রাজধানীর আবাসিক এলাকা মোহাম্মদপুরে হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অপরাধী চক্র। প্রকাশ্যে ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। কোনো কোনো স্থানে দলবেঁধে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। তারা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিচ্ছে। নারীরাও দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হচ্ছে ডাকাতি। ওই এলাকার অপরাধ কর্মকাণ্ড ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
ঘটনাগুলো ওই সব এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ছে। ভুক্তভোগীরা তাদের এলাকার ঘটনাগুলো সবার কাছে বোঝানোর জন্য আপলোড করছেন ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সিসিটিভির ফুটেজগুলোতে দেখা যাচ্ছে, দুর্বৃত্তরা ভিকটিমদের চাপাতি দিয়ে আঘাত করছে। রাত হলেই অতি প্রয়োজন ছাড়া লোকজন বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। রাতে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বের হতে দিচ্ছেন না। কোনো কোনো এলাকায় শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে ছিনতাই ও ডাকাতি রোধে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।
এলাকাবাসী ও পুলিশ জানিয়েছে, মোহাম্মদপুরের ৪ স্পটে অপরাধ হচ্ছে বেশি। স্পটগুলো হচ্ছে, মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান ও ভাঙ্গা মসজিদ এলাকা। দুর্বৃত্তরা এসব এলাকায় অপরাধ করে দ্রুতই পালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ ছিনতাই রোধে সিসিটিভি স্থাপন ও ঢাকা উদ্যান এলাকায় একটি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করেছে। এর মধ্যে চলছে যৌথ বাহিনীর ধরপাকড়। গত শনিবার রাতে পুলিশসহ যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘মোহাম্মদপুরে কোনো অপরাধীর ঠাঁই হবে না। আমরা অভিযান শুরু করেছি।’
প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২০ অক্টোবর সকালে মোহাম্মদপুর হাউজিং লিমিটেড এলাকায় প্রকাশ্যে নেসলে কোম্পানির গাড়ি সিগন্যাল দিয়ে থামিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ১১ লাখ লাখ টাকা ছিনতাই করা হয়। ওই ঘটনায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ৬ দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। সিসি ক্যামেরায় দেখা গেছে, তারা ঘটনার আগে থেকেই ওই এলাকায় রেকি করছিল। এ ছাড়া ২১ অক্টোবর সকালে মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিং এলাকার এক নারীকে লাঞ্ছিত করে সব কিছু কেড়ে নেওয়া হয়।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি সুপারশপে ঢুকে ৫ জন ছিনতাইকারী ছুরি দেখিয়ে টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। এই তিনটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর চারদিকে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে বাসিন্দারা শনিবার মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে মানববন্ধন করেন। সেখানে তারা তাদের নিরাপত্তা দাবি করেন।
রবিবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে মোহাম্মদপুর এলাকায় গিয়ে জানা যায়, মানুষের মধ্যে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় লোকজন জানালেন, তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এলাকায় পুলিশের টহল বেড়েছে। রাত হলেই কিছু শিক্ষার্থী রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। ঢাকা উদ্যোনের স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল বলেন, ‘আমরা থানায় গিয়েছিলাম। পুলিশ আমাদের আশ্বাস দিয়েছে। চাঁদ উদ্যানের বাসিন্দা মুদি দোকানি আরমান জানান, রাত হলে লোকজন আতঙ্কে বের হচ্ছে না। তবে দিন দিন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। পুলিশ আমাদের কাছ থেকে এলাকার খোঁজখবর রাখছে।
এদিকে পুলিশের বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্প। গত আগস্ট মাসে সরকার পতনের পর মাদক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ৫ দফা গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। ওই ক্যাম্পে একাধিকবার অভিযান চালিয়েও দুর্বৃত্তদের লাগাম টানতে পারছে না পুলিশ। গত শনিবার রাতেও জেনেভা ক্যাম্পে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
এমন অবস্থায় শনিবার সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থান থেকে ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। শনিবার রাত ১০টার দিকে সেনাবাহিনীর ৪৬ স্বতন্ত্র ব্রিগেড, র্যাব এবং পুলিশের সমন্বয়ে এই যৌথ বাহিনী অভিযানে নামে।
নিরাপত্তাহীনতায় নিমজ্জিত মোহাম্মদপুরবাসীর জীবনে স্বস্তি আনার লক্ষ্যে যৌথ বাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে এ অভিযান পরিচালনা করছে। এই অভিযানে মোহাম্মদপুর এলাকা হতে ৪৫ জন অপরাধী (৯টি দেশীয় ধারালো অস্ত্রসহ) গ্রেপ্তার হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তাদের আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেন র্যাব-২-এর সহকারী পুলিশ সুপার শিহাব করিম।
এদিকে মোহাম্মদপুরে প্রতিটি হাউজিংয়ে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। শনিবার রাত ১টায় বসিলা সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ২৩ ইস্ট বেঙ্গলের উপ-অধিনায়ক মেজর নাজিম আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আপনারা আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের তথ্য দিন। তথ্য দিলে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।’ ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান ও বিভিন্ন হাউজিং সোসাইটিতে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ৪৫ জন আটক করে তাদের মোহাম্মদপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে জানিয়ে মেজর নাজিম আহমেদ বলেন, ‘আটকদের মধ্য প্রায় ১৫ থেকে ১৬ জন কিশোর গ্যাংয়ের লিডার রয়েছে।’
তিনি আরও জানান, তারা চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক বিক্রিসহ নানা অপকর্মে জড়িত। এলাকাবাসীকে শান্তিতে রাখতে এই অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।
তিনি আরও জানান, মোহাম্মদপুর এলাকায় ২৭ থেকে ২৮টি কিশোর গ্যাং চিহ্নিত করা হয়েছে। জেনেভা ক্যাম্পে এ পর্যন্ত ছয় বার অভিযান হয়েছে। সেখান থেকে প্রচুর দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত যত গ্রেপ্তার হয়েছে তার ৩০ শতাংশ জেনেভা ক্যাম্পের।