যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) সালমান এফ রহমানের ছেলে আহমেদ শায়ান এফ রহমান এবং তার চাচাতো ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রহমানের ৯ কোটি (৯০ মিলিয়ন) পাউন্ড মূল্যের সম্পদ জব্দ করেছে। শুক্রবার (২৩ মে) ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সরকারি নথি অনুযায়ী এনসিএ মোট ৯টি সম্পত্তি জব্দের আদেশ পেয়েছে। এর ফলে এসব সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর আপাতত সম্ভব নয়। জব্দ করা সম্পত্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে লন্ডনের অভিজাত গ্রোসভেনর স্কয়ারে অ্যাপার্টমেন্ট এবং উত্তর লন্ডনের গ্রেশাম গার্ডেনসের বাড়ি।
সালমান এফ রহমান ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। বলা হয়ে থাকে শেখ হাসিনার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি।
শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে আত্মগোপেনে ছিলেন সালমান এফ রহমান। পরে দেশ ছেড়ে পালানোর সময় গ্রেপ্তার হন তিনি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে। এখন তিনি কারাগারে রয়েছেন।
ব্রিটিশ সরকারের নথিপত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ক্ষমতা হারানো বাংলাদেশের সাবেক শাসকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদের অনুসন্ধানে সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্যের ওপর চাপ বাড়তে থাকার মধ্যেই এনসিএ সম্পদ জব্দের ৯টি আদেশ দিয়েছে।
এসব আদেশের মধ্যে রয়েছে আহমেদ শায়ান এফ রহমান এবং তার চাচাতো ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রহমান সম্পদ বিক্রি করতে পারবেন না। জব্দ করা সম্পদের মধ্যে লন্ডনের গ্রোসভেনর স্কয়ারের অ্যাপার্টমেন্টও রয়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ যাদের যুক্তরাজ্যে সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে এই দুজনের নাম পাওয়া গেছে।
কাগুজে কোম্পানি খুলে লন্ডনে টাকা পাচার এবং ঋণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান ও ভাতিজা আহমেদ শাহরিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গত ১৩ মার্চ দায়ের করা ওই মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ৭৬ কোটি টাকা পাচার এবং ব্যাংকঋণের ৩৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে, যাতে মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের সাতজন কর্মকর্তা রয়েছেন। দুদকের আবেদনে আদালত গত ১০ মার্চ সালমান ও তার ছেলে শায়ানের নামে লন্ডনে থাকা দুটি বাড়ি জব্দের আদেশ দেন।
খবরে বলা হয়েছে, দুই দিন আগে শায়ান রহমানের লন্ডনের দুটি অ্যাপার্টমেন্ট অবরুদ্ধের আদেশ পায় যুক্তরাজ্যের এনসিএ।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দুই সম্পত্তির মধ্যে লন্ডনের গ্রোসভেনর স্কয়ারে একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ২০১০ সালে ৬৫ লাখ পাউন্ডে কেনা হয়। এখন শায়ানের সঙ্গে তার চাচাতো ভাই শাহরিয়ারের সম্পদ জব্দেরও খবর পাওয়া গেল।
যেসব সম্পদ জব্দের আদেশ হয়েছে সেগুলো ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, আইলম্যান অথবা জার্সির মতো কোম্পানির মাধ্যমে কেনা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
গত বছর দ্য গার্ডিয়ান এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে শায়ান ও শাহরিয়ারের সম্পদ অনুসন্ধান শুরু করে। সেই অনুসন্ধানে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠদের ৪০ কোটি পাউন্ডের সম্পদের খোঁজ মেলে।
এনসিএ যেসব সম্পদ জব্দ করেছে তার মধ্যে উত্তর লন্ডনের গ্রেশাম গার্ডেনসের একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এর আগে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস শায়ানের যে দুটি অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ পায় তার মধ্যে গ্রেশাম গার্ডেনসের একটি অ্যাপার্টমেন্টও রয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের বরাতে জানা যায়, শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানাও লন্ডনের একটি জব্দ হওয়া বাড়িতে বসবাস করেছেন। শেখ রেহানা হচ্ছেন ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের মা। সাম্প্রতিক সময়ে টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের সিটি মিনিস্টার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
এই দুটি সম্পদ ৭৭ লাখ পাউন্ডে কেনা হয়েছে বলে জানিয়েছিল ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তার বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্যের নীতিবিষয়ক পরিচালক ডানকান হেমস বলেন, ‘আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে তাদের তদন্ত চালু রাখতে এবং অবিলম্বে সব সন্দেহজনক সম্পদ জব্দের আহ্বান জানাই।’
এনসিএর একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমরা নিশ্চিত করতে পারি, চলমান সিভিল তদন্তের অংশ হিসেবে এনসিএ বেশ কয়েকটি জব্দ আদেশ পেয়েছে।’
তবে এর আগে শায়ানের একজন মুখপাত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের মক্কেল কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না, এসব অভিযোগ তিনি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছেন। যুক্তরাজ্যে যেকোনো ধরনের তদন্তে তিনি পূর্ণ সহযোগিতা করবেন।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউকের নীতিনির্ধারণ পরিচালক ডানকান হেমস বলেন, যুক্তরাজ্যের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উচিত, সংশ্লিষ্ট সব সন্দেহভাজন সম্পদের ওপর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
এনসিএর এক মুখপাত্র বলেন, ‘একটি বেসামরিক তদন্তের অংশ হিসেবে আমরা বেশ কিছু সম্পত্তি জব্দের আদেশ জারি করেছি।’
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আহমেদ শায়ান রহমানের পক্ষে একজন মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের মক্কেল জোরালোভাবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং যুক্তরাজ্যে যদি কোনো তদন্ত হয়, তিনি পূর্ণ সহযোগিতা করবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে এবং বহু মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। আমরা আশা করি যুক্তরাজ্য এই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করবে।’
দ্য গার্ডিয়ান এ বিষয়ে সালমান এফ রহমানের পারিবারিক করপোরেট গ্রুপ বেক্সিমকো ও রহমান পরিবারের আইনজীবীদের মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করেছে।