জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের সঙ্গে রয়েছে প্রকৃতির এক অনবদ্য বন্ধন। সবুজ ক্যাম্পাসে লাল ইটের ভবন, লেকের পানিতে পরিযায়ী পাখির কলকাকলী, পদ্মফুলে ভরা পুকুর আর চোখ জুড়ানো বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠের পাশাপাশি সারা বছরই থাকে হরেক ফুলের মেলা। এই গ্রীষ্মে লাল কৃষ্ণচূড়া, বেগুনি জারুল, হলুদ সোনালু ও কনকচূড়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মনে প্রতিনিয়ত আঁকাআঁকি করছে লাল সোনাইল। ভিনদেশি এই ফুল ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে কয়েক গুণ।
লাল সোনাইল দেশের দুর্লভ ফুলের মধ্যে অন্যতম। যার বৈজ্ঞানিক নাম ক্যাসিয়া জাভানিকা (Cassia javanica)। গ্রীষ্মকালীন এই ফুল বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার ছাড়াও জাপান, ইন্দোনেশিয়াসহ উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে ফোটে। দ্রুত বর্ধনশীল এই গাছ মাঝারি আকৃতির, ফুল ও বীজ অনেকটা শিম আকৃতির লম্বা দণ্ডের মতো। ফুলের ভেতর গোলাকৃতির বীজ। অল্পবয়সী গাছগুলো দেখতে ছাতার মতো। বর্ষা ছাড়া প্রতিটি মৌসুমে এই গাছ থাকে পাতাশূন্য।
ক্যাম্পাসে ক্যাসিয়া জাভানিকার সঙ্গে দেখা মেলে একই পরিবারভুক্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত ক্যাসিয়া রেনিজারার। ক্যাসিয়া রেনিজারা মূলত জাপানি ফুল। সাধারণ চোখে দুটি ফুল আলাদা করার উপায় নেই। দৃষ্টিনন্দন ক্যাসিয়া প্রজাতির ৪০ প্রকার গুল্ম ও বৃক্ষজাত রয়েছে। এর মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশে সব মিলিয়ে ১৫টি প্রজাতির দেখা পাওয়া যায়।
জানা যায়, পত্রিকায় ‘ফুলের পরিচয় জানতে চেয়ে’ একদল বৃক্ষপ্রেমী বিষয়টির অনুসন্ধানে গুলশান রাইফেলস ক্লাবের সামনে যান। সেই দলে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আতাউর রহমান খান। তিনি গাছের বীজ সংগ্রহ করে চারা উৎপাদন করেন। পরে ২০০২ সালে সাতটি গাছের চারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে রোপণ করেন।
এই দুর্লভ ফুলের দেখা মেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সামনে, পরিবেশ বিজ্ঞান ভবনের সামনে, শহিদ সালাম-বরকত হলের মাঠসংলগ্ন সড়কে, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল ভবনের সামনে। জহির রায়হান অডিটোরিয়ামের সামনেও কয়েকটি ক্যাসিয়া রেনিজারার গাছ দেখা যায়।
নান্দনিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই ফুল দেখে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, দর্শনার্থীরা মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ান। উপভোগ করেন এর অপরূপ সৌন্দর্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী তৈমুর খান তূর্য বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে ক্যাসিয়া রেনিজারার ফুলগুলো যেন এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে। প্রতিদিন ক্লাসে যাওয়ার সময় এই ফুলের রং আর ছাতার মতো ছায়ার সৌন্দর্য আমাকে নতুন করে প্রাণ জোগায়। এই অনুভূতি ক্লাসে মনোযোগী হতে সাহায্য করে।’
বাংলার চিরাচরিত প্রবাদ ‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী’- এ যেন তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ঢাকা থেকে পরিবারসহ ঘুরতে এসে নওরিন এশা তুলি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই পরিবার নিয়ে জাবিতে আসি। তবে এবারের সৌন্দর্য আলাদা। অমর একুশের সামনে রাস্তায় হঠাৎ চোখে আটকে গেল একটি ফুল। এই ফুল আগে কখনো দেখিনি। নাম না জানা ফুলগুলো খুবই সুন্দর। এগুলো জাহাঙ্গীরনগরের ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়েছে।’
ক্যাসিয়া প্রজাতির গাছের সৌন্দর্য ও উপকারিতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ছালেহ আহাম্মদ খান বলেন, ‘লাল সোনাইল বা ক্যাসিয়া জাভানিকার মতো বৃক্ষগুলো শুধু ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেনি, শিক্ষার্থীদেরও মন-প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। নানা গুণে ভরপুর এই দেশীয় উদ্ভিদ। গোলাপি ও লাল রঙের আকর্ষণীয় ফুলের জন্য এই গাছ বেশ জনপ্রিয়। সৌন্দর্যের পাশাপাশি নানা ধরনের ভেষজ উপকারিতা রয়েছে ক্যাসিয়া জাভানিকার। কোষ্ঠকাঠিন্য, কোলিক, ক্লোরোসিস এবং মূত্রনালির রোগের চিকিৎসায় এই ফুল ব্যবহার করা হতো প্রাচীনকাল থেকেই। জ্বর, ঠাণ্ডা, গ্যাস্ট্রিক এবং ম্যালেরিয়া, হারপিস ও ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসায়ও ব্যবহার করা হয় এসব গাছ। শোভাময় এই ফুল গাছের প্ল্যানটেশন, যত্ন ও সংরক্ষণে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।’