নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করতে অভিন্ন পারিবারিক আইন, সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত এবং একটি স্বতন্ত্র স্থায়ী নারীবিষয়ক কমিশন গঠনসহ ১৫টি বিষয়ে ৪২৩টি সুপারিশ করেছে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন।
শনিবার (১৯ এপ্রিল) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন হস্তান্তর করে।
প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে ব্রিফিংয়ে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, ‘জুলাইয়ে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের স্মরণার্থে এমন কিছু করতে চেয়েছি যা মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে, সমাজের জন্য কল্যাণকর হবে।’
তিনি বলেন, ‘জনপরিসর ও পারিবারিক আইনে সব বৈষম্য বিলুপ্ত করার কথা আমরা বলেছি। সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মের স্বীকৃতি দেওয়া এবং এই অধিকারগুলো ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিসহ বলবৎযোগ্য করা। বেঁচে থাকার অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত না করা। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিলুপ্ত করার কথা বলা হয়েছে। একটি স্বতন্ত্র স্থায়ী নারীবিষয়ক কমিশন প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিরীন পারভীন হক আরও বলেন, ‘সিডও সনদের ওপর অবশিষ্ট দুটি সংরক্ষণ প্রত্যাহার এবং আইএলও সনদ সি১৮৯ ও সি১৯০ অনুস্বাক্ষর ও পূর্ণ বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা রাষ্ট্র হবে ইহজাগতিক, মানবিক এবং কল্যাণমুখী। এর জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন (Uniform Family Code) প্রবর্তন, যাতে ধর্ম, জাতি বা শ্রেণিনির্বিশেষে সব নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ থেকে ঐচ্ছিকভাবে প্রযোজ্য হবে। পাশাপাশি সম্পত্তিতে নারীদের সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করা জরুরি বলে আমরা জানিয়েছি।
আনুষ্ঠানিক খাতে নারীদের জন্য অনুকূল কর্মসংস্থান নীতি তৈরি করে প্রয়োজনীয় পরিষেবা প্রদান করা, যেমন শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র, কর্মক্ষেত্রের জন্য আচরণবিধি প্রণয়নের মাধ্যমে যৌন হয়রানিমুক্ত কর্ম পরিবেশ তৈরি করতেও সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
শিরীন পারভীন হক বলেন, জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৬০০ করার সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় একটি সাধারণ আসন এবং নারীদের জন্য একটি সংরক্ষিত আসন থাকবে। তবে উভয় আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘সুপারিশগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর কিছু সুপারিশ এ সরকারই বাস্তবায়ন করে যেতে পারবে, কিছু পরের নির্বাচিত সরকার করতে পারবে এবং নারী আন্দোলনের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে।’
সংস্কার কমিশন ১৫টি বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। সেগুলো হলো- সংবিধান আইন ও নারীর অধিকার: সমতা ও সুরক্ষার ভিত্তি, সব বয়সী নারীর জন্য সুস্বাস্থ্য, নারীর অগ্রগতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও জাতীয় সংস্থাসমূহ, অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ ও সম্পদের অধিকার, নারীর স্বার্থ ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান, পর্যায়ের উন্নয়ন, নারী শ্রমিকের নিরাপদ অভিবাসন, নারী ও মেয়ে শিশুর জন্য সহিংসতামুক্ত সমাজ, দারিদ্র্য হ্রাসে টেকসই সামাজিক সুরক্ষা, জনপরিসরে নারীর ভূমিকা: জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে, গণমাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ, চিত্রায়ণ ও প্রকাশ, জনপ্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে নারীর অন্তর্ভুক্তি ও বিকাশ, নারীর অগ্রগতির জন্য শিক্ষা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনে নারী।
ব্রিফিংয়ে শিরীন হকের নেতৃত্বে কমিশনের সদস্য ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র ফেলো মাহীন সুলতান, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফৌজিয়া করিম ফিরোজ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কল্পনা আক্তার, নারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হালিদা হানুম আক্তার, বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরুপা দেওয়ান, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র সামাজিক উন্নয়ন উপদেষ্টা ফেরদৌসী সুলতানা এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নিশিতা জামান নিহা উপস্থিত ছিলেন।