শরতের এক সকালে ফুরফুরে মেজাজে হাঁটছিলাম রমনা উদ্যানের ভেতর। ধবধবে সাদা কাঞ্চন ফুল ফুটে ভরে আছে কয়েকটা গাছ। শরতে শ্বেতকাঞ্চন ছাড়া অন্য কাঞ্চন ফোটে না। হঠাৎ একটা ফুলের বুকে কে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। খেয়াল করতেই দেখলাম একটা পোকা ফুলের মাঝখানে বসে ঘাড় গুঁজে কি যেন খেয়েই চট করে উড়াল দিল। খুব তাড়া আছে মনে হলো তার।
পোকার ছবিটা তোলার জন্য কয়েক সেকেন্ড মাত্র সময় পেলাম। এত চঞ্চল যে বসতেই চায় না সে। এরপর ছবি দেখে দেখে পোকাটাকে চেনার চেষ্টা করলাম। পোকাটা দেখতে কিছুটা মৌমাছির মতো, আবার খানিকটা ভ্রমর ও ভিমরুলের মতোও মনে হলো ওর কালো রং দেখে। কিন্তু ভিমরুলের চেয়ে ছোট, আর কাঁধের ওপর হলদে পশমি চওড়া পট্টির মতো আবরণ রয়েছে, যা ভিমরুল ও ভ্রমরে নেই। ওর ডানাগুলো কালো, দেহ কালো ও পশমযুক্ত। পোকাটার নাম কাঠ মৌমাছি, কেউ কেউ বলেন ছুতার মৌমাছি। এ পোকার ইংরেজি নাম কার্পেন্টার বি। সে থেকেই বোধ হয় বাংলায় এ নাম হয়েছে।
হাইমেনোপ্টেরা বর্গ অর্থাৎ মৌমাছি-বোলতা মৌমাছির এ পোকার বৈজ্ঞানিক নাম Xylocopa aestuans, গোত্র এপিডি। এরা মাঝারি আকৃতির পুরু পশমযুক্ত গাট্টাগোট্টা মৌমাছি। দেহ প্রায় ২০ মিলিমিটার লম্বা। কাঠ মৌমাছিরা দেখতে কিছুটা ভ্রমরের মতো হলেও ভ্রমরের চেয়ে এরা কম পশমযুক্ত ও বেশি চ্যাপ্টা। এরা মরা ও নরম কাঠের ভেতর সুড়ঙ্গ করে বাসা তৈরি করে, সে জন্য এদের বলে কাঠ মৌমাছি। সাধারণত মেয়েরাই বাসা বানায়, সে বাসার ভেতরে ডিম পাড়ে, সেখানে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। তবে অনেক সময় স্ত্রী-পুরুষরা মিলেমিশেও বাসা বানায়। একটা বাসা বানাতে দুজনের প্রায় সপ্তাহখানেক সময় লেগে যায়। মরা ও পচনশীল কাঠ, নরম কাঠের গাছ, ঘরের পুরোনো কাঠ, বাঁশ ইত্যাদিতে এরা বাসা বানায়।
এদের আচার-আচরণ বেশ অদ্ভুত। বাচ্চারা বাসায় সুড়ঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। আর প্রাপ্তবয়স্ক কাঠ মৌমাছিরা উড়ে উড়ে শত শত ফুল থেকে ফুলের নেকটার বা মধু মাখানো পুষ্পরেণু সংগ্রহ করে বাচ্চাদের জন্য নিয়ে আসে। আমরা যেমন মধু ও জেলি দিয়ে পাউরুটি খাই, বাচ্চাগুলোও আনন্দের সঙ্গে সেই মধুমাখা রেণু খায়। এ খাবারকে বলা হয় মৌমাছির রুটি বা বি-ব্রেড। বাচ্চাদের এভাবে খাওয়ানোর অস্বাভাবিক রীতি মনে হয় এ প্রজাতির কাঠ মৌমাছিদেরই আছে। প্রাপ্তবয়স্ক মৌমাছিরাও এ খাবার খায়। তবে তারা সুযোগ পেলে লালচে-কমলা রঙের নালশো বা লাল গেছো পিঁপড়াদের (Oecophylla smaragdina) শিকার করতে ছাড়ে না। বিশেষ করে মেয়ে কাঠ মৌমাছিদের এ রকম স্বভাব দেখা যায়। কর্ণাটকের গবেষকরা দেখেছেন, নালশোদের দেখলে সেখানে ওদের ডেরায় গিয়ে বা চলাচলের পথে আক্রমণ করে, যুদ্ধ করে তাকে হত্যা করে, পরে মুখে করে সেই শবদেহ ওদের বাসায় নিয়ে আসে। বাসায় এসে চলে পিকনিক পার্টি। তবে প্রশ্ন উঠেছে যে এটা কি তারা সব সময় করে, নাকি যখন ফুল ও ফুলের রেণু-মধু পায় না তখন করে? এর উত্তর এখনো গবেষকরা পাননি। সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে দেখা হয়নি যে ভোজের সময় ওরা আসলে কী করে?
বি-ব্রেডের সঙ্গে কি লাল গেছো পিঁপড়েদের রোস্টের মতো ওরা চিবিয়ে চিবিয়ে খায়? ফুলের মধু ও রেণু আনতে গিয়ে ওদের অন্য মৌমাছি, প্রজাপতি, বোলতা ইত্যাদি পরাগযোগকারী পোকাদের সঙ্গে তো প্রতিযোগিতা করতে হয়। তার চেয়ে নালশো শিকার করে খাওয়াই তো ভালো, এ ক্ষেত্রে ওদের কোনো প্রতিযোগী নেই। কে ওই নালশোদের বিষকামড় সহ্য করে শিকার করতে যাবে? নালশোদের যে ওরা শিকার করে খায়, সেটাও আগে জানা ছিল না, সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণা করলে নিশ্চয়ই ওদের আরও অনেক মজার আচরণ দেখা যাবে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই এদের দেখা যায়। আফ্রিকাতেও কাঠ মৌমাছি আছে, তবে তার প্রজাতি ভিন্ন, সেগুলো বেশি পশমযুক্ত। সারা বিশ্বে জাইলোকোপা গণের প্রায় ৪৫০ প্রজাতির কাঠ মৌমাছি আছে। আমাদের দেশে দু-চারটি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এরা কিছুটা মানুষজনের সান্নিধ্য বা লোকালয়ে থাকতে পছন্দ করে। শহরের বিভিন্ন পার্কে, সবজি খেতে এদের বেশ দেখা যায়। এরা একা একাও থাকে। আবার দলবদ্ধভাবেও থাকতে দেখা যায়। পুরুষরা গাঢ় হলুদ রঙের, মেয়েরা কালো ও তাদের ঘাড়ের ওপরে হলুদ রঙের খাটো ঘন খাড়া পশমযুক্ত পট্টি থাকে। খাদ্যের সন্ধানে এরা ফুলে ফুলে ঘোরে, সে বেড়ানোতেই ফুলের পরাগায়ন ঘটে। ফুল গাছে এখন বিষাক্ত কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ায় ওদের খুব অসুবিধা হচ্ছে, খাদ্যের টান পড়েছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ