে আলো ফুরোয় না। এই টানেলে আলো বানানো শিখেছে। যা-ই হোক।’

মেয়েটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানায়- তাকে কাল বিয়ে দেবে বাড়ির লোক। পাত্রের সঙ্গে দেখা হয়নি। শহর ছেড়ে অন্য প্রান্তে। সে ভেবেছিল পালাবে, হয়তো অন্য কোথাও চাকরি করবে। টিউশনি করে রেখেছে কিছু টাকা। কিন্তু ভয় লাগছিল- রাস্তাঘাট, মানুষ, ব্যারিকেড। তখনই ট্রেনের আওয়াজে তার মনে হয়েছে- কেউ বলে দিক, ‘পিছিয়ে দাঁড়াও।’ সে পেছালও; তার পর এক লোক আত্মহত্যা করতে গেলে নিজেই হাত বাড়িয়ে দিল। ‘আমি কি খুব দোষ করেছি?’ সে জিজ্ঞেস করে।

রীতা মাথা নাড়ে। ‘না। তুমি আমাদের কাজটাই করলে। আগে বাঁচিয়ে দাও, তার পর নিজের ট্রেন ধরো। নিজের ট্রেন মিস হলে… অন্যটা ধরা যায়।’ মেয়েটা চুপচাপ। ‘তুমি কী করবে?’ ‘আমি ভাবছি… আরেকটু দাঁড়াই। এখনো তো রাত অনেক। বাড়িতে বলেছি লাইব্রেরিতে আছি।’

রীতার মনে পড়ল মিলন- যে বয়সে মেয়েটা, সে বয়সে মিলন ছিল ফেসবুকহীন, বন্ধুহীন, কতটা নরম। সে বলল, ‘‘তুমি চাইলে এই রেকর্ডারে কথা বলতে পার। শুনবে? নিজের গলায় ‘নিজেকে ঘোষণা’ দাও।” মেয়েটা মুচকি হাসে- ‘কী করে?’ রীতা ডিভাইসটা অন করিয়ে দেয়। ‘‘বল, ‘সাবধানে হাঁটো। তোমাকে লাগবে।” মেয়েটা বলে না; চোখ নামিয়ে হাসে। তার পর খুব ধীরে, খুব নিম্নস্বরে ফিসফিস, ‘আমি থাকব।’ শব্দটা এত ছোট, তবু ডিভাইসের মাইক্রোফোনে আটকে রইল।

সিগন্যাল সবুজ হলো। টানেলে ট্রেন নড়ল। হাওয়া উঠল। মানুষ গুছিয়ে দাঁড়াল। জরুরি আলো নিভে আসছে, মূল আলো ফিরে গেল। প্ল্যাটফর্মে একটা হামিং- মেঘের নিচে মধুমাছির ডানা। রীতা ঘোষণা দিল- ‘অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ ভিড়টা এবার গড়িয়ে পড়ল কামরার দিকে। মেয়েটা উঠে দাঁড়াল। তার হাতটা কাঁপছে কম; মুখে একটু রং ফিরেছে। ‘আমি গেলে… আপনাকে খবর দেব?’ এমন প্রশ্নে রীতা এক সেকেন্ড থেমে যায়। তার কাজ মানুষকে কোন কামরায় উঠতে বলার, পরের স্টেশনে নামতে বলার; সেই স্টেশনের পরেও কে কাকে ফোন করবে সে বলে না কখনো। তবু সে বলল, ‘দাও। যদি চাও। না দিলেও আমি শুনে ফেলব- যে ট্রেনে তুমি উঠবে, তার আওয়াজে।’

মেয়েটা চলে গেল। কম্পার্টমেন্টের জানলার বাঁশের ফাঁকে তার মুখ একবার দেখা গেল, তার পর অদৃশ্য। রীতা বোতাম ছেড়ে দিল। তার কাজ শেষ হতে আরও তিনঘণ্টা বাকি। সে ডিউটি রুমে ফিরে এসে টেবিলটা একটু গুছোয়। ক্যালেন্ডারে রিং করা ঘরটার দিকে তাকায়। বারোটা কি খুব ঠাণ্ডা? ঘড়ি বলে- না, বারোটা শুধু আরেকটা সময়- তুমি তাকে কী গলা দিচ্ছ তার ওপর নির্ভর। মিলনের ফোন আসে, ‘মা, আমি কাছেই। জিলিপি নিয়ে আসছি।’ ‘খুব গরম যেন না হয়, তোর জিভ পুড়ে যাবে।’

আলতাফ ফিরে এসে জানায়, ‘‘ডাউন লাইনে ট্রিপ কেমে গেছে, কিন্তু এখন সব ঠিক। তোমার ‘শেষ ঘোষণা’ কি ভাবলে?” রীতা জানালার কাচে নিজের মুখ দেখে। চোখদুটো ছোট, তবু ভিতরে আলো লেগে আছে। সে বলল, ‘ভাবছি। শেষ ঘোষণাও যেন শুরুর মতো শোনায়।’

রাত এগোয়। লোক কমে আসে। ভিজে প্ল্যাটফর্মে কটা কুকুর ঘুরে বেড়ায়; একজন রিকশাওয়ালা অকারণে এসে বসে, আবার চলে যায়। স্টলওয়ালা লোকটা স্টিলের ঢাকনা চাপিয়ে দেয় চায়ের ড্রামে। বাতাসে চা-জিলিপির হালকা মেশানো গন্ধ। রীতা ধীরে ধীরে ডিভাইসটা অন করল। ‘রেক’ লাইটটা লাল হয়ে উঠল। সে মাইকের সামনে একটু ঝুঁকে বলল- ‘দয়া করে সাবধান হোন। আপনার জীবনের ট্রেন কখনো একটাই নয়। একটাকে ছেড়ে দিলে অন্যটা আসে। তবু যে ট্রেনে আপনি উঠবেন, সেটি কোথাও যেন আপনার জন্য থেমে থাকে। আমরা আছি। আপনাদের পাশে।’

তার পর একটু থেমে খুব ক্ষীণ স্বরে যোগ করল- ‘এটা আমারও ঘোষণা।’

ডিভাইসটা অফ করে সে জানালার বাইরে তাকাল। তার মনে হলো- এই শহর বহুদিন তার গলা শুনেছে; আজ সে শহরের গলাটা শুনুক। স্টেশনের ওপরকার ব্রিজে বৃষ্টির জল জমে ছোট ঢেউ উঠছে, সাইরেন দূরে কেঁদে উঠল, আবার থেমে গেল। সিলিং ফ্যানের ক্যাঁচক্যাঁচ ধ্বনি। সব মিলিয়ে একটা ঘুমপাড়ানি ছন্দ। রীতা হাত দিয়ে নিজের গলার ওপর আলতো চাপ দিল- যেন পেটিকোটের দড়ি টাইট করছে, যাতে শাড়ি না খসে।

বারোটার পাঁচ মিনিট বাকি। মিলন দরজায় এসে দাঁড়াল- ভেজা টি-শার্ট, কাঁধে ব্যাগ, হাতে কাগজের ঠোঙা। ‘মা।’ সে নরম গলায়। রীতা তার দিকে ফিরে তাকাল। মিলনের মুখে আজ একধরনের নিশ্চিন্ত রং- বৃষ্টির পরে মাঠে যে কুয়াশা ওঠে তা নয়; বরং ঘরের ভেতর জ্বলতে থাকা নুনআলো। ‘এসো,’ রীতা বলল। ‘আজ তোমাকে একটা জিনিস দিই।’

সে ডিভাইসটা ছেলের হাতে দিল। ‘এখানে আমার ‘শেষ ঘোষণা’ আছে। সঙ্গে তোমারও। পরে বাড়ি গিয়ে শুনব।’ মিলন কৌতূহলে বাটন টিপে সামান্য শোনে, আবার রেখে দেয়। তার চোখে একটু জল- যেন গলা বেয়ে নেমে এসে কোনায় জমে গেছে। ‘মা, আজ থেকে তুমি একটু বেশি ঘুমোবে?’ ‘ঘুম?’ রীতা হাসে। ‘আমি তো এতদিন ধরে মাঝরাতে জেগে থেকেছি। ঘুম এলেই ভয় করত- যদি ঘোষণা মিস হয়। এখন থেকে ঘুমেরও ঘোষণা দেব।’
বারোটার ঘড়ি বাজল। সুপারিন্টেনডেন্ট এসে বলল, ‘শুভেচ্ছা, রীতা-দি। কাল থেকে তোমার নাম প্ল্যাকে যাবে। এত বছরের জন্য ধন্যবাদ।’ সে একটা চড়া সুগন্ধ লাগানো খাম দিল- নোটিস, ফুলের কার্ড, পেন। রীতা খামের গায়ে হাত বোলাল। ‘ধন্যবাদ তো শহরের।’

বাইরে আবার সূক্ষ্ম বৃষ্টি। শেষ ট্রেনটা ঢুকছে। রীতা একবার বোতাম টিপে বলল- ‘আজকের জন্য এটাই শেষ ট্রেন। সবাইকে শুভরাত্রি।’ তার গলায় একফোঁটা কাঁপুনি- কিন্তু প্রশিক্ষিত কণ্ঠ সেটাকে বুকে টেনে নিয়ে নরম করে দিল। ট্রেন বেরিয়ে গেল। প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা। আলো একটু নিস্তেজ। রীতা ডেস্কের ড্রয়ার খুলে নিজের ফুলস্ক্যাপ, পুরোনো রুট-চার্ট, একটা নীল পেনসিল তুলে ব্যাগে রাখল। ‘চলো।’ মিলন তার কাঁধে রেইনকোট চাপিয়ে দিল। ‘ভিজবে না, মা।’
বাইরে বেরোতে বেরোতে রীতা কাচের দরজায় একবার হাত রাখল। শীতল। তার ভেতরের শব্দগুলো কোথায় যাবে? বাড়ি। ঘরের সিলিং ফ্যানে। মিলনের কানে। সেই মেয়েটার অনিশ্চিত পথে। সেই লোকটার বেঁচে থাকা পকেটে। শহরের টানেলে।

বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি। রাস্তায় পানি হাঁটুর নিচে। ছাতা খুলতেই শব্দটা ছাদের ওপর পড়ে ‘টান-টান-টান’- সেই ছন্দে রীতা একবার বিনা মাইকে বলল, খুব নিচু স্বরে- ‘দয়া করে সাবধানে হাঁটুন। বাড়ি পৌঁছে যাবেন।’
মিলন শুনল; মৃদু হাসল। ‘মা, তোমার ঘোষণা ছাড়া তো ঘুমই আসে না।’

রীতা মাথা নাড়ল। ‘ঘুম- এখন থেকে তোমার। আমি শুধু শুনব।’

দুজন পাশাপাশি নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। স্টেশনের বাইরে ট্যাক্সি লাইন, ফাঁকা। বৃষ্টির মধ্যে শহরটা হাত নাড়ল- যেন কোনো দূরের গলা থেকে ঘোষণা শোনা যাচ্ছে- ‘পরের স্টেশন- বাড়ি।’

দিনাজপুরে কবি আযাদ কালাম রচিত ‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’ কবিতা গ্রন্থের পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১০:১০ পিএম
‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’ কবিতা গ্রন্থের পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত
ছবি: সংগৃহীত

উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের আয়োজনে এবং দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সহযোগিতায় কবি আযাদ কালামের কবিতাগ্রন্থ ‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’-এর পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

গত ২২ মে স্থানীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের সভাপতি কবি অধ্যাপক কামরুজ্জামান গোপন। প্রধান আলোচক ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক এমরান কবির।

অনুষ্ঠানের অন্যান্য আলোচক ছিলেন কবি অধ্যাপক মোজাম্মেল বিশ্বাস, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কবি ও প্রাবন্ধিক মাসুদ মুস্তাফিজ, কবি ও গবেষক চাষা হাবিব, কবি নিরঞ্জন হীরা এবং কবি কমল কুজুর। এছাড়া বক্তব্য রাখেন কবি অধ্যাপক জলিল আহমেদ, কবি ফরিদুল আজাদ মিলন, রেজাউর রহমান রেজু, গল্পকার মাহবুব আলী, কবি আজাহারুল আজাদ জুয়েল, প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বরূপ বক্সী বাচ্চু এবং উত্তরতরঙ্গের নির্বাহী সম্পাদক রাজ্জাক কাঞ্চন প্রমুখ।

কবি আযাদ কালামের কবিতা আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী মোকাররম হোসেন, মীর শিরিন, সুবর্ণা মুখার্জী এবং ছড়াকার বিধান দত্ত।

প্রধান আলোচক এমরান কবির বলেন, ‘সাম্প্রতিক কবিতার বড় একটি ব্যর্থতা হলো এর কেন্দ্রহীনতা, পারম্পর্যহীন শব্দসমাবেশ এবং পঙ্ক্তির বিধ্বস্ত বিন্যাস। বিমূর্তায়ন ও বিচ্ছুরণের দিকে ধাবিত হতে গিয়ে সাম্প্রতিক কবিতা প্রায়ই কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কবিতা পড়া যাচ্ছে না। শব্দ থেকে শব্দের যোগাযোগহীনতা, পঙ্ক্তি থেকে পঙ্ক্তির পারম্পর্যহীনতা পাঠককেও যোগাযোগহীন করে তুলছে। এই যোগাযোগহীনতা বা সংযোগ স্থাপনের ব্যর্থতার কারণে কবিতা এখন সবচেয়ে কম পঠিত সাহিত্যধারাগুলোর একটি। আযাদ কালামের কবিতা পাঠ করতে গিয়ে দেখা যায়, এসব নেতিবাচক উপাদানের উপস্থিতি নেই। ফলে তার কবিতাগুলো পাঠযোগ্য। আর যদি কোনো কবিতা পড়া যায়, তাহলে বলা যেতে পারে সেই কবিতায় ‘কিছু একটা’ আছে। এই ‘কিছু একটা’ হলো কবিতার অধরা আলোর কাছে পাঠকের প্রত্যাশা। আযাদ কালামের কবিতা সেই প্রত্যাশা পূরণ করে। কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে মফস্বলে অবস্থান করেও বৈশ্বিক কবিতার সমান্তরালে যে কবিতাচর্চা করা সম্ভব, আযাদ কালাম তা প্রমাণ করেছেন।’

কবি আযাদ কালাম তার কবিতাগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করার জন্য উপস্থিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি ও শিল্পী কমল কুজুর।

সমধারার স্রোতে সৃজনের উচ্ছ্বাস: কবিতা, চেতনা ও আনন্দের মিলনমেলা

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
আপডেট: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
সমধারার স্রোতে সৃজনের উচ্ছ্বাস: কবিতা, চেতনা ও আনন্দের মিলনমেলা
প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উৎসবে বক্তব্য রাখেন। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব যখন অমীমাংসিত যুদ্ধ, সংঘাত আর মানবিক বিপর্যয়ের ভারে ন্যুব্জ—
যখন বিশ্বমানবতা অশান্তি ও উদ্বেগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে—
ঠিক সেই সময়ই অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠাকে দূরে সরিয়ে দেশের এক কোণে, সীমিত পরিসরে, এক অপার আনন্দময় আবহে ধানমন্ডির ছায়ানটে অনুষ্ঠিত হলো সমধারার দ্বাদশ কবিতা উৎসব ২০২৬।

 ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আয়োজন কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; বরং এটি এক চলমান সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণস্পন্দন। “সমধারা”-নামটির মধ্যেই যেন প্রবাহমান সৃজনশীলতার ইঙ্গিত, আর সেই স্রোতধারায় যুক্ত হয়েছেন দেশের প্রথিতযশা ও নবীন কবি-সাহিত্যিকেরা। তাদের সম্মিলিত উপস্থিতিতে উৎসবটি হয়ে উঠেছিল এক অনন্য নান্দনিক মেলবন্ধন। সত্যিই, অনুভূতিটা ছিল অপার্থিব।

সমধারা এমন এক উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নবীন ও প্রবীণ-সব প্রজন্মের সাহিত্যসাধকরা মিলিত হন এক অভিন্ন সৃজনস্পন্দনে। উপস্থিত ছিলেন শিল্প সাহিত্যের দিকপাল বহুমাত্রিক লেখক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল, কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক হারুন হাবীব, কবি-প্রাবন্ধিক ফরিদ আহমেদ দুলাল, কবি মজিদ মাহমুদ এবং লেখক-গবেষক ড. এমদাদ হাসনাইনসহ আরও অনেক গুণীজন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার বক্তব্যে সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন-সাহিত্য কেবল আত্মপরিচয়ের বাহন নয়, এটি চর্চার মধ্য দিয়েই টিকে থাকে। অন্যদিকে, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামার মাঝেও কবিতা চর্চার এমন আয়োজনকে এক বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক মোস্তফা কামাল সাহিত্যচর্চাকে তুলনা করেন প্রার্থনার সঙ্গে—যেখানে প্রতিদিনের সাধনাই লেখককে পরিপূর্ণ করে।

অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকরাও তাদের বক্তব্যে সন্তুষ্টি ও প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করেন।

এ উৎসব যেন নববর্ষের রেশ বহন করছিল। পহেলা বৈশাখের আবহ তখনও বাতাসে ভাসমান-চারদিকে বৈশাখি মেলার আমেজ, প্রকৃতিতে মধুমাসের আগমনী বার্তা, গাছে গাছে ফলের সমারোহ। সেই আবহকে ধারণ করেই লাল রঙে সজ্জিত কবিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যেন উৎসবের রঙ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছিল।

ফরিদ আহমেদ দুলালের সভাপতিত্বে এবং কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক হারুন হাবীবের উদ্বোধনে, সালেক নাছির উদ্দিনের সুচারু সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সারা দেশ থেকে আগত কবিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ছায়ানটের প্রাঙ্গণ।

এবারের সমধারা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। শিশু সাহিত্যিক ড. ধনঞ্জয় সাহা এবং কবিতা সাহিত্যে আদ্যোনাথ ঘোষও সম্মানিত হয়েছেন। তাদের প্রতি রইল অকুণ্ঠ অভিনন্দন, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সমধারার কর্ণধার সালেক নাছির উদ্দিন তার অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এই সংগঠনকে সুসংগঠিত করেছেন। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি সমধারার যাত্রাকে অব্যাহত রাখার যে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

এবারের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল আরেকটি কারণে-অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উপস্থিতি। তিনি নিয়মিতভাবে সব অনুষ্ঠানে অংশ না নিলেও, সমধারায় এসে তিনি যেন লেখক-কবি সত্তাকে নতুন করে জাগ্রত করে তুললেন। তার উপস্থিতি সকলের মধ্যে দ্বিগুণ উৎসাহের সঞ্চার করেছে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মোস্তফা কামালের উপন্যাস “দেবো খোঁপায় তাড়ার ফুল” অবলম্বনে কাব্যগীতি নৃত্যনাট্য “প্রেমার্ঘ নৈবেদ্য”-যা ছিল এক অনবদ্য শিল্পসম্ভার।

সব মিলিয়ে, সমধারার দ্বাদশ কবিতা উৎসব ছিল এক সফল, অর্থবহ এবং শিক্ষণীয় আয়োজন। একটি অনুষ্ঠান শুধু উপভোগের বিষয় নয়-এর ভেতরে থাকে শেখার অসংখ্য উপাদান। গুণীজনদের কথা শোনা যেমন সৌভাগ্যের, তেমনি তাদের সান্নিধ্য পাওয়া এক বিরল প্রাপ্তি।

সৌভাগ্যক্রমে সেই প্রাপ্তির অংশীদার হতে পেরেছি-প্রিয় মানুষদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে, আশীর্বাদ চেয়েছি আগামী পথচলার জন্য।

পরিশেষে, এই আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ ধন্যবাদ সালেক নাছির উদ্দিনকে। সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে-সমধারার এই সৃজনযাত্রা আরও বহুদূর এগিয়ে যাক।

এসএন/

বইয়ের প্রচ্ছদই পাঠককে ডাকে: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
বইয়ের প্রচ্ছদই পাঠককে ডাকে: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন বই ‘প্রিয়জন আপনজন’-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে লেখকসহ অতিথিরা ছবি: খবরের কাগজ

একটি বইয়ের পরিচিতি ও পাঠককে আকর্ষণের ক্ষেত্রে প্রচ্ছদই প্রধান ভূমিকা রাখে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বলেছেন, প্রচ্ছদ ছাড়া বই হয় না। প্রচ্ছদ ডাক দেয়, প্রচ্ছদ চিনিয়ে দেয়। প্রচ্ছদ বলে এসো- তারপরে না বই।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন বই ‘প্রিয়জন আপনজন’-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিতব্য এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন বরেণ্য শিল্পী ও অভিনেতা আফজাল হোসেন।

বই প্রকাশের আগেই ঘটা করে প্রচ্ছদ উন্মোচনের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনকে লুইস ক্যারলের ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর রূপকের সঙ্গে তুলনা করেন অধ্যাপক সায়ীদ। রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘এ কেমন বই, যার বই নেই; কিন্তু প্রচ্ছদ আছে! এটি অনেকটা সেই অদৃশ্য বিড়ালের হাসির মতো।’ লেখক ফরিদুর রেজা সাগর সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কেউ লেখক হওয়ার পরে লেখে, আর কেউ লিখতে লিখতে লেখক হয়। সাগরের ভেতরে আগে থেকেই লেখার রসদ তৈরি ছিল, যা এখন বই হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।’

অনুষ্ঠানে লেখক ফরিদুর রেজা সাগর জানান, ‘প্রিয়জন আপনজন’ বইটিতে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের ১০০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রচ্ছদ নিয়ে লেখক বলেন, শিল্পী আফজাল হোসেন আমার প্রায় ৩০টি বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। তার একটি স্বভাব হলো কাজ দেরিতে করা। কিন্তু এবার তিনি বই লেখা শেষ হওয়ার আগেই একাধিক প্রচ্ছদ তৈরি করে ফেলেছেন। সেই আনন্দ থেকেই এই প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা।

আফজাল হোসেন বলেন, ‘বই প্রকাশের আগে প্রচ্ছদ উন্মোচন আমাদের দেশে নতুন ঘটনা। একটি সময়কে ধরে রাখার জন্য সাগর ভাই যেসব গুণী মানুষকে নিয়ে লিখেছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে।’

অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী, শাইখ সিরাজ, জিল্লুর রহমান, ছড়াকার আমীরুল ইসলাম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষার।

ফারজানা ব্রাউনিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট নজরুল সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা।

স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতা ও ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতা ও ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’

সম্প্রতি শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন সৃজনের মিরপুর কার্যালয়ে একক বক্তৃতা, একক কবিতাপাঠ এবং পাঠপর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কবি লুব্ধক মাহবুবের ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট গবেষক ও গল্পকার প্রফেসর ড. আনোয়ারুল হক, বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ।

আনোয়ারুল হক বলেন, কবি লুব্ধক মাহবুব প্রেমের কবি। প্রবাসী জীবনের টানাপোড়েন তার কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ। ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থে এই কবি পরিণত এবং শব্দ চয়নে দক্ষতা তার কবিতাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। তার কবিতার বিষয়ে গভীরভাবে দেশের প্রতি ভালোবাসা স্থান পেয়েছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রকৃতিও বিশেষভাবে তার কবিতায় উঠে এসেছে। এই কবি যে দেশে না থেকেও দেশের সঙ্গে তার কবিতার মাধ্যমে গভীর সংযোগ রেখেছেন– এই বই তার সাক্ষ্য বহন করে।

প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ বলেন, ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থের কবি লুব্ধক মাহবুব একজন জাত কবি। ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। আগের দুটি কাব্যগ্রন্থ থেকে এ গ্রন্থে তিনি অনেক বেশি পরিণত কবি। সুনির্বাচিত শব্দ চয়ন, অনুপ্রাসের কাব্যময় প্রয়োগ, বক্রোক্তি ও ব্যজস্তুতির বর্ণময় ব্যবহার, প্রাসঙ্গিক যথাযথ উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্প এবং গদ্য ছন্দের অনবদ্য ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে নিজের জন্য একটি নিজস্ব ভাষাশৈলী তৈরিতে দারুণভাবে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করি। আর বাংলায় লেখা এ গ্রন্থের ৮০টি কবিতায়ই বিষয় বৈচিত্র‍্যে বৈচিত্র্যময় ধারক হিসেবে কবিকে অনন্য বিশিষ্টতায় বিভূষিত করেছে। দীর্ঘ ৩৪ বছর বিদেশ বিভুঁইয়ে অবস্থান করেও নিজের মা-মাটি-মানুষকে তিনি যে ভুলে যাননি বরং গভীর ও প্রগাঢ় মমতায় তাদের বেঁধে রেখেছেন, এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা তার বড় প্রমাণ। বলা চলে স্রষ্টা প্রদত্ত কবি প্রতিভা আর গভীর অনুশীলন, অধ্যয়ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে নিজেকে তিনি একজন উত্তর আধুনিক কবি হিসেবে এ কাব্যগ্রন্থে যেভাবে শিল্পশ্রীমণ্ডিতভাবে মেলে ধরেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

অনুষ্ঠানের ‘স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতার গতি-প্রকৃতি’ বিষয়ের মূল বক্তব্যে লেখক ও গবেষক ড. কুদরত-ই-হুদা বলেন, সাতচল্লিশে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা যখন তৈরি হয় তখন পূর্ববাংলার মুসলমান কমিউনিটি সাগ্রহে তাতে শামিল হয়েছে। এর কারণ যতটা বা ধর্ম তারচেয়ে বেশি অর্থনীতিকেন্দ্রিক। তিনি বলেন, চল্লিশের দশকে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রচুর কবিতা লেখা হয়েছে। ষাটের দশকে গিয়ে কবিদের এ বিষয়ে মোহভঙ্গ ঘটে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আরিফ মঈনুদ্দীনের একক কবিতা পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা করেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার, কবি ও কথাসাহিত্যিক নুসরাত সুলতানা এবং কবি ওয়াহিদ জামান। আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে নুসরাত সুলতানা বলেন, কবিতা ব্যাখ্যার অতীত এক শিল্পকর্ম। শিশুর প্রথম কান্না যখন মা শুনতে পান সেই আনন্দ যেমন ব্যাখ্যা করা যায় না তেমনি কবিতাও ব্যাখ্যা করা যায় না। কেবল উপলব্ধি করা যায়। কবি আরিফ মঈনুদ্দীন কাব্যজগতে বহু পথ পেরিয়ে এসেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ১৮টি কাব্যগ্রন্থ। এই কবির কবিতার শব্দ চয়ন যেমন নান্দনিকতার দাবি রাখে তেমনি তার গভীর উপলব্ধি ও পাঠকের মননকে নাড়া দেয়। কবির কবিতায় দর্শন ভাবনা, মনস্তত্ত্ব এবং জীবনের ভাঁজকে পরতে পরতে খুলে দেখার আকাঙ্ক্ষা আছে।

আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার বলেন, এ গ্রন্থের কবিতাগুলোতে মিস্টিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। কবিতাগুলো হৃদয় নয় বরং মেধাশাসিত।

আলোচক কবি ওয়াহিদ জামান বলেন, আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সহজ-সরল, কিন্তু গভীর। জীবনের প্রতিটি অনুভবকে ধারণ করার প্রতিশ্রুতি আছে তার কবিতায়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- কবি লুব্ধক মাহবুব, কবি আরিফ মঈনুদ্দীন, কবি রমজান সরকার, কবি সাদমান সজীব, কবি শামস আরেফিন, কবি ও কথাসাহিত্যিক আকেল হায়দার, অনুবাদক মেজবাহ উদ্দিন, কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আহমেদ বাসার, কবি জুননু রাইন, পরিবেশবিদ কবি শেখ আহমেদ ফরহাদ, কবি ও প্রবন্ধকার প্রফেসর ড. রকিবুল হাসান, প্রফেসর ড. ডি. এম, ফিরোজ শাহ, নাট্য নির্মাতা মিতুল খান, গবেষক হোসাইন মোহাম্মদ জাকি, কবি আহমেদ বাবু, কবি হাসিবুর রহমান জয়, মো. আরিফুল ইসলাম, কবি মুনযির সাদ, কবি ও ছড়াকার হুসাইন আলমগীর, কবি অঞ্জলী রাণী পূজা, কবি ও সাংবাদিক মাসুদ হাসান, কবি ও সম্পাদক বহ্নি কুসুম, কবি ও কথাসাহিত্যিক সাহিনা মিতা, কথাসাহিত্যিক ফরিদুল ইসলাম নির্জন, ড. সর্দার এ হায়দার, কবি রহিজ আলী সরদার, কবি বোরহান মাসুদ, কবি তৌহিদ আহাম্মেদ লিখন, কবি আহমেদ বাবুল, কবি ফরহাদুর রহমান, সোহাগ হাওলাদার, রাসেল প্রমুখ...।

একজন নাবিকের চোখ, কিছু প্রশ্ন এবং ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৯ এএম
একজন নাবিকের চোখ, কিছু প্রশ্ন এবং ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’

সময়ের প্রবাহে মানুষ যত বেশি তথ্যের কাছে পৌঁছেছে, ততই যেন হারিয়ে ফেলেছে ভাবনার গভীরতা। জানা আর বোঝার ভিড়ে প্রশ্ন করার অভ্যাসটি ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এক ভিন্নধর্মী চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে বাজারে এসেছে নতুন বই ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’। যেখানে উত্তর নয়, বরং প্রশ্নই হয়ে উঠেছে মূল আলোচ্য।

বইটি ছাপিয়েছে পরিবার পাবলিকেশনস আর প্রচ্ছদ করেছেন মৌমিতা রহমান। এবারের অমর একুশে বইমেলায় বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বর্তমানে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে এই গ্রন্থ।

বইটির লেখক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন একজন অভিজ্ঞ নৌ কর্মকর্তা, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। সমুদ্রপথে দীর্ঘ যাত্রা, প্রকৃতির বিশালতা ও মহাবিশ্বের নীরব বিস্ময় তাকে বারবার দাঁড় করিয়েছে কিছু মৌলিক প্রশ্নের সামনে। সেই অভিজ্ঞতা, সেই উপলব্ধি এবং সেই প্রশ্নগুলোকেই তিনি শব্দে রূপ দিয়েছেন এই গ্রন্থে।

লেখকের ভাষায়, এই বই কোনো তর্ক জেতার জন্য নয়, কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্যও নয় বরং এটি এক ধরনের মানসিক যাত্রা। যেখানে পাঠককে আহ্বান জানানো হয় ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং চারপাশের দৃশ্যমান জগতের আড়ালে থাকা অদৃশ্য রহস্যগুলোকে অনুভব করতে।

বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এখানে সহজভাবে এমন কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা মানুষের ভাবনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কেন প্রকৃতির নিয়ম আছে? কেন মহাবিশ্ব এত শৃঙ্খলাবদ্ধ? সবকিছু কি কেবলই ঘটে গেছে, নাকি কোনো এক অদৃশ্য প্রজ্ঞা তা ঘটিয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর বইটি দেয় না। বরং লেখক সচেতনভাবেই উত্তরহীনতার জায়গাটিকে উন্মুক্ত রাখেন। কারণ তার বিশ্বাস, প্রশ্নই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়, প্রশ্নই মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের জীবনের অভিজ্ঞতাও কম বিস্ময়কর নয়। ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জন্ম নেয়া এই নৌ কর্মকর্তা ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মিসাইল ফ্রিগেট বানৌজা ওসমানসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজের অধিনায়ক হিসেবে তার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুদান ও লেবাননে দায়িত্ব পালন তাকে দিয়েছে বৈশ্বিক বাস্তবতার কাছাকাছি থাকার সুযোগ।

একজন নাবিক হিসেবে তিনি যেমন বিশাল সমুদ্র দেখেছেন, তেমনি একজন গবেষক হিসেবে খুঁজেছেন তার অন্তর্নিহিত অর্থ। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে এমবিএ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে এমফিল ও পিএইচডি অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি জ্ঞানচর্চার পথেও নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা ও প্রকল্প পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’ তাই শুধু একটি বই নয়, এটি এক ধরনের চিন্তার অনুশীলন। এটি পাঠককে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয় না, বরং তাকে এমন এক মানসিক অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি নিয়ম, প্রতিটি ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন জাগায়।

এই বই যেন এক নীরব দরজা- যা খুললে হয়তো সব উত্তর মিলবে না, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বদলে যাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। আর সেই পরিবর্তিত দৃষ্টিই হয়তো আমাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই হারিয়ে যাওয়া অভ্যাসে, ভাবনায়, প্রশ্নে কিংবা বিস্ময়ে।