সাতটার মাইকে আজও তার গলা উঠলেই প্ল্যাটফর্ম জেগে ওঠে। ‘দয়া করে দূরে দাঁড়ান, ট্রেন ঢুকছে।’ রীতা ঘোষ চেনা স্বরে বলে, তার পর সামান্য বিরতি রেখে ইংরেজিটা। কলসিটা থেকে এক চুমুক জল খেয়ে গলা পরিষ্কার করে আবার বোতাম টিপে দেয়। বোতামের চারপাশে হলুদ টেপ, তাতে পুরোনো আঠার গন্ধ। ডেস্কে এলোমেলো রুট চার্ট, স্যানিটাইজারের কৌটো, ক্যালেন্ডারে ‘সোম’ ঘরে রিং- আজ রাতেই বারোটা বাজলেই তার চাকরি ফুরোবে। কাল থেকে ‘অবসরপ্রাপ্ত’। শব্দটার ভেতর কেমন যেন ধুলো বসে আছে; চোখের কোনে খচখচ করে ওঠে।
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছেলে ফোন করে- ‘মা, ডেলিভারি ছিল, দেরি হবে।’ মিলন এখন অনলাইন খাবার পৌঁছে দেয়। কখনো লেট, কখনো ক্যানসেল; তবু মোটামুটি চলে যায় মা-ছেলের সংসার। বাপটা ছিল বাস কন্ডাক্টর, করোনা-লকডাউনে অন্য শহরে আটকে পড়ে, পরে আর খোঁজ পাওয়া গেল না। রীতা কারও কাছে কাঁদেনি; শুধু অফিসের মাইকটা চালু থাকলে মনে হতো, কাকে যেন সে পৌঁছে দিচ্ছে বাড়ি পর্যন্ত- অন্তত শব্দে।
আজ সারা দিন শহর থম মেরে আছে। আকাশ ফ্যাকাসে, রোদ নেই, শিরা-ধমনিতে শুধু গুমোট। প্ল্যাটফর্ম ২-এ রেলিংয়ের গায়ে তাকিয়ে আছে এক তরুণী- কপালে ঘাম, হাতে সাদা ব্যাগ। চোখে পলক কম। রীতা দেখে বুঝল, কোনো অপেক্ষা নয়, দ্বিধা। এমন চোখ বহুবার দেখেছে- একটা সিদ্ধান্তের ধারে দাঁড়ানো চোখ। মাথা সামান্য কাত করে সে বুঝে নিতে চায়: লোকাল ট্রেনের আনচান এ মেয়েটার ভেতরের আনচানকে জোর দিচ্ছে, না কমাচ্ছে?
চাইলে বাইরে ডিউটি অফিসারকে ডাকতে পারে। চাইলে মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোককে সরে দাঁড়াতে বলবে। কিন্তু সে প্রথমে এক কাজ করে- মাইকে ফাঁকা অডিও লাইনে মুখ কাছাকাছি এনে একবার নিঃশ্বাস নেয়। স্পিকারের ভেতর দিয়ে নিজের নিঃশ্বাসের পাতলা শোঁ শোঁ শব্দ প্ল্যাটফর্মে ভেসে ওঠে। তরুণী চমকে তাকায় এই দিকে। রীতা মাথা ঝুঁকিয়ে হাসে- খুব সামান্য, কাচের ওপার থেকে।
‘দয়া করে হলুদ লাইনের পেছনে দাঁড়ান।’ স্বরটায় মা-মা একটা অনুনয়। মেয়েটা এক পা পিছু যায়। রীতা স্বস্তির একটা রেখা টেনে নেয় কপালে। সবকিছুর আগেই মানুষকে একটু পেছোতে শেখানো দরকার- গুলতানি শব্দে, ভালোবাসার চাপে। তার পর সে স্ট্যাটাস বোর্ডে চোখ বুলিয়ে নেয়- দমদম লোকাল পাঁচ মিনিট দেরি। মাইকে সেটা বলে। শব্দ চলে যায় টানেলে, স্টিলের গায়ে লেগে ফিরে আসে। এই প্রতিধ্বনিটাই তার দিনের চুড়ি।
ডিউটি রুমের প্লাস্টিক চেয়ারটা একটু ফেটে গেছে; সেখানে টেপ লাগিয়েছিল আগের মাসে মিলন। ছেলেটার হাত বাবার মতো নয়, কিন্তু বেশ কাজের। তবু মিলনের একধরনের চুপচাপ ভাব রীতাকে কষ্ট দেয়। ছোটবেলায় যুক্তাক্ষর পড়তে পড়তেই মাথাব্যথা, পরে বোঝা গেল অতিসংবেদনশীল; হঠাৎ শব্দে আঁতকে ওঠে। রীতা তখন অফিসের রেকর্ডিং রুমে ছেলেকে নিয়ে ঘুম পাড়াত- স্পিকারে কম ভলিউমে রাতের ঘোষণা চালিয়ে। ‘অ্যাটেনশন প্লিজ…’- শব্দে শব্দে তার বুকে ওঠানামা করত ছেলের ঘুম। সে ভাবত, শব্দও কি একটা শাড়ি? নরম করে জড়ানো যায় কারও কাঁধে?
আজ দুপুরবেলা সুপারিন্টেনডেন্ট ডেকে বলেছিল, ‘মা, কাল থেকে আর তোমার শিফট লাগবে না। আজ শেষের দিন, ইচ্ছে হলে একটু আগে উঠে যেও।’ রীতা মাথা নাড়ে। ‘শেষের দিনেও ঘোষণা পুরো করা চাই। লোকজন অভ্যস্ত হয়েছে এই গলা শুনতে।’ কথাটা বলার সময় নিজের গলার ওপর একবুক গর্ব সে শুঁকে নিয়েছিল, যেমন ঝাড়বাতিতে ধুলো মুছলে নরম আলো বেরোয়- তেমন। সুপারিন্টেনডেন্ট হাসল, ‘একদম ক্লাসিক, রীতা দি। তুমিই তো আমাদের স্ট্যান্ডার্ড।’ ‘ক্লাসিক’ শব্দটা তার সারা দিনের সঙ্গী- কত বছর ধরে একই ঠিক উচ্চারণ, না কিছু কম, না বেশি। কেউ বলে রোবটিক; সে জানে, এই মাপজোখে তার নাড়ি বসে আছে।
তিনটের দিকে ঝাপসা বৃষ্টি পড়ল। প্ল্যাটফর্ম ভিজে চকচক, আলোতে একরকম আঁচড় পড়ে। মেয়েটা এখনো রেলিংয়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। এবার ওর ফোনটা বাজল, সে ধরল না। চোখ নামিয়ে রাখল থুতনির নিচে। একটি বাচ্চা ছেলে পায়ের কাছে কৌতূহলে লাফালাফি- মাকে টানছে, ‘ট্রেন আসবে?’ মা বলছে, ‘আরেকটু পর।’ রীতার বুকের ভেতর কোথায় যেন টান খেলে গেল: ‘আরেকটু পর’- এই কথাটা বাতাসে থাকলে মানুষ নিজেকে সামলে রাখে। কথা যেমন ব্যান্ডেজ- রক্ত থামায় না, কিন্তু ভিজে বয়ে পড়া ঠেকায়।
চারটে বাজে মিলনের ফোন আসে- ‘মা, তোমার রিংটা দেখলাম ক্যালেন্ডারে… আজ কি শেষ?’ রীতা চুপ করে। ‘হ্যাঁ।’ ‘তা হলে রাতে ফিরব তাড়াতাড়ি। তোমার প্রিয় জিলিপি আনব।’ ‘শুধু জিলিপি নয়, আজ মাইকটা একটু নিয়ে ঘরে বসে শুনতে চাই।’ ‘কী?’ ‘তোর বাবার কণ্ঠস্বর যে রাস্তায় মিলিয়ে গেল-সেই থেকে আমার গলাটা তোদের বাড়ি।’
ফোন নামিয়ে রাখতেই টানেলের ভেতর থেকে ট্রেনের হেডলাইট দেখা গেল। রীতা অটো-রুটিনে ঘোষণা দিল; তবু আজ এই বলার ভেতরে কেমন অস্ফুট কাঁপন। ট্রেন ঢুকল। বাতাসে উড়ে গেল রেলিংয়ে জমে থাকা জলফোঁটা। মানুষ উঠে পড়ছে, নামছে। ধাক্কাধাক্কির মধ্যে সেই মেয়েটা হঠাৎ এগিয়ে একধাপ। রীতা টের পেল- বুঝি সেও ট্রেনে উঠবে; কিন্তু ঠিক শেষ মুহূর্তে মেয়েটা দাঁড়িয়ে পড়ল। ওঠেনি। রীতা নিঃশ্বাস ছাড়ল। সব ট্রেনেই উঠতে নেই; কিছু ট্রেন ছেড়ে দিতে হয়, তবেই পরের ট্রেনটা নিজের মতো আসে।
ক্রমে সন্ধ্যে নামল। বৃষ্টির ধার কমে গিয়ে টুপটাপ। ভেজা লাইনের গায়ে থুতনির মতো কিছুটা কুয়াশা। ট্র্যাফিক কন্ট্রোল থেকে খবর- একটা সিগন্যাল ডাউন, পাঁচ নম্বর গাড়ি আটকে আছে টানেলে। ‘অ্যানাউন্স করো,’ ওদিক থেকে কড়া গলা। রীতা ঘোষণা দিল। প্ল্যাটফর্মে একটা অস্থিরতা ছড়াল। কিশোররা হাসছে, বুড়োরা ক্ষেপছে, বউরা ফোনে বাড়ির খবর দিচ্ছে, বাচ্চারা ‘চায়না বেল্ট’ ফড়ফড় করাচ্ছে। রীতা দেখল- রেলিংয়ের মেয়েটা কেমন ফ্যাকাসে। তার কাছে কি ফিরতে হবে কোথাও? নাকি কোথাও না-ফিরতে চায় বলে এমন দাঁড়িয়ে আছে?
ডিউটি রুমে ঢুকল আলতাফ- পুরোনো গার্ড। ‘রীতা দি, আজ তোমার ফাইনাল, তাই না? এই নাও, একটা রেকর্ডার। কাল খালি আওয়াজটা থাকবে।’ ছোট্ট ডিজিটাল ডিভাইস। ‘ইচ্ছে হলে তোমার নিজের গলায় ‘শেষ ঘোষণা’ রেখে দিও।’ বলে হেসে চলে গেল। রীতা ডিভাইসটা হাতে নিয়ে ভাবল- শেষ ঘোষণা কেমন হতে পারে? শুধু এইটা: ‘সব যাত্রীকে ধন্যবাদ’- না কি একটু নিজস্ব? উনি কখনো নিজের কথা বলেনি মাইকে। কেবল শহরের।
ঠিক সেই সময় বাইরে একটু গোলমাল। প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে কেউ চিৎকার করল, ‘ওই, ধরো ধরো!’ একটা ছায়া হোঁচট খেয়ে পড়ল লাইনের দিকে। মুহূর্ত। মানুষ দৌড়চ্ছে। রীতার চোখ আর মাইকের বোতামের মাঝখানে এক ধাক্কা- আঙুল থতমত। সে দেখল- কেউ পড়েনি; সাদা ব্যাগওয়ালা সেই মেয়েটাই ছায়াটাকে টেনে রেলিংয়ের এদিকে ফেলেছে। লোকজন উঠে দাঁড়িয়ে ভোল পাল্টে গালাগাল, ‘পাগল- পাগল!’ কেউ জল দিল। মেয়েটা দুহাত কাঁপিয়ে একবার চোখ তুলে রীতার দিকে তাকাল। এক পলক। তার পর মাথা নিচু করে পিছিয়ে গেল, যেন নিজের জেদ থেকে একটু নেমে এল। রীতার বুকের ভেতর হালকা ঝুম শব্দ- যেন ট্রেনের ভেতরের রেলিংয়েও কেউ হাত রাখল।
পাঁচ নম্বর ট্রেনের সিগন্যাল ছাড়ল না; টানেলে বসে আছে। কন্ট্রোল আবার বলল, ‘আরও ঘোষণা দাও। যাত্রীদের শান্ত করো।’ রীতা বলল। শব্দ ঝুলে রইল সিলিং ফ্যানের নিচে। হঠাৎ বিদ্যুৎ দপ করে চলে গেল। অন্ধকার। পরে জরুরি আলো। সবার মুখ লালচে। অন্ধকারে শব্দ গায়ে গায়ে ওঠে- জুতোর চাপ, কাশির দম, ব্যাগের চেন। রীতা হাতড়ে ডিভাইসটা কাছে আনল। একটা চিনচিনে ব্যথা হলো মেরুদণ্ডের গুড়ো-জায়গায়; কী যেন টান পড়ল। বয়সের আলগা সুতো। তবু সে মাইকের সামনে গলা নামিয়ে বলল, ‘আমরা আছি। আপনারা ভয় পাবেন না। আলোর ব্যবস্থা হচ্ছে।’
এই ‘আমরা’ শব্দটা রীতার এত প্রিয়। কাজের মানুষেরা- গার্ড, পোর্টার, ক্লিনার, টিকিটচেকার- সবাই মিলে একটা ‘আমরা’। শহরগুলোর নিচে যে টানেল, তার গায়ে একটা হাড়ের ছাঁচ আছে; ‘আমরা’ তাকে উষ্ণ রাখি। জরুরি আলোয় আলতাফ টর্চ নিয়ে ওঠানামা করছে, বাচ্চাদের মাথায় হাত রেখে হাসছে। উঁচু সিঁড়ির পাশের বিজ্ঞাপনে বিদেশি মডেলের হেসে থাকা মুখ। রীতা আবার বলল, ‘ট্রেন আসছে। একটু ধৈর্য। পানি চাইলে স্টলে বলুন।’
হঠাৎ পেছন থেকে এক আওয়াজ- খুব কাঁপা, নরম- ‘দিদি…’ রীতা ফিরল। দরজার পাশে সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে। ‘এখানে বসতে পারি?’ ‘এসো।’ রীতা চেয়ারটা টেনে দিল। মেয়েটা বসে পড়তে পড়তেই বলে, ‘আমি একটু… কোথাও যাইনি আগে। আজ গেলেই হয়তো যেতাম। কিন্তু… আপনার আওয়াজটা শুনে…’ থেমে যায়। ‘মনে হলো… কেউ আছে।’ কথাগুলো এত সোজা যে রীতার গলার কাছে একটা কাঁটা দাঁড়ায়। সে শুধু বলে, ‘এখানে আলো ফুরোয় না। এই টানেলে আলো বানানো শিখেছে। যা-ই হোক।’
মেয়েটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানায়- তাকে কাল বিয়ে দেবে বাড়ির লোক। পাত্রের সঙ্গে দেখা হয়নি। শহর ছেড়ে অন্য প্রান্তে। সে ভেবেছিল পালাবে, হয়তো অন্য কোথাও চাকরি করবে। টিউশনি করে রেখেছে কিছু টাকা। কিন্তু ভয় লাগছিল- রাস্তাঘাট, মানুষ, ব্যারিকেড। তখনই ট্রেনের আওয়াজে তার মনে হয়েছে- কেউ বলে দিক, ‘পিছিয়ে দাঁড়াও।’ সে পেছালও; তার পর এক লোক আত্মহত্যা করতে গেলে নিজেই হাত বাড়িয়ে দিল। ‘আমি কি খুব দোষ করেছি?’ সে জিজ্ঞেস করে।
রীতা মাথা নাড়ে। ‘না। তুমি আমাদের কাজটাই করলে। আগে বাঁচিয়ে দাও, তার পর নিজের ট্রেন ধরো। নিজের ট্রেন মিস হলে… অন্যটা ধরা যায়।’ মেয়েটা চুপচাপ। ‘তুমি কী করবে?’ ‘আমি ভাবছি… আরেকটু দাঁড়াই। এখনো তো রাত অনেক। বাড়িতে বলেছি লাইব্রেরিতে আছি।’
রীতার মনে পড়ল মিলন- যে বয়সে মেয়েটা, সে বয়সে মিলন ছিল ফেসবুকহীন, বন্ধুহীন, কতটা নরম। সে বলল, ‘‘তুমি চাইলে এই রেকর্ডারে কথা বলতে পার। শুনবে? নিজের গলায় ‘নিজেকে ঘোষণা’ দাও।” মেয়েটা মুচকি হাসে- ‘কী করে?’ রীতা ডিভাইসটা অন করিয়ে দেয়। ‘‘বল, ‘সাবধানে হাঁটো। তোমাকে লাগবে।” মেয়েটা বলে না; চোখ নামিয়ে হাসে। তার পর খুব ধীরে, খুব নিম্নস্বরে ফিসফিস, ‘আমি থাকব।’ শব্দটা এত ছোট, তবু ডিভাইসের মাইক্রোফোনে আটকে রইল।
সিগন্যাল সবুজ হলো। টানেলে ট্রেন নড়ল। হাওয়া উঠল। মানুষ গুছিয়ে দাঁড়াল। জরুরি আলো নিভে আসছে, মূল আলো ফিরে গেল। প্ল্যাটফর্মে একটা হামিং- মেঘের নিচে মধুমাছির ডানা। রীতা ঘোষণা দিল- ‘অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ ভিড়টা এবার গড়িয়ে পড়ল কামরার দিকে। মেয়েটা উঠে দাঁড়াল। তার হাতটা কাঁপছে কম; মুখে একটু রং ফিরেছে। ‘আমি গেলে… আপনাকে খবর দেব?’ এমন প্রশ্নে রীতা এক সেকেন্ড থেমে যায়। তার কাজ মানুষকে কোন কামরায় উঠতে বলার, পরের স্টেশনে নামতে বলার; সেই স্টেশনের পরেও কে কাকে ফোন করবে সে বলে না কখনো। তবু সে বলল, ‘দাও। যদি চাও। না দিলেও আমি শুনে ফেলব- যে ট্রেনে তুমি উঠবে, তার আওয়াজে।’
মেয়েটা চলে গেল। কম্পার্টমেন্টের জানলার বাঁশের ফাঁকে তার মুখ একবার দেখা গেল, তার পর অদৃশ্য। রীতা বোতাম ছেড়ে দিল। তার কাজ শেষ হতে আরও তিনঘণ্টা বাকি। সে ডিউটি রুমে ফিরে এসে টেবিলটা একটু গুছোয়। ক্যালেন্ডারে রিং করা ঘরটার দিকে তাকায়। বারোটা কি খুব ঠাণ্ডা? ঘড়ি বলে- না, বারোটা শুধু আরেকটা সময়- তুমি তাকে কী গলা দিচ্ছ তার ওপর নির্ভর। মিলনের ফোন আসে, ‘মা, আমি কাছেই। জিলিপি নিয়ে আসছি।’ ‘খুব গরম যেন না হয়, তোর জিভ পুড়ে যাবে।’
আলতাফ ফিরে এসে জানায়, ‘‘ডাউন লাইনে ট্রিপ কেমে গেছে, কিন্তু এখন সব ঠিক। তোমার ‘শেষ ঘোষণা’ কি ভাবলে?” রীতা জানালার কাচে নিজের মুখ দেখে। চোখদুটো ছোট, তবু ভিতরে আলো লেগে আছে। সে বলল, ‘ভাবছি। শেষ ঘোষণাও যেন শুরুর মতো শোনায়।’
রাত এগোয়। লোক কমে আসে। ভিজে প্ল্যাটফর্মে কটা কুকুর ঘুরে বেড়ায়; একজন রিকশাওয়ালা অকারণে এসে বসে, আবার চলে যায়। স্টলওয়ালা লোকটা স্টিলের ঢাকনা চাপিয়ে দেয় চায়ের ড্রামে। বাতাসে চা-জিলিপির হালকা মেশানো গন্ধ। রীতা ধীরে ধীরে ডিভাইসটা অন করল। ‘রেক’ লাইটটা লাল হয়ে উঠল। সে মাইকের সামনে একটু ঝুঁকে বলল- ‘দয়া করে সাবধান হোন। আপনার জীবনের ট্রেন কখনো একটাই নয়। একটাকে ছেড়ে দিলে অন্যটা আসে। তবু যে ট্রেনে আপনি উঠবেন, সেটি কোথাও যেন আপনার জন্য থেমে থাকে। আমরা আছি। আপনাদের পাশে।’
তার পর একটু থেমে খুব ক্ষীণ স্বরে যোগ করল- ‘এটা আমারও ঘোষণা।’
ডিভাইসটা অফ করে সে জানালার বাইরে তাকাল। তার মনে হলো- এই শহর বহুদিন তার গলা শুনেছে; আজ সে শহরের গলাটা শুনুক। স্টেশনের ওপরকার ব্রিজে বৃষ্টির জল জমে ছোট ঢেউ উঠছে, সাইরেন দূরে কেঁদে উঠল, আবার থেমে গেল। সিলিং ফ্যানের ক্যাঁচক্যাঁচ ধ্বনি। সব মিলিয়ে একটা ঘুমপাড়ানি ছন্দ। রীতা হাত দিয়ে নিজের গলার ওপর আলতো চাপ দিল- যেন পেটিকোটের দড়ি টাইট করছে, যাতে শাড়ি না খসে।
বারোটার পাঁচ মিনিট বাকি। মিলন দরজায় এসে দাঁড়াল- ভেজা টি-শার্ট, কাঁধে ব্যাগ, হাতে কাগজের ঠোঙা। ‘মা।’ সে নরম গলায়। রীতা তার দিকে ফিরে তাকাল। মিলনের মুখে আজ একধরনের নিশ্চিন্ত রং- বৃষ্টির পরে মাঠে যে কুয়াশা ওঠে তা নয়; বরং ঘরের ভেতর জ্বলতে থাকা নুনআলো। ‘এসো,’ রীতা বলল। ‘আজ তোমাকে একটা জিনিস দিই।’
সে ডিভাইসটা ছেলের হাতে দিল। ‘এখানে আমার ‘শেষ ঘোষণা’ আছে। সঙ্গে তোমারও। পরে বাড়ি গিয়ে শুনব।’ মিলন কৌতূহলে বাটন টিপে সামান্য শোনে, আবার রেখে দেয়। তার চোখে একটু জল- যেন গলা বেয়ে নেমে এসে কোনায় জমে গেছে। ‘মা, আজ থেকে তুমি একটু বেশি ঘুমোবে?’ ‘ঘুম?’ রীতা হাসে। ‘আমি তো এতদিন ধরে মাঝরাতে জেগে থেকেছি। ঘুম এলেই ভয় করত- যদি ঘোষণা মিস হয়। এখন থেকে ঘুমেরও ঘোষণা দেব।’
বারোটার ঘড়ি বাজল। সুপারিন্টেনডেন্ট এসে বলল, ‘শুভেচ্ছা, রীতা-দি। কাল থেকে তোমার নাম প্ল্যাকে যাবে। এত বছরের জন্য ধন্যবাদ।’ সে একটা চড়া সুগন্ধ লাগানো খাম দিল- নোটিস, ফুলের কার্ড, পেন। রীতা খামের গায়ে হাত বোলাল। ‘ধন্যবাদ তো শহরের।’
বাইরে আবার সূক্ষ্ম বৃষ্টি। শেষ ট্রেনটা ঢুকছে। রীতা একবার বোতাম টিপে বলল- ‘আজকের জন্য এটাই শেষ ট্রেন। সবাইকে শুভরাত্রি।’ তার গলায় একফোঁটা কাঁপুনি- কিন্তু প্রশিক্ষিত কণ্ঠ সেটাকে বুকে টেনে নিয়ে নরম করে দিল। ট্রেন বেরিয়ে গেল। প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা। আলো একটু নিস্তেজ। রীতা ডেস্কের ড্রয়ার খুলে নিজের ফুলস্ক্যাপ, পুরোনো রুট-চার্ট, একটা নীল পেনসিল তুলে ব্যাগে রাখল। ‘চলো।’ মিলন তার কাঁধে রেইনকোট চাপিয়ে দিল। ‘ভিজবে না, মা।’
বাইরে বেরোতে বেরোতে রীতা কাচের দরজায় একবার হাত রাখল। শীতল। তার ভেতরের শব্দগুলো কোথায় যাবে? বাড়ি। ঘরের সিলিং ফ্যানে। মিলনের কানে। সেই মেয়েটার অনিশ্চিত পথে। সেই লোকটার বেঁচে থাকা পকেটে। শহরের টানেলে।
বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি। রাস্তায় পানি হাঁটুর নিচে। ছাতা খুলতেই শব্দটা ছাদের ওপর পড়ে ‘টান-টান-টান’- সেই ছন্দে রীতা একবার বিনা মাইকে বলল, খুব নিচু স্বরে- ‘দয়া করে সাবধানে হাঁটুন। বাড়ি পৌঁছে যাবেন।’
মিলন শুনল; মৃদু হাসল। ‘মা, তোমার ঘোষণা ছাড়া তো ঘুমই আসে না।’
রীতা মাথা নাড়ল। ‘ঘুম- এখন থেকে তোমার। আমি শুধু শুনব।’
দুজন পাশাপাশি নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। স্টেশনের বাইরে ট্যাক্সি লাইন, ফাঁকা। বৃষ্টির মধ্যে শহরটা হাত নাড়ল- যেন কোনো দূরের গলা থেকে ঘোষণা শোনা যাচ্ছে- ‘পরের স্টেশন- বাড়ি।’