মার্চ বা এপ্রিল মাসে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে বা মধুপুর বনে, দিনাজপুরের বনে, এমনকি গাজীপুরের পুবাইলে কিংবা গাজীপুর থেকে কালিয়াকৈর যাওয়ার পথে শালগাছের ফুল চোখে পড়বে। ফুলে ফুলে ভরে যাওয়া শালগাছের শোভা অনন্য। শাল হলো বনের রাজা।
শালগাছ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার একটি গানে লিখেছেন,
‘ক্লান্ত যখন আম্রকলির কাল,
মাধবী ঝরিল ভূমিতলে অবসন্ন
সৌরভধনে তখন তুমি হে শালমঞ্জরী
বসন্তে কর ধন্য।’
শাল সোজা কাণ্ডবিশিষ্ট পত্রঝরা বৃক্ষ। বাংলায় এটি শাল ও গজারি নামে পরিচিত। সংস্কৃতে অশ্বকর্ণ ও কৌশিক ইত্যাদি নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Shorea Robusta, এটি Dipterocarpaceae গোত্রের বৃক্ষ। ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, রংপুরের বিখ্যাত গজারি বনই এই শাল বৃক্ষের প্রধান বন। শালগাছ কাটলে তার গোড়া থেকে পুনরায় চারা গজায়। এ কারণে স্থানীয় জনসাধারণ শালগাছকে গজারি গাছ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। মূলত শালগাছের কাটা মোথা থেকে গজানো চারাই গজারি নামে পরিচিত।
শাল ফুল নরম, রোমশ ও সাদা। তবে সাদা পাপড়িতে হলদে আভা ও হলদে আঠা আছে। শালগাছের ফুল ১.২৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এর ফল ১-২ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। ফল ধরে মে-জুন মাসে। শালের ফলত্বক প্রসারিত হয়ে ডানার মতো গঠন তৈরি করে। একে সামারয়েড বলে। এই ডানা শালের বীজের বিস্তারে সহায়তা করে। শালের ফলে বা বীজাধারে ৪-৫টি ডানা থাকে। শালের চারার বাকল ধূসর বাদামি। বড় গাছের বাকল ঘন বাদামি ও ফাটা ফাটা। কাঠ ঘন বাদামি, শক্ত, দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত। শালপাতা ১০-২০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা মসৃণ ও চকচকে। মার্চে এর ফুল ফোটে। ফুলের বর্ণ পীতাভ। জুন-জুলাই মাসে ফল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। শালগাছ লাল মাটি অঞ্চলে খুব ভালো জন্মে। এটি ৩০-৩৫ মিটার উঁচু হতে পারে। এর কাণ্ডের ব্যাস ২-২.৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফাল্গুন মাস ছাড়া বছরের সব সময়ই এই গাছের পাতা দেখা যায়। এ কারণে একে প্রায় চিরসবুজ বৃক্ষ বলা যায়।
বাংলাদেশ ও ভারত শালগাছের আদি নিবাস। এ ছাড়া নেপাল থেকে শুরু করে মায়ানমারেও শালগাছ জন্মায়। বাংলাদেশের ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলের বনভূমিতে শালগাছ জন্মায়। বীজ ও কপিসিংয়ের (মোথা থেকে গজানো চারা) মাধ্যমে শাল বংশবিস্তার করে থাকে। এই গাছটির বংশবিস্তার প্রাকৃতিকভাবেই হয়। কিন্তু এই গাছের বংশবিস্তারে মাটি ও আবহাওয়ার তারতম্যের বড় ভূমিকা আছে। বাংলাদেশে ভাওয়াল ও মধুপুরে গড়ে ওঠা বনে এই গাছের আধিক্য রয়েছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুরাণ ও অন্য ধর্মগ্রন্থে শালের উল্লেখ আছে। বলা হয়, বিষ্ণুর অতি প্রিয় বৃক্ষ এটি। জৈন ধর্মের ২৪তম তীর্থঙ্কর মহাবীর শালগাছের নিচেই পরম জ্ঞান লাভ করেন। বৌদ্ধ ধর্মে শালগাছ মহত্ত্বপূর্ণ। বুদ্ধদেব দুটি শালগাছের নিচে মহানির্বাণ লাভ করেন। তার জন্মও হয়েছিল লুম্বিনি উদ্যানে একটি শালগাছের নিচে। শাল ফুলের স্বল্প স্থায়িত্ব বৌদ্ধ ধর্মে জীবনের নশ্বরতার প্রতীক। সনাতন ধর্মমতে গাছটি বিষ্ণুর আশীর্বাদপ্রাপ্ত।
শাল কাঠ শক্ত হওয়ায় এর অনেক ব্যবহার রয়েছে। আয়ুর্বেদ ক্ষমতাও আছে এই গাছের। এর আঠা রক্ত আমাশয় নিবারণ করে। আগুনে দিলে আঠা থেকে সুগন্ধ বের হয়। এই গাছ থেকে উৎপন্ন ধূপ পাইনগাছের ধূপের মতোই। খয়েরি রঙের শাল কাঠ বিভিন্ন ধরনের খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পলিশ ভালো না হওয়ায় এ কাঠ ফার্নিচারের জন্য ব্যবহার কষ্টসাধ্য। তবে এই কাঠ খুব জনপ্রিয়। খুঁটি, দরজা-জানালার ফ্রেম, রেলের স্লিপার, গরুর গাড়ির চাকা, বাস-ট্রাকের বডি তৈরিতে ব্যাপক হারে শাল কাঠ ব্যবহার হয়। শালের ডালপালা, পাতা ও পরিত্যক্ত অংশ উৎকৃষ্ট জ্বালানি। শালের মোথা ও অন্য অংশ থেকে ভালো মানের কাঠ-কয়লা প্রস্তুত করা যায়। মৌমাছি শালের ফুলের মধু সংগ্রহ করে মৌচাকে জমা রাখে। শালের বীজ থেকে তেল পাওয়া যায়। বাকলে ট্যানিন এবং রঞ্জক আছে। শালগাছে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য রোগবালাই দেখা যায় না।
শালগাছের প্রাকৃতিক গুণাবলিও অনেক। চিরসবুজ বৃক্ষ হওয়ায় এই গাছ বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণে সক্ষম। এর মাধ্যমে শালগাছ প্রকৃতির ভারসাম্য ঠিক রাখতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে।
শালগাছের শক্ত বাকল মাটির ক্ষয় রোধ করতে সক্ষম। গাজীপুর, মধুপুরের পাহাড়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য রক্ষাকারী এই শালগাছ, এঁটেল মাটির বিশেষত্বকে আরও অনন্য করে তুলেছে।
মাটিদূষণ রোধেও শালগাছের শিকড় কাজ করে। মাটির ক্ষয়রোধ ও বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্যও এই গাছের অবদান অনেক।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ
মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ