প্রায় ১০ বছর আগে শীতের সকালের মিষ্টি রোদে পাখি দেখতে গিয়েছিলাম ঢাকার পূর্বাচলে। কিছু ঝোপঝাড়, খোলা মাঠ এবং গ্রামীণ পরিবেশ থাকায় নানান প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে সেখানে। তাদের মধ্যে কয়েক প্রজাতির লাটোরা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে বর্মি লাটোরা এবং তামাপিঠ লাটোরা। বাংলাদেশে প্রায় ছয় প্রজাতির লাটোরা দেখা যায়। যার মধ্যে ল্যাঞ্জ লাটোরা বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি। বাকিরা সবই পরিযায়ী এবং অনিয়মিতভাবে বাংলাদেশে ভ্রমণ করে। তবে পরিযায়ী লাটোরাদের মধ্যে তামাপিঠ লাটোরা আমাদের দেশে প্রজনন করে। খয়রা লাটোরা বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি। আর মেটেপিঠ লাটোরা বাংলাদেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি। অন্য তিন প্রজাতির মধ্যে মেটে লাটোরা ২০ শতকের মাঝামাঝি চট্টগ্রাম বিভাগে পাওয়া গিয়েছিল এবং ঢাকা বিভাগের কোনো এক গ্রামে পাওয়া গেছে- এমন তথ্য আছে। তামাপিঠ লাটোরা চট্টগ্রামে এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেখা যায়। তবে বর্মি লাটোরা খুব কমই দেখা যায়। পাখি বিশেষজ্ঞ ড. রোনাল্ড হালদার বর্মি লাটোরাকে মৌলভীবাজার এবং মধুপুরে দেখেছেন কয়েক দশক আগে। ২০০৫ সালে মেহেরপুর জেলায় এ পাখিটি দেখা গিয়েছিল। জানামতে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার জেলার একটি চা-বাগানে বর্মি লাটোরা দেখা গিয়েছিল।
বর্মি লাটোরা বাংলাদেশের অনিয়মিত পরিযায়ী পাখি। প্রধানত শীত মৌসুমে আমাদের দেশে কালেভদ্রে দেখা মেলে। যেসব পাখি আমাদের দেশে মাঝেমধ্যে কিংবা কয়েক বছর বিরতি দিয়ে আসে তাদের অনিয়মিতভাবে বসবাসকারী পাখি বলা হয়। ঢাকার পূর্বাচলে গিয়ে এ পাখিটির দেখা পাই। প্রায় ঘণ্টাদুয়েক খোঁজাখুঁজির পর পাখিটি চোখে ধরা দেয়। মূলত পাখিটি প্রায় সব সময় আবাদি জমিতে, সবজি বাগানে পোকামাকড় ধরে খায়। তবে সকাল ও বিকেলে বেশি কর্মচঞ্চল থাকে। ধীরস্থিরভাবে এক স্থানে তেমন বসে থাকে না। ছোট ঝোপ ও সবজি বাগানে উড়ে বেড়ায়। সাধারণত বসে থাকা স্থান থেকে উড়ে গিয়ে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পোকা ধরে। পোকা ধরার পর অন্য কোনো ডালে গিয়ে বসে খায়। শীতের আবাসে একই স্থানে দিনের পর দিন বিচরণ ও শিকার করে। শিকার ধরার আগে লেজ দোলায়। স্বজাতের অন্য প্রজাতির টেরিটরিতে (বিচরণ এলাকা) যায় না। তবে ভুল করে মাঝেমধ্যে গিয়ে বসলে তাড়া খেয়ে ফিরে আসে। নিজের এলাকায় অন্য পাখি এলে তাড়িয়ে দেয়।
বর্মি লাটোরা ধূসর চাঁদি ও লালচে বা তামাটে পিঠের পোকা শিকারি পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ২৩ সেমি। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে পাখির পিঠের দিক তামাটে। দেহের নিচের দিক সাদা। ডানা-ঢাকনির ও ওড়ার পালক সাদা। মাথার চাঁদি ও ঘাড়ের পিছনের অংশ কালচে ধূসর। দেহের নিচের দিক সাদা। মেয়ে পাখির কপাল সাদাটে, চোখের সামনে কিছুটা খাটো ফিকে ভ্রুরেখা আছে। কাঁধের পালক সামান্য ফিকে তামাটে। উভয় পাখির চোখ লালচে বাদামি এবং পা ও পায়ের পাতা কালচে। বর্মি লাটোরা ফসলের মাঠে পোকা খেয়ে কৃষকের উপকার করে। খাদ্য তালিকায় রয়েছে- পঙ্গপাল, ফড়িং, টিকটিকি, ছোট ইঁদুর ইত্যাদি। বাংলাদেশ বাদে উত্তর-পূর্ব ভারত, চীন, মায়ানমার ও থাইল্যান্ডে এ পাখির বসবাস রয়েছে। লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার