মুক্তিপণের মাধ্যমে দীর্ঘ এক মাস দুই দিন পর সোমালিয়ান জলদস্যুদের জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ ও এর ২৩ নাবিক। বাংলাদেশ সময় গত শনিবার রাত সোয়া ৩টার দিকে এমন খবর দেয় জাহাজটির মালিকপক্ষ কেএসআরএম গ্রুপ। মুক্ত হওয়ার পর এমভি আবদুল্লাহকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ নিরাপত্তা দিয়ে দুবাইয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সোমবার (১৫ এপ্রিল) বেলা ২টার দিকে জাহাজটিকে পাহারা দিয়ে নেওয়ার ছবি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
এদিকে মুক্তির খবরে নাবিকদের পরিবারে বইছে আনন্দের বন্যা। অন্যদিকে মুক্তিপণের ডলার হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ব্যাগে করে ওপর থেকে ফেলা হয়েছে বলে যে ছবি প্রকাশ পেয়েছে, সে বিষয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘ছবিটি এডিট করা।’
নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
এমভি আবদুল্লাহকে পাহারা দিচ্ছে দুই যুদ্ধজাহাজ
মুক্তি পাওয়ার পর এমভি আবদুল্লাহর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনী। বাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ এমভি আবদুল্লাহকে নিরাপত্তা দিয়ে নিরাপদ জলসীমায় নিয়ে আসছে। গতকাল সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এমভি আবদুল্লাহকে পাহারা দেওয়ার তিনটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।
ভারত মহাসাগর পার হয়ে আরব সাগর পৌঁছানো পর্যন্ত নিরাপত্তা দেবে এ যুদ্ধজাহাজ। আজ মঙ্গলবার নিরাপদ সমুদ্রপথে জাহাজটি পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উদ্ধার নাবিকরা
পুরোনো অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জাহাজ ও নাবিকদের উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে মালিকপক্ষ কেএসআরএম গ্রুপ। তবে উদ্ধারের পরপরই দস্যুদের কত টাকা মুক্তিপণ দিতে হয়েছে এবং কীভাবে এসব টাকা দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে গুঞ্জন ওঠে। এ বিষয়ে গত রবিবার চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় কেএসআরএমের করপোরেট কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে করে মালিকপক্ষ।
এ সময় কেএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, ‘আমরা উদ্ধার প্রক্রিয়া হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে কাজ করেছি। আমাদের সঙ্গে ওদের কনফারেন্সিয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছে মুক্তিপণের বিষয়ে আলোচনা না করার জন্য। সেই অ্যাগ্রিমেন্ট অনুযায়ী আমি আপনাদের সঙ্গে কিছু শেয়ার করতে পারব না। কারণ এটা আমি সই করেছি। উদ্ধার প্রক্রিয়ায় আমরা আমেরিকান নিয়ম মেনেছি এবং ইউকে (যুক্তরাজ্য) ও সোমালিয়ার নিয়ম মেনেছি। ফাইনালি কেনিয়ার নিয়মও মেনেছি। সবার সঙ্গে আমাদের অ্যাগ্রিমেন্ট করা আছে এ বিষয়ে আলোচনা না করার জন্য। তবে আমি আবার বলি, আমরা সবকিছু আইন মেনে করেছি।’
এদিকে একটি সূত্রে জানা গেছে, জলদস্যুদের দাবি অনুযায়ী মুক্তিপণ নিয়ে একটি উড়োজাহাজ বাংলাদেশ সময় গত শনিবার বিকেলে জিম্মি জাহাজের ওপর চক্কর দেয়। জাহাজের ওপরে ২৩ নাবিক অক্ষত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর উড়োজাহাজ থেকে ডলারভর্তি তিনটি ব্যাগ সাগরে ফেলা হয়। স্পিডবোট দিয়ে এসব ব্যাগ জলদস্যুরা কুড়িয়ে নেয়। পরে জাহাজে ওঠে দাবি অনুযায়ী মুক্তিপণ গুনে নেয় জলদস্যুরা। মুক্ত হয়ে ২৩ নাবিককে নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দরের উদ্দেশে রওনা দেয় এমভি আবদুল্লাহ। এরপর ২৩ নাবিক দুবাই থেকে প্লেনে দেশে ফিরবেন।
ব্যাগে মুক্তিপণ দেওয়ার ছবি এডিট করা: প্রতিমন্ত্রী
ব্যাগে মুক্তিপণ দেওয়ার ছবি কোন সিনেমার আমি তো জানি না। এমন ছবি তো আমরা অনেক চলচ্চিত্রে দেখি। কোন ছবি কোথায় গিয়ে কীভাবে যুক্ত হয়েছে, কোনটার সঙ্গে কোনটা এডিট হয়েছে আমি জানি না। জানতাম পরিত্যক্ত জিনিস পানিতে ফেলে। এত দামি জিনিস পানিতে ফেলে জানা ছিল না। সোমবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জিম্মি নাবিকদের ছাড়াতে মুক্তিপণের অর্থ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্নের মুখে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এ কথা বলেন।
জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া জাহাজটি এখন দুবাইয়ের উদ্দেশে আসছে জানিয়ে নৌপ্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সেটি ১৯ বা ২০ এপ্রিল দুবাইয়ে পৌঁছাবে। নাবিকরা যদি চায় বাংলাদেশে ফিরে আসতে তাদের বিমানযোগে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে।’
মুক্তির খবরে পরিবারে আনন্দের বন্যা
নাবিকদের মুক্তির খবরে তাদের পরিবারে বইছে আনন্দের বন্যা। নাবিক সাব্বিরের বাবা হারুনুর রশীদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ছেলে জিম্মি হওয়ার পর থেকে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটে। ঈদে পরিবারের কারও মনে আনন্দ ছিল না। সাব্বির মুক্তি পাওয়ায় এখন খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে আজকেই আমাদের ঈদের দিন। সবার মুখে হাসি ফুটেছে।’ সাব্বির হোসেনের বাড়ি টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার সহবতপুর ইউনিয়নের ডাঙা ধলাপাড়া গ্রামে।
সাব্বিরের মা সালেহা বেগম বলেন, ‘একটা মাস কীভাবে কেটেছে তা বলতে পারব না। ছেলে যখন কল দিয়ে বলল, মুক্তি পেয়েছি, ভালো আছি, কথাটা শোনার পর থেকে ঈদ মনে হচ্ছে। ছেলেকে কাছে পেলে আনন্দটা আরও বেড়ে যাবে।’
এদিকে এমভি জাহাজের মাস্টার মোহাম্মদ আবদুর রশিদের স্ত্রী ফাহমিদা আক্তার বলেন, ‘মুক্তির সুখবর পাওয়ার পর আত্মীয়স্বজনরা খোঁজখবর নিচ্ছেন, ঘরে আসছেন। সবার মধ্যে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাস। এ যেন ঈদের আনন্দকেও ছাড়িয়ে গেছে।’
জাহাজের প্রধান কর্মকর্তা আতিক উল্লাহ খানের ভাই আবদুর নুর খান আসিফ বলেন, ‘আমাদের ভাই জিম্মি থাকায় অসহায় ছিলাম। কি করব, কোথায় যাব, কিছুই ভেবে পাইনি। কিন্তু বিষয়টি জাহাজের মালিকপক্ষ খুবই গুরুত্বের সঙ্গে হ্যান্ডেল করেছে। নাবিকরা জীবন নিয়ে ফিরে আসছে এটা আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
একইভাবে চট্টগ্রামের আনোয়ারার বাসিন্দা হোসেন মো. সাজ্জাদ ওই জাহাজে জিম্মি ছিলেন। সাজ্জাদের ভাই মো. মোশাররফ খবরের কাগজকে বলেন, ‘রবিবার ভোরে আম্মার সঙ্গে কথা বলেছে সাজ্জাদ। তারা এখন মুক্ত। ভাই মুক্ত হওয়ার কথা শুনেই মনে হচ্ছে ঈদের প্রকৃত আনন্দ বইছে আমাদের ঘরে।’
গত শনিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টায় মুক্তিপণের ডলারভর্তি তিনটি ব্যাগ জলদস্যুদের হাতে পৌঁছালে নাবিকসহ জাহাজটি মুক্ত করা হয়। জলদস্যুরা জাহাজ থেকে নেমে যায়। মুক্ত হয়ে মধ্যরাতে ২৩ নাবিককে নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দরের উদ্দেশে রওনা দেয় এমভি আবদুল্লাহ। এরপর ২৩ নাবিক দুবাই থেকে প্লেনে দেশে ফিরবেন।