আঁধার রাতে যখন ছাতিম ফোটা গাছের কাছে যাই, তখন সেই ফুলকে দেখা না গেলেও গন্ধে বুঝতে পারি, সে আছে। আর তখন সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের ছোটগল্প আলোকিত অন্ধকারের কয়েকটা কথা মনে পড়ে- ‘অন্ধকারেরও নিজস্ব আলো থাকে। বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলে সেই আলোটাকে অনুভব করা যায়।’
ছাতিমের সেই উগ্র গন্ধেই এ দেশে হেমন্তের আগমন ঘটে। এ বছরের পয়লা কার্তিক ভোরবেলায় শাহবাগের বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের গেটে গিয়ে দেখা পেলাম ফুলে প্রস্ফুটিত একটা ছাতিমগাছের। ঝাঁকড়া মাথায় পুষ্প-পল্লবে অপূর্ব সাজে সেজেছে সে। তবে ঘ্রাণের সেই উগ্রতা নেই।
এর দুই দিন পর গেলাম রমনা পার্কে। রমনা পার্কে দুটি বিশাল ছাতিমগাছ আছে। এর একটি আছে দক্ষিণ দিকে মহিলা অঙ্গনের কাছাকাছি। অন্যটি আছে যে বটমূলে ছায়ানটের নববর্ষের গান হয়, সে অঙ্গনে ঢোকার আগে, কর্পূরগাছের কাছে। সে গাছের তলায় দেখেছি, ঝরা ফুলে আচ্ছাদিত ছাতিমতলা। সেই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে বাতাসে ভাসা ছাতিম গন্ধে উতলা হলাম।
এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলায় ছাতিমের গন্ধেই হেমন্ত আসে। ছাতিম হলো হেমন্তের ফুল, যেমন বর্ষার ফুল কদম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাতিমগাছের নাম রেখেছিলেন সপ্তপর্ণী। পর্বসন্ধি থেকে একটি বোঁটায় সাতটি পাতা বের হয়। এ জন্যই মনে হয় এর নাম সপ্তপর্ণী। গাছের ডালপালা ও পাতা এমনভাবে ছড়িয়ে থাকে যে তা দেখে খোলা ছাতার মতো মনে হয়। ছাতিমের মতো ছায়াতরু খুব কমই আছে। এ জন্যই বাংলায় ছাতা থেকে এর নাম হয়েছে ছাতিম। এ কথা কবি নজরুল ইসলামও জানতেন। একটি গানে তিনি সেই ছাতিম ছাতার কথা লিখেছেন-
‘ডালিম-দানায় রং ধরেছে, ডাঁশায় নোনা আতা,
তোমার পথে বিছায় ছায়া ছাতিম তরুর ছাতা।
তেম্নি আজো নিমের ফুলে
ঝিম্ হয়ে ঐ ভ্রমর দুলে,
হিজল-শাখায় কাঁদছে পাখি বউ গো কথা কও॥’
নিম ফুলের চেয়েও ছাতিম ফুলের উগ্র গন্ধে মাথা বেশি ঝিম ধরে। ছাতিম ফুলের গন্ধ কেউ কেউ সহ্য করতে না পেরে অসাড় হয়ে পড়ে। এ জন্য তাদের কাছে ছাতিম যেন শয়তানের গাছ। এ কারণে এর ইংরেজি নাম হয়েছে Devil’s tree, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Alstonia scholaris ও গোত্র অ্যাপোসাইনেসি। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামের প্রথমাংশ অ্যালস্টোনিয়া রাখা হয়েছে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অধ্যাপক চার্লস অ্যালস্টনের (১৬৮৫-১৭৬০) সম্মানে। স্কটিশ উদ্ভিদবিদ রবার্ট ব্রাউন ১৮১০ সালে এ নাম রাখেন। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামের শেষাংশ স্কলারিস হয়েছে বিদ্যালয় বা স্কুল থেকে। অবশ্য এর কারণও রয়েছে। আগের দিনে বিদ্যালয়ে লেখার জন্য ব্ল্যাকবোর্ড ও কাঠের স্লেট তৈরি করা হতো ছাতিম কাঠ দিয়ে। এ জন্য কেউ কেউ ছাতিমকে বলেন ‘ব্ল্যাকবোর্ড ট্রি’। কাঠ হালকা বলে শ্রীলঙ্কায় ছাতিম কাঠ দিয়ে কফিন বানানো হয়।
ছাতিম আমাদের দেশি গাছ। এই গাছ বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় সর্বত্রে জন্মে। ভেজা ও জলসিক্ত স্থানে ছাতিমগাছ বেশি জন্মে। ছাতিমগাছকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ‘রাজ্য উদ্ভিদ’ ঘোষণা করা হয়েছে। ছাতিমের সাহিত্য মূল্যও কম নেই। কবি কালিদাসের কাব্যে ছাতিমের নাম হয়েছে সপ্তচ্ছদ। তার ঋতুসংহার কাব্যের তৃতীয় সর্গে ছাতিম ফুলের দেখা মেলে শরতে- ‘ছাতিম পুষ্পে শুভ্র বনানী মালতী কুসুম বনতল’। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী ও আরণ্যক উপন্যাসেও রয়েছে ছাতিমের সগর্ব উপস্থিতি, ঘ্রাণের তীব্রতা। আরণ্যক উপন্যাসে রাতের নিস্তব্ধতাকে ছাড়িয়ে তিনি ছাতিমের সুবাসকে ছড়িয়ে দিয়েছেন এক অসাধারণ রোমাঞ্চকর অনুভূতি হিসেবে। এসব পড়তে পড়তে মনে হয়, বাংলা সাহিত্য যেন এ দেশের প্রকৃতির মতোই ছাতিমময়।
ছাতিমগাছ ১৫ থেকে ৪০ মিটার উঁচু হয়। এটি বহু শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট ও বহুবর্ষী বৃহৎ বৃক্ষ। পাতা বেশ বড়। পাতার ওপরের পিঠ সবুজ ও চকচকে, নিচের পিঠ সাদাটে ও ধূসর। ডালের মাথায় থোকা ধরে সাদাটে-সবুজ ফুল ফোটে। মঞ্জরিদণ্ড প্রায় ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মঞ্জরিদণ্ডের শীর্ষে ছাতার মতো অর্ধবৃত্তাকার মঞ্জরিতে অনেকগুলো ছোট ফুল ফোটে। ফুল শেষে লম্বা কাঠির মতো গোছা ফল ধরে ঝুলে থাকে। পাতা ও ফুলের বোঁটা ভাঙলে দুধের মতো সাদা কষ ঝরে।
ছাতিমগাছ পথতরু হিসেবে মানানসই। তবে উদ্যানেও এটি লাগানো যায়। বীজ দিয়ে সহজে চারা তৈরি করা যায়। বীজ ছাড়াও শাখা ও গুটিকলম করে ছাতিমের চারা তৈরি করা যায়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ