জীবদ্দশাতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তি। আমাদের সময়ের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ এবং বামপন্থি বুদ্ধিজীবী হিসেবে জানা ছিল তার কথা। সৌভাগ্য মনে করছি, তার শেষজীবনে খুব কাছ থেকে দেখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছি। মাঝে মাঝে বসি কলাভবনের শিক্ষক লাউঞ্জে। সেখানেই, খুব সাধারণ পোশাকের একজন মানুষ, একটু ঝুঁকে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়ছেন। তাকে দেখেই উপস্থিত শিক্ষকরা দাঁড়িয়ে পড়ছেন। কুশল বিনিময়ের মুহূর্তেই তার কথায় দিপ্তী, যুক্তি আর রসবোধের পরিচয় পেয়ে সবাই মুগ্ধ। জানা গেল এই মানুষটিই হচ্ছেন সরদার ফজলুল করিম। সবার প্রিয় ‘সরদার ভাই’। আমার সঙ্গেও তার সম্পর্ক গড়ে উঠল।
সরদার ফজলুল করিম মৌলিক গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। আগেই পড়া ছিল সেই বিখ্যাত বইটি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত নিয়ে লেখা এই বইটি শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের আলাপের কেন্দ্রে থাকত। অনন্য বিষয়-আশয় নিয়ে আর একটি বইও আজ অবধি লেখা হয়নি। সারা জীবন তিনি এরকমই সব অসাধারণ গ্রন্থ রচনা করে গেছেন, যা আমাদের এখনো আলোকিত করে চলেছে।
তার রচিত দর্শন কোষের কথা বলি। এটিই আমাদের দর্শন ও অভিধান-চর্চার পথিকৃৎ হয়ে আছে। তখনই আমরা জেনেছি প্লেটো, সেই সূত্রে তার ‘প্লেটোর সংলাপ’ বইটির কথা। প্লেটো বা দর্শনচর্চাও শুরু হয়েছিল সরদার ফজলুল করিমের মাধ্যমে। এরপর যখন ‘এঙ্গেলস্ এর অ্যান্টি-ডুরিং’ ও ‘আমি রুশো বলছি: দি কনফেশানস’-এর অনুবাদ হাতে এল, নিঃসন্দেহে দেখা গেল সরদার ভাই অনুবাদেও কতটা সিদ্ধহস্ত। সারা জীবন বামপন্থি রাজনীতি করে গেছেন, বই রচনার মধ্য দিয়েও সেই অনুরাগ দেখা গেছে সবসময়। লেখার জন্য লেখাতে তার আগ্রহ ছিল না। একবার কথাপ্রসঙ্গে আমাকেও বলেছিলেন একথা। এ ছাড়া তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘রুমীর আম্মা’, ‘চল্লিশের দশকের ঢাকা’, ‘সেই সে কাল’, গল্পের গল্প, আমি সরদার বলছি, অতিক্রান্ত সময়, আমার প্রিয় মুখ, নানাকথা ও নানাকথার পরের কথা ইত্যাদি। তার স্মৃতির ভান্ডারও ছিল অনেক সমৃদ্ধ। লিখেছেন ও সম্পাদনাও করেছেন পরিচিত উল্লেখযোগ্য কৃতী ব্যক্তিত্বদের নিয়ে। গ্রন্থ রচনা করেছেন জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও জাহানারা ইমামকে নিয়ে ‘রুমীর আম্মা ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ শিরোনামে। শহিদ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা স্মারকগ্রন্থ, মুজাফফর আহমদ চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ, নূরজাহান মুরশিদ স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন তিনি।
সরদার ফজলুল করিমের অনন্যতা এইখানে যে, তিনি একাধারে ছিলেন সৃজনশীল ও মননশীল লেখক। পুরোপুরি সম্পৃক্ত ছিলেন আমাদের গ্রন্থভুবনের সঙ্গে। আমাদের রাজনীতির ব্যাখ্যাদাতা হিসেবেও তার গুরুত্ব স্মরণযোগ্য হয়ে আছে। শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য। তার ছাত্র এবং পরবর্তীকালে যারা শিক্ষক হয়েছেন, তাদের মুখেই শুনেছি তার কথা।
জন্মেছিলেন বরিশালের প্রত্যন্ত গ্রাম আটিপাড়ার ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারে। অন্নচিন্তায় তাদের দিন কাটত। প্রতিদিন তিনি সকালে পান্তা খেয়ে বাবাকে ফসলের মাঠে সাহায্য করার জন্য লাঙল নিয়ে মাঠে ছুটতেন। আজ তার জন্মশতবর্ষ। শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি তার প্রতি। নিজেই লিখেছিলেন, ‘কৃষকের সন্তানের কোনো ভবিষ্যৎ নেই!’ অথচ সেই তিনি চরম দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে হয়ে উঠেছিলেন আমাদের মননের বাতিঘর। আমাদের কালের প্রবাদপ্রতিম মনীষী, শিক্ষক, সমকালের সেরা বাঙালি দার্শনিক।