দেখতে দেখতে বসন্ত পেরিয়ে গেল। বসন্তে যে শুধু ফুলই ফোটে তা না, গাছে গাছে নতুন পাতা গজায়, প্রশান্তির বাতাস খেলে যায় ধানখেতের ওপর দিয়ে। ভারি সুন্দর সেসব সবুজের ঢেউতোলা ধানের মাঠগুলো। বিলের মধ্যে রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশের এ এক অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য দেখা যায়, যা পৃথিবীর সব দেশ থেকে আমাদের স্বতন্ত্র করে দেয়। আহা, এমন বসন্তশোভা, দিগন্তবিস্তৃত সবুজের গালিচা আছে কোন দেশে! চৈত্রের শেষে টাঙ্গাইল সদরের ঘারিন্দা ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে গাড়িতে যাওয়ার সময় আশপাশের ধানখেতের সেসব শোভা দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। বিস্তীর্ণ মাঠের শোভার সেসব রস আস্বাদনে গাড়ি থেকে নেমে মাঠে পড়লাম। ধানগাছগুলো তখন শিষ ছেড়েছে। ধানের দানাগুলোর মধ্যে দুধ জমেছে, শিষগুলো খাড়া হয়ে আকাশের সঙ্গে মিতালি করছে। এসব দৃশ্য দেখতে দেখতেই চোখ পড়ল আইলের কোলে থাকা একটা ধানগাছের ওপর। পাতার ওপরে বসে হাওয়ায় দোলা খাচ্ছে একটি অপূর্ব সুন্দর পোকা, যেন শুভ্র রেশমি উলের পোশাক পরে বেড়াতে এসেছে।
সবুজের জমিতে তাকে মানিয়েছে বেশ। চিনতে কষ্ট হলো না, এর আগেও তাকে কয়েকবার দেখেছি। নাম তার হলদে পুচ্ছ মথ, ইংরেজি নাম ইয়েলো-টেইল মথ। প্রজাতিগত নাম Euproctis similis, গোত্র ইরেবিডি, অধিগোত্র নকটুইডি, বর্গ লেপিডোপ্টেরা। এক সুইস চিত্রকর, কীটতত্ত্ববিদ ও প্রকাশক যোহান কাসপার ফুসেলিন ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম এ প্রজাতির পোকার বিবরণ দেন। এরা বসার সময় ডানাগুলো মাটির দিকে ভাঁজ করে রাখে, যেন দোচালা ঘরের চাল। সে জন্য পাশ থেকে ওদের স্পষ্ট চেহারা দেখা যায়। ডানা প্রসারিত অবস্থায় বিস্তার হয় ৩৫ থেকে ৪৫ মিলিমিটার। ডানা ধবধবে দুধসাদা, সূক্ষ্ম রেশমি আঁশের মতো পশমাবৃত। দেহের সব অঙ্গই সাদা। শুধু পেটের শেষ প্রান্ত হলদে। এ জন্যই এ মথের নাম হয়েছে হলদে পুচ্ছ মথ। মেয়ে মথ পুরুষ মথের চেয়ে বড় ও সামনের ডানাজোড়া দাগবিহীন সাদা, পুরুষের সামনের ডানায় একটি করে ক্ষুদ্র কালো বা বাদামি দাগ থাকে। উভয়ের শুঁড় চিরুনির মতো।
দেখতে সুন্দরী হলেও তার মতো ঘাতিনী আর নেই। তার প্রথম কাজ হলো তার পুরুষ সাথিকে খুঁজে বের করা, তারপর তার সঙ্গে সঙ্গম করা। দ্বিতীয় কাজ হলো সঙ্গমের পর গর্ভবতী হলে ডিম পাড়া। ডিম ফুটে বাচ্চারা যাতে খেয়ে ডাঙ্গর হতে পারে, সে জন্য সে ডিম পাড়ে ধানের পাতার নিচে। ব্যস, এ পর্যন্তই তার দায়িত্ব। এরপর সেসব ডিম ফুটে ছানারা বের হলে তারা পাতা খাওয়া শুরু করে। বাচ্চাগুলোর সারা গা পশমে ঢাকা, সে জন্য কৃষকদের কাছে তারা বিছা পোকা নামে পরিচিত। বিছা পোকা গায়ে লাগলে চুলকায়।
কয়েক রকমের বিছাপোকা ধানখেতে দেখা যায়। এ পোকার জীবনচক্র আর ক্ষতির নমুনা দেখা একসময় আমার একটা আগ্রহের বিষয় ছিল। সচরাচর এদের আমন ধানের খেতে দেখা যায়। আলোতে এরা আকৃষ্ট হয়। আমন ধানের খেতের ধারে আলোক ফাঁদ পেতে এসব পোকাকে ধরেছি কয়েকবার। একদিন ধানখেতে থেকে বেশ মোটাসোটা পেটফোলা একটি হলদে পুচ্ছ মথ ধরে এনে একটা পোকার চিড়িয়াখানার মধ্যে ছেড়ে দিয়েছিলাম। একটা টবে এক গোছা ধানগাছ লাগিয়ে সে গাছকে বস্তার মতো বড় স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঘিরে সেই চিড়িয়াখানা বানিয়েছিলাম। অনুমান সত্য। পরদিনই দেখলাম, একটা ধানপাতার নিচে কয়েকটা ডিম। রোজই একবার করে দেখতে থাকলাম, ডিম ফুটেছে কি না। একদিন দেখলাম ডিম ফুটে ছানা বেরিয়ে পাতার ওপর হাঁটতে শুরু করেছে। ছানার সঙ্গে মায়ের চেহারা ও রঙের কোনো মিলই নেই।
ছানাদের গা পশমে ভর্তি, পিঠের ওপর দিয়ে লম্বালম্বিভাবে ইট-লাল রেখা, পাশে সাদা রেখা, মাথাটা কালো। কিছুক্ষণ ঘুর ঘুর করল ছানারা, তারপর পাতার কিনারায় গিয়ে খাওয়া শুরু করল। প্রথমে দেখলাম, তেরছা করে পাতার কিনারা থেকে খেতে খেতে মধ্য শিরা পর্যন্ত গেল, তারপর সোজা মধ্য শিরার পাশ থেকে ইঞ্চি দেড়েক খেতে খেতে আবার তেরছা করে খেয়ে উঠে গেল। খাওয়া অংশটুকু দেখতে অনেকটা থার্ড ব্র্যাকেটের মতো দেখাল। এতেই ওর খাওয়ার ধরনটা আমার বোঝা হয়ে গেল। খেতে খেতে ছানারা বড় হতে লাগল, মল ত্যাগ করে চিড়িয়াখানাটা নোংরা করল। অবশেষে সাদাটে খোলসের মধ্যে একদিন মূককীট অবস্থায় গেল। এরপর একদিন সেই খোলস কেটে বেরিয়ে এলো সাদা ধবধবে মথ। পুরো ডিম থেকে মথ হতে সময় লাগল প্রায় দেড় মাস। জানা গেল, এর ছানারা বহুভোজী। অর্থাৎ শুধু ধানগাছ না, এরা কুল, কাজুবাদাম ও অনেক বনজ বৃক্ষেরও পাতা খায়। সে অর্থে এরা ক্ষতিকর পোকা। ভারত ও শ্রীলঙ্কায়ও এ পোকা আছে। সাধারণত এপ্রিল থেকে আগস্টে নিশাচর এ পোকাদের দেখা যায়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ