অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে ছাত্রসমাজ ঠিক করবে তারা কি ধরনের ভবিষ্যৎ চায়। আমরা যে ধরনের বিশ্ব গড়তে চাই তা করার ক্ষমতা আমাদের আছে। সকল মানুষের আছে। কিন্তু আমরা গৎবাঁধা পথে চলে যাই বলে নতুন পৃথিবীর কথা আমরা চিন্তা করি না। তিনি জোবরা গ্রামকে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখ করে বলেছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় তাকে এসব শিখিয়েছেন।
বুধবার (১৪ মে) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পঞ্চম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন জীবনের একটা মস্তবড় ঘটনা। সারাজীবন স্মরণ করে। ছবিটি সংরক্ষণ করে নিজের পরের প্রজন্মকে দেখায়। সেই বিশেষ দিনটি আজকে। এই দীর্ঘ সময় পরে এই সমাবর্তন অনুষ্ঠান হতে পারল এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন জানাই। দুর দুরান্ত থেকে যেসব শিক্ষার্থী এসেছে তাদেরকেও অভিনন্দন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সময়টা কত তাড়াতাড়ি চলে যায় বোঝা যায় না। যখন শেষ হয়ে যায় তখন মনে মনে কষ্ট লাগে। আনন্দের দিন শেষ হল। জীবনের বড় একটা অধ্যায় শেষ হল। নতুন অধ্যায় শুরু। আমার ব্যক্তিগত আনন্দ আজ অন্য বিষয়ে। তোমাদের সঙ্গে দেখা হওয়া সেটা অবশ্যই ভীষণ আনন্দের। এই ক্যাম্পাসে বহুবছর পর ফিরে আসা সেটাও আনন্দের ব্যাপার। তথাপি নতুন সনদ প্রাপ্তদের অভিনন্দন জানানো সেটাও আনন্দের।
স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ৭২ সালে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। তখন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলাম। তখন বুঝতে পারিনি কী পরিবর্তন হতে যাচ্ছে আমার ভিতরে। অত্যন্ত উৎসাহ সহকারে দায়িত্ব পালন করছিলাম। এরমধ্যে ৭৪ সালে বিরাট দুর্ভিক্ষ হয়ে গেল। সবকিছু উলটপালট হয়ে গেল। মনের মধ্যে বহু জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হল। মনে মনে ভাবলাম সারা বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ ঠেকানোর ক্ষমতা আমার নেই। আমি চেষ্টা করতে পাারি। বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র অংশের কয়েকটি পরিবারের দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে পারলে সেটা আমার জন্য কৃতিত্বের বিষয় হবে। যেকারণে নজর পড়ল পার্শ্ববর্তী গ্রাম জোবরায়। কী করবো জোবরাতে? সারাদেশে হাহাকার। জোবরাতে তখনো কেউ মারা যায়নি। অবস্থা খারাপ। মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জোবরা গ্রামের মাঝে অনেক জমি পড়ে আছে। সেখানে অনেক ফসল হওয়ার কথা। যাতে সারাবছরের সংস্থান হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করলাম, তারা জানাল ফসল হয় না। কেন হয় না? বৃষ্টি না হলে হয় না। উত্তরে জানালেন তারা। রাউজানে তখন সবেমাত্র ইরি ধান চাষ শুরু হয়েছে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়কে জিজ্ঞাসা করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কী।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় যদি জ্ঞানের ভাণ্ডার হয় সেই জ্ঞান পাশের গ্রামে উপচে পড়ে না কেন? তারা জানেনা কেন? কেউ কোন সদুত্তর দিল না। বা দেয়ার চেষ্টাও করল না। তখন আমি চিন্তা করলাম তাদের দিয়ে চাষাবাদ করা যায় কিনা। তখন তারা জানাল পানি নেই। রাউজানে ডিপটিউবওয়েল আছে। এখানে নেই। ডিপটিউবওয়েল তখন সবে দেশে এসেছে। শীতকালে চাষ অবিশ্বাস্য ছিল। মানুষ বিশ্বাস করতো যদি শীতকালে চাষাবাদের বিষয় থাকতো তাহলে আল্লাহতায়ালা শীতকালে বৃষ্টি দিতেন। আপনি জোর করে আল্লাহ এর হুমুক উল্টিয়ে দিয়েন না। আমি তাদের জন্য ডিপটিউবওয়েলের ব্যবস্থা করলাম। ফসল হল। পরের বছর জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তারা জানাল গতবছর চিটা ধান পেয়েছি। কারণ পানির টানাটানি ছিল। পর্যাপ্ত পানি পায়নি। একজন বলল এবার ডিপটিউবওয়েলে চাষ হবে না। আমরা বারমাসিয়া খাল থেকে পানি নেব। তখন এলাকাবাসী জানাল পাশের বারমাসিয়া খাল থেকে পানি নেয়া যায়। গিয়ে দেখলাম সেখানে পানি আছে। তাদের জিজ্ঞেস করলাম আল্লাহ এর পানি তো এখানে আছে চাষ করলেন না কেন? তারা জানাল এতদিন কেউ করেনি, তাই আমরাও করিনি। সবাই মিলে বাঁধ দিলাম। বাঁধে যে পানি এল তা ডিপটিউবওয়েলের চেয়ে অনেক বেশি পানি পাওয়া গেল। নতুন শিক্ষা লাভ হল। গরজ না থাকলে ইচ্ছে না থাকলে সবকিছু থাকা সত্ত্বেও অভাব থেকে যায়। জমি আছে, পানি আছে। চাষ করা যায়। কিন্তু কেউ করেনি কোনদিন আমরা কেন করবো? এর থেকে শিক্ষা লাভ হলো। এরপর জন্মলাভ করল তেভাগা খামার। এই চাষ সমস্যা হলো ইরি ধান চাষ করতে হলে লাইন ধরে রোপা লাগাতে হয়। কষ্ট করতে হয়। কৃষকরা বললেন বেশি কষ্ট। আমি বললাম, খাবার যখন খাবেন কষ্ট করবেন না।? অদ্ভুত একটা মানসিকতা। তখন আমি ছাত্রদের নিয়ে বসলাম। আমরা মাঠে নামি। সুতা ধরবো এবং চারা লাগাবে। ওই সময়ের আমার ছাত্র-ছাত্রীরা যারা ছিল তাদের সারাজীবন মনে থাকবে। দলে দলে তারা মাঠে নেমে লাইন করে ধানের চারা লাগাল। জোবরাতে আমরা ইরি ধানের চাষ শুরু করে দিয়ে আসছি। তার থেকে আসতে আসতে নজর পড়ল জোবরার আশপাশের গ্রামে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজ এই কথা বলছি, এই কারণে আমি এখানে এসেছি শিক্ষক হিসেবে। যতই দিন গেল দেখলাম আমি ছাত্র হয়ে গেছি। আমি আর শিক্ষকতার ভূমিকায় নাই। আমি ক্রমাগত শিখছি। জোবরা এবং আশপাশের মহিলারা আমার শিক্ষক। তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখলাম। আমার ছাত্র-ছাত্রীরা যারা আমার সঙ্গে ছিল। আজ অনেকেই উপস্থিত আছে। যারা মহিলাদের কাছে আমাকে নিয়ে গেল তাদের কাছ থেকে পাঠদান নেয়ার জন্য। অবাক হয়ে গেলাম। যা ক্লাশরুমে পড়াই তার সঙ্গে কিছুই মিল না। যে কাজে হাত দিলাম তা মহিলাদের কাছে অনেক পছন্দের বিষয় হয়ে গেল। তাদের ঋণ দিলাম। তাদের হাতে ৫ টাকা, ১০ টাকা দিলাম। ৫ টাকা ১০ টাকা যে মানুষের জীবনের এত আনন্দ আনতে পারে, কোনদিন ভাবিনি। আমি কোন মাগনা টাকা তাদেরকে দিচ্ছিলাম না। আমি তাদেরকে বললাম টাকা দিচ্ছি রোজগার করে আমার টাকা আমাকে ফেরৎ দেবেন। তাতেই তারা খুশি। অনেক কাহিনী তাদের কাছ থেকে শুনলাম। তারা নিজের নাম পর্যন্ত বলতে পারেনা। আমাদের সমাজ মহিলাদের তার নিজের নাম শেখার বা জানারও সুযোগ দেয়নি। ছোটবেলায় অমুকের, মেয়ে, বিয়ে হলে অমুকের বউ, মা হলে অমুকের মা। সে যে কে সে নিজেও জানেনা। আমরা প্রথম চেষ্টা করলাম তার নাম বের করার। যাতে করে সে সেটা লিখতে পারে। আমার ছাত্রীরা তাদের লেখা শেখাতে গিয়ে তার জীবনের অনেক কাহিনী আসল।
এর থেকে আমি একটা সিদ্ধান্তে আসলাম এবং সভা সমিতিতে বললাম ঋণ মানুষের মানবিক অধিকার। সবাই হাসাহাসি করেন। আপনি ঋণের কথাও বলেন, অধিকারের কথাও বলেন। ইকোনোমিকসে তো অধিকারের কথা নেই। তাও আবার মানবিক অধিকার। আপনি কোন সাবজেক্টে লেখাপড়া করেন। অনেক খটকা। একটা খটকার পর আরেকটা খটকা। তারপর বললাম আমরা দারিদ্রকে জাদুঘরে পাঠাব। বলে আপনি কে জাদুঘরে পাঠানোর। আমি বললাম আমি আপনার মতই একজন মানুষ। আমি পাঠাইতে চাই, আপনি বাধা দিতে চাইলে বাধা দেন। তখন আমাকে বলা হল, আপনি কে, এটা তো সরকারের কাজ। তাহলে আমি আমার কাজ করতে থাকি। সরকার বাধা দিলে তখন দেখবো।
জোবরার মহিলাদের কাছ থেকে নতুন অর্থনীতি শেখা আরম্ভ করলাম। সে হিসেবে জোবরা আমার নতুন বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড়িয়ে গেল। আজ পর্যন্ত যা কিছু করে যাচ্ছি, এই জোবরা থেকে যা শিখেছি তারই বহি:প্রকাশ। এখন যে অর্থনীতি আমরা পড়াচ্ছি তা ব্যবসার অর্থনীতি। মানুষের অর্থনীতি না।
তিনি বলেন, যেকোন অর্থনীতি যদি শুরু করতে হয় মানুষকে দিয়ে করতে হয়। ব্যবসাকে দিয়ে নয়। আজকে যে শুরুটা হল সেই শুরুটা আমাদের ভুল পথে নিয়ে গেল। আমরা এক ব্যবসাকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে তুললাম। এই সভ্যতা আত্মঘাতি সভ্যতা। এটা টিকবে না। ওইযে, যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়াশোনা শুরু করলাম, সেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে বলল এই বিদ্যার পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। এর থেকে রেহাই পাওয়ার কোন উপায় নেই। তখন আরো বড় আকারের জিনিসের মধ্যে ঢুকলাম। বললাম, আমাদের নতুন সভ্যতা গড়তে হবে। আমি ভাবলাম এটা বললে তো আমার সহকর্মী যারা আছেন, যারা অথর্নীতি পাঠদান করেন, লেখালেখি করেন তারা আমাকে অনেক আগেই ত্যায্য করেছে। তারা একেবারেই শেষ করে দেবে। এর সাথে কথা বলার দরকার নেই।
কিন্তু ওই নতুন শিক্ষাপ্রাপ্ত ছাত্র আমার মাথায় সেটা রয়ে গেল। আমাদেরকে নতুন সূত্রে যাত্রা শুরু করতে হবে। যে অর্থনীতির ভিত্তি হবে মানুষ। যে অর্থনৈতিক ভিত্তি হবে তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা। ভবিষ্যত চিন্তাধারা। কিভাবে সে নিজেকে আবিষ্কার করবে। যেদিকে তাকে ছুটিয়ে দেয়া হয়েছে তার থেকে বের করে আনা। এগুলো সমস্ত কিছুর বীজ বপন হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের বিশ্ববিদ্যালয় জোবরা থেকে। সেজন্য আমি জোবরার কাছে কৃতজ্ঞ। চবির কাছে কৃতজ্ঞ যেহেতু এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে জায়গা দিয়েছে। এরপর যে একটা নোবেল পুরস্কার পাব সেটা কল্পনা করিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যখন পরিচয় দেয় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নোবেল পুরস্কার পেয়েছি। গৌরব করে।
ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় গৌরব করে, আমি তাদের ছাত্র ছিলাম। আমি তাদের বলি চবির গৌরব করার কারণ দুইটি। পুরো কর্মসূচি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার গোড়াপত্তন হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহচর্যে।
গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে ড. ইউনুস বলেন, আসলে এই বিশ্ববিদ্যালয় দুটি নোবেল পুরস্কারের জন্য গৌরব বোধ করতে পারে। একটিতো হলো আমি ব্যক্তিগতভাবে নোবেল পেয়েছি। দ্বিতীয়ত হল যে গ্রামীণ ব্যাংক সৃষ্টি হল সেটির গোড়াতেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রামীণ ব্যাংকের আইনে পরিস্কারভাবে লেখা আছে গ্রামীণ ব্যাংক কোথা থেকে আসল। ব্যাংকের জন্ম হল চবি অর্থনীতি বিভাগে সেটি পরিস্কার লেখা আছে। কাজেই দুটো নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস নিজেদের ছাত্রছাত্রীদের জানাতে পারে।
পাঠদান ও গবেষণা কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে ছাত্রসমাজ ঠিক করবে তারা কি ধরনের ভবিষ্যৎ চায়। আমরা যে ধরনের বিশ্ব গড়তে চাই তা করার ক্ষমতা আমাদের আছে। সকল মানুষের আছে। কিন্তু আমরা গৎবাঁধা পথে চলে যাই বলে নতুন পৃথিবীর কথা আমরা চিন্তা করি না। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবসময় যেন এটা মনে রেখে পাঠদান ও গবেষণা কর্মসূচি চালু রাখে। আমি খন্ডিত বিষয়ে গবেষণা চালানোর জন্য নিয়োজিত নই। প্রত্যেকটি গবেষণার পেছনে আমাদের উদ্দেশ্য হল সমস্ত বিশ্বকে মনের মতো করে সাজানো। আমাদের যদি সেই লক্ষ্য না থাকে তাহলে গন্তব্যবিহীন গবেষণা ও শিক্ষাতে পরিণত হবে।
আমরা যেভাবে বিশ্ব গড়তে চাই সেভাবেই বিশ্ব গড়তে পারি। আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে গড়তে হবে এমন কোন কথা নেই। আমি আমার কথাটা বলে যাচ্ছি। অন্যরা অন্যদের কথা বলবে। তোমরা তোমাদের কথা বলবে। কিন্তু নিজের মনের একটা স্বপ্ন থাকতে হবে। আমরা কি ধরনের বিশ্ব চাই, কি ধরনের সমাজ চাই, কি ধরনের সংসার চাই কি ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চাই । এগুলো মনের মাধুরি মিশিয়ে আমাদেরকে বের করে নিতে হবে।
আজকে দুই বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং মহিলাদের যে বিশ্ববিদ্যালয় আমার জন্য সৃষ্টি হয়েছিল জোবরা এবং আশপাশের গ্রামে। তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চবি উপাচার্য ড. ইয়াহ্ইয়া আখতার। এসময় উপস্থিত ছিলেন মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ, চবি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান এবং উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) মো. কামাল উদ্দিন প্রমুখ।