পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল এস এম আহসানকে ১৯৭১ সালের এই দিন অর্থাৎ ৬ মার্চ অপসারণ করা হলো। তার জায়গায় এলেন বেলুচিস্তানের কসাই নামে পরিচিত লে. জেনারেল টিক্কা খান। এদিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে রাজনৈতিক নেতাদের অভিযুক্ত করলেন এই বলে যে তারা নিজেদের মধ্যে সমস্যার সমাধান করতে পারেননি।
প্রেসিডেন্টের এই ভাষণের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসন আওয়ামী লীগের নির্দেশ অনুযায়ী চলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ‘বাংলাদেশের তারিখ’ গ্রন্থে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। এদিন বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে নিজেদের মধ্যে সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। আমি ১০ মার্চ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বৈঠক আহ্বান করেছিলাম। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ এই বৈঠক প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই এই প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের প্রস্তাবিত অধিবেশন আহ্বান।’
মহিউদ্দিন আহমদের ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ গ্রন্থেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বক্তব্য রয়েছে। ওই দিন ৬ মার্চের ঘটনাবলি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান বেতার ও টেলিভিশনে ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেন, অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, যার ফলে চরমপন্থিরা উৎসাহিত হবে এবং তারা রাস্তায় বের হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত করবে।’ ইয়াহিয়া আরও বলেন, ‘তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য সময় চান।’
প্রেসিডেন্টের ভাষণে ধমকের সুর প্রচ্ছন্ন ছিল। তিনি (ইয়াহিয়া খান) বলেন, ‘আমি যতক্ষণ রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আছি, আমি পাকিস্তানের ঐক্য টিকিয়ে রাখব। এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি আমার ওয়াদা, আমি এই দেশটিকে বাঁচাব। মানুষ আমার কাছে এটিই আশা করে। আমি তা বিফল হতে দেব না। গুটিকয়েক লোকের হাতে কোটি কোটি নিরপরাধ পাকিস্তানির আবাসভূমি আমি ধ্বংস হতে দেব না। পাকিস্তানের একতা, সংহতি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা সশস্ত্র বাহিনীর কর্তব্য এবং এটি পালন করতে তারা কখনো পিছপা হয়নি।’
রাওয়ালপিন্ডিতে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ভাষণকে স্বাগত জানান। লাহোরে কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মার্শাল নূর খান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ-শাসনের বৈধ অধিকার রয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের সব বাধা অবিলম্বে দূর করতে হবে। প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণে পরিস্থিতি অবনতির জন্য শেখ মুজিবকে দোষারোপ করায় নূর খান দুঃখ প্রকাশ করেন।
ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণের পর পরই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। হরতাল পালনে ষষ্ঠ দিনের মতো সর্বস্তরের জনতা নেমে আসে ঢাকার রাস্তায়। বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় কারাগারের গেট ভেঙে ৩৪১ জন কয়েদি পালিয়ে যান। পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে সাতজন নিহত এবং ৩০ জন আহত হন। রাজশাহীতে মিছিলকারীদের ওপর গুলি চলে, সেখানে অন্তত একজন নিহত হন। খুলনায় সংঘর্ষ আর গুলিতে ১৮ জন নিহত, ৮৬ জন আহত হন।
মহিউদ্দিন আহমদ ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘৬ তারিখেই বঙ্গবন্ধুর বাসায় আওয়ামী লীগ কার্যকরী কমিটির সভায় পরদিন (৭ মার্চ) অনুষ্ঠেয় জনসভার ভাষণের বিষয়বস্তু কী হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা হয়। দলের তরুণেরা চাইছিলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হোক। তাদের কাছে স্বাধীনতার কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা নিয়ে শেখ মুজিবকে অনেক ভাবতে হয়েছে। শেখ মুজিব দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলাদা করে বসলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোশতাক আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান। বৈঠকে কামাল হোসেনকেও থাকতে বলা হয়। আলোচনা হয় যে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলে সামরিক বাহিনী হামলা করার অজুহাত পেয়ে যাবে। সুতরাং এটি করা ঠিক হবে না। বরং ইয়াহিয়ার ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করেন। একই সঙ্গে স্বাধীনতার পক্ষে যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তাকে টিকিয়ে রাখতে হবে।’
শহিদ জননী জাহানারা ইমাম প্রতিদিনের মতো এদিনও (৬ মার্চ) ডায়েরি লেখেন। প্রসঙ্গ আসে ওই দিনের প্রেসিডেন্টের ভাষণ এবং পরের দিন ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের রেসকোর্সের জনসভার। ডায়েরিতে তার বর্ণনা ছিল এ রকম, ‘আগামীকাল রেসকোর্সে গণজমায়েতে শেখ মুজিব কী বলবেন, তা নিয়ে লোকজনের জল্পনা-কল্পনার অবধি নেই। এক তারিখ হোটেল পূর্বাণীতে তিনি বলেছিলেন, বাংলার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের কর্মসূচির ঘোষণা তিনি সাত তারিখে দেবেন। কিন্তু এ ক’দিনের ঘটনা তো অন্য খাতে বইছে। এত মিছিল, মিটিং, প্রতিবাদ, কারফিউ ভঙ্গ, গুলিতে শয়ে শয়ে লোক নিহত- এর প্রেক্ষিতে শেখ আগামীকাল কী ঘোষণা দেবেন? কেউ বলছেন, উনি আগামীকাল স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। কেউ বলছেন দূর তা কি করে হবে? উনি নির্বাচনে জিতে গণপ্রতিনিধি, মেজরিটি পার্টির লিডার, উনি দাবির জোরে সরকার গঠন করবেন, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করবেন। এখন স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে সেটা রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়বে। কেউ বলছেন, আগামীকালের মিটিংয়ের ব্যাপারে ভয় পেয়ে ইয়াহিয়া আজ ভাষণ দিচ্ছেন।’
“ভাষণ শুনে সবাই ক্ষুব্ধ এবং উত্তেজিত। আমি হেসে শরীফকে বললাম, ‘তুমি কী আশা করেছিলে? ইয়াহিয়া ‘এসো বধূ এসো আধ-আঁচরে বসো’ বলে মুজিবকে ডেকে সরকার গঠন করতে বলবে?” ‘না, অতটা আশা না করলেও ও রকম কর্কশ গলায় ধমক-ধামকও আশা করিনি। যত দোষ নন্দ ঘোষ বলে উনি যেভাবে আমাদের গালাগালি করলেন, সেটা মোটেই আমাদের প্রাপ্য নয়। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য উনিই তো দায়ী।’