সরকার অর্থসংকটে আছে। আয় বাড়াতে গিয়ে বাজেটে বেশির ভাগ পণ্য ও সেবা খাতে রাজস্ব আরোপ করছে। তবে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে অনেকের দাবি মানতে গিয়ে অনেক খাতে রাজস্ব ছাড় দেওয়ার চেষ্টাও করছে।
বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাজেটের আকার ও জিডিপির প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়, যার বেশির ভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮৬ শতাংশ আহরণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। বাজেটে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করার হিসাব কষা হবে।
বাজেট প্রস্তাবে রাজস্ব ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, কর অব্যাহতির বিস্তৃত সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র করভিত্তি, কর ফাঁকি ও ডিজিটালাইজেশনের ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছে।
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য প্রগতিশীল করকাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী দুই অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামীতে ইটিআইএন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শূন্য রিটার্ন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর বহাল রাখা হয়েছে। মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী প্রায় ৬০ লাখ মানুষকে ই-টিআইএন নিতে বাধ্য করা হবে। কৌশলে ব্যাংক হিসাবধারীদের করজালে আনা হচ্ছে। ছোট মাপের দোকানদের ওপরও ভ্যাটের আওতায় আনা হচ্ছে। এভাবে সারা দেশে রাজস্ব জালের আওতায় অনেক মানুষকে আনার ছক কষা হয়েছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থসংকটে নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়াও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আগামী বাজেটে খরচ কমানোর প্রত্যাশা করলেও তা বাস্তবায়ন হবে না। বরং বাজেটে সরকার আয় বাড়াতে গিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অনেক জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প খাতে খরচ বাড়বে। রাজস্ব জালের আওতায় অনেক কিছু আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অন্য সব বাদ দিয়ে শুধু এই দুই কারণেই অনেক কিছুর দাম ও খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এসব কিছুই জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে ফেলবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আওতা বাড়িয়ে সরকার আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। অনেক নতুন খাত অর্থনীতির মূল ধারায় যুক্ত করা হচ্ছে। এতে সরকারের আয় বাড়বে বলে আশা করছি।’
বাজেটে কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন–ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে কর মওকুফ না করে কিছুটা কমিয়ে বহাল রাখা হয়েছে। এতে দাম তেমন কমবে না।
বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অনেক যন্ত্রপাতি আমদানিতে রাজস্ব আরোপ করা হয়েছে। এতে গোটা স্বাস্থ্য খাতে খরচ বাড়বে। তবে রাজস্বের পরিমাণ, হার ও আওতা বাড়িয়ে কিছু খাতে ছাড় দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে করছাড়ের অংশ হিসেবে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। এ ছাড়া শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য আমদানীকৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে হ্রাস করা হবে। উৎসে করের উচ্চহারের কারণে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে হ্রাস করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক এবং ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে করহার ৫ শতাংশ থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়। কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডেটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি এবং কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশে হ্রাস করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ ও ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে হ্রাস করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ৪ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে হ্রাস করা হয়েছে। রিফাইনারি কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে হ্রাস করা হয়েছে রিসাইকেল্ড পণ্য ও রিসাইক্লিং কাঁচামালে করহার ৩ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে হ্রাস, বিটিআরসি কর্তৃক প্রাপ্ত রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি বা চার্জের ওপর প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার করা হবে। মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে হ্রাস করা হবে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে অগ্রিম করের সাধারণ হার ৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে হ্রাস করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের স্বার্থে যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ অনিবাসী করদাতাকে পরিশোধ খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১৫ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে হ্রাস করা হয়েছে। বিমা খাতে রি-ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম বাবদ খরচ কমানোর স্বার্থে অনিবাসী করদাতাকে পরিশোধিত বিমা প্রিমিয়াম থেকে উৎসে কর কর্তনের হার ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে হ্রাস করা হয়েছে। শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগের ব্যয় কমানোর স্বার্থে বিদেশি ঋণের সুদের ওপর উৎসে করের হার ২০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটে কর ভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সংগৃহীত এ অগ্রিম করের পরিমাণ প্রতি ১ হাজার টাকা ২ টাকা। ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দাখিল করার বিধানের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে করের জাল আরও বাড়বে।
বাজেটে সব দেশীয় শিল্পের প্রসারে পাঙাশ মাছের ফিলেট আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করায় দাম বাড়বে। বাজেটে ভ্যাটের হার অনেক বাড়ানো হয়েছে। আর এতে হাজারের বেশি পণ্যের দাম বাড়বে। তামাকজাত পণ্যের দাম বাড়বে। চাপে পড়বে দেশের কম্পিউটার শিল্প, কারণ আমদানি করা একই জাতীয় পণ্যের ওপর রাজস্ব ছাড় দেওয়া হবে।
বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈশ্বিক মানের ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং উচ্চমানের কন্টেন্ট ও চলচ্চিত্র নির্মাণসামগ্রী যেন তরুণদের নাগালের মধ্যে থাকে, সে জন্য বাজেটে কতিপয় পণ্যে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। এভাবে এসব খাতকে রাজস্ব জালের আওতায় আনা হয়েছে।
একইভাবে ডিজিটাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত সংগীতের মানোন্নয়ন ও ক্রিয়েটিভ মিউজিক তৈরিতে সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট–যেমন গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ইত্যাদি এবং এদের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া চলচ্চিত্র ও ক্রিয়েটিভ মিডিয়ার কারিগরি দিক আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করার উদ্দেশ্যে উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন প্রস্তুতকারী শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ফ্লোট গ্লাস আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে।