দেশের সব ক্ষেত্রেই পুরুষতান্ত্রিকতা রয়েছে। ফলে নারীর সমঅধিকার সম্পত্তিতে না পাওয়া থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে। আমাদের সংবিধানে সমঅধিকারের কথা বলা হলেও সম্পত্তিতে সমঅধিকারে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। তাই এ থেকে বেরিয়ে আসতে সংবিধানের পরিবর্তনের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও নারী গ্রন্থ প্রবর্তনার সভানেত্রী ফরিদা আখতার।
শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে ক্ষুব্ধ নারী সমাজের সংলাপ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। সোচ্চার হতে হবে। এটি নিয়ে এখন আওয়াজ তুলতে হবে। তিনি বলেন, চলে আসা প্রক্রিয়ায় এখনো এ দেশ পুরুষ তান্ত্রিক। তাই অনেক ক্ষেত্রেই আমরা নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে গেলেও নারীদের পাচ্ছি না। আমার মনে হয় আমাদের এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের সমঅধিকারের যে আন্দোলন তা চালিয়ে যেতে হবে।
সংলাপ অনুষ্ঠানে অংশ নেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীরা, সঙ্গে ছিলেন নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহিদ হওয়া সন্তানদের পরিবারের সদস্যরা এবং আন্দোলনের বিভিন্ন জায়গার সমন্বয়করা।
সংলাপে বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নারীর অধিকার আদায়ে করণীয় ও নারীরা সমাজের কোথায় কীভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তা নিয়ে আলোচনা হয়। এতে ক্ষুব্ধ নারী সমাজের পক্ষ থেকে ১০টি প্রত্যাশার তুলে ধরা হয়-
১. নাগরিক ও মানুষ হিসাবে রাষ্ট্রে বাঁচা ও জীবন ধারনের অধিকার চাই।
২. গণতন্ত্র-জবাবদিহিতা-স্বচ্ছতা ঘর-সংসার-সংগঠন-দল ও রাষ্ট্র সর্বত্র দেখতে চাই
৩. নারীর অধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ও সংবিধানের সংস্কার চাই।
৪. সারাদেশে অব্যাহত ধর্ষণ-যৌন নিপীড়নের সাথে যুক্তদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. হাইকোর্ট প্রণীত যৌন নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালাকে সকল প্রতিষ্ঠানে-কারখানায় বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করতে হবে। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (সংশোধিত) এর ১৪৬ (৩) ধারা সংশোধনসহ সকল নারীবিদ্বেষী আইন বাতিল করতে হবে।
৬. সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে নারীর ন্যূনতম ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠায় শতকরা ৩০ ভাগ নারী ও ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। একইভাবে অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনগুলোতেও এই অনুপাতে প্রতিনিধি মনোনয়ন ও নির্বাচনের অধিকার দিতে হবে। রাজনৈতিক দলসমূহতেও একই হারে প্রতিনিধি মনোনয়ন দিতে হবে।
৭. পারিবারিক ও উত্তরাধিকার আইনে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠায় 'নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত কনভেনশন' (সিডও) দলিলের পূর্ণ স্বীকৃতি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন করতে হবে। বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তান লালন- পালনে নারী-পুরুষের সমানাধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে।
৮. সকল ধরনের পেশায় মজুরি, পদমর্যাদা এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে বা কারখানায় ন্যূনতম শতকরা ৩০ ভাগ নারী কর্মী নিশ্চিত করতে হবে, পরিচালনা পর্ষদেও একই অনুপাত বজায় রাখতে হবে।
৯. পেশাজীবী-শ্রমজীবী সকল নারীর জন্য ছয় মাস সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যাবস্থা করতে হবে এবং যথাযথ কার্যকর করতে হবে। একইভাবে সকল প্রতিষ্ঠানে-কারখানায় অন্তত ১৫ দিনের সবেতন পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে।
১০. সকল কারখানা-প্রতিষ্ঠানে শিশুদিবা যত্নকেন্দ্রের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি- বেসরকারি উদ্যোগে বড় শহরগুলোতে ওয়ার্ড ভিত্তিক সস্তায় শিশু দিবা যত্নকেন্দ্রের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পরিশেষে, বলতে চাই রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
আলোচনায় শহিদ সন্তানদের পরিবারের সদস্যরা তাদের অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, অনেক পরিবার তাদের পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম মানুষটিকে হারিয়েছেন তাদের জন্য এ ৫ লাখ টাকা তেমন কোন উপকারে আসবে না। আবার অনেক পরিবারের এ টাকার প্রয়োজন নেই তারা কেবল ন্যায় বিচার চান। আবার অনেকে এমন আহত হয়েছে যে তার চিকিৎসা ব্যায় ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে আবার কারো ২০ হাজার টাকায় হয়ে যাবে। তাই যাদের যা প্রয়োজন তা দেওয়ার দাবি জানান তারা।
এর প্রেক্ষিতে অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ বলেন, আমরা যে অর্থের পরিমাণটি ঠিক করেছি তার প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছে। এর পরবর্তিতে আরও সহায়তা দেওয়া হবে তাদের অবস্থা বিবেচনা করে।
তিথি/এমএ/