শীত ফুরিয়ে আসছে, ফাগুনের হাওয়ায় দোল খাচ্ছে মনটা। হিমেল সকালের রোদটাও মিষ্টি। মনটা উড়তে চায় প্রজাপতির মতো থেমে থেমে, দেখেশুনে। তাই চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ দিন ছুটির সকালটায় ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম।
আগারগাঁও ফ্যালকন নার্সারির সংগ্রহে শতাধিক জাতের গোলাপ আছে। ইচ্ছা হলো সেসব গোলাপ দেখব আর ছবি তুলব। গোলাপ দেখতে দেখতে কয়েকটা গ্ল্যাডিওলাস ফুলের গাছ চোখে পড়ল। ফুলের রং কমলা-গোলাপি, বেশ মিষ্টি। ফুলের আকর্ষণে সেদিকে তাকাতেই চোখ পড়ল একটা পোকার দিকে। পোকাটা তো আমার আগেই ফুলের শোভা দেখে ফেলেছে! ফুল ছেড়ে তাই তার দিকে নজর দিলাম। কী আলসে রে বাবা! এত কাছে এসে তাকে দেখছি, তবু তার নড়ার লক্ষণ নেই। ঘাপটি মেরে তরবারির ফলার মতো গ্ল্যাডিওলাসের সবুজ পাতার ওপর ডানা ছড়িয়ে বসে রোদ পোহাচ্ছে।
তার শরীরটা কালো হলেও পেটের ওপর একটা হলুদ বেল্টের মতো আড়াআড়ি চওড়া দাগ আছে। মাথার পেছনে ঘাড়ের কাছে আছে দুটি হলদে ফোঁটা। তার ডানাগুলোও কালো। প্রতিটি ডানায় থাকা ফোঁটার মতো নয়টা দাগ, যেন জানালায় লাগানো ফ্রস্টেড গ্লাস বা ঘোলা কাচ। ডানায় ফোঁটার মতো নয়টা দাগ থাকায় এর ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে নাইন স্পটেড মথ। পেটে হলদে বেল্টের মতো বেষ্টনী থাকায় এর ইংরেজি নাম হয়েছে ইয়েলো বেল্টেড বারনেট। নাম থেকেই বোঝা গেল, পোকাটা মথজাতীয়। মথরাও প্রজাপতি গোত্রীয়, বর্গ লেপিডোপ্টেরা। এর প্রজাতিগত নাম পাওয়া গেল Amata phegea, গোত্র ইরেবিডি।
কার্ল লিনিয়াস ১৭৫৮ সালে তার ‘সিস্টেমা নেচারি’ বইয়ের দশম সংস্করণে প্রথম এ পোকা সম্পর্কে বিবরণ দেন। বিশ্বে Amata-গণের প্রায় ২৫০টি প্রজাতির মথ আছে। তবে বাংলাদেশে আছে কয়েক প্রজাতির। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এ-গণের আরও একটি প্রজাতির পোকা আছে, যার বৈজ্ঞানিক নাম Amata cyssca। এর চেহারাও এ পোকার মতো, শুধু ডানার দাগগুলোর রং হলুদ। লেখক কৌশিক তার ‘locv’ বইয়ের বাংলা নামকরণ করেছেন লুলিত। আশ্চর্যের বিষয় যে, মথ ও প্রজাপতি একই বর্গের পোকা হলেও প্রজাপতির চেয়ে মথের সংখ্যা প্রায় ৮ গুণ। বিশ্বে প্রজাপতি আছে প্রায় ২০ হাজার প্রজাতির। আর মথ আছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার প্রজাতির। কাজেই মথ শনাক্তকরণ খুব সহজ না।
১৫-১৬ বছর আগে প্রথম এ পোকাটির দেখা পাই পাবনার টেবুনিয়ায়। সেখানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পোকামাকড় চেনানোর জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলাম। তারা ধানখেত থেকে হাতজাল দিয়ে যখন অনেক পোকা ধরে নিয়ে এসেছিলেন, তখন সেগুলোর মধ্যে এ পোকাটিকেও দেখেছি। তবে পোকাটাকে তখন চিনিনি। তা ছাড়া ধানের পোকামাকড়ের তালিকায় এ পোকার কোনো নাম না দেখে সেটিকে আর চেনার চেষ্টাও করিনি। পোকাটিকে কোনো গুরুত্বও দিইনি। কিন্তু সে বারবার আমার সামনেই এসে পড়ে। টাঙ্গাইলের সখিপুরে কবি নজরুল পার্কে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে দেখেছিলাম হেলিক্রিসাম ফুলে বসা অবস্থায়। ২০২৩ সালে আবার তাকে দেখি গাজীপুরের পুবাইলে জলজঙ্গলের কাব্য রিসোর্টের ঝোপঝাড়ের ভেতর, আসামলতা গাছের পাতায়। তাতে মনে হলো পোকাটি এ দেশে বিরল না।
এটি মাঝারি আকারের মথ, বসলে প্রসারিত ডানার বিস্তার হয় ৩৫ থেকে ৪০ মিলিমিটার। ডানার রং কালো বা নীলচে-কালো। সামনের দুটি ডানার প্রতিটিতে ছয়টি করে অর্ধস্বচ্ছ দাগ থাকে। পেছনের দুটি ডানার প্রতিটিতে তিনটি করে এরূপ দাগ থাকে। দেহের এক পাশের এক জোড়া ডানায় মোট নয়টি দাগের কারণেই এ পোকার নাম হয়েছে নয়-ফোঁটা মথ। দেহ লম্বা, পেটের দ্বিতীয় খণ্ডে দুটি হলুদ দাগ ও ষষ্ঠ খণ্ডে একটি হলুদ বেষ্টনী থাকে। এর মাথা লালচে-বাদামি। হঠাৎ দেখলে একে মথ বা প্রজাপতি বলে মনেই হয় না। বরং বোলতা ও মাছির সঙ্গে কিছুটা মিল দেখা যায়। কিন্তু মাছিদের থাকে দুটি ডানা, এদের আছে চারটি। সুতরাং এটি নিশ্চিত মথ। পুরুষদের চেয়ে মেয়েদের দেহ একটু বড় হয়। মেয়েদের শুঁড় পুরুষদের চেয়ে মোটা। শুঁড় কালো হলেও অগ্রভাগ সাদা। এরা সাধারণত শুষ্ক স্থানে, ঝোপঝাড়ে ও জঙ্গলে থাকে। রোদ ও খোলা স্থানে দিনের বেলায় ঘোরাঘুরি করে। সাধারণত মে থেকে আগস্টে এদের বেশি দেখা যায়। তবে অন্য সময়েও দেখা যায়। এরা পাতায় ডিম পাড়ে। বাচ্চা বা কিড়ার দেহ প্রায় ৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। দেহ মোটা কম্বলের মতো কালো পশমাবৃত থাকে। বাচ্চারা বিভিন্ন গাছের পাতা খায়। বিভিন্ন ঘাসের পাতাও খায়। মাটিতে রেশমি খোলসের মধ্যে এরা পুত্তলি দশায় যায়। বছরে এরা মাত্র একবার বংশবিস্তার করে। এ দেশে সচরাচর দেখা যায়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ