অ্যালামন্ডা ফুলের বাংলা নাম অলকানন্দা। অলকানন্দা নামটা রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার একটি গানে সেই অলকানন্দার নাম নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন,
প্রাণের তটে কামোদ নটে সুর বাজিছে সুমধুর -
দুলে অলকানন্দা রাঙা তরঙ্গে
শিখী কুরঙ্গ নাচে রঙিলা ভ্রুভঙ্গে,
বাজিছে বুকে সুর-সারং কাফির সঙ্গ্॥
গানটি যখনই শুনি, মনে হয় অলকানন্দা ফুলের সৌন্দর্যের সঙ্গে পাহাড়ি নদী অলকানন্দার ফেনায়িত তরঙ্গ যেন সুরের মূর্ছনা তুলে উপলখণ্ডের ওপর দিয়ে নেচে নেচে বয়ে চলেছে। বর্ষাকালে ভারতের উত্তরাখন্ডের অলকানন্দা নদীর স্রোত আর অলকানন্দা ফুলের প্রস্ফূরণ দুই হয় প্রচণ্ড। নদী যেমন সতত বহমান, অলকানন্দা ফুলও প্রায় সারা বছর ফুটতে থাকে। রমনা উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যান বা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে শাহবাগের দিকে যখনই যাই, সীমানাপ্রাচীরের ওপর নদীর মতো বয়ে চলা অলকানন্দা লতার ব্যাপক বিস্তার দেখি। সেখানে কিছু না কিছু ফুলের দেখা পাই। এ ফুল সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এ গাছ এত সুলভ যে একবার কোথাও জন্মালে সেখানে তা ঝোপ করে ছাড়বেই।
গত বছরের ২৭ নভেম্বর দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার এ আর মালিক সিড ফার্মে এমন ঝোপালো অলকানন্দাগাছ ও ফুলের প্রাচুর্য দেখেছিলাম। অথচ সে সময় এত ফুল ফোটার কথা না।
অলকানন্দা লতানো গুল্মপ্রকৃতির বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গাছ। গাছ কাষ্ঠল লতানো স্বভাবের হলেও লতায় কোনো আকর্ষি বা আঁকড়ি নেই। লতানো গাছ ছেঁটে ছেঁটে চাইলে খাটো ঝোপালো করে রাখা যায়।
বাইতে দিলে এ গাছ ৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা বর্শার ফলার মতো, চকচকে সবুজ। পাতা ছিঁড়লে ও ডাল ভাঙলে দুধের মতো কষ বের হয়। ফুল ঘণ্টা বা মাইকের চোঙের মতো। গ্রীষ্ম-বর্ষাকালে প্রচুর ফুল ফোটে। ফুলে পাঁচটি পাপড়ি থাকে। ফুলের হলুদ রঙের কারণে অলকানন্দার ইংরেজি নাম গোল্ডেন ট্রামপিট বা ইয়েলো অ্যালামন্ডা। অলকানন্দার এখন নতুন নতুন জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। হলুদ ছাড়াও এখন মেরুন, গেরুয়া, ঘিয়া সাদা, খয়েরি, কমলা ইত্যাদি রঙের অলকানন্দা ফুল দেখা যায়। মিশ্রবর্ণের ফুলও আছে। এ ফুলের আরও নতুন জাত আসছে।
চাষ করা সহজ, তাই যেকোনো বাগানে বা উদ্যানের শোভা বাড়াতে অলকানন্দা এক চমৎকার ফুল। শোভাবর্ধক ফুলের গাছ হিসেবেই মূলত এর ব্যবহার। ছাদবাগানে ও টবে এ গাছ লাগানো যায়।
অলকানন্দার উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Allamanda cathartica, গোত্র অ্যাপোসাইনেসি। প্রজাতিগত নামের প্রথম অংশ ‘অ্যালামন্ডা’ আঠারো শতকের বিখ্যাত সুইস উদ্ভিদতত্ত্ববিদ ড. ফ্রেডেরিক অ্যালামন্ডার নামে এ নামকরণ করা হয়। দ্বিতীয় অংশ ল্যাটিন শব্দ ‘ক্যাথারটিকা’ অর্থ পরিশোধনকারী বা রেচক। অর্থাৎ এ গাছের জোলাপ পেট পরিষ্কার করে বলে জানা গেছে।
এ গাছের পাতা ও শিকড় শক্তিশালী বিরেচক ও বমনকারক, যা পেট পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে এ গাছ বিষাক্ত। তাই ওষুধে সাধারণত এ গাছ ব্যবহার করা হয় না। ব্যবহার করলেও অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। ত্বকের সমস্যায় বিশেষ করে ত্বকে ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, ফোড়া ও দাদের চিকিৎসায় এ গাছের আঠার লৌকিক ব্যবহারের কথা জানা গেছে। এর শিকড় জন্ডিস রোগ সারানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। কৃমি কমাতেও শিকড়ের ক্বাথ কাজে লাগে। এ বিষয়ে আরও গবেষণা করে ঔষধি গাছ হিসেবে এর ব্যবহারের সুযোগ আছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক গবেষণায় এ গাছের পাতার নির্যাস ক্যানসাররোধী বলে জানা গেছে। এ ছাড়া এটি পুরুষদের শুক্রাণু উৎপাদনকে বাধা দেয়, যা জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে।
শাখাকলম বা গুটিকলম করে অলকানন্দার চারা তৈরি করা যায়। এপ্রিল-মে মাস কলম করার সবচেয়ে ভালো সময়। আর্দ্রতা ও পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা থাকলে এ গাছ ভালো হয়। রোদে জন্মানো গাছের বৃদ্ধি ভালো হয় ও প্রচুর ফুল ফোটে।
মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা এ গাছের আদিনিবাস, বিশেষ করে বলিভিয়া, ব্রাজিল, গায়ানা, সুরিনাম ও ভেনেজুয়েলা এ গাছের জন্মভূমি। তবে অলকানন্দা বাংলাদেশে দিব্যি মানিয়ে গেছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ