ভারতের স্থল শুল্কস্টেশন ব্যবহার করে বন্দর ও বিমানবন্দর দিয়ে তৃতীয় দেশে সরাসরি পণ্য রপ্তানির জন্য বাংলাদেশকে দেওয়া দীর্ঘদিনের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করল ভারত।
গত মঙ্গলবার (৮ এপ্রিল) দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে বাংলাদেশের এই সুবিধা বাতিল করে। ভারত ২০২০ সালের জুন থেকে বাংলাদেশকে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির এই সুবিধা দেয়। এদিকে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বুধবার (৯ এপ্রিল) রাতে বৈঠকে বসে। এই সুবিধা প্রত্যাহার করার পর গতকাল বেনাপোল বন্দর থেকে চারটি মালবাহী ট্রাক ফেরত পাঠিয়েছে ভারত।
এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, বাংলাদেশকে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেওয়ার কারণে ভারতের বিমানবন্দর ও বন্দরগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে যানজট তৈরি হচ্ছিল। এতে লজিস্টিক বিলম্ব এবং উচ্চ ব্যয় আমাদের নিজস্ব রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করছিল। তাই মঙ্গলবার থেকে বাংলাদেশকে দেওয়া এই সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ভারত ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করলেও এ সিদ্ধান্ত ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে নেপাল বা ভুটানে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ওপর প্রভাব ফেলবে না।
ভারতের কেন্দ্রীয় পরোক্ষ কর ও শুল্ক বিভাগের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাংলাদেশকে দেওয়া এই সুবিধার জন্য ২০২০ সালের ২৯ জুনের জারি করা সার্কুলার বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাতিলের এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। তবে আগের সার্কুলারের প্রক্রিয়া অনুযায়ী ইতোমধ্যে ভারতে প্রবেশ করা বাংলাদেশি কার্গোকে ভারতীয় অঞ্চল ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। এর আগে ভারতের রপ্তানিকারকরা, বিশেষ করে পোশাক খাতের মালিকরা বাংলাদেশকে দেওয়া এই সুবিধা প্রত্যাহারের জন্য বিজেপি সরকারের কাছে আবেদন করেছিলেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভারত সরকার কেন এ ধরনের পদক্ষেপ নিল, সেটি বোধগম্য নয়। দেশটির এই সিদ্ধান্ত আমাদের অবাক করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ভারতের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া উচিত। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাল্টা কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক হবে না। এই পদক্ষেপের কারণে দুই দেশের মধ্যে আর্থিক ক্ষতির চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষতি বেশি হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করায় নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে খরচ ও সময় বাড়বে। কারণ এর আগে সরাসরি এসব দেশে বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি করতে পারত। এখন ভেঙে ভেঙে স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আনলোড-লোড করতে হবে এবং এতে কৃষিজাত পণ্য নষ্ট হতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বিমানবন্দরে কার্গো পরিচালনার ওপর চাপ ও খরচ বাড়বে।’
ভারতীয় বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোতে যাওয়ার পথে দেশটির স্থল শুল্কস্টেশন (এলসিএসএস) ব্যবহার করে এতদিন বাংলাদেশ থেকে তৃতীয় দেশে রপ্তানি কার্গো ট্রান্সশিপমেন্টের অনুমতি দেওয়া হতো। ভারতীয় বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্ত পোশাক, জুতা, রত্ন এবং গহনার মতো কয়েকটি ভারতীয় রপ্তানি খাতের জন্য সহায়ক হবে।
বিশ্ববাণিজ্যে পোশাক খাতে ভারতের অন্যতম বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ। ভারতীয় রপ্তানিকারকদের সংগঠন ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনসের (এফআইইও) মহাপরিচালক অজয় সাহাই বলেন, ‘ভারতের এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন আমাদের কার্গো পরিবহনে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকবে। অতীতে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা বাংলাদেশকে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেওয়ার কারণে বন্দর ও বিমানবন্দরে স্থান কম পাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করতেন।’
এর আগে ভারতের পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন এইপিসি বাংলাদেশকে দেওয়া সুবিধার আদেশ স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছিল। ওই সুবিধার ফলে দিল্লি এয়ার কার্গো ভবনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি কার্গো তৃতীয় দেশে ট্রান্সশিপমেন্টের অনুমতি পেত। এইপিসির চেয়ারম্যান সুধীর সেখরি বলেন, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০টি পণ্যবাহী ট্রাক দিল্লিতে আসে, যা কার্গোর চলাচল ধীর করে দেয় এবং এয়ারলাইনসগুলো এই ধীরগতির কারণে অযৌক্তিক সুবিধা নিয়ে থাকে।
ভারতীয় থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) প্রতিষ্ঠাতা ও ভারতের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ভারতীয় স্থলবন্দর হয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য তৃতীয় দেশে পাঠানোর সুবিধা বাতিল হওয়ায় বাংলাদেশকে এখন দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত পরিবহনব্যবস্থার মুখে পড়তে হবে। তিনি বলেন, দুই দশক ধরে ভারত একতরফা বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়ে আসছে। তবে লালমনিরহাটে চীনের সহায়তায় বিমানঘাঁটি উন্নয়নের পরিকল্পনা এবং সেই অঞ্চল ভারতের ‘চিকেন নেক’ করিডরের কাছাকাছি হওয়ায় দিল্লি নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
তিনি আরও জানান, এই সিদ্ধান্ত ভারতের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসংক্রান্ত দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সাধারণ শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সব সদস্য দেশকে স্থলবেষ্টিত দেশের পণ্যের জন্য মুক্ত ট্রানজিট সুবিধা দিতে হবে।
দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার (পিটিআই) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের দেওয়া এই সুবিধার ফলে নেপাল, ভুটান ও মায়ানমারের মতো দেশে বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য এতদিন বাণিজ্যপ্রবাহ বাধাহীন ছিল। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার এমন একসময়ে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশকে দেওয়া সুবিধা বাতিল করল, যার কয়েক দিন আগে ভারত, বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েক ডজন দেশ ও অঞ্চলের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
যেসব পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো
বাংলাদেশের প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, ওয়ালটন, আসবাবপত্রের প্রতিষ্ঠান হাতিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নেপালে পণ্য রপ্তানি করে। এ ছাড়া রপ্তানি তালিকায় রয়েছে মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন, আসবাব, খাদ্যজাত পণ্য। বাংলাদেশের মানসম্মত সিমেন্ট, স্টিল ও আয়রন, খাদ্যপণ্য, সিরামিকস পণ্য, ওষুধ ও পেটেন্ট, আসবাবপত্র, সাবান, মেলামাইন, হোম টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, গৃহস্থালি পণ্য, আইটি পণ্য, নির্মাণসামগ্রী, সেবা খাতের পণ্যের চাহিদা রয়েছে নেপাল ও ভুটানে। নেপাল থেকে সুলভে আমদানির সুযোগ রয়েছে ডাল, জুস, মসলাসহ হরেক ধরনের কৃষিজ খাদ্যপণ্য। অন্যদিকে ভুটানে যায় জুস, ড্রিংক, পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি বৈঠক
ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের পর পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বুধবার রাতে বৈঠকে বসেছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশিরউদ্দিন সভাপতিত্ব করেন। ঢাকার কারওয়ান বাজারের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরাও বৈঠকে যোগ দেন। অনলাইনে যুক্ত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার। রাত সাড়ে ১১টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বৈঠক চলছিল।
ফেরত এল ৪ ট্রাক
বাংলাদেশকে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করার পর বুধবার বেনাপোল বন্দর থেকে চারটি মালবাহী ট্রাক ফেরত পাঠিয়েছে ভারত। পরে রপ্তানি পণ্যবোঝাই চারটি ট্রাক ঢাকায় ফেরত যায়। ভারতের কেন্দ্রীয় পরোক্ষ কর ও শুল্ক বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যেসব পণ্যবোঝাই যানবাহন ইতোমধ্যে ভারতের ভূখণ্ডে আছে, সেগুলোকে দ্রুত ভারতের ভূখণ্ড ত্যাগ করতে হবে।
ভারতের পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়াডিং এজেন্টস স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, স্থলবন্দর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা বন্ধের জন্য ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় একটি চিঠি ইস্যু করেছে কাস্টমসে। এ চিঠির আলোকে ট্রানজিট সুবিধার পণ্য বেনাপোল থেকে পেট্রাপোল বন্দরে প্রবেশ বন্ধ রয়েছে।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুজিবর রহমান বলেন, ভারত সরকার ট্রানজিট সুবিধা বাতিল করায় বুধবার বেনাপোল থেকে চারটি রপ্তানি পণ্যবোঝাই ট্রাক ফেরত গেছে। ঢাকার রপ্তানিকারক ডিএসভি এয়ার অ্যান্ড সি লিমিটেডের প্রতিষ্ঠানের ছিল ট্রাকগুলো। বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবির তরফদার বলেন, ট্রানজিট সুবিধা বাতিল করায় পেট্রাপোল কাস্টমস থার্ড কান্ট্রির পণ্যে কার্পাস ইস্যু করেনি।