এমন সুন্দর গাছ, দেখে মনে হয় যেন ডালের আগায় আগায় মেরুন রঙের খুদে গোলাপ ফুল ফুটে আছে। চমৎকার এ গাছের দেখা পেলাম যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের পিটসবার্গে। ফ্রিক পার্কের কাছে উইলকিনসবার্গ এলাকার মিল্টন অ্যাভিনিউর ১১২৫ নম্বর বাড়ির সামনে শোভাবর্ধক এ গাছ লাগিয়ে আচ্ছাদন তৈরি করা হয়েছে। গাছগুলো পাথুরে বাগানের ঢালের ওপর বেয়ে বেয়ে ঘন মাদুরের মতো ছেয়ে গেছে।
হিমশীতল তুষার ঝরা দিনগুলোর পর ২৮ ডিসেম্বরের মেঘলা বিকেলে সুদর্শন এ গাছগুলোর দেখা পেলাম। ছোট গাছগুলো যেন পাথরের ওপর নূপুর বাজিয়ে ঢেলে দিয়েছে সুরের ঝরনাধারা। শীতেও এর পাতা ঝরেনি, এমনকি তার রূপও ম্লান হয়নি। মাটির ওপরটা লাল গালিচার মতো ঢেকে ফেলে বলে এর ইংরেজি নাম রেড কার্পেট সেডাম। এর অন্য নাম ড্রাগন’স ব্লাড স্টোনক্রপ। পাথরে জন্মায় বলে এ গাছকে স্টোনক্রপ বলে। গাছটির গণগত নাম সেডাম। এ গণে বিশ্বে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ প্রজাতির গাছ রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ প্রজাতির গাছ দেখা যায় উত্তর গোলার্ধে। ধীরে ধীরে সেডাম উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকায় বিস্তার লাভ করে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কয়েক প্রজাতির সেডাম বাহারি গাছ হিসেবে লাগানো হয়। এমনকি বাংলাদেশেও এখন কয়েক প্রজাতির সেডাম দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন নার্সারিতে এখন সেডামের চারা বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশেও ড্রাগন’স ব্লাড ও ট্রাইকালার সেডাম আছে। গত বছরের জুলাইয়ে ঢাকার সাভারের বরিশাল নার্সারিতে ফুলসহ সেডামের চারা দেখেছিলাম। তবে তার প্রজাতি ছিল ভিন্ন।
উত্তর আমেরিকায় দেখা এ ড্রাগন’স ব্লাড স্টোনক্রপ গাছের প্রজাতিগত নাম Sedum spurium, গোত্র ক্রাসুলেসি। এর গণগত নাম এসেছে লাতিন শব্দ সেডিও (sedeo) থেকে, যার অর্থ বসা। অর্থাৎ গাছটি যেন পাথরের ওপর বসে থাকে ও সেখান থেকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এ গাছের কাণ্ড ও পাতা বেশ পুরু, নরম ও রসালো। এ জন্য এদের সাকুলেন্ট বা স্থূলপর্ণী দলে ফেলা হয়েছে।
সেডাম বহুবর্ষজীবী বিরুৎজাতীয় চিরসবুজ উদ্ভিদ। এ গাছ ভূমি থেকে বড়জোড় ৬ ইঞ্চি উঁচু হয়। তবে এ গাছের উচ্চতা সাধারণত ৩ ইঞ্চির মধ্যেই থাকে। এদের কাণ্ড শাখায়িত। একটি গাছ তার চারপাশে প্রায় দেড় ফুট পর্যন্ত ছড়ায়। কাণ্ডের আগায় পাতাগুলো এমনভাবে সজ্জিত থাকে যে তাকে দেখে ফুল বলে ভুল হয়। তবে ফুলের চেয়ে এদের পাতার সৌন্দর্যই বেশি মনোমুগ্ধকর। মোটা বা পুরু, রসালো, ওল্টানো ডিম্বাকৃতির গাঢ় মেরুন-লাল পাতাগুলোর কিনারা খাজকাটা ও আবর্তাকারে সজ্জিত। যতদিন গাছ বেঁচে থাকে, ততদিন পর্যন্ত পাতা গজাতে থাকে।
প্রধানত ভূমি আচ্ছাদক উদ্ভিদ হিসেবে এ গাছ বাগানে লাগানো হয়। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে গাছে গোলাপি-লাল ফুল ফোটে। ফুলগুলো দেখতে তারার মতো। ফলের পাপড়ি পাঁচটি। এই ফুল প্রজাপতি ও অন্যান্য পরাগযোগকারী পতঙ্গকে আকর্ষণ করে। ফুল ফোটা শেষ হলে ফল ও বীজ হয়। বীজ দিয়ে বংশবৃদ্ধি করা যায়। তবে গাছের কাণ্ড ও পাতা ছিঁড়ে ভেজা মাটিতে পুঁতে দিলে তা থেকেও চারা হয়। গাছ মাটির ওপর দিয়ে বেয়ে চলার সময় মাটির সংস্পর্শে থাকা গিঁট থেকে শিকড় গজায়। সেখান থেকে শিকড়সহ কাণ্ড কেটে লাগালে নতুন গাছ হয়ে যায়। রক গার্ডেন, ছোট বাগানের গ্রাউন্ড কাভার, বাগানের সীমানা, পাড়ের দেয়ালের ফাঁকে, ঢালে, টবে ইত্যাদি স্থানে এ গাছ লাগানো যায়।
গাছগুলো বিরূপ পরিবেশের ধকল সইতে পারে। কয়েক দিন তুষারপাতে ঢেকে থাকার পরও দেখলাম গাছগুলো মরেনি। অসাধারণ তার জীবনীশক্তি। এমনকি খরা পরিস্থিতিতেও এ গাছ বেঁচে থাকে। তার বেঁচে থাকার জন্য তেমন পানিরও দরকার হয় না। বরং বেশি পানি দিলে শিকড় পচে গাছ মরে যায়। একবার এ গাছ কোথাও লাগিয়ে দিলে সেখানে সে বাড়তে থাকে। যত্ন না নিলেও সে কিছু মনে করে না। এ গাছ বেলে ও কাঁকুড়ে মাটিতেও জন্মে। রোদেলা জায়গায় লাগানো গাছের রং ও রূপ বেশি হয়।
সেডাম যেমন পরিবেশের প্রতিকূলতা সইতে পারে, তেমনি এর ক্ষতি করার শত্রুও কম। পোকামাকড়, হরিণ ও অন্যান্য প্রাণীরা এ গাছ খায় না। রোগও এদের তেমন আক্রমণ করে না। তবে শামুক ও গেছো শামুক বা স্লাগের উপদ্রব দেখা দিতে পারে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
