শুধু নিউ মার্কেট, গুলিস্তান নয়; গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায়ও এবার ঈদে বিক্রি কম। শুক্রবার (২৮ মার্চ) সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত গুলশান পিংক সিটি শপিং কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন অভিজাত মার্কেট ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
বিক্রেতারা বলছেন, তাদের অনেক নিয়মিত ক্রেতা ছিল। তারা কিনতে এসে কেউ কেউ একবারে এক-দেড়, দুই লাখ টাকার পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন আসায় সেই নিয়মিত ক্রেতাদের অনেকে দেশের বাইরে চলে গেছেন, অনেকে দেশে আত্মগোপনে আছেন। এখন নতুন কিছু ক্রেতা আসছেন। তারা দরদাম করে তারপর কিনছেন। অনেকেই একদরের পণ্যের অর্ধেক দামও দিতে চাইছেন না। আবার কেউ কেউ চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির ভয়ে শো অফ করা থেকে বিরত থাকছেন।
গুলশান পিংক সিটি শপিং কমপ্লেক্সের চতুর্থ তলায় গ্রালগার্ল। বেলা আড়াইটার দিকে দেখা যায় ওই দোকানের মধ্যে দুই বিক্রয় প্রতিনিধি বসে আছেন। আর গেটে একজন দাঁড়িয়ে ছিলেন। কথা হলে তিনি জানান তার নাম লাবিব। তিনি এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার।
লাবিব বলেন, এবার অনেক কম বিক্রি। গতবারের তুলনায় তিন ভাগ কম বিক্রি হয়েছে। দিনে ক্রেতা কম আসে। রাত ৮টার দিকে কিছু ক্রেতা আসেন। ১১টা পর্যন্ত থাকে। তারা দরদাম করে কেনেন। কস্টিং, দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন সবকিছু মিলে একটা ড্রেসের দাম নির্ধারণ করা হয়। ধরেন ৮ হাজার টাকার ড্রেস তারা সাড়ে ৩ হাজার টাকা বলেন। তাতে তো দেওয়া সম্ভব না।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তাদের বেশির ভাগ মানুষ গা-ঢাকা দিয়েছেন। অনেকে দেশ ছেড়েছেন। তারাই বিগত সময়ে কেনাকাটা করতে আসতেন। নিয়মিত সেসব ক্রেতা এখন পাচ্ছি না। তারা একেকজন এসে এক-দেড় লাখ টাকার জিনিস নিয়ে যেতেন।
এই প্রতিষ্ঠানে দেশীয় পোশাকের পাশাপাশি পাকিস্তানি ও ভারতীয় পোশাক বিক্রি করা হতো। গত বছর ভারত পানি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশে বন্যা সৃষ্টি করে দেওয়ার পর থেকে ভারতীয় পণ্য বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত হয়। তখন যত ভারতীয় পোশাক ছিল সেগুলো ৬০ শতাংশ মূল্য ছাড়ে বিক্রি করা হয়। লাবিব বলেন, পাকিস্তানি পোশাকের খুব চাহিদা আছে। এবার পাকিস্তানি পোশাক আসেনি। আগের কিছু পাকিস্তানি পোশাক ছিল সেগুলো এবং দেশি পোশাক বিক্রি করছি।
মুসায়ারার ম্যানেজার রাজ বলেন, ‘আমাদের এখানে শুধু নারীদের পোশাক বিক্রি করা হয়। গত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি কম। কিন্তু কেন কম তা বুঝতে পারছি না।
তৃতীয় তলায় গুলশান শাড়ি নিউ দোকানে গিয়ে দেখা যায় ম্যানেজারসহ ৯ জন বিক্রেতা অলস বসে আছেন। কোনো ক্রেতা নেই। বিক্রির অবস্থা জানাতে চাইলে বলেন, ওই দিকে তাকিয়ে দেখেন, কোনো লোক আছে? খেলার মাঠ মনে হয় না? এখন কি এই অবস্থা থাকার কথা? এখন সবার মার্কেটমুখী থাকার কথা। কিন্তু ক্রেতা নেই।
এই কমপ্লেক্সের গ্রাউন্ড ফ্লোরে ইনফিনিটির বিক্রয় কেন্দ্র। সেখানেও কথা বলে জানা গেছে এবার তাদেরও বিক্রি কিছুটা কম। ইনফিনিটিতে প্রবেশের ডান পাশে রয়েছে গুলশান শাড়ি মিউজিয়াম। সেখানে বেলা সোয়া ৩টার দিকে গিয়ে কয়েকজন ক্রেতা দেখা যায়। একটি থ্রি-পিস ৯ হাজার ৯০০ টাকা ট্যাগ লাগানো। সেটি ক্রেতা ৭ হাজার টাকা দিতে চান। যখন চলে যাচ্ছিলেন তখন সাড়ে ৭ হাজার টাকায় ক্রেতাকে থ্রি-পিসটি দেন।
এই দোকানের এক বিক্রয় প্রতিনিধি জানান, তাদের এখানে ২ হাজার ৭৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা দামের থ্রি-পিস এবং ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকার শাড়ি আছে।
এই বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, এবার বিক্রি অনেক কম। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ধরেন গত বছর ১০ লাখ টাকা বিক্রি করলে এবার বিক্রি করছি ৩ লাখ টাকা। তাহলে আপনি বুঝেন কেমন বিক্রি হচ্ছে।
তবে সব দোকানে যে ক্রেতা নেই তা নয়। কারও কারও বিক্রি ভালো। তৃতীয় তলায় চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে নেমে হাতের ডান কোণে ছোট একটি দোকান। সেখানে রয়েছে খুব দামি দামি থ্রি-পিস। একেকটা ২৬-৩০ হাজার। এই দোকানের বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, গত ১০ দিন বিক্রি কম ছিল। তার আগে আলহামদুলিল্লাহ বিক্রি ভালো হয়েছে।
ক্যাশ কাউন্টারে বসা আরেক নারী বলেন, ‘আমাদের বিক্রি ভালো হয়। পরে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ওই নারী বিক্রয় প্রতিনিধিকে আর কিছু না বলার ইশারা দিয়ে বের হয়ে যান। পরে বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, ম্যামের নিষেধ আছে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলার। দয়া করে আমাদের দোকানের নাম দিয়ে কিছু লিখবেন না। তাহলে আমার চাকরি থাকবে না। আমাদের প্রচার দরকার নেই।’
এ ছাড়া চতুর্থ তলায় জুতার কয়েকটি দোকানে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তানিয়া নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘আগে অন্য সব কিনেছি। শুধু জুতা কিনতে বাকি ছিল। আজ জুতা কিনতে এসেছি। মারুফা নামের আরেক ক্রেতা বলেন, এবার পোশাকের দাম বেশি মনে হচ্ছে। মানের তুলনায় মনে হচ্ছে দাম বেশি চাচ্ছে।’