পদ্মকূলের আমি পদ্মিনী বঁধু
এনেছি শাপলা পদ্মের মধু।’
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের কথাগুলোর মতোই শরতে ফোটা শাপলা ফুলগুলো বড়ই মধুর এক শোভা নিয়ে আসে। ফুলের মধু পান করতে ওর বুকে নেমে আসে ভ্রমররা। আহা! শত-সহস্র ফুল ফোটা শরতের সেই শোভা যে না দেখেছে সে আসলে বুঝবে না বাংলার শরৎ আর আমাদের জাতীয় ফুলের মাহাত্ম্যকে। আদিগন্ত বিলের পানিতে ভাসতে থাকে থালার মতো গোল গোল পাতা, সেসব পাতার ফাঁক দিয়ে শরতের নীল আকাশকেই যেন নিবেদন করে শাপলাগাছ তার ফুলকে।
ঢাকা শহরে তেমন বিস্তীর্ণ বিল কই? তবুও গেলাম এই শরতের এক সকালে বলধা উদ্যানে শাপলা ফুল ফুটেছে কি না দেখতে। উদ্যানের সাইকি অংশে থাকা ছোট ছোট চৌবাচ্চার ভেতর কয়েক রকমের শাপলা দেখে মুগ্ধ হলাম। বিস্তীর্ণ বিলে আছে সাদা আর লাল শাপলা। কিন্তু বলধা উদ্যানে ছোট ছোট চৌবাচ্চার ভেতরে আছে সাত রকমের শাপলা। ভাবলাম, এর নামটা কেন শাপলা হলো? সারা দেশেই তো বর্ষা-শরতে শাপলা পাতা আর ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় বিল-ঝিল। গাঁয়ের বুকে সেই শাপলা চাদরে চলে ডিঙি নৌকা। হয় জলবিহারের আনন্দ ভ্রমণ। আর গাঁয়ের হতদরিদ্র কিশোর-কিশোরীরা মেতে ওঠে শাপলা আহরণে।
শাপলা রূপবৈভবের চেয়ে পেটের টানটাই যেন ওদের বেশি! কয়েক আঁটি শাপলা বেচে হয়তো জুটবে একবেলার আহার! সেই শাপলাই আমাদের গৌরব, সাদা শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। নীল শাপলা আবার শ্রীলঙ্কার জাতীয় ফুল, সাদা শাপলা ভারতের অন্ধ্র প্রদেশেরও রাজ্য ফুল। কিন্তু লাল শাপলার তো সে রকম কোনো মর্যাদা দেখি না। সাদা শাপলা জাতীয় ফুল হলেও এ দেশে সেও এক অবহেলিত উদ্ভিদ, জলজ আগাছা।
প্রাপ্ত বিভিন্ন জীবাশ্ম সাক্ষ্য দেয়, আজ থেকে প্রায় ১৬ কোটি বছর আগেও পৃথিবীর বুকে শাপলাগাছের অস্তিত্ব ছিল। প্রাচীন মিসরে সাদা ও নীল শাপলার অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়ার বহু দেশে শাপলা জন্মে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডেও শাপলা আছে। আমাদের দেশের প্রায় সর্বত্র পানিতে-ডোবায়, বিলে-ঝিলে, পুকুরে-খালে শাপলা জন্মে থাকে। এর পুষ্পদণ্ড হচ্ছে নল বা পাইপের মতো। তাই এর স্থানীয় নাম ‘নাল’ বা ‘নাইল’। পৃথিবীতে আর কোনো ফুলের বোঁটা বা পুষ্পনল এত লম্বা আছে বলে আমার জানা নেই। ফুলের বোঁটা সাপের মতো নলাকার ও লম্বা বলেই এর নাম হয়েছে শাপলা। এ দেশে সাদা শাপলাই বেশি, এরপর দেখা যায় লাল শাপলা। লাল শাপলা ফুলগুলো যেন বুকে জ্বালা ধরায়। গাজীপুরের পূবাইলে জলজঙ্গলের কাব্যের পুকুরগুলোতে ফোটা বড় লাল শাপলাগুলোকে দেখে নজরুলের একটি গানের কিছু কথা মনে পড়ছিল, ‘গিয়া তারে দিয়া আইস আমার শাপলা মালা/ আমার তরে লইয়া আইস তাহার বুকের জ্বালা।’
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ঢাকায় নিযুক্ত সিভিল সার্জন জেমস টেইলর তার ‘টপোগ্রাফি অব ঢাকা’ বইটিতে ঢাকার যেসব গাছের নাম লিখেছেন তার মধ্যে শাপলা, শালুক, পদ্ম, পানিকলা, মাখনা, রক্তকমল (লাল শাপলা) ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদ অন্যতম। ঠিক ২০০ বছর আগে ১৮২৫ সালে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন, আট বছর তিনি এখানে ছিলেন। সে সময়ই তিনি এ দেশে কয়েক রকমের শাপলা দেখেছিলেন। বলধা উদ্যানে গিয়ে পেলাম সাদা, গোলাপি, লাল, নীল ও বেগুনি শাপলা। বর্ষাকাল থেকে ধানমন্ডি ঝিলের পানিতে ফুটছে লাল শাপলা।
নিমফায়েসি গোত্রের গাছগুলোকে একত্রে শাপলা বলা হয়। বিশ্বে এ গোত্রে প্রায় ৭০ প্রজাতির শাপলা আছে। শাপলা বর্ষজীবী জলজ-বিরুৎপ্রকৃতির উদ্ভিদ। বছরে একবার ফুল দেওয়ার পরই সে গাছে ফল হয়, এরপর গাছ মরে যায়, কিন্তু গোড়ার মোথাটা পানির নিচে মাটির মধ্যে রয়ে যায়। গাছের কন্দ ও শিকড় থাকে পানির নিচে কাদার ভেতর। সেখান থেকে গাছ গজায়। লম্বা নলের মতো পত্রদণ্ডের মাথায় থাকে পত্রফলক বা পাতা। পাতা গোলাকার, কিনারা খাঁজকাটা, বোঁটার কাছে হৃৎপিণ্ডাকারে খাঁজ কাটা, পাতা পানির ওপর ভাসে। লম্বা নলাকার পুষ্পদণ্ডের মাথায় পানির ওপর ফুল ফোটে। ফুলের অনেক পাপড়ি। প্রজাতিভেদে পাপড়ির রং হয় সাদা, হলুদ, ঘিয়ে, নীলাভ, বেগুনি, লাল ইত্যাদি। বীজ হয়, বীজ ও কন্দ থেকে চারা হয়। শাপলার ইংরেজি নাম ওয়াটার লিলি। লাল শাপলার উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Nymphaea pubescens. শাপলা ফুল দেখতে খুবই সুন্দর। শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে তাই জলজ উদ্যানে লাগানো হয়। লাল শাপলার ঔষধিগুণ আছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ