অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের যদি রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি না হয়, তাহলে কী করে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ তৈরি হতে পারে? বৈষম্যহীন বাংলাদেশ তৈরি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে হবে, দখলদারত্বমুক্ত করতে হবে। ছাত্ররাজনীতি অবশ্যই সেখানে সক্রিয়ভাবে রাখতে হবে।’
শুক্রবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন। ‘জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-শ্রেণি বৈষ্যমহীন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও বাংলাদেশের বিনির্মাণের দাবি’ শিরোনামে এ সমাবেশ আয়োজন করা হয়।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজাহাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দেশের বুদ্ধিজীবী মহলে কেউ কেউ এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্যরা এর বিরোধিতা করেন।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বাহাত্তর, পঁচাত্তর, আশির দশক কিংবা নব্বইয়ের দশকে কারা সন্ত্রাস করেছে? আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল তখন ছাত্রলীগ, বিএনপি-জামায়াতের সময় ছাত্রদল-ছাত্রশিবির, জাতীয় পার্টির সময় জাতীয় ছাত্রসমাজ সন্ত্রাস করেছে। কিন্তু এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে কারা? দখলদারত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে কারা? বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করল কারা?’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্দেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আপনি নিষিদ্ধ করলেন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র কাউন্সিল। এদের ইতিহাস কী? এরা সব সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-শিক্ষার্থীর যে গণ-অভ্যুত্থান হলো, সেখানেও তারা অংশগ্রহণ করেছে। তারা যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তাহলে সক্রিয় হবে কারা?’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনাকে আনু মুহাম্মদ উল্লেখ করেছেন ‘গ্যাং কিলিং’ বলে। হত্যাকারীরা ‘ক্ষমতার অংশীদারত্ব পেয়েছে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গ্যাং কিলিং যারা করেছে, তারা কোনো সংগঠনের নাম দিয়ে করে নাই। কিন্তু তারা কোনো না কোনো জায়গা থেকে আশীর্বাদ পেয়েছে। কোনো না কোনো জায়গা থেকে তারা ক্ষমতার অংশীদারত্ব পেয়েছে।’
আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর করতে গেলে সব নাগরিককে সক্রিয় করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের সব কাজে নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সকল পর্যায়ে সংগঠিত শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে।
সমাবেশে তিনি পাহাড়ে-সমতলের সব ধরনের নৈরাজ্য, আক্রমণ সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হোতারা এখনো কেন সক্রিয় রয়েছে এ প্রশ্নও তোলেন আনু মুহাম্মদ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হতাহতদের সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা করা হলেও তাদের ভরণপোষণের গুরুদায়িত্ব সরকারকে নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
সমাবেশে অতিথি অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘এ সরকার বলছে, সংস্কার করতে আমাদের যতদিন লাগবে আমরা তত দিন থাকব। সংস্কার করতে যদি ১৫ বছর লাগে, তাহলে তাদের ১৫ বছর থাকতে দেবেন আপনারা? এসব সরকারকে মানুষ বড়জোর এক বছর সহ্য করে। এর বেশি সহ্য করবে না। কারণ মানুষ তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সরকারকে একটা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। সরকার হচ্ছে আমার অধিকার বাস্তবায়নের গ্যারান্টি। আমাদের অধিকার রক্ষা করার শক্তি যদি বর্তমান সরকারের না থাকে বা তার সঙ্গে যে উপসরকার (প্রশাসন) আছে, তারা যদি সেটা বাস্তবায়িত হতে না দেয়, তাহলে এই সরকার যে ম্যান্ডেট দাবি করছে, সেই দাবি কিন্তু বেশি দিন থাকবে না।’
ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা বলেন, ‘আমরা পাহাড়িরা যদি অধিকারের প্রশ্ন তুলি, তখন আমাদের সন্ত্রাসী বলা হয়। বলা হয়, আমরা দেশটাকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছি। আজকে দীঘিনালায় যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, তা নতুন কোনো ঘটনা নয়। পাহাড়ের সবচেয়ে বড় বৈষম্য সামরিক শাসন। পাহাড়ে বৈষম্য বিতাড়ন করতে হলে সেখান থেকে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করতে হবে।’
সমাবেশের সঞ্চালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা নিত্রা বলেন, ‘এই অন্তর্বর্তী সরকারের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি মধ্যমেয়াদি, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছে।’
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, গবেষক মাহা মির্জা, বাম নেতা ডা. হারুন-অর-রশিদসহ অন্যরা।
জয়ন্ত সাহা/এমএ/