সারা বছরই ফোটে এবং প্রায় সব বাগানে দেখা যায়, এমন একটি ফুল হলো নয়নতারা। এর বাংলা অন্য নাম হচ্ছে সদাবাহার, সদাফুলি, সদাসোহাগি ইত্যাদি। প্রতিদিন ফোটে বলে এ ফুলের আরেক নাম নিত্যবিলাস। নয়নতারা ফুল গোলাপি, সাদা, হালকা গোলাপি কিংবা মিশ্র রঙের হতে পারে। তবে ফুলের মধ্যবিন্দুটি অন্য রঙের হয়। যেমন- সাদার মাঝে লাল, গোলাপির মাঝে হলুদ। দেশের নার্সারিগুলোতে এখন হাইব্রিড জাতের অনেক রঙের নয়নতারা ফুলের গাছ পাওয়া যায়। আর এ জাতগুলো দিন দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর সকালে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে শিল্পাচার্য জয়নুল উদ্যানে হাঁটতে গিয়ে কাচারিঘাটসংলগ্ন বাংলাদেশ নার্সারির বিক্রয়কেন্দ্রে নয়নতারার দেখা পেলাম। ঝটপট ছবি তুলে নিলাম।
নয়নতারার বৈজ্ঞানিক নাম Catharanthus roseus, এটি Apocynaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। এটি ইংরেজিতে Cape periwinkle, Madagascar periwinkle, Periwinkle ইত্যাদি নামে পরিচিত।
নয়নতারার ফুলের আদি নিবাস আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কারে। মাদাগাস্কার ছাড়াও ওই মহাদেশের অন্য বেশ কয়েকটি দেশসহ বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে এর দেখা পাওয়া যায়।
নয়নতারা ফুলগাছ বহু শাখাবিশিষ্ট কাষ্ঠল গুল্ম। এটি এক মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। নয়নতারার শাখা বা ডালের পর্বসন্ধি থেকে এক জোড়া করে পাতা বের হয়। পাতা বিপরীতমুখী, মসৃণ ও অনেকটা ডিম্বাকৃতির। পাতা বোঁটাসহ ৫-৮ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ২ থেকে ৩ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার প্রশস্ত হয়। পাতার উপরিভাগ গাঢ়-সবুজ থাকলেও নিচের ভাগ হালকা বর্ণের। মঞ্জরিদণ্ড ২-৩ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। তাতে ফুল ফোটে। ফুলে তেমন গন্ধ নেই। ফুল পাঁচ পাপড়িবিশিষ্ট। পাপড়িগুলো চারদিকে ছড়ানো থাকে। এর ফলের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফল লম্বালম্বিভাবে দুটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত। প্রতিটি ফলে ১৬-৩০টি পর্যন্ত বীজ থাকে। বীজ সরিষার বীজের মতো। গোটা গাছ তেঁতো স্বাদের।
নয়নতারা গাছ সবার পছন্দের। বিশেষ কোনো পরিচর্যা ছাড়াই এ ফুল গাছ সারা বছর টিকে থাকে। বীজের সাহায্যে বংশ বৃদ্ধি করে। শীতের সময় এ গাছের বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কমে যায়। এ সময় তেমন একটা ফুল ফোটে না। আর ফুল আকারে ছোট হয়ে যায়। তবে শীতের শেষে এর বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
নয়নতারার অনেক ঔষধি গুণ রয়েছে। গাছটির পাতা, ফুল ও ডালে বহু মূল্যবান রাসায়নিক উপাদান পাওয়া যায়। এ গাছ থেকে ৭০টিরও বেশি অ্যালকালয়েড পাওয়া যায়। এ গাছ থেকে পাওয়া ভিনক্রিস্টিন ও ভিনব্লাস্টিন নামের অ্যালকালয়েড লিউকেমিয়া রোগে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া
ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে, রক্তশূন্যতা দূর করতে এবং কৃমিনাশক হিসেবে এটি ব্যবহার হয়ে থাকে। নারীদের অনিয়মিত মাসিকের সমস্যায়ও নয়নতারা ব্যবহার হয়ে থাকে। তা ছাড়া স্মৃতিশক্তিবর্ধক হিসেবে নয়নতারার সুনাম রয়েছে। এসব ছাড়াও সন্ধিবাত, বহুমূত্রসহ নানা রোগে এর ব্যবহার রয়েছে। মৌমাছি ও বোলতা প্রভৃতির হুলের জ্বালা নিরাময়ে নয়নতারা ফুল বা পাতার রস ব্যবহার করা হয়।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ