রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ইস্যুতে সৃষ্ট মতবিরোধ ঘোচাতে শনিবার (২৬ অক্টোবর) ও আগের দিন শুক্রবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির ছাত্র নেতৃত্ব। এসব বৈঠকে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর বিষয়ে নানামুখী মতামত উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সাংবিধানিক সংকট এড়াতে রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে কঠোর অবস্থানে যেতে রাজি নয় বিএনপি। দলটি মনে করে, রাষ্ট্রপতিকে সরালে নানা ধরনের সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে এবং এতে নির্বাচন পিছিয়ে যাবে।
পক্ষান্তরে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য দলগুলো রাষ্ট্রপতিকে সরানোর বিষয়ে প্রায় একমত। এই দলগুলো মনে করে, যেহেতু গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন হয়েছে এবং একধরনের বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়েছে, সেহেতু এই সরকারের নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংবিধানের মিল নেই। সুতরাং শুধু রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে সাংবিধানিকভাবে অনড় থাকার যুক্তি নেই। ফলে তারা রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে সবকিছু ঢেলে সাজানোর পক্ষে।
অন্যদিকে বিএনপি মনে করে, রাষ্ট্রপতিকে সরানো হলে সাংবিধানিক সংকট দেখা দেবে। এতে নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে এবং তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপও অমূলক নয়। বিএনপি তাই যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের পক্ষে। এ জন্য তারা রাষ্ট্রপতিকে তার পদে বহাল রাখতে চায়। তার পদে থাকার ন্যূনতম হলেও সাংবিধানিক ভিত্তি আছে বলে তারা মনে করে। তবে এর ঘোরতর বিরোধী অন্য দলগুলো। তারা মনে করে, রাষ্ট্রপতি তার পদে বহাল থাকলে কখনো কোনো সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগ সরকার বা শেখ হাসিনার পক্ষে অবস্থান নেবেন। রাষ্ট্রপতির ন্যূনতম এই সুযোগটি তারা সাংবিধানিকভাবে রাখতে রাজি নয়। বিপ্লবী সরকারের আদলে তারা আমূল পরির্বতন চায়। সে ক্ষেত্রে সংবিধানকে দূরে রাখার পক্ষে তারা। ইতোমধ্যে ছাত্র নেতৃত্বসহ কয়েকটি দল নতুন সংবিধান তৈরির কথাও বলেছে।
গতকাল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে বৈঠক করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং পরদিন শুক্রবার জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বৈঠক করেছে তারা। এ ছাড়া টেলিফোনে ছোট দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির অপসারণের ব্যাপারে মতামত নিচ্ছে ছাত্র নেতৃত্ব। এরও আগে উপদেষ্টা পরিষদে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে গতকাল দুপুরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে এই বৈঠকে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। পুরো ঘটনা বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বিএনপির সঙ্গে ছাত্র নেতৃত্ব ও জাতীয় নাগরিক কমিটির বৈঠক
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সঙ্গে বৈঠক করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতৃত্ব ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। গতকাল বিকেল সোয়া ৫টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে মূলত রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে সরানোর দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন ছাত্রনেতারা। তারা বলেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দালিলিক প্রমাণ নেই বলে রাষ্ট্রপতি পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে একমত হয়ে এর সমাধান করতে হবে।
বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির প্রতি বিএনপির কোনো সহানুভূতি নেই। কিন্তু তাকে সরানোর পর কী পরিস্থিতি হতে পারে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিএনপির।
বৈঠকের শেষে ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ বিলুপ্তির প্রাথমিক ধাপে শেখ হাসিনার পতন ঘটিয়েছি। কিন্তু ফ্যাসিবাদের পূর্ণাঙ্গ বিলুপ্তির পথে আরেকটি বাধা রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। দুই দিন ধরে গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সঙ্গে আমরা আলোচনা করেছি। এরই অংশ হিসেবে বিএনপির সঙ্গেও আলোচনা করেছি। দ্বিতীয় স্বাধীনতা কীভাবে অক্ষুণ্ন রাখা যায়, রাষ্ট্রপতির অপসারণে কীভাবে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে নিয়ে আসা যায়, সে ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে জাতীয় ঐক্য কীভাবে ধরে রাখা যায়, তা নিয়েও কথা হয়েছে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আমাদের এই সংলাপ অব্যাহত থাকবে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিএনপি আমাদের মতামত শুনেছে। তারা বলেছে, এ ব্যাপারে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে।’
জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই চলে যেতে হবে। আমরা এই দাবি নিয়ে মাঠে থাকব। ছাত্রদের পাশে আছি এবং থাকব।’
বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র সামান্তা শারমিন; বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, সদস্যসচিব আরিফ সোহেল, মুখপাত্র উমামা ফাতেমা, মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসুদ, রিফাত রশিদ প্রমুখ।
চরমোনাই পীরের সঙ্গে বৈঠক
গতকাল বিকেলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির সঙ্গে বৈঠক করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। সূত্র জানায়, বৈঠকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে সরানোর বিষয়ে ছাত্রদের দাবির সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন নীতিগতভাবে একমত বলে জানায়। কারণ হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বলছে, রাষ্ট্রপতি শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে মিথ্যাচার করে তার শপথ ভঙ্গ করেছেন। তিনি এই পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির অপসারণের পক্ষে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হওয়ার পরই রাষ্ট্রপতি ইস্যুর সমাধান চায় তারা।
বিদ্যমান সংবিধান বাতিল বা সংশোধন করার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। কেউ কেউ বলেছেন, এই সংবিধান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগ তাদের ইচ্ছামত এটি ব্যবহার করেছে। এই সংবিধান বাতিল করে তাই নতুন সংবিধান লিখতে হবে। তা ছাড়া রাষ্ট্রপতির অপসারণের পর করণীয় কী হবে, সেসব বিষয়ে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আরও আলোচনা করে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সমাধান চায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক কমিটি।
ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম চরমোনাই পীর, প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন ও যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান।
এবি পার্টির সঙ্গে বৈঠক
এ ছাড়া আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। বৈঠকে এবি পার্টি রাষ্ট্রপতিকে সরানোর ব্যাপারে মত দিয়েছে। দলটি মনে করে, যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকার একটি বিপ্লবী সরকার। ফলে এখানে সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সংবিধান মোতাবেক চলতে গেলে ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়বে।
গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ
রাষ্ট্রপতির অপসারণ বা পদত্যাগ ইস্যুতে নুরুল হক নূরের নেতৃত্বাধীন গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রথমে ছাত্র নেতৃত্ব ও নাগরিক কমিটি রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে ছিল না। কিন্তু যখনই বিএনপি বলল তারা দেশে সাংবিধানিক সংকট চায় না, তখনই তারা ৩৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায়। তারা মনে করে, বিএনপির সঙ্গে মিল রেখে চললে সবাই বিএনপি ভাবতে শুরু করবে। তারা সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বা অপসারণ ইস্যুর সমাধান চায়। তবে গণভবনের সামনে বিক্ষোভ হোক এটা ছাত্রনেতারা চান না।
গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতিকে নিয়োগ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আর এই রাষ্ট্রপতির অধীনেই শপথ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়ার পর করণীয় কী হবে, কী ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। কিন্তু সেই ধরনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখছি না।’
গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২-দলীয় জোট ও গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে বৈঠক আজ
আজ রবিবার সন্ধ্যায় গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২-দলীয় জোট ও গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির বৈঠক হতে পারে। গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক খবরের কাগজকে বলেন, রাষ্ট্রপতি তার পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। দ্বিমুখী অবস্থান নিয়ে পদের গুরুত্ব ও মর্যাদা তিনি রক্ষা করতে পারেননি। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন। এই পদে তার থাকা চলে না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতিকে সাংবিধানিকভাবে সরানোর উপায় নেই। বিশেষ কোনো মহল ও গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া ঠিক হবে না। তার অপসারণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত হতে হবে। যদি উনি সরে যান তাহলে কী সংকট দেখা দিতে পারে, তারও বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন।