গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের দেশ দেখা ভ্রমণের অংশ হিসেবে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে যাই সেন্ট মার্টিন বা নারিকেল জিঞ্জিরায়। ১১ ডিসেম্বর সকালে কক্সবাজার থেকে কর্ণফুলী এক্সপ্রেস জাহাজে করে নারিকেল জিঞ্জিরা দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে রওনা হই। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা জাহাজ ভ্রমণ শেষে বেলা পৌনে ১টায় সেন্ট মার্টিন জেটিঘাটে পৌঁছালাম। সেদিনের অর্ধেক বেলা ও পরের দিন সকাল ও বিকেল মিলিয়ে দেড় দিনে প্রায় পুরোটা দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে ফেললাম। ১৩ ডিসেম্বর সকালে নাশতা সারার আগে সহকর্মী অধ্যাপক তৈমুর ইসলামকে নিয়ে ঘণ্টাখানেকের জন্য আশপাশটায় হাঁটতে গেলাম, যদি কোনো পাখির সন্ধান পাই। কিন্তু চড়ুই, কাক ও শ্বেত খঞ্জন ছাড়া অন্য কোনো পাখির দেখা পেলাম না। হোটেল থেকে সমুদ্রের তীর বরাবর হাঁটতে হাঁটতে প্রায় দেড় কিলোমিটার চলে এলাম। একটি চায়ের দোকান দেখে চা পানের নেশা চেপে গেল। দোকানদারকে চা বানাতে বলে আশপাশটায় চোখ মেলে দ্বীপের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে থাকলাম।
তৈরি হলে চায়ে চুমুক দিতে দিতেই কোত্থেকে যেন ‘কোয়েক-কোয়েক…’, ‘পিক-পিক…’ ও কোনো কিছুর ডানা জাপটানোর শব্দ শুনতে পেলাম। ক্রমেই শব্দ বাড়তে থাকল। কাজেই দ্রুত চা পান শেষ করে শব্দের উৎস খোঁজ করতে লাগলাম। আর খানিকক্ষণ পর শব্দের উৎস আবিষ্কার করে ফেললাম। আমরা যেখানে চা পান করছিলাম, তার পাশের কয়েকটি বড় গাছে শ-খানেক শিয়ালমুখো প্রাণীকে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতে দেখলাম। ওরাই গাছে ঝুলে ঝুলে এমন শব্দ করছিল। তা ছাড়া পরস্পর মারামারিও করছিল। কিছু প্রাণীকে গাছে হাঁটাহাঁটি ও ওড়াউড়িও করতে দেখলাম। ওদের সঙ্গে প্রায় ১৮ মিনিট সময় কাটালাম। এই সময়ের মধ্যে গোটা পঞ্চাশেক ছবি তুলে হোটেলের পথে পা বাড়ালাম।
নারিকেল জিঞ্জিরায় দেখা উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা শিয়ালমুখো এই প্রাণীগুলো আর কেউ নয়। আমাদের অতি পরিচিত বহুল দৃশ্যমান স্তন্যপায়ী প্রাণী চম্পা বাদুড়। এটি বড় বাদুড় নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Flying Fox, Indian Flying Fox, Indian Fruit Bat বা Greater Indian Fruit Bat। টেরোপোডিডি (Pteropodidae) গোত্রের প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Pteropus giganteus (ট্যারোপাস জাইগেনটিয়াস)। বাংলাদেশে প্রায় সব পরিবেশে এবং সবখানেই এদের দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, যেমন- ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ প্রভৃতি দেশে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এদের আমি ভারতের কেরালার কোচি সিটির বিভিন্ন এলাকায় দেখেছি। এ ছাড়া চীন ও মায়ানমারে দেখা যায়।
চম্পা বাদুরের দেহের দৈর্ঘ্য ২৩ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার, সামনের বাহু বা অগ্রবাহু ১৭ সেন্টিমিটার। লেজ নেই। প্রসারিত অবস্থায় এক ডানার এক প্রান্ত থেকে অন্য ডানার বিপরীত প্রান্ত পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ১.২ থেকে ১.৫ মিটার। দেহের ওজন ০.৬ থেকে ১.৬ কেজি। বাংলাদেশসহ এই উপমহাদেশের বাদুড়গুলোর মধ্যে আকারে এরাই সবচেয়ে বড়। তা ছাড়া বিশ্বের বৃহদাকৃতির বাদুড় প্রজাতিগুলোর মধ্যে এরাই অন্যতম। এদের মাথা গাঢ় তামাটে-বাদামি, ঘাড় ও পিঠ তামাটে-বাদামি। পেট গাঢ় হলদে-বাদামি। ডানা বেশ বড় ও কালো, হাতে একটি করে বড় নখ থাকে। পা বড়, প্রতি পায়েই পাঁচটি করে আঙুল থকে। কালো বর্ণের কান দুটি বেশ লম্বা।
বড় বাদুর নিশাচর, সান্ধ্যচারী ও বৃক্ষচারী প্রাণী। এরা সমাজবদ্ধভাবে কয়েক শ বা হাজারখানেক একসঙ্গে বসবাস করে। গ্রামীণ ও শহুরে এলাকার কৃষিক্ষেত্র, পুকুরপাড়, রাস্তার ধার, বাগান, পার্ক প্রভৃতির বড় বড় গাছে, যেমন- বট, পাকুর, ডুমুর, তেঁতুল ইত্যাদি উপনিবেশ তৈরি করে বসবাস করে। সারা দিন গাছে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে ও রাতে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। ফলখেকো এই প্রাণীগুলো মূলত ফল ও ফলের রস, যেমন- লিচু, আম, পেয়ারা, ডুমুর ইত্যাদি খেতে পছন্দ করে। ফল খেয়ে ফলের বাগানের যথেষ্ট ক্ষতি করে। তবে ফলের পরাগায়ণে তারা যে পরিমাণ সাহায্য করে, তার তুলনায় ফল খেয়ে কমই ক্ষতি করে। খাদ্যের সন্ধানে আবাস এলাকা থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরেও চলে যেতে পারে।
এরা সারা বছর প্রজনন করতে সক্ষম হলেও জুলাই থেকে অক্টোবরে বেশি করে। আর বাচ্চা প্রসব করে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে। স্ত্রী বড় বাদুর বহুগামী অর্থাৎ বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়। স্ত্রী ১৪০ থেকে ১৫০ দিন গর্ভধারণের পর সচরাচর একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। কদাচ দুটি বাচ্চাও জন্ম নিতে পারে। স্ত্রীরা সচরাচর বাচ্চাদের লালন পালন করে। এ ক্ষেত্রে বাবার তেমন কোনো ভূমিকা নেই। বাচ্চারা প্রায় ১১ সপ্তাহ বয়সে উড়তে শিখে। সচরাচর স্ত্রী বাচ্চারা এক বছরে ও পুরুষগুলো দেড় বছরে পূর্ণতা পায়। আয়ুষ্কাল ১৫ থেকে ৩১ বছর। আবদ্ধাবস্থায় একটি বড় বাদুড়ের সর্বোচ্চ ৩১ বছর ৫ মাস বাঁচার রেকর্ড রয়েছে।
তবে এই প্রজাতির বাদুড় রোগজীবাণুর আধার হিসেবে কাজ করে। এদের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রাণঘাতী রোগ ছড়াতে পারে। কাজেই এই দিক থেকে আমাদের সাবধান থাকতে হবে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
