বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম হবিনগর। এই গ্রামের এক বাড়িতে একটি বড় মান্দারগাছ আছে। গাছটির একটি শুকনা ডাল আড়াআড়িভাবে ধানখেতের সমতলে হেলানো ছিল। সেই ডালের ফোকরে কয়েক বছর আগে বাসা করেছিল এক জোড়া লাল টুপি জর কাঠঠোকরা। পাশে ছিল বিশাল ধানখেত, চারদিক নির্জন। এ রকম একটা নির্জন জায়গায়ই পাখিদের বাসা বাঁধার লাগসই স্থান। একদিন একঝাঁক রূপালি ধূসর রঙের পাখি উড়ে এসে সেই শুকনা ডালটিতে বসল। তারা সংখ্যায় ছিল ১০ থেকে ১২টি। তারা সুরেলা গান ধরল। এরপর এক এক করে সব পাখি কাঠঠোকরার সেই ফোকরে ঢুকল, আবার বেরিয়ে এল। কিছুক্ষণ পর রুরু... স্বরে ডাক দিয়ে উড়ে গেল। এর কিছুদিন পর দুটি পাখি এসে ফোকরটি দখল করল। খড়কুটো ঠোঁটে করে বাসায় জমাতে শুরু করল। পাখি দুটি ছিল খয়রালেজ কাঠশালিক।
ভাতশালিক যেমন সহজেই মানুষের বন্ধু বনে যায়, খয়রালেজ কাঠশালিক কিন্তু তার উল্টো। এরা লাজুক স্বভাবের। লোকজনের কাছে ঘেঁষে না। এরা গাছের মগডালে, পাতার আড়ালে ছোট বা বড় দলে একসঙ্গে থাকে। একটি দলে ৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত পাখি থাকে। এরা ময়না ও অন্য শালিকদের সঙ্গে একত্রে খাবার খায়। এদের কণ্ঠ তীক্ষ্ণ, কাঁপা কাঁপা শিস দিয়ে উড়ে চলে। গাছের শাখায় শাখায় খাবার খুঁজে বেড়ায়। সাধারণত সকালের আভা ফুটলেই ঝাঁক বেঁধে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। চমৎকার ভঙ্গিতে ফুলের গুচ্ছে, গাছের ফোকরে কিংবা ফলের সঙ্গে লেপ্টে থাকে। কিছু সময় পরপরই দল বেঁধে আকাশে উড়াল দেয়। তারপর আবার এক স্থানে আগের মতো জাঁকিয়ে বসে। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে লোকেরা এ শালিককে বলে তেলঢুপি।
স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম। দেহ লম্বায় ২০ সেমি। গায়ের পালক রূপালি ধূসর। বুক গাঢ় লালচে বাদামি। পা পাটকিলে হলুদ। ঠোঁটের গোড়া নীল, ডগা হলদেটে। লেজ কালচে, লেজের মাঝের কিছু পালক রূপালি ধূসর। কিশোর বয়সীদের রং বিবর্ণ ধুলোট ও ধূসর। নিচের অংশ বিবর্ণ হলদেটে। এদের খাবার তালিকায় আছে পাকা ডুমুর, বট, পিপুল, কীটপতঙ্গ প্রভৃতি। গাছের পুরোনো বাকলের নিচে ও ফাঁকফোকরে কীটপতঙ্গ খুঁজে বেড়ায়। ফুলের মধু ও খেজুরের রস এদের খুব প্রিয়। কাঠশালিক বসন্তে পলাশ ও শিমুল ফুলের মৌলোভী কীটপতঙ্গ খেতে আসে। দেশের সব জেলাতেই খয়রালেজ কাঠশালিক আছে। হালকা ঝোপ, বাগান, সদ্য গজিয়ে ওঠা বন, কখনো গ্রাম ও শহরের চারপাশে খয়রালেজ কাঠশালিক দেখা যায়।
খয়রালেজ কাঠশালিক বেশির ভাগ সময় দলে চলে। তবে গ্রীষ্মে ডিম পাড়ার আগে দল থেকে আলাদা হয়ে যায়। এ সময়ে জোড়ায় জোড়ায় ডালে বসে নিচু স্বরে কী যেন বলাবলি করে। এরা ১০ থেকে ২৫ ফুট উঁচু গাছের ফোকরে বাসা বাঁধে। পুরোনো দেয়ালের ফাঁকে, পাইপের ছিদ্রেও এদের বাসা বাঁধতে দেখা যায়। এরা বাসা বানাতে শুকনা ঘাস, খড়কুটো আর পাখির পালক জোগাড় করে। বাসা করার সময় অঞ্চল ও স্থানীয় অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এরা ডিম পাড়ে ৩ থেকে ৫টি। ডিমের রং ফিকে নীল। ১৫ থেকে ২১ দিনের মধ্যে ডিম ফোটে। মা ও বাবা পাখি মিলে বাচ্চাদের দেখাশোনা করে। বাচ্চারা উড়তে শিখলে মা-বাবার সঙ্গে ডালে ডালে ঘুরে বেড়ায়।
লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার
