ঢাকা ৫ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
নিয়োগ দেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, যোগ্যতা এইচএসসি পাস লোডশেডিং বন্ধ হোক ‘বাংলাদেশ থেকেও বিশ্বমানের উমরা সেবা দেওয়া সম্ভব’ মন্ত্রীদের আচরণ যা হওয়া উচিত মেধা পাচার: উন্নয়নের আড়ালে নীরব বিপর্যয় রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন বহুদূর চকরিয়ায় বাক প্রতিবন্ধী যুবককে ধাক্কা দিয়ে পালালো গাড়ি আগুন সন্ত্রাসীর তান্ডবে নির্ঘুম কৃষক, পাচ্ছেন দয়াও বিশ্বকাপের পরই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলবেন নয়্যার নোয়াখালীতে ১৭ বেডের হাম ওয়ার্ডে রোগী ৮৭ কৌশলগত সম্পর্কের পথে ঢাকা-বেইজিং নিত্যপণ্যের বাজারে নেই মূল্যতালিকা মধুখালীতে দুইদিনে দুই মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর কমল দাদার পাঠশালা এমপি আসলে আগে পায়ে একটা মেরে দিব: এমপির পিএ ও যুবদল কর্মীর অডিও ভাইরাল লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১৬ মেহেরপুর সীমান্তে ৪ জনকে পুশইনের চেষ্টা বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৬০ হাজার ৫৮৮ হাজি, মৃত্যু ৫৪ ‘দোষ সব আমার, খেলোয়াড়দের ওপর থেকে নজর সরান’: প্যারাগুয়ে কোচ শুক্রবারের নির্ধারিত মার্কিন-ইরান আলোচনা বাতিল : সুইজারল্যান্ড মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায় আর্থিক সংকটে ভর্তি অনিশ্চিত, শিক্ষার্থীর পাশে প্রতিমন্ত্রী অনুবাদ হয় না মানুষের স্মৃতির ভেতর অন্ধকারের গান প্রেমের এলিজি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড সফর স্থগিত

প্রকৃতি বর্মি লাটোরা

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৫, ০৪:০১ পিএম
বর্মি লাটোরা
বর্মি লাটোরা, ঢাকার পূর্বাচল থেকে তোলা। ছবি: লেখক

প্রায় ১০ বছর আগে শীতের সকালের মিষ্টি রোদে পাখি দেখতে গিয়েছিলাম ঢাকার পূর্বাচলে। কিছু ঝোপঝাড়, খোলা মাঠ এবং গ্রামীণ পরিবেশ থাকায় নানান প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে সেখানে। তাদের মধ্যে কয়েক প্রজাতির লাটোরা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে বর্মি লাটোরা এবং তামাপিঠ লাটোরা। বাংলাদেশে প্রায় ছয় প্রজাতির লাটোরা দেখা যায়। যার মধ্যে ল্যাঞ্জ লাটোরা বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি। বাকিরা সবই পরিযায়ী এবং অনিয়মিতভাবে বাংলাদেশে ভ্রমণ করে। তবে পরিযায়ী লাটোরাদের মধ্যে তামাপিঠ লাটোরা আমাদের দেশে প্রজনন করে। খয়রা লাটোরা বাংলাদেশের সুলভ পরিযায়ী পাখি। আর মেটেপিঠ লাটোরা বাংলাদেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি। অন্য তিন প্রজাতির মধ্যে মেটে লাটোরা ২০ শতকের মাঝামাঝি চট্টগ্রাম বিভাগে পাওয়া গিয়েছিল এবং ঢাকা বিভাগের কোনো এক গ্রামে পাওয়া গেছে- এমন তথ্য আছে। তামাপিঠ লাটোরা চট্টগ্রামে এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেখা যায়। তবে বর্মি লাটোরা খুব কমই দেখা যায়। পাখি বিশেষজ্ঞ ড. রোনাল্ড হালদার বর্মি লাটোরাকে মৌলভীবাজার এবং মধুপুরে দেখেছেন কয়েক দশক আগে। ২০০৫ সালে মেহেরপুর জেলায় এ পাখিটি দেখা গিয়েছিল। জানামতে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার জেলার একটি চা-বাগানে বর্মি লাটোরা দেখা গিয়েছিল।

বর্মি লাটোরা বাংলাদেশের অনিয়মিত পরিযায়ী পাখি। প্রধানত শীত মৌসুমে আমাদের দেশে কালেভদ্রে দেখা মেলে। যেসব পাখি আমাদের দেশে মাঝেমধ্যে কিংবা কয়েক বছর বিরতি দিয়ে আসে তাদের অনিয়মিতভাবে বসবাসকারী পাখি বলা হয়। ঢাকার পূর্বাচলে গিয়ে এ পাখিটির দেখা পাই। প্রায় ঘণ্টাদুয়েক খোঁজাখুঁজির পর পাখিটি চোখে ধরা দেয়। মূলত পাখিটি প্রায় সব সময় আবাদি জমিতে, সবজি বাগানে পোকামাকড় ধরে খায়। তবে সকাল ও বিকেলে বেশি কর্মচঞ্চল থাকে। ধীরস্থিরভাবে এক স্থানে তেমন বসে থাকে না। ছোট ঝোপ ও সবজি বাগানে উড়ে বেড়ায়। সাধারণত বসে থাকা স্থান থেকে উড়ে গিয়ে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পোকা ধরে। পোকা ধরার পর অন্য কোনো ডালে গিয়ে বসে খায়। শীতের আবাসে একই স্থানে দিনের পর দিন বিচরণ ও শিকার করে। শিকার ধরার আগে লেজ দোলায়। স্বজাতের অন্য প্রজাতির টেরিটরিতে (বিচরণ এলাকা) যায় না। তবে ভুল করে মাঝেমধ্যে গিয়ে বসলে তাড়া খেয়ে ফিরে আসে। নিজের এলাকায় অন্য পাখি এলে তাড়িয়ে দেয়। 

বর্মি লাটোরা ধূসর চাঁদি ও লালচে বা তামাটে পিঠের পোকা শিকারি পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ২৩ সেমি। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে পাখির পিঠের দিক তামাটে। দেহের নিচের দিক সাদা। ডানা-ঢাকনির ও ওড়ার পালক সাদা। মাথার চাঁদি ও ঘাড়ের পিছনের অংশ কালচে ধূসর। দেহের নিচের দিক সাদা। মেয়ে পাখির কপাল সাদাটে, চোখের সামনে কিছুটা খাটো ফিকে ভ্রুরেখা আছে। কাঁধের পালক সামান্য ফিকে তামাটে। উভয় পাখির চোখ লালচে বাদামি এবং পা ও পায়ের পাতা কালচে। বর্মি লাটোরা ফসলের মাঠে পোকা খেয়ে কৃষকের উপকার করে। খাদ্য তালিকায় রয়েছে- পঙ্গপাল, ফড়িং, টিকটিকি, ছোট ইঁদুর ইত্যাদি। বাংলাদেশ বাদে উত্তর-পূর্ব ভারত, চীন, মায়ানমার ও থাইল্যান্ডে এ পাখির বসবাস রয়েছে। লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার 

দেখা পেলাম দুষ্প্রাপ্য চামেলির

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:০৩ এএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:৩৪ এএম
দেখা পেলাম দুষ্প্রাপ্য চামেলির
মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে সম্প্রতি ফোটা চামেলি ফুল। ছবি: লেখক

‘গ্রীষ্মকাল, জ্যৈষ্ঠের ত্রিশ তারিখ, সকাল সাতটা সাঁইত্রিশ মিনিট। অবশেষে দেখা হলো চামেলির সঙ্গে। আহা কী শুভ্র স্নিগ্ধ ফুল! তীব্র সুগন্ধে ভরা ফুলের ঝোপটার নিচে দাঁড়িয়ে আমি বিমোহিত হয়ে গেলাম। এক অনাবিল আনন্দে মনটা ভরে উঠল। আহা, কতদিন যে এই ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করেছি!’

গত বসন্ত থেকে প্রতি মাসেই দু-চারবার করে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে যাই আর চামেলিকে দেখব বলে নার্সারির গেটে কড়া নাড়ি, লতানো ঝোপটার কাছে যাই। প্রতিবারই হতাশ হই। অবশেষে ১২ জুন বৃক্ষবন্ধু আজহার ভাইয়ের একটা পোস্টে চামেলি ফুলের ছবি দেখে ভোর হতেই ছুটে যাই সে ফুল চাক্ষুষ করতে। রোদের তেজ নেই, ফুল সকালেও সতেজ রয়েছে।

কত জায়গায় যে খুঁজেছি চামেলিকে! কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়ে ফিরে এসেছি। এর আগে রমনা ও বলধায় খুঁজেছি চামেলিকে, দেখা পাইনি। নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া বলেছিলেন, চামেলি হাউসে (সিরডাপ) চামেলি আছে, এখন সেখানেও নেই। অবশেষে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের এই সবেধন নীলমণি একটি গাছের চামেলি ফুলকে দেখে নজরুলসংগীতের একটা লাইন মনে পড়ল–‘বনে মোর ফুটেছে হেনা চামেলি যূথী বেলি।’

পাঁচ পাপড়ির ফুলগুলো যেন সদ্যঃস্নাতা রমণী, পবিত্র ও শুভ্র। মিষ্টি গন্ধের নেশায় তার কাছে ছুটে গেলাম। খুব কাছ থেকে এই প্রথম চামেলিকে দেখা। চামেলি ফুলকে একজন সুন্দরী রমণীর সঙ্গে তুলনা করা বোধহয় ভুলই হলো। কেননা, সে তুলনা তো কবি কাজী নজরুল ইসলামই করতে পারেননি। তার একটি গানেই তিনি এ কথা স্বীকার করে লিখেছেন: ‘গোলাপ বেলী যুঁই চামেলী–কোন্ ফুল তারি তুল্ গো/ তার যৌবন-নদী বয় নিরবধি ভাসায়ে দুকূল গো..।’ চামেলির সঙ্গে আর কোনো ফুলের তুলনাই যেন হয় না। চামেলি যেন কবিদের ফুল, এ জন্য এর এক ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে পোয়েট’স জেসমিন।

চামেলিকে দেখে মনে হলো, ফুল ও নারী–এর মধ্যে কোনটি বেশি সুন্দর? ফুল যেমন বীজ উৎপাদী, নারী তেমন সন্তান উৎপাদী। দুটিই উর্বরতার প্রতীক। প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এ দুটি সত্তারই প্রয়োজন অনিবার্য, এ দুটির কোনো একটি না থাকলেই এ বিশ্ব সৃষ্টিতে ঘটবে চরম বিশৃঙ্খলা। এসব কথা চিন্তা করতে করতেই ভাবলাম চামেলিকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কত যে মাতামাতি, সেই চামেলি এখন আমার সামনে ফুটে রয়েছে, লতায় লতায় দোল খাচ্ছে। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। কেননা, চামেলি এ দেশে দুষ্প্রাপ্য ফুল বলে প্রকৃতিবন্ধু মোকারম হোসেন তার বাংলাদেশের পুষ্প-বৃক্ষ লতা-গুল্ম বইয়ে লিখেছেন। সেই দুষ্প্রাপ্য ফুলকে দেখতে পাব ভাবিনি। সঙ্গে ছিলেন আরেক প্রকৃতিবন্ধু সৌমিক। দুজনে তখন চামেলির ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।

চামেলির আরেক বাংলা নাম জাঁতি। চামেলি জুঁইজাতীয় ফুল হলেও জুঁই ফুলের সঙ্গে এর কিছুটা পার্থক্য আছে। সেটি খুব ভালো করে খেয়াল না করলে চামেলিকেই জুঁই বলে মনে হতে পারে। চামেলি ফুল জুঁই ফুলের চেয়ে বড়, পাপড়ি জুঁই ফুলের চেয়ে লম্বা ও সরু, কিন্তু রং ও সুগন্ধ প্রায় জুঁই ফুলের মতোই, যেন আতরের ঘ্রাণমাখা। প্রধানত গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফুল ফোটে।

চামেলি ফুলের উর্দু নাম চাম্বেলী। ধারণা করা হয়, সেই উর্দু নাম কালক্রমে বাংলায় হয়েছে চামেলী বা চামেলি। চামেলি মূলত সংস্কৃত ভাষার মিলগত স্ত্রীবাচক নাম, যা সৌন্দর্য, পবিত্রতা, ভালোবাসা ও সুগন্ধকে প্রকাশ করে। এর ইংরেজি নাম স্প্যানিশ জেসমিন ও রয়্যাল জেসমিন। সব জুঁইজাতীয় ফুলকেই জেসমিন বলা হয়, পার্সি ভাষায় বলে ইয়াসমিন। সেখান থেকেই এর গণগত নাম হয়েছে জেসমিনাম ও প্রজাতিগত নাম Jasminum grandiflorum. গ্র্যান্ডিফ্লোরোম অর্থ ‘মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত’, গোত্র ওলিয়েসি।

চামেলি একটি চিরসবুজ কাষ্ঠল লতা। লতার গিঁট থেকে কোনো আকর্ষি বের হয় না। প্রতিটি গিঁটের দুপাশে বিপরীতমুখীভাবে দুটি যৌগিক পক্ষল পাতা জন্মে। পত্রক ডিম্বাকার, ছোট, অগ্রভাগ সরু, চকচকে সবুজ, মসৃণ। বাইতে দিলে এ গাছ ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তবে গাছ ছেঁটে ছোট করে রাখা যায়। ফুলের পাপড়ি সাদা, সুগন্ধী ও ফোটা ফুলের বিস্তৃতি প্রায় ৫ সেন্টিমিটার। গাছ কষ্ট সইতে পারে, দিনের প্রখর রোদ ও গরমেও গাছের ক্ষতি হয় না, এমনকি রাতে নিম্ন তাপমাত্রাতেও গাছের কোনো ক্ষতি হয় না। ধীর বৃদ্ধিসম্পন্ন গাছ, বিশেষ করে চারা লাগানোর পর প্রথম দুই বছর পর্যন্ত বাড়ে কম, ভোরে ফুল ফোটে, বেলা বাড়লেই নেতিয়ে যায়। বীজ ও গুটিকলমের মাধ্যমে চারা তৈরি করা যায়।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সবুজ পাতায় সাদা ফুলের গালিচা

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:২২ এএম
সবুজ পাতায় সাদা ফুলের গালিচা
ময়মনসিংহের কাচারিঘাটের নার্সারিতে ফোটা সাদা পর্তুলাকা ফুল ছবি: লেখক

পর্তুলাকা আমাদের কাছে মূলত ‘টাইম ফুল’ বা ‘নাইন ও-ক্লক’ হিসেবে বেশি পরিচিত। এর সাদা রঙের জাতটি বাগানের সৌন্দর্য বর্ধনে এবং ভেষজ চিকিৎসায় এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Portulaca Oleracea, এটি Portulacaceae পরিবারের বীরুৎ। এটি সাধারণত একবর্ষজীবী বা বহুবর্ষজীবী রসালো প্রকৃতির লতানো উদ্ভিদ। অনেকের কাছে এই ফুল ‘মস রোজ’ নামে পরিচিত। 

সাদা পর্তুলাকা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এর শারীরিক গঠন শুষ্ক পরিবেশেও টিকে থাকার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। এর কাণ্ড নরম, মাংসল ও রসালো এবং মাটির বুক ঘেঁষে লতানো প্রকৃতির হয়ে থাকে। কাণ্ড সাধারণত মসৃণ এবং সবুজ বা হালকা লালচে-বেগুনি রঙের হয়।
পাতাগুলো আকারে ছোট, পুরু, চামড়ার মতো মসৃণ এবং রসালো। এগুলো কাণ্ডের সঙ্গে পর্যায়ক্রমিক বা বিপরীতমুখীভাবে সাজানো থাকে। পাতাগুলো পানি ধরে রাখতে পারে যা উদ্ভিদটিকে খরাসহিষ্ণু করে তোলে।

এর প্রধান আকর্ষণ হলো এর ধবধবে সাদা ফুল। ফুলগুলো সাধারণত ডালের একদম মাথায় গুচ্ছ আকারে ফোটে। এতে ৫টি নরম পাপড়ি থাকে এবং মাঝখানে হলুদ রঙের পুংকেশর দৃশ্যমান হয়, যা সাদা পাপড়ির মাঝে এক অপূর্ব বৈপরীত্য তৈরি করে। এই ফুলের সবচেয়ে মজার বৈশিষ্ট্য হলো এর ফোটার সময়। সাধারণত কড়া রোদ না উঠলে এই ফুল ফোটে না। সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ফুলগুলো পূর্ণতা পায় এবং বিকেল হতেই আবার বুজে যায়। এই কারণেই একে ‘টাইম ফুল’ বলা হয়।

ফুল শুকিয়ে যাওয়ার পর সেখানে ছোট ছোট ডিম্বাকার ক্যাপসুল বা ফল তৈরি হয়। এই ফলের ভেতর অসংখ্য ক্ষুদ্র, কালচে বা ধূসর রঙের বীজ থাকে। বাতাসের মাধ্যমে বা মাটিতে পড়ে এই বীজ থেকেই খুব সহজে নতুন চারা গজায়।

সাধারণত আমরা একে কেবলই শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ মনে করলেও, এর রয়েছে নানাবিধ পুষ্টি ও ঔষধি গুণ। অন্যান্য পর্তুলাকা ফুলের মতো সাদা পর্তুলাকার রয়েছে নান্দনিক ও উদ্যানতাত্ত্বিক গুরুত্ব। সাদা পর্তুলাকা খুব কম পরিচর্যাতেই ঘন হয়ে চমৎকার একঝাঁক সাদা ফুলের গালিচা তৈরি করতে পারে। বারান্দার ঝুলন্ত টবে বা ছাদবাগানের রক গার্ডেনে এই লতানো গাছটি লাগালে তা দেখতে অত্যন্ত সুন্দর লাগে। তীব্র খরা বা কড়া রোদেও এই গাছ মরে না। ফলে ব্যস্ত মানুষের বাগানের জন্য এটি একটি আদর্শ উদ্ভিদ।

সাদা পর্তুলাকার রয়েছে কিছু ভেষজ গুণ। পর্তুলাকা বা পার্সলেন উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়, যা হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরী। এতে রয়েছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি এবং ভিটামিন-ই, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ত্বকের বার্ধক্য রোধে সাহায্য করে। ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় এর রস পেটের অসুখ, আমাশয় এবং লিভারের নানাবিধ সমস্যায় পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ গাছের রস পোকা-মাকড়ের কামড়, হালকা পুড়ে যাওয়া বা ত্বকের অ্যালার্জি দূর করতে বাহ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়।

এর উজ্জ্বল হলুদ পুংকেশর ও সাদা পাপড়ি মৌমাছি, প্রজাপতি এবং অন্যান্য পরাগায়নকারী কীটপতঙ্গকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে, যা আশপাশের পরিবেশের পরাগায়নে সহায়তা করে। লতানো স্বভাবের কারণে এটি মাটির উপরিভাগ দ্রুত ঢেকে ফেলে, যা তীব্র রোদে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং মাটির ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।

সাদা পর্তুলাকা শুধু একটি সাধারণ ফুলগাছই নয়, বরং এটি প্রকৃতি, স্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। স্বল্প যত্নে বেশি আনন্দ পেতে আপনার ঘরের বারান্দা বা ছাদবাগানে অনায়াসেই এই গাছের জায়গা হতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ।

চমৎকার জয়ফুল মথ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
চমৎকার জয়ফুল মথ
খুলনার দৌলতপুরে সম্প্রতি দেখা জয়ফুল মথ।

জ্যৈষ্ঠ মাসে সাধারণত প্রচণ্ড গরম পড়ে। তবে এ বছরের ৩০ মে ভোরবেলাটা অন্যরকম লাগছিল। মেঘমাখা রোদ্দুর আর বিস্তীর্ণ পাটখেতের গাছগুলোর হাওয়া, তার পাশের আইল দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যেন এক আলাদা প্রশান্তি পাচ্ছিলাম। পাটগাছগুলো আমার বুক বা মাথা সমান লম্বা হয়েছে, কোনো কোনো গাছের ডগার পাতাগুলো ডিঙি নৌকার মতো কুঁকড়ে গেছে।

কাছে গিয়ে কিসে এমন হলো তা পরখ করতে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অনুমান, পাটের লাল মাকড়ই পাটগাছের এ দশা করেছে। তবু না দেখে বিশ্বাস নেই। পাতা উল্টে দেখার চেষ্টা করলাম। নাহ্, মাকড়রা এত ক্ষুদ্র হয় যে সেগুলো আতশ কাচ দিয়ে দেখা ছাড়া বোঝার উপায় নেই। কিছু সাদাটে আঁশের মতো দেখতে পেলাম। তাতে অনুমান সত্য বলে মনে হলো। আরও কোনো পোকামাকড় পাটগাছে পাই কি না, তা খুঁজতে লাগলাম। 

ডগায় একটি বড় বাদামি রঙের কেড়ি পোকার দেখা পেলাম। ওরা বোধ হয় ভালো দেখতে পায়। কিছুতেই নিজেকে আড়ালে রাখতে ছাড়ছে না। আমি যতই তার কাছে গিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করি, ততই সে স্থান বদলায়। ফোকাসই করতে পারছিলাম না। দু-একটি ছবি তুলে শেষে হাল ছাড়তে হলো। কেননা ওটা হঠাৎ টুপ করে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে হারিয়ে গেল। ওটাকে খুঁজতে গিয়েই খুলনার দৌলতপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বিশাল পাটখেতের মধ্যে ঘাগড়া আগাছার পাতার ওপর দেখতে পেলাম আরেকটি পোকাকে।

পোকাটি এত্ত ছোট যে কেউ ভালো করে খেয়াল না করলে তাকে দেখাই যায় না। লম্বা আধা সেন্টিমিটারের চেয়ে একটু বেশি হতে পারে, তবে এক সেন্টিমিটার হবে না। কিন্তু পোকাটির রং-রূপ আমাকে মুগ্ধ করল। এত ক্ষুদ্র একটি পোকার দেহে প্রকৃতির কোন শিল্পী এত রূপ দিয়েছে? বিস্ময়কর! 

কালচে বাদামি পাখার ওপর হলদে-সাদা কয়েকটি ফোঁটা, প্রাকৃতিক রংগুলোর এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ মিল বা ম্যাচিং ফুল, কুঁড়ি ও পাতায় বহুবার দেখেছি। কিন্তু পোকার ক্ষেত্রে এটি যেন আমার কাছে আরও বেশি বিস্ময়কর বলে মনে হয়।

জানি যে ওদের এই আকর্ষণীয় রং ও চেহারা রাখতে হয় সাথিকে মিলনে আমন্ত্রণের জন্য, কেউ কেউ আবার নেচে নেচে সে আমন্ত্রণ জানায়, আবার কেউ আমন্ত্রণ জানায় গা থেকে বিশেষ একধরনের ঘ্রাণ বাতাসে ছেড়ে। মেয়েরা যেমন সাজুগুজুর পর পারফিউম স্প্রে করে বের হয়, অনেকটা তেমনই। পোকাদের এ বিস্ময়কর জগৎ দেখা ও অনুভব করার মজাটাই আলাদা।

যাহোক, নিচু হয়ে পাটখেতের মধ্যেই বসে পড়লাম সে নকশাদার ডানার সুন্দরীকে ভালো করে দেখার আশায়। পাখার ওপরে ফোঁটাগুলোর মধ্যে তিনটি একটু বড় ও পাখার ওপরের দিকে ত্রিভুজাকারে সজ্জিত, পাখার পেছনের দিকে আবার কয়েকটি ফোঁটা সারি করে সাজানো। পাখার পেছন প্রান্ত ঝালরের মতো। এবার এ পোকাটি আর আমাকে নিরাশ করল না, স্থির হয়ে ঘাগড়া পাতার ওপর বেশ কিছুক্ষণ বসে রইল। আমিও আনন্দের সঙ্গে ওর বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম।

পোকাটির চেহারা দেখে একবার ভেবেছিলাম স্পিটল বাগ বা থুতু পোকা। কিন্তু আকার ও পাখার রঙের সঙ্গে থুতু পোকার কিছুটা মিল থাকলেও পাখার দাগ, মাথা, মুখ–এসবের মিল নেই। তাই বাড়ি ফিরে বসলাম সেই অচেনা পোকাটিকে চেনার জন্য।

গুগল পণ্ডিতের সাহায্যে জানতে পেলাম ওর বংশ-পরিচয়, এমনকি নামও। ওই খুদে পোকাটি সাইথ্রিডিডি গোত্রের ইরেটমোচেরা গণের একটি মথজাতীয় পোকা, বর্গ লেপিডোপ্টেরা। প্রজাতিগত নাম পেলাম Eretmocera impactella, ইংরেজি নাম জয়ফুল মথ বা ফ্লাওয়ার মথ। 

জানা গেল এটি একটি ক্ষতিকর পোকা, বিশেষ করে ডাঁটা ও লালশাকের। বথুয়া, হেলেঞ্চা, নটেশাকও এ পোকার আশ্রয়দাতা। বহুদিন আগে একবার ভুট্টাপাতায় একে চোখে পড়েছিল, জানি না সে গাছের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না। এ পোকার বাচ্চারা এসব গাছের পাতা খায়। খাওয়ার আগে মুখের লালার সুতো দিয়ে পাতা মুড়ে ফেলে, তার ভেতরে বসে কুরে কুরে পাতা খায়। চলার সময় ওরা বেশ কায়দা করে হাঁটে। সামনে যেতে সমস্যা মনে হলে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটার মতো খানিকটা পেছনে যায়, আবার সামনে আসে। ওদের প্রায়ই মিলনরত অবস্থায় পাতার ওপর বসে থাকতে দেখা যায়।

এ পোকাটি দেখা যায় এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান ও ওমানে এ পোকা আছে। এ দেশে এটি একটি আবাসিক পোকা, বিক্ষিপ্তভাবে এদের দেখা যায়। আলোতে এরা প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়। দিনের বেলায় এরা চলাচল করে।

রমনার বন আসরা

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:২৯ এএম
রমনার বন আসরা
রমনা উদ্যানে সম্প্রতি ফুটেছে বন আসরা ফুল। ছবি: লেখক

রাজধানীর রমনা উদ্যানে দুটি গাছ আছে, যা বেশ বড়সড়, অথচ তা জবাগোত্রীয়। ফুলের গড়নে জবার সঙ্গে মিল থাকলেও অন্য আর কিছুর সঙ্গেই মিল নেই। গাছ দুটি হলো কাশিপালা ও বন আসরা। গাছ দুটির দিকে তাকালেই নিসর্গপুত্র দ্বিজেন শর্মার কথা মনে পড়ে।

রমনা উদ্যানে তিনি সিলেটের পাহাড় থেকে নানা প্রজাতির গাছের চারা তুলে এনে লাগাতেন। গাছগুলোর বেশির ভাগই কিছুদিন পর যত্নের অভাবে বা অরক্ষিত থাকায় মরে যেত, কিছু গাছ দাঁড়িয়ে যেত। সেসব গাছ বৃক্ষ হয়ে এখন তাঁর সেসব স্মৃতির কথা কইছে। বন আসরা গাছটির অবস্থান রমনা উদ্যানের লেকের পাড়ে। লেক ভ্রমণের বোটগুলোকে ওখান থেকে ছাড়া হয়। বছর দশেকের বেশি হবে।

রমনায় একদিন দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে কয়েকজন মিলে হেঁটে হেঁটে গাছ দেখতে দেখতে এই বন আসরা গাছটিকে চোখে পড়েছিল। গাছের গোড়ার দিকটা আগুনে ঝলসে গেছে, গোড়া থেকে গজানো ডালপালার পাতাগুলোও পুড়ে গেছে। রমনা তখন এখনকার মতো রূপসী ছিল না। সেই আহত ও দগ্ধ গাছটির কাছে দাঁড়িয়ে তিনি হাহাকার করে উঠেছিলেন, বলেছিলেন, ‘গাছের সঙ্গে এমন অন্যায় কেউ করে? গাছ তো মায়ের মতন, তাকে কেউ এভাবে পোড়ায়? জানি না, কোন হতভাগার দল এখানে কী রেঁধে বনভোজন করে গেছে! এখনো সেই গাছটির কাছে গেলে সেসব কথা মনে পড়ে।

বুনোগাছ হলেও বন আসরার এই একটি গাছই রমনা উদ্যানে আছে। কিন্তু কখনো এর অনিন্দ্য রূপসী মেমসাহেবের মতো ফর্সা ফুলগুলোকে দেখার সুযোগ হয়নি। এ বছরও সে গাছে ফুল ফুটেছে। গত ৭ জুন সকালবেলায় সে গাছটিতে ফুলের দেখা পেলাম। পরপর দুদিনে আরও বেশি ফুল দেখলাম। একটি দুটি না, ডালে ডালে অনেক ফুল ফুটেছে। কুঁড়িগুলো দেখে মনে হলো কয়েকদিনে আরও ফুল ফুটবে। আহা, ফুল কী চমৎকার! ঘিয়া রঙের বড় বড় মাইকের মতো ফুল, ফুলের বোঁটার কাছে ঝালরের মতো হালকা সবুজ অঙ্গ, বৃতিগুলো যেন ছিল কলার খোসা। এদিক দিয়ে মুচকুন্দ ফুলের সঙ্গে এর কিছুটা মিল আছে। প্রচুর মৌমাছি উড়ছে ফুলে।

বন আসরা এ গাছের স্থানীয় বাংলা নাম, ইংরেজি নাম Indian Kapok ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম  Pterospermum semisagittatum ও গোত্র মালভেসি। প্রজাতিগত নামের প্রথমাংশ টেরোস্পার্মাম–এর অর্থ ডানাযুক্ত বীজ এবং শেষাংশের অর্থ আংশিক বর্শার ফলার মতো আকৃতিবিশিষ্ট পাতা। বন আসরা বনের গাছ, এ দেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের অরণ্যে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। রমনা উদ্যানের গাছটি মাঝারি আকারের বৃক্ষ প্রকৃতির।

আবহাওয়া ও অবস্থানভেদে গাছ পর্ণমোচী বা চিরসবুজ হতে পারে; গাছ ১৫ থেকে ২৫ মিটার লম্বা হতে পারে। গোড়া থেকে বেশ খানিকটা অংশের কাণ্ডে কোনো শাখা থাকে না। বীজ থেকে চারা হয়। পাতাগুলো কিছুটা ছুরি বা তলোয়ারের আগার মতো, পাতার ওপরের পিঠ সবুজ ও কিছুটা মসৃণ হলেও নিচের পিঠ রূপালি সবুজ ও খসখসে। এর কাণ্ড সোজা ও শক্ত হয়। গুড়ি বা কাণ্ডে বাকল ওঠা ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়।

বন আসরার কুঁড়িগুলোও বেশ ব্যতিক্রম, লম্বা খাঁজযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্রের মতো। গাছের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর ফুল। এর ফুলগুলো রাতের বেলা ফোটে, যার সাদা পাপড়ি ও হালকা সবুজ বৃতি দেখতে অসাধারণ লাগে। ভোরে ফুলগুলো মলিন হতে শুরু করে। ফুলগুলো সুগন্ধযুক্ত এবং নিশাচর পাখি ও কীটপতঙ্গকে আকৃষ্ট করে।

প্রাচীনকাল থেকেই এর শক্ত কাঠ গৃহনির্মাণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর লালচে-ধূসর কাঠ ভারী, বেশ শক্ত ও টেকসই। এটি কুড়ালের হাতল তৈরি করতে ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে বাড়ির স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্থানীয়ভাবে চিবানোর জন্য এবং আঁশ ও কাঠের উৎস হিসেবে ব্যবহারের জন্য বন্য পরিবেশ থেকে এ গাছ সংগ্রহ করা হয়। সুপারির বদলে পানের সঙ্গে চিবানোর জন্য এর ছাল ব্যবহার করা যায়। ডালের বাকল খুব শক্ত, টেনে ছেঁড়া বা ছুরি দিয়ে সহজে কাটা যায় না।

এজন্য বন আসরার বাকলের আঁশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের দড়ি ও তন্তু তৈরি করা হয়। বনজীবীরা বন থেকে কাঠ কেটে আঁটি বাঁধার জন্য এ গাছের বাকল ব্যবহার করে। এটি একটি ঔষধি উদ্ভিদ, যা জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা, চর্মরোগ ও প্রদাহের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। আধুনিক ফার্মাকোলজিক্যাল গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং মেজাজ ঠিক রাখতেও সহায়ক হতে পারে। 

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

কুরমা অভয়াশ্রমের হলদে-চোখ ছাতারে

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
কুরমা অভয়াশ্রমের হলদে-চোখ ছাতারে
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কুরমা চা-বাগানের গুল্মের ডালে শেষ বিকেলে সংকটাপন্ন হলদে-চোখ ছাতারে পাখি। ছবি: লেখক

হলদে চোখের বিরল ও সংকটাপন্ন পাখিটিকে প্রথম দেখি সাত বছর আগে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি গ্রামের এক ভুট্টাখেতে। কিন্তু তার অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও দ্রুত চলে যাওয়ার কারণে সেদিন ছবি তুলতে পারিনি। দুই বছর পর পাখিটিকে ফের দেখলাম মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা চা-বাগানের এক চিলতে ঘাসবন ও ঝোপঝাড়ে। এরপর থেকে অন্তত একবছর পাখিটিকে কুরমায় দেখেছি, প্রায় প্রতিবার যখন ওখানে গিয়েছি। বহু ছবি তুলেছি ওর। কিন্তু হার্ড ড্রাইভ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেসব ছবি হারিয়ে গেছে চিরতরে। কুরমার সেই জায়গাটি এখন এক চিলতে অভয়ারণ্য। নাম কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রম। তবে অভয়াশ্রম হলেও বর্তমানে ওখানে তেমন একটা পাখির দেখা মিলছে না। চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ঝোপঝাড় কেটে ফেলায় ভয় পেয়ে পাখিরা সেই যে চলে গেল, এখন পর্যন্ত আর ফিরে এল না, বিশেষ করে পরিযায়ী পাখিগুলো। দেশি আবাসিক পাখিদের সংখ্যাও কমে গেছে। এ বছরের ২৪ জানুয়ারি রাজকান্দির সংরক্ষিত বনের আদমপুর বিটে পাখি পর্যবেক্ষণ শেষে কুরমার বর্তমান অবস্থা দেখার জন্য বিকেলে সেখানে গিয়েছিলাম।
 
আকারে ক্ষুদ্র হলেও একসময় কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রমটি ছোট ছোট বীজভুক পাখিদের স্বর্গরাজ্য ছিল। লাল মুনিয়া, লালগলা ফিদ্দা, চিনা লালগলা ফিদ্দা, বঘেরি, কালোমাথা বঘেরি, হলদেবুক বঘেরি, খয়েরিকান বঘেরি, মদনটাক এবং হলদে চোখের পাখিসহ প্রায় আশি প্রজাতির পাখি দেখেছি ওখানে। কিন্তু জানুয়ারিতে ওখানে গিয়ে ২-৩ প্রজাতির বেশি পাখি দেখলাম না। তাই ওখান থেকে আরেকটু সামনের দিকে বাগানের সবচেয়ে উঁচু স্থানটিতে গেলাম। সেখানে ছোট যে ঝোপটি রয়েছে, ওখানে বুলবুলি, ফিঙ্গে, বাদামি কসাই ও অল্প কিছু সাধারণ পাখি দেখলাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায় হয় হয়। এমন সময় কোত্থেকে যেন হলদে চোখের পাখিটি এসে হাজির হলো। তবে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এই সময়ের জন্য ৪-৫ বার ক্লিক করতে পারলাম। ছবি বেশি তুলতে না পারলেও বিরল পাখিটিকে যে ওখানে দেখলাম, তাতেই আমি খুশি। কারণ এর আগে বেশ কয়েকজন বার কয়েক গিয়েও পাখিটির দেখা পাননি। সন্ধ্যা হয়ে এল, তাই সঙ্গে আনা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে পাখিপ্রেমী রূপকের দোকানে জিলাপি খাওয়ার জন্য চলে গেলাম। 

এতক্ষণ বিরল ও সংকটাপন্ন যে পাখিটির কথা বললাম, সে এদেশের এক প্রজাতির আবাসিক পাখি হলদে-চোখ ছাতারে। বাগেরহাট জেলায় পাখিটি ‘সাদা মইনে’ নামে পরিচিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বলে গুলাবচশম। ওর ইংরেজি নাম Yellow-eyed Babbler। প্যারাডক্সওরনিথিডি (Paradoxornithidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Chrysomma sinense (ক্রাইসোমা সাইনেনস)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির দেখা মেলে।

হলদে-চোখ ছাতারের দেহের দৈর্ঘ্য ১৮ সেন্টিমিটার। ওজন ১৯ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। দেহের উপরটা লালচে-বাদামি। থুতনি-গলা-বুক সাদা; পেট-তলপেট হলদেটে সাদা। শক্ত মোটা ঠোঁটটি কালো। চোখের চারদিকের বলয় কমলা হলেও মনি হলুদ। পা ও পায়ের পাতা হলুদ। লেজ লম্বা। অপ্রাপ্তবয়ষ্ক পাখির পিঠ বেশি লালচে ও ঠোঁট বাদামি।  

প্রজাতিটি মূলত সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা, তবে খুলনা বিভাগ ও উত্তরবঙ্গেও কোথাও কোথাও দেখা যায়। সচরাচর জলাসংলগ্ন লম্বা ঘাস ও ঝোপঝাড়ে এরা বাস করে। বেশ লাজুক। জোড়ায় বা ছোট দলে ঝোপঝাড় বা গাছের গোড়ার দিকে আড়ালে-আবডালে ঘুরে বেড়ায়। উঁচু ঘাসের আড়ালে খাবার খোঁজে। কীটপতঙ্গ, শুককীট, রসালো ফল ও ফুলের রস খায়। সুমধুর কণ্ঠে ‘চিপ-চিপ-চিপ…’ শব্দে ডাকে।

জুন থেকে নভেম্বর প্রজননকাল। এ সময় ভূমির কাছাকাছি আখ, পাট বা অন্যান্য ঘাসের কাণ্ডে ঘাস দিয়ে গোলাকার বাসা বানায়। লালচে-বাদামি ছিটছোপসহ ঘিয়ে-সাদা রঙের ৩ থেকে ৫টি ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ১৫-১৬ দিনে। ছানারা ১৩ দিন বয়সে উড়তে শিখে ও বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল ৫ থেকে ৮ বছর। 

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়