চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) জালিয়াতির মাধ্যমে গৃহকর কমিয়ে দেওয়া ‘প্রচলিত নিয়মে’ পরিণত হয়েছে। বড় বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি ছোট স্থাপনার ক্ষেত্রেও ফ্লুইড দিয়ে মুছে গৃহকর কমিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজস্ব বিভাগের অনিয়ম ও গাফিলতির কারণে সংস্থাটির ২২২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চসিকের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, তিন তারকা মানের ‘হোটেল আগ্রাবাদ লিমিটেডের’ বার্ষিক কর মূল্যায়ন নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ কোটি টাকা। এই হোল্ডিংয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে বার্ষিক গৃহকর নির্ধারণ করা হয় ৮৫ লাখ টাকা। কমানো হয় ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। একইভাবে ‘চিটাগং কনটেইনার ট্রান্সপোর্টেশন কোম্পানি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। কর কর্মকর্তারা নিজ উদ্যোগে ওই হোল্ডিংয়ের গৃহকর চূড়ান্ত করেন ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
শহরের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার আরেক তিন তারকা হোটেল ‘সেন্ট মার্টিন লিমিটেডের’ গৃহকর নির্ধারণ করেছিল ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সেই হোল্ডিংয়ে কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১৮ লাখ টাকা। শুনানি ছাড়াই কাজটি করেছে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা। মূলত ফ্লুইড দিয়ে মুছে তারা এই জালিয়াতি করেন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, আরও ৩৭টি হোল্ডিংয়ের জন্য বার্ষিক কর মূল্যায়ন নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। জালিয়াতির মাধ্যমে এসব হোল্ডিংয়ের কর কমানো হয় ১৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। চূড়ান্ত কর নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, চসিকের ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৭৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা গৃহকর এবং ১৭ কোটি ১১ লাখ টাকার ট্রেড লাইসেন্স ফি, দোকান ভাড়া ৬ কোটি টাকা এবং রিকশা লাইসেন্স ফির ৯০ লাখ টাকা বকেয়া আছে। বকেয়া আদায়ে রাজস্ব বিভাগের তৎপরতা ছিল না বলেও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া দুই অর্থবছরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাইনবোর্ড ফি হিসেবে ১ কোটি ৩১ লাখ ৭১ হাজার টাকা আদায় করেছে চসিক। আদায় হওয়া অর্থের বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ভ্যাট আদায় করা হয়। এই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করেনি। এ ছাড়া রিকশা লাইসেন্স ফি, মেডিকেল বর্জ্য ইজারা, সৌন্দর্যবর্ধন ফি খাত থেকে ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা আদায় করে সিটি করপোরেশন। এখানেও ভ্যাট হিসেবে আদায় ৫৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়নি। এ ছাড়া সাইনবোর্ডের আয়তন কমিয়ে চসিককে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চসিকের আইন অনুযায়ী কোনো হোল্ডিং মালিক যদি মনে করেন তার ওপর মাত্রাতিরিক্ত গৃহকর আরোপ করা হয়েছে, তা হলে তিনি আপিল করার সুযোগ পান। আপিল বোর্ড শুনানি শেষে একটি যৌক্তিক গৃহকর নির্ধারণ করে দেন। এসব হোল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কর কর্মকর্তারা ফ্লুইড দিয়ে মুছে কর কমিয়ে দেন। এতে বিরাট অংকের লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফুল আমিন বলেন, ‘অভিযুক্ত সব হোল্ডিংয়ের বিষয়ে তদন্ত করতে আইন কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মুরাদকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আসেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চিটাগং ডেভেলপমেন্ট ফোরামের মূখপাত্র খোরশেদ আলম এ বিষয়ে বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব শাখা দুর্নীতির আখড়া। এই বিভাগের লোকজন মানুষের বাড়ি গিয়ে বেশি গৃহকর আরোপের ভয় দেখায়। আবার মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে গৃহকর কমিয়ে দেয়— এমন অভিযোগও রয়েছে।’
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়ম চিহ্নিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে তা হলো ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’-এর মতো। তদন্ত করলে হাজার ফাইল বেরিয়ে আসবে। কিন্তু কে করবে তদন্ত। মেয়র পরিবর্তন হলেও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রয়ে যান। তারা সম্মিলিতভাবে দুর্নীতি করেন।’