ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ৬০ কাঠা (১০ কাঠা করে ৬টি প্লট) প্লট বরাদ্দ নেওয়ার মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও পরিবারের সাত সদস্যসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ছয়টি চার্জশিট অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার (১০ মার্চ) দুদকের মুখপাত্র ও মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শিগগিরই দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে চার্জশিটগুলো সংশ্লিষ্ট আদালতে দাখিল করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
চার্জশিটে শেখ হাসিনার পরিবারের বাকি অভিযুক্তরা হলেন শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানার মেয়ে ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও অপর মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক। অপর অভিযুক্তরা হলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব সালাউদ্দিন, মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সরকার, সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কবির আল আসাদ, সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস, সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মো. নুরুল ইসলাম, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সাবেক সদস্য মেজর (ইঞ্জিনিয়ার) (অব.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী, পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলাম, উপপরিচালক হাফিজুর রহমান ও হাবিবুর রহমান। এর মধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব সালাউদ্দিন এবং মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্ত হয়েছেন। তারা এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন না।
ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাজউকের প্লট হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্য এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গত ১২, ১৩ ও ১৪ জানুযারী ওই ছয়টি মামলা করে দুদক।
এজাহারে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত সরকারের সর্বোচ্চ পদে বহাল থাকার সময়ে সরকারি প্লট বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হয়েও ক্ষমতার অপব্যবহার করে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পে নিজ পরিবারের সদস্যদের নামে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। এসব প্লট অবৈধভাবে পাইয়ে দিতে রেহানার মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক প্রভাব খাটিয়েছেন। অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অসৎ উদ্দেশ্যে প্লটগুলো পাইয়ে দিতে সহায়তা করেছেন, যা দুদকের তফসিলভুক্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারের ১৩/এ ধারার ক্ষমতাবলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোট বোন রেহানা সিদ্দিক, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি এবং রেহানার মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নম্বর রোডে ১০ কাঠা করে মোট ৬০ কাঠার ছয়টি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন যাচাই শেষে গত ডিসেম্বর মাসে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। দীর্ঘ অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
অভিযোগ অনুসন্ধানে ১৮ ডিসেম্বর দুদকের উপপরিচালক সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বিশেষ টিম গঠন করা হয়। টিমের অপর সদস্যরা হলেন উপপরিচালক সাইদুজ্জামান, সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া, সহকারী পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসান ও সহকারী পরিচালক এ কে এম মর্তুজা আলী সাগর।
এ ছাড়া শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের আরেকটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। গত ২২ ডিসেম্বর উপপরিচালক সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন একই টিমকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আমেরিকার তদন্ত সংস্থা এফবিআই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিষয়ে প্রাথমিক তদন্ত করে। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বনাম রিজভী আহমেদ মামলায় শেখ হাসিনার ছেলে জয়ের নাম প্রথম নজরে আসে। এফবিআইয়ের তদন্তে জয়ের গুরুতর আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়টি উন্মোচিত হয়। বিশেষ করে তার নামে থাকা হংকং ও কেম্যান আইল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে স্থানীয় একটি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক এবং লন্ডনের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে টাকা পাচারের তথ্য উঠে আসে। এফবিআই তাদের লন্ডনের প্রতিনিধির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং প্রমাণ পেয়েছে যে সেখানে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম এবং মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের (ডিওজে) সিনিয়র ট্রায়াল অ্যাটর্নি লিন্ডা স্যামুয়েলস স্পেশাল এজেন্ট লা প্রিভোটের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়েছে।