২০২৫ শিক্ষাবর্ষের নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে গ্রাফিতিতে সংযোজন করা ‘আদিবাসী’ শব্দযুক্ত গ্রাফিতি ফের সংযুক্ত করার দাবি তুলেছেন বিক্ষুদ্ধ নাগরিক সমাজ। একইসঙ্গে সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিও জানান তারা।
রবিবার (১৯ জানুয়ারি) রাজধানীর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে এ দাবি জানানো হয়। এতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আগের সরকারকে হঠিয়ে আমরা বলেছি, বৈষম্য যেন আর ফিরে না আসে। কিন্তু এই যে গ্রাফিতি বাদ দেওয়া হলো কীভাবে? একদল ছেলে একটা দাবি জানালো, আর তা মেনে নেওয়া হলো! এইটাও তো ওই স্বৈরাচারের পথে হাঁটা। এই যে স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি কোন ভুইঁফোর সংগঠন না তারা একটি পরিকল্পিত সংগঠন।’
হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিসহ এবং আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অলীক মৃ বলেন, ‘১৪ জানুয়ারি সংক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির হামলার দিন পুলিশের ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয় কিন্তু ১৬ তারিখ আমরা যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে পদযাত্রা সমাবেশ করেছি তখন আবার আমাদের ওপর পুলিশ হামলা চালায়। লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। আমরা মনে করি, এই রাষ্ট্র ও সরকার ইচ্ছে করে আমাদের ওপর হামলা করিয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী রাখা যাবে না, সেই রকম একটা পরিস্থিতি তারা সৃষ্টি করছে। যারা এদেশের বৈচিত্রকে নষ্ট করতে চায় তারাই আজকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে চায়।’
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘স্বাধীন দেশে জাতীয়তাবাদ কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদ এক ধরনের উগ্রতা। ১৪ জানুয়ারি হামলায় রুপাইয়া শ্রেষ্ঠাসহ আমার সাংবাদিকতা বিভাগের ৩ জন আহত হয়েছে। হকিস্টিক ও স্ট্যাম্পের মাথায় জাতীয় পাতাকা বেঁধে সহিংসতা তো পতাকারও অবমাননা। ৫ আগস্টের পর ২ হাজার ৬১ স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘরে আক্রমণ হয়েছে। তারা আতঙ্কে থাকেন কখন তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, কখন ধর্ষিতা হতে হয়। এটা বোঝার জন্য সংবেদনশীল মন প্রয়োজন কিন্তু বর্তমান সরকার প্রধানের মধ্যে সেইরকম সংবেদনশীলতা লক্ষ করা যাচ্ছে না।’
এতে অন্যান্যদের মধ্যে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরিন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খায়েরুল ইসলাম, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহসাধারণ সম্পাদক ডা. গজেন্দ্রনাথ মাহাতো প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
এসময় বিক্ষুদ্ধ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ৬ দফা দাবি পেশ করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা।
দাবিগুলো হলো- জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক (এনসিটিবি) কার্যালয়ের কাছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিবাদরত আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণের দ্রুত উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত করে এই হামলার সঙ্গে যুক্ত সকল সন্ত্রাসীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা; গত ১৪ জানুয়ারি হামলায় আহত সকল আদিবাসী শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের সুচিকিৎসার দায়িত্ব সুনিশ্চিত করা; হামলার জন্য দায়ী গোষ্ঠীর পেছনে কোনো বিশেষ মদদদাতা গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল কি না তাও দ্রুত শনাক্ত করে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতসহ জড়িতদের আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করা; পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসীদের যথাযথ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত অধ্যায় যুক্ত করা; আদিবাসী শব্দযুক্ত যে গ্রাফিতি প্রত্যাহার করে ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানকে কার্যত অসম্মানিত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে তার জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অভুত্থানের মূল নায়ক ছাত্র-জনতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং গ্রাফিতি যথাস্থানে যথা মর্যাদায় পুনঃস্থাপন করা এবং হামলাকারীদের পূর্বপরিকল্পিত হামলা প্রতিরোধে আইন শৃংখলার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর সদস্যরা কেন নীরব ছিলেন বা ব্যর্থ হলেন তার সুস্পষ্ট ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রদান।
আরিফ জাওয়াদ/মাহফুজ