‘হবে। তবে চোখ বন্ধ করে ঝিমালে হবে না!’ বুজুর্গ বন্ধুবর যে প্রশ্নের জবাবে বলেছেন একথা, তা একটু পরেই বলছি। বন্ধ চোখ নিয়ে আপনার ধারণা কী? কী ঘটে আপনার বেলায়, চোখ মুদলেই? চলে যান দূর নির্জনে, প্রিয় বন্ধুর সাথে পাহাড়ি ঝর্ণা দেখার মুহূর্তে? নাকি ব্ল্যাকবোর্ড থেকে মুখ ঘুরিয়ে স্যারের চোখ রাঙানিটা এখনো স্পষ্ট শাসায়? খাবি খাওয়া স্বপ্নগুলোর আজগুবি আস্ফালনে বাড়তে থাকে আপনার হার্টবিট? নাকি নাকের গরম নিঃশ্বাস পড়ে বসের কাঁপা গোঁফে বিরক্তির শব্দটা শুনতে পান আবারও! নাকি সমুদ্রের পানি এসে পা ভিজিয়ে দেয়ার সেই স্মৃতিটাই রোমন্থন করেন!
আচ্ছা, যা-ই ঘটুক, ভালো বা মন্দ! পড়া থামিয়ে খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করে একটুখানি দেখে নেয়া যেতে পারে! এরপর না হয় বাকি লেখায় চোখ রাখা যাক।
একটা বিষয় খেয়াল করেছেন? বন্ধ চোখে এমন অনেক কিছুই দেখতে পাওয়া যায়, খোলা চোখে যা আদতে দেখা যায় না। বন্ধ চোখে দেখা এসব অনুভূতি, ছবি বা স্মৃতি কীসের ফলাফল? জ্বি, প্রতি মুহূর্তে পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে যে অগণিত তথ্য মস্তিষ্ক গ্রহণ করে, তারই বিশ্লেষণ। বিশ্লেষণ থেকেই এই ছবি বা ইমেজ তৈরি হয়। হ্যাঁ, যারা জানেন, তারা এআই জেনারেটেড ছবির ব্যাকরণের সাথে মিলিয়ে নিতে পারেন।
আমাদের মস্তিষ্কের ভাষা হচ্ছে ছবি। এই ছবি তৈরি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ও দারুণ মনোযোগের দাবিদার! তথ্য বিশ্লেষণ করে ছবিটা কেমন হবে, এটি তথ্যের পাশাপাশি আপনার ওপর নির্ভর করে অনেকখানি। আপনি বলতে আপনার মুডের ওপর! মুডকে ভাব, দৃষ্টিভঙ্গি বা নিয়ত নানান শব্দেও প্রকাশ করা যেতে পারে। কী রকম? একটা ছোট্ট ঘটনা উল্লেখ করা যাক।
একটি বাচ্চা চিৎকার জুড়েছে, হাতির দাঁত খাবে! খাবে তো খাবেই! কোনোভাবেই কেউ তাকে বোঝাতে পারছে না। দুরন্ত শক্তিশালী নতুন জেনারেশনের বাচ্চা! চাচা-ফুফু, মা-বাবা রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। দাদি টিকে আছেন কোনোমতে। বুঝতেই পারছেন, ‘বাড়ি মাথায় তোলা’ বাগধারার সার্থক পরিস্থিতি বাড়িতে। অগত্যা বই বন্ধ করে উঠলেন দাদা। নাতির কাছে গিয়ে বললেন, চলো! হাতির দাঁত কিনে আনি। নাতি তো বেজায় খুশি! কিছুক্ষণ পর দাদা-নাতি বাইরে থেকে ঘুরে এসে বাসায় ঢুকলেন। নাতির হাতে হাতির দাঁতসদৃশ লম্বা এক গাজর! কিছুক্ষণ খাওয়ার চেষ্টা করে নাতিও ভুলে গেল হাতির দাঁতের কথা!
নাতিকে এখানে মস্তিষ্ক হিসেবে ভাবতে পারেন। তাকে কোন মুডে থেকে কেমন ছবি দিয়ে কীভাবে আপনার কাজ উদ্ধার করবেন, তা বাচ্চা লালনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার!
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মস্তিষ্কে অনেক তথ্য জমতে থাকে। ছবি তৈরির এই পুরো প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে আরো বৈচিত্র্যময়! যেমন- শিশুকে লাল গাজর দিয়ে সাদা হাতির দাঁত বোঝানো গেলেও বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। আবার বয়স্ক মানুষের হাতির দাঁত খাওয়ার ইচ্ছা না হয়ে হাতির গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হওয়া সাধারণভাবে যুক্তিযুক্ত! বয়স্কদের আবার এই ইচ্ছা না হওয়াও যুক্তিযুক্ত!
আবার আমাদের কারো কারো ক্ষেত্রে দুঃখ বা বেদনার অনেক স্মৃতি আমরা ভুলতে পারি না। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার স্মৃতি হতে পারে, অন্যায় অপদস্থ হওয়ার স্মৃতি হতে পারে বা এমন স্মৃতি বা ছবি যা ভাসলেই শারীরবৃত্তীয় স্বাভাবিক ক্রিয়াগুলো অস্বাভাবিক হয়ে যায়। অনিচ্ছাসত্তেও বার বার অনাকাক্সিক্ষত ছবি মস্তিষ্কপটে আসতে থাকাটাই চিকিৎসাবিজ্ঞানে ট্রমা নামে পরিচিত। শুধু ট্রমাগ্রস্ত মানুষ নয়, সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের জন্যেও স্মৃতি বা ছবির ওপর নিয়ন্ত্রণ কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে প্রায় প্রতিটি মুহূর্তেই অনেক কাজের।
ধরা যাক, অফিসের বস বা শিক্ষকের রুমে ভাইভার জন্যে ঢুকবেন। সেই সময় যদি ভয়ানক অভিজ্ঞতা বা কল্পনার স্মৃতি তার সামনে ভাসতে থাকে, সম্ভাবনা আছে, তিনি যতটুকু প্রস্তুতি নিয়েছেন, ততটুকু দেখাতে পারবেন না!
স্মৃতি বা ছবির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে কাজের পারফরম্যান্স ভালো করাও সম্ভব। কতটা ভালো করা সম্ভব? এটা জানার আগে আমরা বোঝার চেষ্টা করি স্মৃতি বা মস্তিষ্কে ছবি তৈরির ওপর কীভাবে নিয়ন্ত্রণ নেয়া যায়। এই নিয়ন্ত্রণের জন্যে বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি ধ্যান বা মেডিটেশন। প্রাচ্যের আবিষ্কৃত এ পদ্ধতিটি নিয়ে পাশ্চাত্যের আগ্রহ তুঙ্গস্পর্শী! বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৩২ সালে মেডিটেশনের ইন্ডাস্ট্রি গিয়ে দাঁড়াবে ৩২ বিলিয়ন ডলারে (প্রায় ৩ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা বর্তমান ডলার মূল্য অনুযায়ী, দেশের বর্তমান বাজেটের অর্ধেকমতো!) । এক আমেরিকাতেই ধ্যান বা মেডিটেশন চর্চাকারীর সংখ্যা সাড়ে ৩ কোটি ছাড়িয়েছে!
মেডিটেশনের এই উত্থানের পেছনে মূল কারণ এর কার্যকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মোজেজা বা কারামতি! কার্যকারিতা হচ্ছে, চর্চাকারীরা দ্রুতই ফল লাভ করেন। অর্থাৎ হতাশা, একঘেয়েমি, বিষণ্ণতা, ক্রনিক পেইন ইত্যাদি মনোদৈহিক বা সাইকোসোমাটিক রোগগুলোর ক্ষেত্রে মেডিটেশন অব্যর্থ প্রায়!
আর মোজেজা হচ্ছে ক্রনিক রোগের প্রচলিত ওষুধগুলোর মতো মেডিটেশনের কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। মেডিটেশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া একটিই, তা হলো মস্তিষ্কে সেরোটনিনের প্রবাহ বাড়বে, কর্টিসলের পরিমাণ কমবে। ফলে চর্চাকারীর স্বতঃস্ফূর্তভাবে সুখ সুখ থাকার পরিমাণ বেড়ে যাবে।
একারণে মেডিটেশন চর্চাকারীরা একবার মেডিটেশন বিষয়টা বুঝে ফেললে এটাকে জীবনযুদ্ধ জয় এবং আধ্যাত্মিক অনেক ক্ষেত্রেই কাজে লাগাতে পারেন। সেগুলো এ লেখার বিবেচ্য বিষয় নয়। এ লেখার বিবেচ্য বিষয়ের একটি হতে পারে মেডিটেশনের মাধ্যমে স্মৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কতটা ভালো করা সম্ভব? কী কী করা সম্ভব?
এক্ষেত্রে বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধ্যানপদ্ধতি কোয়ান্টাম মেথডের প্রসঙ্গ আনা যেতে পারে। কোয়ান্টাম মেথড মেডিটেশন চর্চা করে লক্ষাধিক মানুষ বিচিত্র রকমের উপকার পেয়েছেন। ব্যথা বেদনা ভালো হয়ে গেছে, ঘুমের সমস্যা দূর হয়েছে, লক্ষ্য স্থির করতে পেরেছেন, লক্ষ্যের পথে লেগে থাকতে পেরেছেন, ক্ষতিকর অভ্যাস ছাড়তে পেরেছেন ইত্যাদি নানান প্রসঙ্গ আনা যেতে পারে।
তবে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, পাশ্চাত্যের ভ্রান্ত অনুকরণে দমচর্চাকে মেডিটেশন ভেবে ধোঁকায় পরা যাবে না! যেমন- পাঁচ মিনিটের মেডিটেশন, তিন মিনিটের মেডিটেশন! এগুলো চটুল এবং বিজ্ঞাপনের জন্যে চলতেই পারে। কিছু সময় দমচর্চায় হয়তো শরীরে অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়বে, কিছুটা ভালো লাগা তৈরি হবে। কিন্তু মেডিটেশনের উপকার পাওয়ার জন্যে মেডিটেটিভ লেভেলে যাওয়াটা কিন্তু জরুরি। সেই লেভেলে মনের ক্যানভাসে আঁকা ছবি বাস্তবতায় রূপ নেয়ার জন্যেই যেন সময়ের দরজায় কলিং বেল চেপে অপেক্ষা করছে।
বিষয়টি একেবারেই সহজ। সাইকেল চালানোর মতো! সাইকেল চালানো শুরু করার সময় ব্যাকরণটা বুঝে ফেলতে হয়। এরপর চালাতে চালাতে চালকের দক্ষতাও বাড়ে, সাইকেল দিয়ে কারিশমাও দেখাতে পারে। মেডিটেশনও তাই। মেডিটেশনের মাধ্যমে নিজের দেহ-মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। তখন নিরাময়সহ বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের কাজেও মেডিটেশনকে প্রয়োগ করা সম্ভব।
শুরুতে আমরা চোখ বন্ধ করে কিছু ভাবার চেষ্টা করেছিলাম, এটাকে আরো ভালোভাবে করা যেতে পারে সামান্য সময় দমচর্চা দিয়ে শুরু করে। পুরো প্রক্রিয়া এখানে না লিখে একটা অডিও লিংক ( https://url-shortener.me/17NS ) শেয়ার করা যাক। আগ্রহীরা চেষ্টা করে দেখতে পারেন। উপকার ঘরে উঠবে নিশ্চিত।
এই স্মৃতি বা ছবি তৈরির ওপর নিয়ন্ত্রণ আপনাকে দিতে পারে অনন্য স্বাধীনতা! পরিস্থিতি দ্বারা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত না হয়ে, সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার অসাধারণ এক ক্ষমতা! তীব্র যানযটেও আপনি বিরক্ত না হয়ে ভাবতে পারবেন, এখন কোন পথ বা কোন বাহনটা বেছে নেয়া আপনার জন্যে সঠিক! চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আঁকতে পারবেন সমস্যা থেকে উত্তরণের বাস্তবসম্মত নকশা। উত্তেজনার নরকাগ্নি উত্তাপেও আপনি সুশীতল ঝর্ণাসম আচরণ উপহার দিয়ে ঘটনার প্রতিটি কানাচে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন নিজের নিয়ন্ত্রণ!
ব্যক্তিজীবনে শুধু নয়, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও দূরপ্রসারী ছবি আঁকা এবং সে দায়িত্বগুলো পালনে যারা অগ্রগামী, তাদের জন্যেও মেডিটেশন হতে পারে যুগসাধনায় পাওয়া ব্রহ্মাস্ত্র!
এ কারণেই শুরুতে বুজুর্গ বন্ধুবরের টক-মিষ্টি উত্তর দিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম। প্রশ্ন করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এক আগ্রহী তরুণ, চোখ বুজে মেডিটেশন করলে কী ভাই দেশের উন্নতি হবে? বুজুর্গ বন্ধুবরের উত্তরের মর্মার্থ ছিল, মেডিটেশন আত্মউন্নয়নের জন্যে, দূরপ্রসারী লক্ষ্য নির্ধারণে সুপরিকল্পিত হওয়ার জন্যে। মেডিটেশনের সময় দেহকে শিথিল রেখে সচেতনতার এক উচ্চতর মাত্রায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে বন্ধ চোখে তথ্য বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনায় সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ রাখা যায়! তাই মেডিটেশন দিয়ে অনেক কিছুই সম্ভব। কিন্তু চোখ বন্ধ করে ঘুমালে বা ঝিমালে তা হবে না!
বুজুর্গ বন্ধুবরের শেষ কথা- ব্যক্তির উন্নয়নই রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের ভিত্তি। প্রতিটি ব্যক্তির উন্নয়নের মধ্যদিয়েই প্রস্ফুটিত হবে রাষ্ট্রীয় উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর স্বপ্ন। সকলকে মেডিটেশন দিবসের শুভেচ্ছা।
লেখক: জান্নাতুল আদন, সমাজকর্মী