ঢাকা ৩ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
সিলেটে হাম ও হাম উপসর্গে মৃত্যু ৭০ ছাড়িয়েছে স্বপ্নের চাকরির খোঁজে তরুণদের ভিড়, ঠাকুরগাঁওয়ে ব্যতিক্রমী জব ফেয়ার সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ৪টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৬ষ্ঠ পর্ব, এইচএসসির বাংলা ১ম পত্র পুঠিয়ায় ট্রাক-অটোরিকশা সংঘর্ষে ২ ভাই নিহত ডাক্তারের চেম্বারে একদিন চট্টগ্রামে শিশু আয়াত হত্যা মামলায় আসামির মৃত্যুদণ্ড ফুটবল জার্সিতে শিশু যীশু: মেক্সিকো সিটির ক্যাথেড্রালে ভক্তদের অলৌকিক প্রার্থনা ফিফার বাপ স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে বেরোবি ছাত্রদল নেতার পদ স্থগিত জামালপুরে স্ত্রী হত্যায় মৃত্যুদণ্ড ও শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন কুমিল্লায় চাকরি মেলা, কর্মসংস্থানের সন্ধানে তরুণ-তরুণীদের ঢল পটুয়াখালীতে সেপটিক ট্যাংকে নেমে ২ শ্রমিকের মৃত্যু গফরগাঁওয়ে স্বামীকে ঘরে বেঁধে গৃহবধূকে তুলে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ চীনের ডেইরি কারখানায় উৎপাদন বাড়াচ্ছে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি আমাদের ঘরগুলো কি রহমত শূন্য হচ্ছে? বাংলাদেশের বাজারে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করবে দারাজ টুকটুক ও চিকু পাঠ থেকে ৪টি সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন, ২য় পর্ব, পঞ্চম শ্রেণির বাংলা গোল করার পর কান্নার কারণ জানালেন মেসি রংপুরে হিমাগারের ভাড়া বাড়ানোয় মহাসড়ক অবরোধ সোনামসজিদ পরিদর্শন করলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সময়মতো পূর্বাভাসেই বেঁচে যাচ্ছে চীনের জুঁই বাজেটকে একটি গোষ্ঠী গণবিরোধী বলছে: প্রধানমন্ত্রী মৌলভীবাজারে নারী-তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে মুখর জনসভা শরীয়তপুরে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল মাঠে মদ্রিচ আমার ডান হাত: জ্লাতকো ডালিচ প্রস্তাবিত বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি: সিপিডি ওয়াহিদুল হত্যার আসামিদের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল আদালত চত্বর ভারতে ৩ বছর কারাভোগ শেষে দেশে ফিরলেন ৬ নারী শরীয়তপুরে ছোট ভাইয়ের লাঠির আঘাতে প্রাণ গেল বড় ভাইয়ের ‘আমরাই মেসির কাজটা সহজ করে দিয়েছি’, বললেন আলজেরিয়ার কোচ
Nagad desktop

কাঞ্চন ফুলে কাঠ মৌমাছি

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:০৫ এএম
আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:২৩ এএম
কাঞ্চন ফুলে কাঠ মৌমাছি
রমনা পার্কে সম্প্রতি দেখা কাঠ মৌমাছি। ছবি: লেখক

শরতের এক সকালে ফুরফুরে মেজাজে হাঁটছিলাম রমনা উদ্যানের ভেতর। ধবধবে সাদা কাঞ্চন ফুল ফুটে ভরে আছে কয়েকটা গাছ। শরতে শ্বেতকাঞ্চন ছাড়া অন্য কাঞ্চন ফোটে না। হঠাৎ একটা ফুলের বুকে কে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। খেয়াল করতেই দেখলাম একটা পোকা ফুলের মাঝখানে বসে ঘাড় গুঁজে কি যেন খেয়েই চট করে উড়াল দিল। খুব তাড়া আছে মনে হলো তার।

পোকার ছবিটা তোলার জন্য কয়েক সেকেন্ড মাত্র সময় পেলাম। এত চঞ্চল যে বসতেই চায় না সে। এরপর ছবি দেখে দেখে পোকাটাকে চেনার চেষ্টা করলাম। পোকাটা দেখতে কিছুটা মৌমাছির মতো, আবার খানিকটা ভ্রমর ও ভিমরুলের মতোও মনে হলো ওর কালো রং দেখে। কিন্তু ভিমরুলের চেয়ে ছোট, আর কাঁধের ওপর হলদে পশমি চওড়া পট্টির মতো আবরণ রয়েছে, যা ভিমরুল ও ভ্রমরে নেই। ওর ডানাগুলো কালো, দেহ কালো ও পশমযুক্ত। পোকাটার নাম কাঠ মৌমাছি, কেউ কেউ বলেন ছুতার মৌমাছি। এ পোকার ইংরেজি নাম কার্পেন্টার বি। সে থেকেই বোধ হয় বাংলায় এ নাম হয়েছে।

হাইমেনোপ্টেরা বর্গ অর্থাৎ মৌমাছি-বোলতা মৌমাছির এ পোকার বৈজ্ঞানিক নাম Xylocopa aestuans, গোত্র এপিডি। এরা মাঝারি আকৃতির পুরু পশমযুক্ত গাট্টাগোট্টা মৌমাছি। দেহ প্রায় ২০ মিলিমিটার লম্বা। কাঠ মৌমাছিরা দেখতে কিছুটা ভ্রমরের মতো হলেও ভ্রমরের চেয়ে এরা কম পশমযুক্ত ও বেশি চ্যাপ্টা। এরা মরা ও নরম কাঠের ভেতর সুড়ঙ্গ করে বাসা তৈরি করে, সে জন্য এদের বলে কাঠ মৌমাছি। সাধারণত মেয়েরাই বাসা বানায়, সে বাসার ভেতরে ডিম পাড়ে, সেখানে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। তবে অনেক সময় স্ত্রী-পুরুষরা মিলেমিশেও বাসা বানায়। একটা বাসা বানাতে দুজনের প্রায় সপ্তাহখানেক সময় লেগে যায়। মরা ও পচনশীল কাঠ, নরম কাঠের গাছ, ঘরের পুরোনো কাঠ, বাঁশ ইত্যাদিতে এরা বাসা বানায়।
 
এদের আচার-আচরণ বেশ অদ্ভুত। বাচ্চারা বাসায় সুড়ঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। আর প্রাপ্তবয়স্ক কাঠ মৌমাছিরা উড়ে উড়ে শত শত ফুল থেকে ফুলের নেকটার বা মধু মাখানো পুষ্পরেণু সংগ্রহ করে বাচ্চাদের জন্য নিয়ে আসে। আমরা যেমন মধু ও জেলি দিয়ে পাউরুটি খাই, বাচ্চাগুলোও আনন্দের সঙ্গে সেই মধুমাখা রেণু খায়। এ খাবারকে বলা হয় মৌমাছির রুটি বা বি-ব্রেড। বাচ্চাদের এভাবে খাওয়ানোর অস্বাভাবিক রীতি মনে হয় এ প্রজাতির কাঠ মৌমাছিদেরই আছে। প্রাপ্তবয়স্ক মৌমাছিরাও এ খাবার খায়। তবে তারা সুযোগ পেলে লালচে-কমলা রঙের নালশো বা লাল গেছো পিঁপড়াদের (Oecophylla smaragdina) শিকার করতে ছাড়ে না। বিশেষ করে মেয়ে কাঠ মৌমাছিদের এ রকম স্বভাব দেখা যায়। কর্ণাটকের গবেষকরা দেখেছেন, নালশোদের দেখলে সেখানে ওদের ডেরায় গিয়ে বা চলাচলের পথে আক্রমণ করে, যুদ্ধ করে তাকে হত্যা করে, পরে মুখে করে সেই শবদেহ ওদের বাসায় নিয়ে আসে। বাসায় এসে চলে পিকনিক পার্টি। তবে প্রশ্ন উঠেছে যে এটা কি তারা সব সময় করে, নাকি যখন ফুল ও ফুলের রেণু-মধু পায় না তখন করে? এর উত্তর এখনো গবেষকরা পাননি। সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে দেখা হয়নি যে ভোজের সময় ওরা আসলে কী করে?

বি-ব্রেডের সঙ্গে কি লাল গেছো পিঁপড়েদের রোস্টের মতো ওরা চিবিয়ে চিবিয়ে খায়? ফুলের মধু ও রেণু আনতে গিয়ে ওদের অন্য মৌমাছি, প্রজাপতি, বোলতা ইত্যাদি পরাগযোগকারী পোকাদের সঙ্গে তো প্রতিযোগিতা করতে হয়। তার চেয়ে নালশো শিকার করে খাওয়াই তো ভালো, এ ক্ষেত্রে ওদের কোনো প্রতিযোগী নেই। কে ওই নালশোদের বিষকামড় সহ্য করে শিকার করতে যাবে? নালশোদের যে ওরা শিকার করে খায়, সেটাও আগে জানা ছিল না, সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণা করলে নিশ্চয়ই ওদের আরও অনেক মজার আচরণ দেখা যাবে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই এদের দেখা যায়। আফ্রিকাতেও কাঠ মৌমাছি আছে, তবে তার প্রজাতি ভিন্ন, সেগুলো বেশি পশমযুক্ত। সারা বিশ্বে জাইলোকোপা গণের প্রায় ৪৫০ প্রজাতির কাঠ মৌমাছি আছে। আমাদের দেশে দু-চারটি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এরা কিছুটা মানুষজনের সান্নিধ্য বা লোকালয়ে থাকতে পছন্দ করে। শহরের বিভিন্ন পার্কে, সবজি খেতে এদের বেশ দেখা যায়। এরা একা একাও থাকে। আবার দলবদ্ধভাবেও থাকতে দেখা যায়। পুরুষরা গাঢ় হলুদ রঙের, মেয়েরা কালো ও তাদের ঘাড়ের ওপরে হলুদ রঙের খাটো ঘন খাড়া পশমযুক্ত পট্টি থাকে। খাদ্যের সন্ধানে এরা ফুলে ফুলে ঘোরে, সে বেড়ানোতেই ফুলের পরাগায়ন ঘটে। ফুল গাছে এখন বিষাক্ত কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ায় ওদের খুব অসুবিধা হচ্ছে, খাদ্যের টান পড়েছে।


লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সবুজ পাতায় সাদা ফুলের গালিচা

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:২২ এএম
সবুজ পাতায় সাদা ফুলের গালিচা
ময়মনসিংহের কাচারিঘাটের নার্সারিতে ফোটা সাদা পর্তুলাকা ফুল ছবি: লেখক

পর্তুলাকা আমাদের কাছে মূলত ‘টাইম ফুল’ বা ‘নাইন ও-ক্লক’ হিসেবে বেশি পরিচিত। এর সাদা রঙের জাতটি বাগানের সৌন্দর্য বর্ধনে এবং ভেষজ চিকিৎসায় এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Portulaca Oleracea, এটি Portulacaceae পরিবারের বীরুৎ। এটি সাধারণত একবর্ষজীবী বা বহুবর্ষজীবী রসালো প্রকৃতির লতানো উদ্ভিদ। অনেকের কাছে এই ফুল ‘মস রোজ’ নামে পরিচিত। 

সাদা পর্তুলাকা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এর শারীরিক গঠন শুষ্ক পরিবেশেও টিকে থাকার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। এর কাণ্ড নরম, মাংসল ও রসালো এবং মাটির বুক ঘেঁষে লতানো প্রকৃতির হয়ে থাকে। কাণ্ড সাধারণত মসৃণ এবং সবুজ বা হালকা লালচে-বেগুনি রঙের হয়।
পাতাগুলো আকারে ছোট, পুরু, চামড়ার মতো মসৃণ এবং রসালো। এগুলো কাণ্ডের সঙ্গে পর্যায়ক্রমিক বা বিপরীতমুখীভাবে সাজানো থাকে। পাতাগুলো পানি ধরে রাখতে পারে যা উদ্ভিদটিকে খরাসহিষ্ণু করে তোলে।

এর প্রধান আকর্ষণ হলো এর ধবধবে সাদা ফুল। ফুলগুলো সাধারণত ডালের একদম মাথায় গুচ্ছ আকারে ফোটে। এতে ৫টি নরম পাপড়ি থাকে এবং মাঝখানে হলুদ রঙের পুংকেশর দৃশ্যমান হয়, যা সাদা পাপড়ির মাঝে এক অপূর্ব বৈপরীত্য তৈরি করে। এই ফুলের সবচেয়ে মজার বৈশিষ্ট্য হলো এর ফোটার সময়। সাধারণত কড়া রোদ না উঠলে এই ফুল ফোটে না। সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ফুলগুলো পূর্ণতা পায় এবং বিকেল হতেই আবার বুজে যায়। এই কারণেই একে ‘টাইম ফুল’ বলা হয়।

ফুল শুকিয়ে যাওয়ার পর সেখানে ছোট ছোট ডিম্বাকার ক্যাপসুল বা ফল তৈরি হয়। এই ফলের ভেতর অসংখ্য ক্ষুদ্র, কালচে বা ধূসর রঙের বীজ থাকে। বাতাসের মাধ্যমে বা মাটিতে পড়ে এই বীজ থেকেই খুব সহজে নতুন চারা গজায়।

সাধারণত আমরা একে কেবলই শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ মনে করলেও, এর রয়েছে নানাবিধ পুষ্টি ও ঔষধি গুণ। অন্যান্য পর্তুলাকা ফুলের মতো সাদা পর্তুলাকার রয়েছে নান্দনিক ও উদ্যানতাত্ত্বিক গুরুত্ব। সাদা পর্তুলাকা খুব কম পরিচর্যাতেই ঘন হয়ে চমৎকার একঝাঁক সাদা ফুলের গালিচা তৈরি করতে পারে। বারান্দার ঝুলন্ত টবে বা ছাদবাগানের রক গার্ডেনে এই লতানো গাছটি লাগালে তা দেখতে অত্যন্ত সুন্দর লাগে। তীব্র খরা বা কড়া রোদেও এই গাছ মরে না। ফলে ব্যস্ত মানুষের বাগানের জন্য এটি একটি আদর্শ উদ্ভিদ।

সাদা পর্তুলাকার রয়েছে কিছু ভেষজ গুণ। পর্তুলাকা বা পার্সলেন উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়, যা হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরী। এতে রয়েছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি এবং ভিটামিন-ই, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ত্বকের বার্ধক্য রোধে সাহায্য করে। ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় এর রস পেটের অসুখ, আমাশয় এবং লিভারের নানাবিধ সমস্যায় পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ গাছের রস পোকা-মাকড়ের কামড়, হালকা পুড়ে যাওয়া বা ত্বকের অ্যালার্জি দূর করতে বাহ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়।

এর উজ্জ্বল হলুদ পুংকেশর ও সাদা পাপড়ি মৌমাছি, প্রজাপতি এবং অন্যান্য পরাগায়নকারী কীটপতঙ্গকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে, যা আশপাশের পরিবেশের পরাগায়নে সহায়তা করে। লতানো স্বভাবের কারণে এটি মাটির উপরিভাগ দ্রুত ঢেকে ফেলে, যা তীব্র রোদে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং মাটির ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।

সাদা পর্তুলাকা শুধু একটি সাধারণ ফুলগাছই নয়, বরং এটি প্রকৃতি, স্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। স্বল্প যত্নে বেশি আনন্দ পেতে আপনার ঘরের বারান্দা বা ছাদবাগানে অনায়াসেই এই গাছের জায়গা হতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ।

চমৎকার জয়ফুল মথ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
চমৎকার জয়ফুল মথ
খুলনার দৌলতপুরে সম্প্রতি দেখা জয়ফুল মথ।

জ্যৈষ্ঠ মাসে সাধারণত প্রচণ্ড গরম পড়ে। তবে এ বছরের ৩০ মে ভোরবেলাটা অন্যরকম লাগছিল। মেঘমাখা রোদ্দুর আর বিস্তীর্ণ পাটখেতের গাছগুলোর হাওয়া, তার পাশের আইল দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যেন এক আলাদা প্রশান্তি পাচ্ছিলাম। পাটগাছগুলো আমার বুক বা মাথা সমান লম্বা হয়েছে, কোনো কোনো গাছের ডগার পাতাগুলো ডিঙি নৌকার মতো কুঁকড়ে গেছে।

কাছে গিয়ে কিসে এমন হলো তা পরখ করতে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অনুমান, পাটের লাল মাকড়ই পাটগাছের এ দশা করেছে। তবু না দেখে বিশ্বাস নেই। পাতা উল্টে দেখার চেষ্টা করলাম। নাহ্, মাকড়রা এত ক্ষুদ্র হয় যে সেগুলো আতশ কাচ দিয়ে দেখা ছাড়া বোঝার উপায় নেই। কিছু সাদাটে আঁশের মতো দেখতে পেলাম। তাতে অনুমান সত্য বলে মনে হলো। আরও কোনো পোকামাকড় পাটগাছে পাই কি না, তা খুঁজতে লাগলাম। 

ডগায় একটি বড় বাদামি রঙের কেড়ি পোকার দেখা পেলাম। ওরা বোধ হয় ভালো দেখতে পায়। কিছুতেই নিজেকে আড়ালে রাখতে ছাড়ছে না। আমি যতই তার কাছে গিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করি, ততই সে স্থান বদলায়। ফোকাসই করতে পারছিলাম না। দু-একটি ছবি তুলে শেষে হাল ছাড়তে হলো। কেননা ওটা হঠাৎ টুপ করে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে হারিয়ে গেল। ওটাকে খুঁজতে গিয়েই খুলনার দৌলতপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বিশাল পাটখেতের মধ্যে ঘাগড়া আগাছার পাতার ওপর দেখতে পেলাম আরেকটি পোকাকে।

পোকাটি এত্ত ছোট যে কেউ ভালো করে খেয়াল না করলে তাকে দেখাই যায় না। লম্বা আধা সেন্টিমিটারের চেয়ে একটু বেশি হতে পারে, তবে এক সেন্টিমিটার হবে না। কিন্তু পোকাটির রং-রূপ আমাকে মুগ্ধ করল। এত ক্ষুদ্র একটি পোকার দেহে প্রকৃতির কোন শিল্পী এত রূপ দিয়েছে? বিস্ময়কর! 

কালচে বাদামি পাখার ওপর হলদে-সাদা কয়েকটি ফোঁটা, প্রাকৃতিক রংগুলোর এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ মিল বা ম্যাচিং ফুল, কুঁড়ি ও পাতায় বহুবার দেখেছি। কিন্তু পোকার ক্ষেত্রে এটি যেন আমার কাছে আরও বেশি বিস্ময়কর বলে মনে হয়।

জানি যে ওদের এই আকর্ষণীয় রং ও চেহারা রাখতে হয় সাথিকে মিলনে আমন্ত্রণের জন্য, কেউ কেউ আবার নেচে নেচে সে আমন্ত্রণ জানায়, আবার কেউ আমন্ত্রণ জানায় গা থেকে বিশেষ একধরনের ঘ্রাণ বাতাসে ছেড়ে। মেয়েরা যেমন সাজুগুজুর পর পারফিউম স্প্রে করে বের হয়, অনেকটা তেমনই। পোকাদের এ বিস্ময়কর জগৎ দেখা ও অনুভব করার মজাটাই আলাদা।

যাহোক, নিচু হয়ে পাটখেতের মধ্যেই বসে পড়লাম সে নকশাদার ডানার সুন্দরীকে ভালো করে দেখার আশায়। পাখার ওপরে ফোঁটাগুলোর মধ্যে তিনটি একটু বড় ও পাখার ওপরের দিকে ত্রিভুজাকারে সজ্জিত, পাখার পেছনের দিকে আবার কয়েকটি ফোঁটা সারি করে সাজানো। পাখার পেছন প্রান্ত ঝালরের মতো। এবার এ পোকাটি আর আমাকে নিরাশ করল না, স্থির হয়ে ঘাগড়া পাতার ওপর বেশ কিছুক্ষণ বসে রইল। আমিও আনন্দের সঙ্গে ওর বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম।

পোকাটির চেহারা দেখে একবার ভেবেছিলাম স্পিটল বাগ বা থুতু পোকা। কিন্তু আকার ও পাখার রঙের সঙ্গে থুতু পোকার কিছুটা মিল থাকলেও পাখার দাগ, মাথা, মুখ–এসবের মিল নেই। তাই বাড়ি ফিরে বসলাম সেই অচেনা পোকাটিকে চেনার জন্য।

গুগল পণ্ডিতের সাহায্যে জানতে পেলাম ওর বংশ-পরিচয়, এমনকি নামও। ওই খুদে পোকাটি সাইথ্রিডিডি গোত্রের ইরেটমোচেরা গণের একটি মথজাতীয় পোকা, বর্গ লেপিডোপ্টেরা। প্রজাতিগত নাম পেলাম Eretmocera impactella, ইংরেজি নাম জয়ফুল মথ বা ফ্লাওয়ার মথ। 

জানা গেল এটি একটি ক্ষতিকর পোকা, বিশেষ করে ডাঁটা ও লালশাকের। বথুয়া, হেলেঞ্চা, নটেশাকও এ পোকার আশ্রয়দাতা। বহুদিন আগে একবার ভুট্টাপাতায় একে চোখে পড়েছিল, জানি না সে গাছের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না। এ পোকার বাচ্চারা এসব গাছের পাতা খায়। খাওয়ার আগে মুখের লালার সুতো দিয়ে পাতা মুড়ে ফেলে, তার ভেতরে বসে কুরে কুরে পাতা খায়। চলার সময় ওরা বেশ কায়দা করে হাঁটে। সামনে যেতে সমস্যা মনে হলে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটার মতো খানিকটা পেছনে যায়, আবার সামনে আসে। ওদের প্রায়ই মিলনরত অবস্থায় পাতার ওপর বসে থাকতে দেখা যায়।

এ পোকাটি দেখা যায় এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান ও ওমানে এ পোকা আছে। এ দেশে এটি একটি আবাসিক পোকা, বিক্ষিপ্তভাবে এদের দেখা যায়। আলোতে এরা প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়। দিনের বেলায় এরা চলাচল করে।

রমনার বন আসরা

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:২৯ এএম
রমনার বন আসরা
রমনা উদ্যানে সম্প্রতি ফুটেছে বন আসরা ফুল। ছবি: লেখক

রাজধানীর রমনা উদ্যানে দুটি গাছ আছে, যা বেশ বড়সড়, অথচ তা জবাগোত্রীয়। ফুলের গড়নে জবার সঙ্গে মিল থাকলেও অন্য আর কিছুর সঙ্গেই মিল নেই। গাছ দুটি হলো কাশিপালা ও বন আসরা। গাছ দুটির দিকে তাকালেই নিসর্গপুত্র দ্বিজেন শর্মার কথা মনে পড়ে।

রমনা উদ্যানে তিনি সিলেটের পাহাড় থেকে নানা প্রজাতির গাছের চারা তুলে এনে লাগাতেন। গাছগুলোর বেশির ভাগই কিছুদিন পর যত্নের অভাবে বা অরক্ষিত থাকায় মরে যেত, কিছু গাছ দাঁড়িয়ে যেত। সেসব গাছ বৃক্ষ হয়ে এখন তাঁর সেসব স্মৃতির কথা কইছে। বন আসরা গাছটির অবস্থান রমনা উদ্যানের লেকের পাড়ে। লেক ভ্রমণের বোটগুলোকে ওখান থেকে ছাড়া হয়। বছর দশেকের বেশি হবে।

রমনায় একদিন দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে কয়েকজন মিলে হেঁটে হেঁটে গাছ দেখতে দেখতে এই বন আসরা গাছটিকে চোখে পড়েছিল। গাছের গোড়ার দিকটা আগুনে ঝলসে গেছে, গোড়া থেকে গজানো ডালপালার পাতাগুলোও পুড়ে গেছে। রমনা তখন এখনকার মতো রূপসী ছিল না। সেই আহত ও দগ্ধ গাছটির কাছে দাঁড়িয়ে তিনি হাহাকার করে উঠেছিলেন, বলেছিলেন, ‘গাছের সঙ্গে এমন অন্যায় কেউ করে? গাছ তো মায়ের মতন, তাকে কেউ এভাবে পোড়ায়? জানি না, কোন হতভাগার দল এখানে কী রেঁধে বনভোজন করে গেছে! এখনো সেই গাছটির কাছে গেলে সেসব কথা মনে পড়ে।

বুনোগাছ হলেও বন আসরার এই একটি গাছই রমনা উদ্যানে আছে। কিন্তু কখনো এর অনিন্দ্য রূপসী মেমসাহেবের মতো ফর্সা ফুলগুলোকে দেখার সুযোগ হয়নি। এ বছরও সে গাছে ফুল ফুটেছে। গত ৭ জুন সকালবেলায় সে গাছটিতে ফুলের দেখা পেলাম। পরপর দুদিনে আরও বেশি ফুল দেখলাম। একটি দুটি না, ডালে ডালে অনেক ফুল ফুটেছে। কুঁড়িগুলো দেখে মনে হলো কয়েকদিনে আরও ফুল ফুটবে। আহা, ফুল কী চমৎকার! ঘিয়া রঙের বড় বড় মাইকের মতো ফুল, ফুলের বোঁটার কাছে ঝালরের মতো হালকা সবুজ অঙ্গ, বৃতিগুলো যেন ছিল কলার খোসা। এদিক দিয়ে মুচকুন্দ ফুলের সঙ্গে এর কিছুটা মিল আছে। প্রচুর মৌমাছি উড়ছে ফুলে।

বন আসরা এ গাছের স্থানীয় বাংলা নাম, ইংরেজি নাম Indian Kapok ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম  Pterospermum semisagittatum ও গোত্র মালভেসি। প্রজাতিগত নামের প্রথমাংশ টেরোস্পার্মাম–এর অর্থ ডানাযুক্ত বীজ এবং শেষাংশের অর্থ আংশিক বর্শার ফলার মতো আকৃতিবিশিষ্ট পাতা। বন আসরা বনের গাছ, এ দেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের অরণ্যে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। রমনা উদ্যানের গাছটি মাঝারি আকারের বৃক্ষ প্রকৃতির।

আবহাওয়া ও অবস্থানভেদে গাছ পর্ণমোচী বা চিরসবুজ হতে পারে; গাছ ১৫ থেকে ২৫ মিটার লম্বা হতে পারে। গোড়া থেকে বেশ খানিকটা অংশের কাণ্ডে কোনো শাখা থাকে না। বীজ থেকে চারা হয়। পাতাগুলো কিছুটা ছুরি বা তলোয়ারের আগার মতো, পাতার ওপরের পিঠ সবুজ ও কিছুটা মসৃণ হলেও নিচের পিঠ রূপালি সবুজ ও খসখসে। এর কাণ্ড সোজা ও শক্ত হয়। গুড়ি বা কাণ্ডে বাকল ওঠা ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়।

বন আসরার কুঁড়িগুলোও বেশ ব্যতিক্রম, লম্বা খাঁজযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্রের মতো। গাছের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর ফুল। এর ফুলগুলো রাতের বেলা ফোটে, যার সাদা পাপড়ি ও হালকা সবুজ বৃতি দেখতে অসাধারণ লাগে। ভোরে ফুলগুলো মলিন হতে শুরু করে। ফুলগুলো সুগন্ধযুক্ত এবং নিশাচর পাখি ও কীটপতঙ্গকে আকৃষ্ট করে।

প্রাচীনকাল থেকেই এর শক্ত কাঠ গৃহনির্মাণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর লালচে-ধূসর কাঠ ভারী, বেশ শক্ত ও টেকসই। এটি কুড়ালের হাতল তৈরি করতে ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে বাড়ির স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্থানীয়ভাবে চিবানোর জন্য এবং আঁশ ও কাঠের উৎস হিসেবে ব্যবহারের জন্য বন্য পরিবেশ থেকে এ গাছ সংগ্রহ করা হয়। সুপারির বদলে পানের সঙ্গে চিবানোর জন্য এর ছাল ব্যবহার করা যায়। ডালের বাকল খুব শক্ত, টেনে ছেঁড়া বা ছুরি দিয়ে সহজে কাটা যায় না।

এজন্য বন আসরার বাকলের আঁশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের দড়ি ও তন্তু তৈরি করা হয়। বনজীবীরা বন থেকে কাঠ কেটে আঁটি বাঁধার জন্য এ গাছের বাকল ব্যবহার করে। এটি একটি ঔষধি উদ্ভিদ, যা জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা, চর্মরোগ ও প্রদাহের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। আধুনিক ফার্মাকোলজিক্যাল গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং মেজাজ ঠিক রাখতেও সহায়ক হতে পারে। 

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

কুরমা অভয়াশ্রমের হলদে-চোখ ছাতারে

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
কুরমা অভয়াশ্রমের হলদে-চোখ ছাতারে
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কুরমা চা-বাগানের গুল্মের ডালে শেষ বিকেলে সংকটাপন্ন হলদে-চোখ ছাতারে পাখি। ছবি: লেখক

হলদে চোখের বিরল ও সংকটাপন্ন পাখিটিকে প্রথম দেখি সাত বছর আগে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি গ্রামের এক ভুট্টাখেতে। কিন্তু তার অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও দ্রুত চলে যাওয়ার কারণে সেদিন ছবি তুলতে পারিনি। দুই বছর পর পাখিটিকে ফের দেখলাম মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা চা-বাগানের এক চিলতে ঘাসবন ও ঝোপঝাড়ে। এরপর থেকে অন্তত একবছর পাখিটিকে কুরমায় দেখেছি, প্রায় প্রতিবার যখন ওখানে গিয়েছি। বহু ছবি তুলেছি ওর। কিন্তু হার্ড ড্রাইভ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেসব ছবি হারিয়ে গেছে চিরতরে। কুরমার সেই জায়গাটি এখন এক চিলতে অভয়ারণ্য। নাম কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রম। তবে অভয়াশ্রম হলেও বর্তমানে ওখানে তেমন একটা পাখির দেখা মিলছে না। চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ঝোপঝাড় কেটে ফেলায় ভয় পেয়ে পাখিরা সেই যে চলে গেল, এখন পর্যন্ত আর ফিরে এল না, বিশেষ করে পরিযায়ী পাখিগুলো। দেশি আবাসিক পাখিদের সংখ্যাও কমে গেছে। এ বছরের ২৪ জানুয়ারি রাজকান্দির সংরক্ষিত বনের আদমপুর বিটে পাখি পর্যবেক্ষণ শেষে কুরমার বর্তমান অবস্থা দেখার জন্য বিকেলে সেখানে গিয়েছিলাম।
 
আকারে ক্ষুদ্র হলেও একসময় কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রমটি ছোট ছোট বীজভুক পাখিদের স্বর্গরাজ্য ছিল। লাল মুনিয়া, লালগলা ফিদ্দা, চিনা লালগলা ফিদ্দা, বঘেরি, কালোমাথা বঘেরি, হলদেবুক বঘেরি, খয়েরিকান বঘেরি, মদনটাক এবং হলদে চোখের পাখিসহ প্রায় আশি প্রজাতির পাখি দেখেছি ওখানে। কিন্তু জানুয়ারিতে ওখানে গিয়ে ২-৩ প্রজাতির বেশি পাখি দেখলাম না। তাই ওখান থেকে আরেকটু সামনের দিকে বাগানের সবচেয়ে উঁচু স্থানটিতে গেলাম। সেখানে ছোট যে ঝোপটি রয়েছে, ওখানে বুলবুলি, ফিঙ্গে, বাদামি কসাই ও অল্প কিছু সাধারণ পাখি দেখলাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায় হয় হয়। এমন সময় কোত্থেকে যেন হলদে চোখের পাখিটি এসে হাজির হলো। তবে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এই সময়ের জন্য ৪-৫ বার ক্লিক করতে পারলাম। ছবি বেশি তুলতে না পারলেও বিরল পাখিটিকে যে ওখানে দেখলাম, তাতেই আমি খুশি। কারণ এর আগে বেশ কয়েকজন বার কয়েক গিয়েও পাখিটির দেখা পাননি। সন্ধ্যা হয়ে এল, তাই সঙ্গে আনা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে পাখিপ্রেমী রূপকের দোকানে জিলাপি খাওয়ার জন্য চলে গেলাম। 

এতক্ষণ বিরল ও সংকটাপন্ন যে পাখিটির কথা বললাম, সে এদেশের এক প্রজাতির আবাসিক পাখি হলদে-চোখ ছাতারে। বাগেরহাট জেলায় পাখিটি ‘সাদা মইনে’ নামে পরিচিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বলে গুলাবচশম। ওর ইংরেজি নাম Yellow-eyed Babbler। প্যারাডক্সওরনিথিডি (Paradoxornithidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Chrysomma sinense (ক্রাইসোমা সাইনেনস)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির দেখা মেলে।

হলদে-চোখ ছাতারের দেহের দৈর্ঘ্য ১৮ সেন্টিমিটার। ওজন ১৯ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। দেহের উপরটা লালচে-বাদামি। থুতনি-গলা-বুক সাদা; পেট-তলপেট হলদেটে সাদা। শক্ত মোটা ঠোঁটটি কালো। চোখের চারদিকের বলয় কমলা হলেও মনি হলুদ। পা ও পায়ের পাতা হলুদ। লেজ লম্বা। অপ্রাপ্তবয়ষ্ক পাখির পিঠ বেশি লালচে ও ঠোঁট বাদামি।  

প্রজাতিটি মূলত সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা, তবে খুলনা বিভাগ ও উত্তরবঙ্গেও কোথাও কোথাও দেখা যায়। সচরাচর জলাসংলগ্ন লম্বা ঘাস ও ঝোপঝাড়ে এরা বাস করে। বেশ লাজুক। জোড়ায় বা ছোট দলে ঝোপঝাড় বা গাছের গোড়ার দিকে আড়ালে-আবডালে ঘুরে বেড়ায়। উঁচু ঘাসের আড়ালে খাবার খোঁজে। কীটপতঙ্গ, শুককীট, রসালো ফল ও ফুলের রস খায়। সুমধুর কণ্ঠে ‘চিপ-চিপ-চিপ…’ শব্দে ডাকে।

জুন থেকে নভেম্বর প্রজননকাল। এ সময় ভূমির কাছাকাছি আখ, পাট বা অন্যান্য ঘাসের কাণ্ডে ঘাস দিয়ে গোলাকার বাসা বানায়। লালচে-বাদামি ছিটছোপসহ ঘিয়ে-সাদা রঙের ৩ থেকে ৫টি ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ১৫-১৬ দিনে। ছানারা ১৩ দিন বয়সে উড়তে শিখে ও বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল ৫ থেকে ৮ বছর। 

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

শখ থেকে স্বাবলম্বী গৃহবধূ, ঘরের ছাদ যেন ক্যাকটাস রাজ্য

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:৫১ এএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:৫৩ এএম
শখ থেকে স্বাবলম্বী গৃহবধূ, ঘরের ছাদ যেন ক্যাকটাস রাজ্য
জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে গৃহবধূ কারিশমা আমরিন রুনার ব্যতিক্রমী ছাদবাগানে ক্যাকটাস ও সাকুলেন্ট দেখছেন দর্শনার্থীরা। ছবি: খবরের কাগজ

জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে ইউটিউব দেখে ব্যতিক্রমী এক ছাদবাগান করেছেন গৃহবধূ কারিশমা আমরিন রুনা। তার এই শখের বাগানটি এখন বিরল গাছের এক বিশাল সাম্রাজ্য হয়ে উঠেছে। তার ছাদবাগানে এখন রয়েছে প্রায় হাজার প্রজাতির ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট ও দৃষ্টিনন্দন ইনডোর প্ল্যান্ট। শখের বশে শুরু করলেও তিনি এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। স্থানীয় কৃষি বিভাগ তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

জানা গেছে, পাঁচবিবি রেলস্টেশন রোডের বাসিন্দা ইমন হোসেনের স্ত্রী গৃহবধূ কারিশমা আমরিন রুনা। তিনি স্থানীয় একটি স্পেশাল চাইল্ড বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। করোনা মহামারির সময় তার স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। সেই ঘরবন্দি সময়ে ইউটিউব দেখে অনলাইনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নানা জাতের ক্যাকটাস সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর বাড়ির ছাদে ছোট পরিসরে শুরু করেন ছাদবাগান। সংসারের কাজের পাশাপাশি তিনি বাগানের যত্ন নিতেন।

ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিরল প্রজাতির ক্যাকটাস ও সাকুলেন্ট সংগ্রহ করেন রুনা। এখন তার পুরো ছাদ জুড়ে বিভিন্ন ধরনের পাতাবাহার, লতাবাহার, বনজ ও ফলজ গাছের সামরোহ। তবে হাজার প্রজাতির ক্যাকটাস ও সাকুলেন্টই মানুষের নজর কাড়ছে বেশি। প্রতিদিন অনেকে এই বাগান দেখতে আসেন, কেউ কেউ আসেন গাছ কিনতে। পাশাপাশি তিনি অনলাইনেও গাছ বিক্রি করে ভালো লাভ করছেন। তাকে দেখে এখন অনেকেই অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। পরিবেশ রক্ষা ও সৌন্দর্য বাড়াতেও এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখছে।

পাঁচবিবি পৌর শহরের চামড়া গুদাম এলাকার শবনম আরা সানি বলেন, ‘আমি কারিশমা আমরিন রুনা আপুর ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করে কয়েকটা ক্যাকটাস গাছ কিনেছি। পরে বাগান দেখার আগ্রহ থেকে এখানে এসেছি। সাধারণত ছাদবাগানে ফুলের গাছ দেখা যায়। কিন্তু এখানে এসে অনেক রকম ক্যাকটাস দেখলাম। আমার খুব ভালো লেগেছে।’

স্টেশন রোড এলাকার আরজু আরা শাম্মি বলেন, ‘এই বাগানে এসে নানা প্রজাতির ক্যাকটাস গাছ দেখলাম। এসব সাধারণত রংপুর, রাজশাহীতে পাওয়া যায়। কিন্তু এখান থেকে কিনতে পেরে আমি অনেক খুশি। রুনা আপা গৃহবধূ হয়েও উদ্যোক্তা হয়ে আয় করতে পারছেন। আমারাও এখান থেকে শিখে নিজে এমন উদ্যোগ নিতে পারি।’

মালঞ্চা এলাকার সাব্বির হোসেন বলেন, ‘এই ছাদবাগান দেখে আমি মুগ্ধ। এখানে এত সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যে সবার চোখ জুড়িয়ে যাবে। আমার জীবনে একসঙ্গে এত প্রজাতির ক্যাকটাস আগে কখনো দেখিনি। আমি নিজেও দুটি গাছ কিনেছি।’

উদ্যোক্তা কারিশমা আমরিন রুনা বলেন, ‘করোনা মহামারির সময় বাসায় বসে থাকার সময় শখের বশে ইউটিউব দেখে কয়েকটি ক্যাকটাস গাছ কিনে ছাদবাগান শুরু করি। এরপর দিন দিন বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা প্রজাতির গাছ কিনে বাগান বড় করি। এখন আমার এখানে হাজার প্রজাতির ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট ও সুন্দর ইনডোর প্ল্যান্ট আছে। এ থেকে আমার মাসে মোটামুটি ভালো আয় হয়। অনলাইনে যোগাযোগ করে অনেকে কেনেন, আবার কেউ কেউ এখানে এসেও নিয়ে যান।’

পাঁচবিবি উপজেলা কৃষি অফিসার জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সচরাচর দেখি ছাদবাগানে শাক-সবজি বা ফুলের চাষ হয়। কিন্তু পাঁচবিবির গৃহবধূ রুনা তার ছাদে বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসসহ বিরল প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন। ছাদবাগান করেও যে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, রুনা তার দৃষ্টান্ত উদাহরণ। আমরা উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন সহযোগিতা দিয়ে থাকি। নতুন করে কেউ যদি এমন বাগান করতে চান, তাহলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা সার্বিক সহযোগিতা করব।’